তিন-চারজন ছুটিল কুমার চক্রবর্তীকে বুঝাইয়া ঠান্ডা করিয়া ফিরাইয়া আনিতে। কুমার চক্রবর্তী যে একরোখা, চড়ামেজাজের মানুষ সবাই তা জানে।কিন্তু ইহাও জানে যে, সে রাগ তার বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় না। নায়েবমশায় বলিলেন—তুমি যেও না হরি খুড়ো—তোমার মুখ ভালো না, আরও চটিয়ে দেবে। কার্তিক যাক আর শ্যামলাল যাক— হারাণ চক্রবর্তীর যে মেয়েটিকে লইয়া ঘোঁট চলিতেছে, সে মেয়েটি কাজের বাড়িতে পদার্পণ করে নাই।
পাশের বাড়ির গোলার নীচে সে এতক্ষণ চুপ করিয়া বসিয়াছিল, আজই একটা মিটিং হইয়া তাহার সম্বন্ধে যে চূড়ান্ত সামাজিক নিষ্পত্তি কিছু হইবে, তাহা সে জানিত এবং তাহারই ফল কী হয় জানিবার জন্যই সে অপেক্ষা করিতেছিল।হঠাৎ চেঁচামেচি শুনিয়া সে ভয় পাইয়া উঠিয়া দাঁড়াইল এবং তাহারই নাম কুমার চক্রবর্তীর মুখে ওভাবে উচ্চারিত হইতে শুনিয়া পাঁচিলের ঘুলঘুলি দিয়া দুরু দুরু বক্ষে ব্যাপারটা কী দেখিবার চেষ্টা পাইল।
পাঁচিলের ওপাশে নিকটেই কেশবকে দেখিতে পাইয়া সে ডাকিল-কাকা, ও কাকা— কেশব কাকাকে সে ছেলেবেলা হইতে জানে, কেশব কাকার মতো নিপাট ভালোমানুষ এ গাঁয়ে দুটি নাই।আহা, সে শুনিয়াছে যে, আজই সকালে কেশব কাকার খোকাটি মারা গিয়াছে, অথচ নিজের দুর্ভাবনায় আজ সকাল হইতে সে এতই ব্যস্ত যে, কাকাদের বাড়ি গিয়া একবার দেখা করিয়া আসিতে পর্যন্ত পারে নাই।
কেশব বলিল—কে ডাকে? কে, বিদ্যুৎ? কী বলচ মা? তা ওখানে দাঁড়িয়ে কেন? হারাণ চক্রবর্তীর মেয়েটির নাম বিদ্যুৎ।খুব সুন্দরী না-হইলেও বিদ্যুতের রূপের চটক আছে সন্দেহ নাই, বয়স এই সবে উনিশ। বিদ্যুৎ স্লানমুখে গলার সুমিষ্ট সুরে অনেকখানি খাঁটি মেয়েলি সহানুভূতি জানাইয়া বলিল—কাকা, খোকামণি নাকি নেই? আমি সব শুনেছি সকালে।কিন্তু কোথাও বেরুতে পারিনি সকাল থেকে, একবার ভেবেছিলুম যাব।
কেশব উত্তর দিতে গিয়া চাহিয়া দেখে বিদ্যুতের চোখ দিয়া জল পড়িতেছে।এতক্ষণ এই একটি লোকের নিকট হইতে সে সত্যকার সহানুভূতি পাইল। কেশব একবার গলা পরিষ্কার করিয়া বলিল—তা যা, এখানে দাঁড়িয়ে থাকিসনে—যা। ও ঘোঁটের কথা শুনে আর কী হবে, তুই বাড়ি যা। কুমার চক্কোত্তি রাগারাগি করে চলে গিয়েচে, ওকে সবাই গিয়েছে ফিরিয়ে আনতে।
তোর ওপর খুব রাগ কুমারের।তবে ও তো আর সমাজের কর্তা নয়, ওর রাগে কি-ই বা এসে যাবে! –কী বলছিল ওরা? তুই নাকি এখনও গাঙ্গুলী বাড়ি যাস, তোকে ওদের টিউবকলে জল তুলতে যেতে দেখেছে কুমারের স্ত্রী। কোনদিন নাকি ওদের নারকোল তলায়—ইয়ে, সুশীলের সঙ্গে কথাবার্তা বলছিলি, তাও কুমারের স্ত্রী দেখেছে—এইসব কথা।
বিদ্যুৎ বলিল—আমি যাইনি কাকা, সেবার সেই বারণ করে দেওয়ার পর থেকে আর কখনো যাইনি। এ কথাটা বিদ্যুৎ মিথ্যা বলিল। সুশীলের সঙ্গে তার ছেলেবেলা হইতেই আলাপ। সুশীল যখন কলেজে পড়িত, তখন বিদ্যুৎ বারো-তেরো বছরের মেয়ে। সুশীলদার দেখা পাইলে তখন হইতেই সে আর কোথাও যাইতে চায় না।
সুশীলের সঙ্গে তাহার বিবাহ হওয়ার কোনো সম্ভাবনা ছিল না, কারণ তাহারা বৈদিক আর সুশীলেরা রাঢ়িশ্রেণি। বিদ্যুতের বিবাহ হইয়াছিল পাশের গ্রামের শ্রীগোপাল আচার্যের সঙ্গে। বিদ্যুৎ বিধবা হইয়াছে বিবাহের দু-বছর পরেই। শ্বশুরবাড়ি মাঝে মাঝে যায়, কিন্তু বেশির ভাগ এখানেই থাকে। সুশীলের সঙ্গে তাহার ছেলেবেলার মাখামাখি লইয়া একটা অপবাদ গ্রামের মাঝে রটিয়াছিল।
এই অপবাদের দরুনই তাহারা এখন গ্রামে একঘরে হইয়া আছে, এ বাড়িতে তাহাদের নিমন্ত্রণ হয় নাই।ইতিমধ্যে ঝুমুর গানের দল আসিয়া হাজির হইল। সামিয়ানার একধারে ইহাদের জন্য স্থান নির্দিষ্ট ছিল, গ্রামের ছোটো ছেলে-মেয়েরা, দল আসিতেই সেখানে গিয়া জায়গা দখল করিয়া বসিবার জন্য হুড়াহুড়ি বাধাইয়া দিল। কেশব ছুটিয়া গেল গোলমাল থামাইতে।
দলের অধিকারী বলিল—ও সরকার মশাই, আমাদের একটু তামাক-টামাকের জোগাড় করে দিন, আর দু-পাঁচ খিলি পান। রোদুরে বামুনগাঁতির বিল পার হতে যা নাকালটা হয়েচি সবাই মিলে! বেলা বারোটার সময় কেশব একবার বাড়ির মধ্যে ঢুকিল। স্ত্রীর জন্য তাহার মনটা চঞ্চল হইয়া উঠিয়াছে।
আহা, বেচারি এ বাড়ি আসিয়াছে তো,—না খালি বাড়িতে একা পড়িয়া পড়িয়া কাঁদিতেছে? না, দেখিয়া আশ্বস্ত হইল স্ত্রী আসিয়াছে ও ইদারার পাড়ে একরাশ পুরোনো বাসন ঝিয়ের সঙ্গে বসিয়া মাজিতেছে, তাহাদের আজ মরণাশৌচ, বাহিরের কাজকর্ম ছাড়া অন্য কাজ করিবার জো নাই।মেজোবাবুর যে-খোকার অন্নপ্রাশন, দালানে খাটের উপর সুন্দর বিছানাতে চারিদিকে উঁচু তাকিয়া ঠেস দিয়া তাহাকে বসাইয়া রাখা হইয়াছে।
ছ-মাসের হৃষ্টপুষ্ট নধরকান্তি শিশু, গায়ে একগা গহনা, সামনের গদিতে একখানা থালে যেসব বিভিন্ন অলংকার আত্মীয়-কুটুম্ব, বন্ধুবান্ধবে দিয়াছে, সেগুলি সাজানো। তিন চার ছড়া হার, সোনার ঝিনুক, পদক, তাগা, বালা, রূপার কাজললতা। চারিধারে ঘিরিয়া মেয়েরা দাঁড়াইয়া আছে, ইহারা কেউ কেউ এ গ্রামের বউ-ঝি, কিন্তু বেশিরভাগই নবাগতা কুটুম্বিনীর দল।
সকাল হইতে বেলা এগারোটা পর্যন্ত আপ ডাউন যে তিনখানা ট্রেন যায়, প্রত্যেক ট্রেনের সময়ে দু-তিনখানা ট্যাক্সি বোঝাই হইয়া ইহারা কোনো দল কলিকাতা হইতে, কোনো দল বা রানাঘাট, কী গোয়াড়ি কৃষ্ণনগর, কী শান্তিপুর হইতে আসিয়াছে। শহরের মেয়ে, কী সব গহনা ও শাড়ির বাহার, কী রূপ, কী মুখশ্রী, যেন এক-একজন এক-একখানি ছবি! খোকাটি কেমন চমৎকার হাসিতেছে।
কেমন সুন্দর মানাইয়াছে ওই বেগুনি রংয়ের জামাটাতে! তাহার খোকারও অন্নপ্রাশন দিবার কথা ছিল এই মাসে।গরিবের সংসার, খোকার যখন চার মাস বয়স, তখন হইতে ধীরে ধীরে সব জোগাড় করা হইতেছিল। কাপালিরা মুসুরি ও ছোলা দিয়াছিল প্রায় আধ মণ, নাড়ুর চালের জন্য ধান জোগাড় করা হইয়াছিল, সাত-আটখানা খেজুরের গুড় দিয়াছিল বাগদিপাড়ার সকলে মিলিয়া।
