তিনি তার পরেও বললেন, ‘আসুন, আসুন।
বুড়ি ঘরে ঢুকল না। দরজার ওপাশ থেকেই বলল, ‘আপনার কি মাথা ধরা আছে?
‘এখন নেই। রােজই সন্ধ্যা থেকে শুরু হয়। আজ এখনাে কেন যে শুরু হচ্ছে না বুঝতে পারছি না।’
বুড়ি হাসতে হাসতে বলল, “মনে হচ্ছে মাথা না–ধরায় আপনার মন খারাপ হয়ে গেছে। স্যার, আমি কি বসব?
‘বসুন, বসুন। আমাকে স্যার বলছেন কেন তা তাে বুঝতে পারছি না!”
‘আপনি শিক্ষক–মানুষ, এই জন্যেই স্যার বলছি। ভালাে শিক্ষক দেখলেই ছাত্রী হতে ইচ্ছা করে।’
‘আমি ভালাে শিক্ষক, আপনাকে কে বলল ।
কেউ বলে নি। আমার মনে হচ্ছে। আপনি কথা বলার সময় খুব জোর দিয়ে বলেন। এমনভাবে বলেন যে, যখন শুনি মনে হয় আপনি যা বলছেন তা মনে প্রাণে বিশ্বাস করেন বলেই বলছেন। ভালাে শিক্ষকের এটা হচ্ছে প্রথম শর্ত।
‘দ্বিতীয় শর্ত কী?
‘দ্বিতীয় শর্ত হচ্ছে জ্ঞান। ভালাে শিক্ষককে প্রচুর জানতে হবে এবং ভালােমতাে জানতে হবে।’
‘আপনি নিজেও কিন্তু শিক্ষকের মতো কথা বলছেন।
বুড়ি বলল আমার জীবনের ইচ্ছা কী ছিল জানেন? কিন্ডার গার্টেনের শিক্ষিকা হওয়া। ফ্রক–পরা ছােট–ছােট ছেলেমেয়ে ঘুরে বেড়াবে, আমি তাদের পড্রাব, গান শেখাব। ব্যথা পেয়ে কাঁদলে আদর করব। অথচ আমি কী হয়েছি দেখুন—একজন অভিনেত্রী। আমার সমস্ত কর্মকাণ্ড বয়স্ক মানুষ নিয়ে। আমার জীবনে শিশুর কোনো স্থান নেই। স্যার, আমি কী বকবক করে আপনাকে বিরক্ত করছি?
অনীশ-পর্ব-(৪)
‘না, করছেন না।
‘আপনি আমাকে তুমি করে ডাকলে আমি খুব খুশি হব। আপনি আমাকে তুমি করে ডাকবেন, এবং নাম ধরে ডাকবেন। প্লীজ।
‘বুড়ি ডাকতে বলছ?
‘হ্যা, বুড়ি ডাকবেন। আমার ডাক নামটা বেশ অদ্ভুত না? যখন সত্যি–সত্যি বুড়ি হব, তখন বুড়ি বলে ডাকার কেউ থাকবে না।’
মিসির আলি বললেন, ‘তুমি কি সবসময় এমন গুছিয়ে কথা বল ?
আপনার কী ধারণা?
আমার ধারণা ভুমি কম কথা বল। যারা কথা বেশি বলে, তারা গুছিয়ে কিছু বলতে পারে না। যারা কম কথা বলে, তারা যখন বিশেষ কোনাে কথা বলতে চায়, তখন খুব গুছিয়ে বলতে পারে। আমার ধারণা তুমি আমাকে বিশেষ কিছু বলতে চাচ্ছ।’
‘আপনার ধারণা সত্যি নয়। আমি আপনাকে বিশেষ কিছু বলতে চাচ্ছি না। আগামীকাল আমার অপারেশন। ভয়ভয় লাগছে। ভয় কাটানাের জন্যে আপনার সঙ্গে গল্প করতে এসেছি।
‘ভয় কেটেছে?
অনীশ-পর্ব-(৪)
কাটেন তবে ভুল যাই। আমার এখান থেকে যাবার গরম পানিতে গোসল করব। আয়াকে গরম পানি আনতে বলেছি। গােসলের পর কড়া ঘুমের ওষুধ খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ব।।
মিসির আলি হাই তুললেন। মেয়েটির কথা এখন আর শুনতে ভালাে লাগছে না। তাকে বলাও যাচ্ছে না—তুমি এখন যাও। আমার মাথা ধরেছে। মাথা সত্যি সত্যি ধরল–-বলা যেত। মাথা ধরে নি।
আপনি কি তৃত বিশ্বাস করেন স্যার? মিসির আলি হেসে ফেলে বললেন, গমটা বল।
কোন গল্পটা বলব?‘ | ‘কেউ যখন জানতে চায়, আপনি কি ভূত বিশ্বাস করেন, তৎ তার মাথায় একটা ভূতের গল্প থাকে। ঐটা সে শোনাতে চায়। তুমিও চাচ্ছি।
‘আপন ভল করেছেন। আমি আপনাকে কোনাে গল্প শােনাতে চাচ্ছি । কোনাে ভৌতিক গল্প আমার জানা নেই।
আর একটা কথা, আপনি দয়া করে ও আচ্ছা‘ বা লবেন না, এবং নিজেকে বেশি বদ্ধিমান মনে করবেন না।‘
বুড়ি, তুমি রেগে যাচ্ছ।‘ আমাকে তুমি–তুমি করে বলবেন না,
বুটি উঠে দাঁড়াল এবং প্রায় ঝড়ের চুল সড় চলে গেল। মিসির আলি দীঘনিঃশ্বাস ফেললেন। তাঁর মনে হল, এই মাত্র মেয়েদের মধ্যেই বিপরীত শুণাবলীর দর্শনীয় সমাবেশ ঘটয়েছে।
অনীশ-পর্ব-(৪)
মেয়েকে যেত সবসময়ই সন্তান ধারণ করতে হয়, সেহেতু প্রকৃতি তাকে করল—স, ধীর হির! একই সঙ্গে ঠিক একই মাত্রায় তাকে মল–মশত, অধীর, হির। তি এইসব হিসাব–নিকাশ খুব মজার।
খে মনে হয় পরিহাসপ্রিয় প্রবৃত্ত সই মজার খেলা খেলছে।
মিসির আলি বই খুলবেন, মত পরের জগৎ সম্পর্কে মিখ সাহেবের বও পড়া যাক। | ‘ল দেহের ভেতর লুকিয়ে আছে মানুষের সূক্ষ্ম দেহ! সেই দেহকে বলে বাইওলামিক বড়ি! ফুলদৃষ্টিতে সেই দেহ দেখা যায় না। স্কুল দেহের বিনাশ হলেই সম্মা দেহ বা বাইক ও স্কুল দেহ থেকে আলাদা হয়ে যায়। সূক্ষ দেহ শক্তির মতাে শক্তির যেমুন মাশ নেই–সূক্ষ দেহেরও তেমনি বিনাশ নেই! সূক্ষ্ম দেহের তবধর্ম আজ। দূৈর্ধ, মুল দেহের কামনা–বাসনার সঙ্গে সম্পর্কিত। যার কামনা–– বাসনা পুলিশ এর অঙ্গদৈব তত বেশি।
মিশালি বই বন্ধ করে দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেললেন। মিথ নামের এই লােহ বৈজ্ঞানিক শক ব্যবহার করে তাঁর গ্রন্থটি তারিক্তি করার চেষ্টা করেছেন। নিজের বিভ্রান্তি ছড়িয়ে দিতে চেষ্টা করেছেন পাঠকদের কাছে। গ্রহের শুভ ভূমিকার কথাই সবাই বলে-–– যে গ পাতা‘ তুমি আছে, সে–সম্পর্কে কেউ কিছু বলে
একজন ক্ষতির মানুষ সমাজের যতটা ক্ষতি করতে পারে, তারচেয়ে এক শ‘ গুণ বেশি ক্ষতি করতে পারে সেই মানুষটির লেখা একটি বই। বইয়ের কথা বিশ্বাস করার
আমাদের যে–প্রবণতা, তার শিকড় অনেক দূর চলে গেছে। একটা বই মাটিতে পড়ে থাকলে তা মাটি থেকে তুলে মাথায় ঠেকাতে হয়। এই ট্রেনিং দিয়ে দেওয়া হয়েছে সুদূর শৈশবে।
অনীশ-পর্ব-(৪)
‘স্যার, আসব?
মেয়েটি আবার দরজার কাছে এসে দাঁড়িয়েছে। তাকে লজ্জিত এবং অনুতপ্ত মনে হচ্ছে। ঝড়ের বেগে ঘর ছেড়ে চলে যাওয়ার অপরাধে সে নিজেকে অপরাধী করে কষ্ট পাচ্ছে।
‘স্যার, আসব? মিসির আলি হাসতে হাসতে বললেন, না।’
মেয়েটি ঘরে ঢুকে চেয়ারে বসতে–বসতে বলল, ‘একটু আগে নিতান্ত বালিকার মতাে যে–ব্যবহার আপনার সঙ্গে আমি করেছি, এ-রকম ব্যবহার আমি কখনােই কারাে সঙ্গেই করি না। আপনার সঙ্গে কেন করলাম তা–ও জানি না। আপনার কাছেই আমি জানতে চাচ্ছি–কেন এমন ব্যবহার করলাম?’
মিসির আলি বললেন, এটা বলার জন্যে তুমি আস নি। অন্য কিছু বলতে এসেছ-সেটাই বরং বল।’
বুড়ি নিচু গলায় বলল, আমি খুব বড় ধরনের একটা সমস্যায় ভুগছি। কষ্ট পাচ্ছি। ভয়ংকর কষ্ট পাচ্ছি। আমার সমস্যাটা কেউ–একজন বুঝতে পারলে আমি কিছুটা হলেও শান্তি পেতাম। মনে হয় আপনি বুঝবেন।’
বােঝার চেষ্টা করব। বল তােমার সমস্যা।
‘বড় একটা খাতায় সব লেখা আছে! খাতাটা আপনাকে দিয়ে যাব। আপনি ধীরেসুস্থে আপনার অবসর সময়ে পড়বেন। তবে একটি শর্ত আছে।”
কি শর্ত?
অনীশ-পর্ব-(৪)
‘কাল আমার অপারেশন হবে। আমি মারাও যেতে পারি। যদি মারা যাই, তাহলে আপনি এই খাতায় কি লেখা তা পড়বেন না। খাতাটা নষ্ট করে ফেলবেন। আর যদি বেঁচে থাকি তবেই পড়বেন। | মিসির আলি বললেন, ‘তােমার এই শর্ত পালনের জন্যে সবচেয়ে ভালাে হয় যদি খাতাটা তােমার কাছে রেখে দাও। তুমি মরে গেলে আমি খাতাটা পাব না। বেঁচে থাকলে তুমি নিজেই আমাকে দিতে পারবে।’
‘খাতাটা আমি আমার কাছে রাখতে চাচ্ছি না। আমি চাই না অন্য কেউ এই লেখা পড়ুক। আমি মারা গেলে সেই সম্ভাবনা অনেক বেশি থাকে। আপনার কাছে খাতাটা থাকলে এই দুশ্চিন্তা থেকে আমি মুক্ত থাকব।’
‘দাও তােমার খাতা।
কাল ভােরবেলা অপারেশন থিয়েটারে যাবার আগে–আগে আপনার কাছে পাঠাব।
‘ভালাে কথা, পাঠিও।’
এখন আপনি কোনাে–একটা হাসির গল্প বলে আমার মন ভালাে করে দিন। ‘আমি কোনাে হাসির গল্প জানি না।’ ‘বেশ, তাহলে একটা দুঃখের কথা বলে মন খারাপ করিয়ে দিন। অসম্ভব খারাপ করে দিল। যেন আমি হাউমাউ করে কাঁদি।
অনীশ-পর্ব-(৪)
রাতের বেলার রাউন্ডের ডাক্তার এসে মিসির আলির ঘরে বুড়িকে দেখে খুব বিরক্ত হলেন। কড়া গলায় বললেন, ‘কাল আপনার অপারেশন। আপনি ঘুরে ফিরে বেড়াচ্ছেন, এর মানে কী?’ | বুড়ি শান্ত গলায় বলল, ‘এমনও তাে হতে পারে ডাক্তার সাহেব যে আজ রাতই আমার জীবনের শেষ রাত। মৃত্যুর পর কোনাে–একটা জগৎ থাকলে ভালাে কথা, কিন্তু জগৎ তাে না–ও থাকতে পারে। তখন?
