হুমায়ন আহমেদ এর রোদনভরা এ বসন্ত শেষ পর্ব

বৌ সঙ্গে সঙ্গে বলল, এত অবাক হচ্ছেন কেন মা? পিপড়া চায়ে ভাসবে এটাই তাে স্বাভাবিকপিপড়া চায়ের চেয়ে হালকাআর্কিমিডিসের সূত্র অনুসারে সে ভাসছে। একটা মার্বেল চায়ে ছেড়ে দিয়ে দেখা যাবে মার্বেল ডুবে গেছে। মা একটা মার্বেল ছেড়ে দেখাব?

রোদনভরা এ বসন্ত 

মীরু হাসছেহাসি থামানাের চেষ্টা করেও পারছে না। যতই সে হাসি থামানাের চেষ্টা করছে ততই হাসি বাড়ছে। আশেপাশের লােকজন কৌতূহলী চোখে তাকাচ্ছেনাসের বলল, আরেকটা বলব? এরচেকড়া ডােজের? 

মীরু বলল, আর লাগবে নাআপনি সিঙাড়া নিয়ে আসুন। 

নাসের বলল, আরেকটা বলিএটা বলে আমি খাবার আনতে চলে যাবআপনি একা একা হাসতে থাকবেন। আশা করছি এর মধ্যে বারসাত 

ঘড়িতে পাঁচটা বাজেআকাশ মেঘে মেঘে কালাে হয়ে আছেমীরু বলল, বলুন তাে বৃষ্টি কখন নামবে? 

নাসের বলল, বলতে পারছি নাআকাশের অবস্থা দেখে মনে হচ্ছেএক্ষুনি বৃষ্টি নামবে। 

মীরু বলল, আমি লক্ষ্য করেছি আকাশে যেদিন খুব মেঘ হয় সেদিন বৃষ্টি হয় নাতবে আজ হবেবাতাসে বৃষ্টির গন্ধ চলে এসেছে। 

নাসের বলল, আর কতক্ষণ অপেক্ষা করতে চান

বৃষ্টি নামা পর্যন্ত অপেক্ষা করবআমি আপনার সারাটা দিন নষ্ট করলামসরিএক কাজ করুন, আপনি চলে যানআমার একা অপেক্ষা করতে কোনাে সমস্যা নেই| নাসের বলল, আপনার যদি একা অপেক্ষা করতে ইচ্ছা করে তাহলে অবশ্যই একা অপেক্ষা করবেনআমি চলে যাবসে-রকম কোনাে ইচ্ছা যদি না থাকে তাহলে অপেক্ষা করব। 

রোদনভরা এ বসন্ত শেষ পর্ব

মীরু বলল, বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে নাবৃষ্টির একটা ফোঁটা গায়ে পরা মাত্রই আমি রওনা হব । 

নাসের বলল, আপনি মােটেও চিন্তা করবেন নাআমি লােক লাগিয়ে দিয়েছি উনি কোথায় আছেন সেই খোজ আজ রাতের মধ্যে বের করে ফেলব। 

পরিশিষ্ট 

মীরু জবাব দিল নাআকাশের দিকে তাকিয়ে থাকলনাসের বলল, সময় কাটানাের জন্যে একটা মজার খেলা আছেএই খেলাটা খেলবেন? আপনাকে দেখে মনে হচ্ছে আপনার সময় কাটছে নাভিতরে ভিতরে আপনি ছটফট করছেন খেলাটা খেলবেন

কী খেলা? 

আমি একটা শব্দ বলবশব্দটা শােনার সঙ্গে সঙ্গে আপনার মনে যে শব্দটা আসবে আপনি সেটা বলবেনআপনার কাছ থেকে শব্দটা শােনার পর আমামনে যা আসবে তা বলবএরকম চলতে থাকবে। 

শেষ হবে কখন? 

যেখান থেকে শুরু করেছি সেখানে পৌঁছার পর শেষ হবেআসুন শুরু করিআমি বলছি প্রথম শব্দবৃষ্টিবৃষ্টি শব্দটা শুনে আপনার মনে যে শব্দটা আসবে সেটা বলুন। 

মীরু : অশ্রুনাসের : নদীমীরু : নৌকার পালনাসের : নীল আকাশমীরু : আকাশে মেঘনাসের : ঝড়। মীরু :বৃষ্টি। 

রোদনভরা এ বসন্ত শেষ পর্ব

নাসের বলল, খেলা শেষ। আমরা বৃষ্টি দিয়ে শুরু করেছিলাম আবার বৃষ্টিতে ফিরে এসেছি। 

মীরু বলল, বৃষ্টি নামতেও শুরু করেছেকয়েক ফোঁটা আমার গায়ে পড়েছেচলুন যাওয়া যাক। 

মীরুর চোখ ভর্তি পানিসে চোখের পানি আড়াল করার কোনাে চেষ্টা করছে না। 

নাসের দুঃখিত গলায় বলল, ঐন্দ্রিলা আপনি নিশ্চিত থাকুন আমি আজ রাতের মধ্যে বারসাত সাহেবের খবর বের করব। 

