হারাণ আমার প্রতিবেশী, আমার বাড়ির পাশেই তার বাড়ি। তার ছেলে-মেয়ে আমার নাতি-নাতনির বয়সি।আজ আমার বাড়ির কাজ, আর তারা মুখ চুন করে বাড়ি বসে থাকবে, এ বাড়িতে আসতে পারবে না, খুদকুঁড়ো যা দুটো রান্না হয়েছে তা মুখে দিতে পারবে না, এতে আমার মন ভালো নেয় না।
আপনারা বিচার করুন তার কী দোষ—আমাদের গাঁয়ের লোক মিলে আজ সকালে একটা মিটিং আমরা এ নিয়ে করেছিলাম, কিন্তু সকলে উপস্থিত না-হলে ব্যাপারটা উত্থাপন করা ভালো নয় বলে আমরা বন্ধ রেখেছি।আমার যদি মত শোনেন, আমি বলি হারাণ চক্কোত্তির মেয়ে নির্দোষ, তাকে সমাজে নিতে দোষ নেই।ইহার পর ঘণ্টাদুইব্যাপী তুমুল বাগযুদ্ধ শুরু হইল, আজ সকালবেলার মতোই।
এই সভায় সবাই বক্তা, শ্রোতা কেহ নাই। চড়া গলায় সকলেই কথা বলে, কথার মধ্যে যুক্তিতর্কের বালাই নাই। দেখা গেল, এ গাঁয়ের হারাণ চক্রবর্তীর ব্যাপার লইয়া দুটো দল, একদল তাহাকে ও তাহার মেয়েকে একঘরে করিয়া রাখিবার পক্ষে মত দিল।অপর পক্ষ ইহার বিরুদ্ধে।
হারাণ চক্রবর্তীর ডাক পড়িল, তাঁর বয়স যদিও খুব বেশি নয়, কিন্তু কানে একেবারে শুনিতে পান না। টাইফয়েড হইয়া অল্পবয়স হইতেই কান দুটি গিয়াছে। তিনি হাতজোড় করিয়া নিবেদন করিলেন, তাঁহার মেয়েকে তিনি ভালো রকমই জানেন, তার স্বভাবচরিত্র সৎ।যে ছেলেটিকে লইয়া এ কথা উঠিয়াছে, গাঙ্গুলীবাড়ির সেই ছেলেটি কলেজের পাশ, উঁচু নজরে কাহারও দিকে চায় না।
ছেলেবেলা হইতেই বিদ্যুতের সঙ্গে তার ভাই বোনের মতো মেশামেশি, এর মধ্যে কেউ যে কিছু দোষ ধরিতে পারে—ইত্যাদি! ইহার উত্তরে বিরুদ্ধ দলের কর্তা কুমার চক্রবর্তী রাগিয়া উঠিয়া যাহা বলিলেন, তাহা আমাদের মনে আছে, কিন্তু সে-সব কথা পাড়াগাঁয়ের দলাদলি সভায় উচ্চারিত হইতে পারিলেও ছাপার অক্ষরে প্রকাশ করিবার যোগ্য নয়।
অনেক করিয়াও হারাণ চক্রবর্তীর হিতাকাঙক্ষী দল কিছু করিতে পারিল না। কুমার চক্রবর্তীর দলই প্রবল হইল। আসলে বিদ্যুৎ যে খুব ভালো মেয়ে, বিদ্যুতের মনটি বড়ো নরম, পাড়ার আপদ-বিপদে ডাকিলেই ছুটিয়া আসে এবং বুক দিয়া পড়িয়া উপকার করে, তাহার উপর সে ছেলেমানুষ, এখনও তত বুঝিবার বয়স হয় নাই, বৃদ্ধের দলের আসল যুক্তি এই।
কিন্তু এ সত্য কথা সভায় দাঁড়াইয়া বলা যায় না। কুমার চক্রবর্তীর দলের লোকেরা বলিল—সেবার সুরেনের মেয়ের বিয়ের সময় আমরা তো বলে দিয়েছিলাম, বিদ্যুৎ সুশীলদের বাড়ি যাতায়াত বা সুশীলের সঙ্গে মেলামেশা বন্ধ করুক।এক বছর আমরা যদি দেখি, সে আমাদের কথা মেনে চলেচে, তবে আমরা তাদের দলে তুলে নেব—কিন্তু সে কী তা শুনেচে?