বৃদ্ধ ভুবন মণ্ডল বলিয়াছিল—মুহুরি মশায়, যত তরিতরকারি দরকার হবে, আমার খেত থেকে নিয়ে যাবেন খোকার ভাতের সময়, একপয়সাও দিতে হবে না। কেবল বামুন-বাড়ির দুটো পেরসাদ যেন পাই।শূদ্র-ভদ্র সবাই খোকাকে ভালোবাসিত। মেজোবাবুর খোকার গায়ের রং অনেক কালো তার খোকার তুলনায়। মেজোবাবু নিজে কালো, খোকার খুব ফরসা হইবার কথাও নয়।
সুতরাং এদের মানানো শুধু জামায় গহনায়। তাহার খোকা গরিবের ঘরে আসিয়াছিল। একজোড়া রূপার মল ছাড়া আর কোনোকিছু খোকার গায়ে ওঠে নাই।আজ শেষরাত্রে খোকার সেই হেঁচকির কষ্টে কাতর কচি মুখখানি, অবাক দৃষ্টি, নিস্পাপ, কাচের চোখের মতো নির্মল ব্যথাক্লিষ্ট চোখদুটি…আহা, মানিক রে! —ও কেশব, বলি হ্যাদ্দেশ্যে এখানে সঙের মতো দাঁড়িয়ে আছ যে! বেশ লোক যা হোক।
ব্রাহ্মণদের পাতা করবার সময় হল, সামিয়ানা খাটাবার ব্যবস্থা করো গে। আমি তোমায় খুঁজে বেড়াচ্ছি চোদ্দোভুবন, আর তুমি এখানে, বেশ নম্বুরি নোটখানি বাবা! পা চালিয়ে দেখো গিয়ে— নবীন সরকার।কিন্তু, নবীন সরকার তো জানে না… সে কী একবার বলিবে…?—ও গোমস্তা মশায়, এই আমার খোকা আজ সকালে…ওরকম করে আমায় ডাকবেন না…আমার মনটা আজ ভালো না… দলে দলে নিমন্ত্রিত ব্রাহ্মণেরা আসিতে আরম্ভ করিয়াছে নানা গ্রাম হইতে।
এগারোখানা গাঁ লইয়া সমাজ, সমাজের সকলেই নিমন্ত্রিত। বড়ো বৈঠকখানায় লোক ধরিল না, শেষে লিচুতলায় প্রকাণ্ড শতরঞ্জ পাতিয়া দেওয়া হইল।আসরের মধ্যে দাঁড়াইয়া দেউলে সরাবপুরের বরদা বাঁড়ুয্যে মশায় বলিলেন—একটা কথা আমার আছে। এ গাঁয়ে হারাণ চক্কোত্তি সমাজে একঘরে, তাদের বাড়ির কারুর কী নেমন্তন্ন হয়েছে আজ কাজের বাড়িতে?
যদি হয়ে থাকে বা তাদের বাড়ির কেউ যদি এ বাড়িতে আজ এসে থাকেন, তবে আমি অন্তত দেউলে সরাবপুরের ব্রাহ্মণদের তরফ থেকে বলচি যে, আমরা এখানে কেউ জলস্পর্শ করব না।আরও দু-পাঁচখানা গ্রামের লোকেরা সমস্বরে এ কথা সমর্থন করিল। অনেকে আবার হারাণ চক্রবর্তীর আসল ব্যাপারটা কি জানিতে চাহিল। ছেলে-ছোকরার দল না–বুঝিয়া গোলমাল করিতে লাগিল।
এ বাড়ির বৃদ্ধ কর্তা সান্যালমশায়ের ডাক পড়িল। তিনি কাজের বাড়িতে কোথাও ব্যস্ত ছিলেন, গোলমাল শুনিয়া সভায় আসিয়া দাঁড়াইলেন। এ গাঁয়ের সমাজ বড়ো গোলমেলে, তাহা তিনি জানিতেন। পান হইতে চুন খসিলেই এই তিনশো নিমন্ত্রিত ব্রাহ্মণ এখনই হই-চই বাধাইয়া তুলিবে, খাইব না বলিয়া শুভকার্য পণ্ড করিয়া দিয়া বাড়ি চলিয়া যাইবে।
প্রাচীন, বিচক্ষণ ব্যক্তি সব, কিন্তু সামাজিক ঘোঁটের ব্যাপারে ইহাদের না-আছে বিচার-বুদ্ধি, না-আছে কাণ্ডজ্ঞান। তবুও সান্যালমশায় সভার মধ্যে খুব সাহসের পরিচয় দিলেন। বলিলেন, আপনাদের সকলকেই জানাচ্চি যে হারাণ চক্কোত্তির বাড়ির একটি প্রাণীও আমার বাড়ি নিমন্ত্রিত নয়, তাদের কেউ এ বাড়িতে আসেওনি। কিন্তু, আমার আজ অনুরোধ, এই সভাতেই সে ব্যাপারের একটা মীমাংসা হয়ে যাওয়া দরকার।
Read more