মেয়েটির চেহারা অত্যন্ত মিষ্টিচোখ বুদ্ধিতে ঝলমল করছেসে এসেছে তার বিয়েতে আমাকে দাওয়াত করতেআমি বললাম, তােমার নাম কী

মেয়েটি বলল, আমার চারটা নাম, মরিয়ম, মীরু, ঐন্দ্রিলা এবং ঐআমি বললাম, চার নামের মেয়ে আমি এই প্রথম দেখলাম। 

মেয়েটি বলল, চারটা নামের মধ্যে কোন নামটা আমার সঙ্গে সবচেভালাে যায় । 

আমি বললাম, মরিয়ম নামটা সবচেভালাে যায়মরিয়ম নামের মধ্যে কোমল একটা ব্যাপার আছেতােমার মধ্যেও কোমলতা আছে। 

আমার মধ্যে কোনােই কোমলতা নেইআমি খুবই কঠিন একটা মেয়ে। যাই হােক আমি কঠিন না কোমল তা নিয়ে আমার মাথা ব্যথা নেইআমার বিয়েতে কিন্তু আপনাকে আসতে হবেশুক্রবারে বিয়ে শুক্রবারে আপনি কোনাে কাজ রাখতে পারবেন না । 

তােমার বিয়েতে আমাকে আসতে হবে কেন? 

কারণ আমার জীবনটা অবিকল আপনার লেখা একটা উপন্যাসের মতাে। উপন্যাসের নায়িকা গােপনে একটা ছেলেকে বিয়ে করার জন্যে কাজি অফিসে যায়ছেলেটা কিন্তু আসে নামেয়েটা কাঁদতে কাঁদতে ফিরে আসেতার বিয়ে হয় অন্য আরেকজনের সঙ্গে

রোদনভরা এ বসন্ত শেষ পর্ব

তার জীবন কাটে কাদতে কাদতেউপন্যাসের কথা কি আপনার মনে পড়েছে ? 

ছেলেটা আসে না কেন? ছেলেটা খুবই অসুস্থ ছিলতার হয়েছিল হেপাটাইটিস বি ডাক্তাররা সন্দেহ করেছিলেন তার লিভার সিরােসিস হয়েছেএক ধরনের ক্যানসার কাজেই তার মনে হল দুদিন পরে সে মারা যাচ্ছে এই অবস্থায় একটা মেয়েকে বিয়ে করে তার জীবন সে নষ্ট করতে পারে 

কাজেই বিয়ের দিন সে পালিয়ে গেল গ্রামেএখন কি আপনার মনে পড়েছে

হা মনে পড়েছে। 

উপন্যাসের নাম রােদনভরা বসন্ত। 

আমি বললাম, তুমিও কি সেই উপন্যাসের নায়িকার মতাে অন্য একটা ছেলেকে বিয়ে করছ

না আমি অসুস্থ ছেলেটাকেই বিয়ে করছি। তাকে গ্রাম থেকে ধরে আনা হয়েছে। আমার এক বন্ধু নাসের নাম উনি তাকে তার বাড়িতে গৃহবন্দি করে রেখেছেন। 

ইন্টারেস্টিং তাে! 

অবশ্যই ইন্টারেস্টিং। আমাদের বিয়েতে আপনি উপস্থিত থাকবেনএবং উপন্যাসের শেষটা পাল্টে দেবেনছেলেটার অসুখ অবশ্যই সারিয়ে দেবেনউপন্যাসের নায়ক-নায়িকা যেন খুব সুখে জীবন কাটায়। 

তাহলে তাে উপন্যাসের নামও পাল্টাতে হয়মিলনান্তক উপন্যাসের নাম রােদনভরা বসন্ত হতে পারে না। 

নাম পাল্টানাের দরকার নেইআমি সারা জীবন কাঁদতে রাজি আছি কিন্তু বারসাতকে হারাতে রাজি না। 

মেয়েটি কাঁদছেতার চোখ দিয়ে টপ টপ করে পানি পড়ছেসুন্দর লাগছে দেখতে। 

আমি বললাম, আমার উপন্যাসের নায়ক সুন্দর ছবি আঁকততােমার এই ছেলে বারসাত কি ছবি আঁকতে পারে? 

ঐন্দ্রিলা চোখ মুছতে মুছতে হাসূচক মাথা নাড়ল। 

তার চেহারা থেকে কান্না চলে গেছেসে এখন আনন্দে ঝলমল করছেএই মেঘ এই রৌদ্র

 

Read more

সত্যজিৎ রায় এর নয়ন রহস্য (পর্ব-১)

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *