আপনার এরকম ধারণা?
জি। গাড়ি যখন খাদে পড়ল তখন যদি হৈচৈ করে আপনার ঘুম ভাঙাতাম, খুব অস্থির হয়ে যেতাম সেটা আপনার অনেক বেশি পছন্দ হত। মীরু বলল, ঝুম বৃষ্টিতে গাড়িতে বসে গরম চা খাচ্ছি, সিঙাড়া খাচ্ছি। এটা আমার বেশ পছন্দ হচ্ছে। চা খাবার পর আমরা কি গাড়িতে বসে থাকব নাকি গাড়ি খাদ থেকে উঠানাের ব্যবস্থাও আপনি করে রেখেছেন?
নাসের হাসিমুখে বলল, চা খাবার পর আপনাকে নিয়ে একটা মাইক্রোবাসে উঠব। মাইক্রোবাস আনানাে হয়েছে। আমার লােকজন মাইক্রোবাসে বসে আছে। তারা এসে খাদে পড়া গাড়ি তুলবে। আমরা মাইক্রোবাস নিয়ে চলে যাব।
মীরু ছােট্ট নিঃশ্বাস ফেলে বলল, আপনি ঠিকই বলেছেন। এত গােছানাে মানুষ মেয়েরা পছন্দ করে না। যখন গরম চা খাচ্ছিলাম তখন আপনাকে ভালাে লাগছিল । বিপদ থেকে উদ্ধারের সব ব্যবস্থা করে রেখেছেন শুনে আর ভালাে লাগছে না। এখন আপনাকে রােবট রােবট লাগছে।
নাসেরের অফিসের লােকজন ছাতা হাতে চলে এসেছে। মীরু কিছুক্ষণ ভুরু কুঁচকে তাদের দেখল । তারপর নাসেরের দিকে তাকিয়ে বলল, আমার কেন জানি গাড়ি থেকে নামতে ইচ্ছা করছে না। আমি কি আরেক কাপ চা খেয়ে তারপর নামতে পারি?
অবশ্যই পারেন।
নাসের কাপে চা ঢেলে এগিয়ে দিল। মীরু বলল, আপনাকে অন্যরকম লাগছে । কেন অন্যরকম লাগছে বুঝতে পারছি না।
নাসের বলল, আমাকে অন্যরকম লাগছে কারণ আমি আমার টাক মাথা ঢেকে ফেলেছি। ক্যাপ পরেছি।
মীরু বলল, আশ্চর্য! এই ব্যাপারটা আমি লক্ষ্য করলাম না কেন?
নাসের বলল, আপনার পর্যবেক্ষণ শক্তি খুব ভালাে বলে আপনি লক্ষ্য করেননি। যাদের পর্যবেক্ষণ শক্তি খুব ভালাে তারা প্রায়ই খুব কাছের জিনিস দেখতে ভুল করে।
রোদনভরা এ বসন্ত (পর্ব-১২)
মীরু নাসেরের দিকে তাকিয়ে আছে। নাসের কি কোনাে বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে কথাগুলি বলেছে? সে-রকম মনে হচ্ছে না। আবার কেন জানি মনে হচ্ছে। মীরু বলল, ভালাে কথা, আপনি কি আমার নাম জানেন?
আপনার নাম মীরু।
মীরু আমার নাম ঠিকই আছে কিন্তু এই নামটা আমার অপছন্দের। আমার পছন্দের নাম ঐন্দ্রিলা । আমার চা খাওয়া শেষ হয়েছে। এখন আমি নামব।
নাসের বলল, আমরা কি আরেকবার বারসাত সাহেবের মেসে খোজ নিয়ে দেখব। উনি ফিরেছেন কি না।
মীরু ক্লান্ত গলায় বলল, না আমি বাসায় যাব। আপনার মাথা ধরা কি কমেছে? হ্যা কমেছে। যে ভাবে ভুরু কুঁচকে আছেন মনে হচ্ছে না মাথা ধরা কমেছে।
কমলেও সমস্যা নেই। আমি চাচ্ছি না আপনি মাথা ধরা নিয়ে বাসায় যান । কি বলতে চাচ্ছেন পরিষ্কার করে বলুন। নাসের শান্ত গলায় বলল, আপনার সঙ্গে হয়ত আমার আর দেখা হবে না । আমাদের শেষ দেখায় হাইফেনের মত থাকবে মাথাব্যথা। এই হাইফেনটা না থাকলে হয় না।
মীরু বলল, আমাকে বাসায় নামিয়ে দিন। আমার কথা বলতে ভাল লাগছে না।
বারসাতের মুখের ওপর অনেকক্ষণ ধরে দুটা মাছি ভন ভন করছে। একটা বড় একটা ছােট। বড়টার রঙ ঘন নীল। বারসাত বিস্মিত চোখে মাছি দুটার দিকে তাকিয়ে আছে। বৃষ্টি–বাদলার সময় মাছি উড়ে না। বৃষ্টি শুরু হলেই মাছিরা যে যেখানে আছে সেখানে ঝিম ধরে বসে থাকে। বৃষ্টির পানি পাখায় লাগলে মাছিদের উড়তে অসুবিধা হয় বলেই তাদের এত সাবধানতা।
অথচ এই মাছি দুটা উড়েই যাচ্ছে। বাইরে মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে সেদিকেও তাদের নজর নেই। তারা উড়ে উড়ে জানালা পর্যন্ত যাচ্ছে আবার ফিরে এসে বারসাতের নাকের কাছাকাছি ওড়াউড়ি করছে। বারসাতের কেন জানি মনে হচ্ছে এই মাছি দুটার একটা (বড়টা যেটার গায়ের রঙ ঘন নীল ।) তার নাকের ফুটো দিয়ে ঢুকে পড়ার চেষ্টায় আছে। যে কোনাে মুহর্তে এই কাজটা সে করবে।
রোদনভরা এ বসন্ত (পর্ব-১২)
খুবই অদ্ভুত চিন্তা–ভাবনা। মাছিরা এমন কাজ কখনাে করবে না। তারা জাপানি কামাকাজি পাইলট না। বারাসাত তাদের শত্রুও না। তারপরেও সে এই চিন্তা মাথা থেকে দূর করতে পারছে না। জ্বর বেশি হলে মানুষের মাথায় উদ্ভট চিন্তা আসে। বারসাতের গায়ে জ্বর । বেশ ভালােই জ্বর। মাথার ভেতর এরােপ্লেন চলার মতাে শব্দ হচ্ছে। জ্বর খুব বেড়ে গেলে মাথার ভেতর এরােপ্লেন চলার মতাে শব্দ হয়। এরকম জুর–তপ্ত মাথায় উদ্ভট চিন্তা আসতেই পারে। | বারসাত শুয়ে আছে তার দূর–সম্পর্কের মামার বাগানবাড়িতে। বাড়ির নাম ‘পদ্ম‘। কাঠের একতলা বাড়ি। বড় বড় জানালা। জানালা খুললেই
চোখে পড়ে বাড়ির পেছনের পদ্ম পুকুর। পুকুরে সত্যিকার পদ্ম ফুটে আছে। মীরু এই বাড়ি দেখলে মুগ্ধ হত। সেটা সম্ভব হল না। মীরু আসেনি, বারসাতকে একা আসতে হয়েছে। বারসাত তিন বেহালাবাদক ঠিক করে রেখেছিল। এরা পদ্ম নামের বাড়ির উঠানে বসে থাকবে। বারসাত এবং মীরুর বাড়ির গেট দিয়ে ঢুকতে দেখলে বেহালায় বাজাতে থাকবে—
লীলাবালী লীলাবালী।
বড় যুবতী কন্যা কি দিয়া সাজাইতাম তরে?
Read more