ডাক্তার সাহেব বললেন, ‘প্লীজ, আপনি নিজের ঘরে যান। বিশ্রাম করুন।
উঠে চলে গেল। ডাক্তার সাহেব বললেন, ‘এই ভদ্রমহিলার সঙ্গে কি আপনার পরিচয় আছে?
‘সম্প্রতি হয়েছে।” ‘উনি তাে ডেনজারাস মহিলা। ‘ডেনজারাস কোন অর্থে বলছেন?
‘সব অর্থেই বলছি। যে–কোনাে সিনেমা–পত্রিকা খুঁজে বের করুন—ওঁর সম্পর্কে কোনাে–না–কোনাে স্ক্যান্ডালের খবর পাবেন। একবার সুইসাইড করার চেষ্টা করেছেন—একগাদা ঘুমের অষুধ খেয়েছিলেন। এই হাসপাতালেই চিকিৎসা হয়। একবার গায়ে আগুন লাগাবার চেষ্টাও করেছেন। তার বাঁ পায়ের কিন অনেকখানিই নষ্ট। বাইরে থেকে স্কিন গ্রাফটিং করিয়েছেন।’
‘মনে হচ্ছে খুব ইন্টারেস্টিং চরিত্র।
‘অনেকের কাছে ইন্টারেস্টিং মনে হতে পারে। আমার কাছে কখনাে মনে হয় না। এই মহিলার লক্ষ লক্ষ টাকা। ইচ্ছা করলেই তিনি ইংল্যান্ড স্লামেরিকায় গিয়ে অপারেশনটা করাতে পারেন। দেশেও নামী–দামী ক্লিনিক আছে, সেখানে যেতে পারেন। তা যাবেন না। এসে উঠবেন সরকারি হাসপাতালে। কেন বলুন তাে?’
‘কেন?’
অনীশ-পর্ব-(৪)
পাবলিসিটি, আর কিছুই না। অপারেশন হয়ে যাবার পর পত্রিকায় খবর হবে—অমুক হাসপাতালে অপারেশন হয়েছে। স্রোতের মতো ভক্ত আসবে। হসপিটাল অ্যাডমিনিসট্রেশন কলাপস্ করবে। আমাদের পুলিশে খবর দিতে হবে। পুলিশ লাঠি চার্জ করবে।
আবারও খবরের কাগজের প্রথম পাতায় নিউজ হবে। হাসপাতাল থেকে রিলিজুড় হয়ে যাবার পর তিনি খবৱের কাগজে ইন্টার দেবেন। সাংবাদিক জিজ্ঞেস করবে, আপনি বিদেশে চিকিৎসা না—করিয়ে এখানে কেন করালেন? তিনি হাসিমুখে জবাব দেবেন—“আমি দেশকে বড় ভালবাসি। খবরের কাগজে তার হাস্যমুখী ছবি ছাপা হবে। নিচে লেখা—রূপা চৌধুরী দেশকে ভালবাসেন।
‘তাঁর নাম রূপা চৌধুরী ? ‘কেন, আপনি জানতেন না?
না।’ ‘রূপা চৌধুরীর নাম জানেন না শুনলে লােকে হাসবে। ওর কথা বাদ দিন; আপনি কেমন আছেন বলুন। মাথাধরা শুরু হয়েছে?”
এখানাে হয় নি, তবে হবে–হবে করছে।
বছর খালি পড়ে থাকে। আপনি আমার ঐ বাড়িতে কিছুদিন থেকে আসুন না।
আপনার পৈত্রিক বাড়িতে?
এই বিশেষ ফেভার আপনি কেন করতে চাচ্ছেন? আমি আপনার একজন সাধারণ রুগী। এর বেশি কিছু না। আপনি নিশ্চয়ই আপনার সব রুগীদের হাওয়া বদলের জন্যে আপনার পৈত্রিক বাড়িতে পাঠান না।”
‘তা পাঠাই না.……. ‘আমাকে পাঠাতে চাচ্ছেন কেন?
Read more
অনীশ-পর্ব-(৫)-হুমায়ূন আহমেদ