হারাণ চক্রবর্তী বলিলেন—কই কে দেখেচে—বলুক কবে আমার মেয়ে এই এক বছরের মধ্যে– কিন্তু এমন ক্ষেত্রে পাড়াগাঁয়ে দেখিবার লোকের অভাব হয় না।দেখিয়াছে বই কী! বহু লোক দেখিয়াছে।পরের বাড়ি কোথায় কী হইতেছে দেখিবার জন্য যাহারা ওত পাতিয়া থাকে, তাদের চোখে অত সহজে ধুলা দেওয়া চলে না।
অবশেষে কে বলিল—আচ্ছা, কাউকে দিয়ে সেই মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করা হোক না—সে যদি আমাদের সামনে স্বীকার করে, সে ওখানে যাতায়াত করে এবং সঙ্গে সঙ্গে ঘাট স্বীকার করে, কথা দেয়, আর কখনো এ কাজ সে করবে না, তবে না-হয়— বিদ্যুৎ পাঁচিলের ঘুলঘুলিতে চোখ দিয়াই দাঁড়াইয়া ছিল।কেশব গিয়া বলিল—মা আছিস? রাজি হয়ে যা না, ওরা যা যা বলচে।কেন মিছে মিছে— বিদ্যুৎ কাঁদিয়া বলিল—আপনি ওদের বলুন আমি সব তাতে রাজি আছি কাকা।
সভার মধ্যে বাপকে অপদস্থ হইতে দেখিয়া লজ্জায়, দুঃখে সে মরিয়া যাইতেছিল…তার জন্যই তার নিরীহ পিতার এ দুর্দশা…তা ছাড়া তার দাদা শ্রীগোপালের ছোটো ছোটো ছেলে-মেয়েরা আজ পাঁচ-ছ-দিন হইতে যজ্ঞিবাড়ির নিমন্ত্রণ খাইবার লোভে অধীর হইয়া আছে, ছেলেমানুষ তারা কী বোঝে—অথচ আজ তাদের নিমন্ত্রণ হয় নাই, এ বাড়িতে আসিতে না-পাইয়া মুখ চুন করিয়া বেড়াইতেছে—ইহা তাহার প্রাণে বড়োই বাজিয়াছে।
ছোটো মেয়ে সুবু তো কেবলই জিজ্ঞাসা করিতেছে—পিছিমা, ওদের বালি থেকে ডাকতে আছবে কখন? পায়েছ খাব, ছন্দেছ খাব, না, পিছি? আমি যাব, ওবু যাবে, দাদা যাবে, মা যাবে— তার মা ধমক দিয়া থামাইয়া রাখিয়াছে—থাম, এখন চুপ কর। যখন যাবি তখন যাবি। তা না এখন থেকে—এখন বরং একটু ঘুমো দিকি। ঘুমিয়ে উঠে আমরা সেই বিকেলে তখন সবাই যাব ঘরে বাহিরে বিদ্যুতের আর মুখ দেখাইবার জো নাই।
কিন্তু কেশবের কথায় কী হইবে। এক-আধটি বাজে লোকের প্রস্তাবেই বা কী হইবে। বরদা বাঁড়ুয্যে ও কুমার চক্রবর্তী এ প্রস্তাবে রাজি হইলেন না। একবার যে শর্ত ভঙ্গ করিয়াছে, তাহার সঙ্গে আর শর্ত করিয়া ফল নাই। আর এ শর্তের ব্যাপার নয়। একটা স্ত্রীলোককে সামাজিক শাসন করা হইতেছে, ইহার মধ্যে শর্তই বা কীসের? মাথা মুড়াইয়া ঘোল ঢালিয়া যে গ্রাম হইতে বিদায় করিয়া দেওয়া হয় নাই এতদিন, ইহাই যথেষ্ট।
সুতরাং হারাণ চক্রবর্তী যেমন একঘরে ছিলেন, তেমনই রহিয়া গেলেন। তারপর ব্রাহ্মণ-ভোজনের পালা। কেশবের মরণাশৌচ, সে পরিবেশন করিবে, ভিখারি বিদায়ের ভার পড়িল তার উপর। দু-তিন দফা ব্রাহ্মণ খাওয়ানো ও ভিখারি বিদায় করিতে সন্ধ্যা হইয়া গেল। সন্ধ্যার পরে শূদ্র-ভোজন, সে চলিল রাত দশটা পর্যন্ত। কেশব সারাদিন হাড়ভাঙা খাটুনির পর যখন খাইতে বসিল, তখন রাত এগারোটা।
আয়োজন ভালোই হইয়াছিল, কিন্তু এত রাত্রে জিনিসপত্র বেশি কিছু ছিল না। কেবল দই ও মিষ্টি এবং দু-তিন রকমের টক তরকারি দিয়া কেশব পরিতৃপ্তির সঙ্গে দুইজনের আহার একা করিল।পরে স্ত্রীকে লইয়া অন্ধকারেই নিজের বাড়ি রওনা হইল। কেশবের স্ত্রীও খুব খাইয়াছে। কেশবের প্রশ্নের উত্তরে বলিল—তা গিন্নির বড়ো মেয়ে নিজে দাঁড়িয়ে থেকে খাওয়ালে।
নিজের হাতে আমার পাতে সন্দেশ দিয়ে গেল।খুব যত্ন করেছে।রান্নাবান্না কী চমৎকার হয়েছে, না? কেশব বলিল—তা বড়োলোকের ব্যাপার, চমৎকার হবে না? নয় তো এমন অসময়ে কপি কোথা থেকে এই পাড়াগাঁয়ে আসে বল দিকি? পেয়েছিলে কপির তরকারি? —তা আর পাইনি? দু-দু-বার দিয়েছে আমার পাতে। হ্যাঁ গা, এখন কপি কোথেকে আনালে? কলকাতায় কী বারোমাস কপি মেলে? বাড়ির উঠানে তুলসীতলায় একটা মাটির প্রদীপ তখনও টিমটিম করিয়া জ্বলিতেছে।
কেশবের স্ত্রী বলিল—ও বাড়ির ছোটো-বউ জ্বালিয়ে দিয়ে গিয়েছে, আহা বড়ো ভালো মেয়ে। আজ সকালে কেঁদে একেবারে আকুল। সকালে যেভাবে ইহারা ফেলিয়া রাখিয়া গিয়াছিল, ঘরবাড়ি সেইভাবেই পড়িয়া আছে। কারো সাড়াশব্দ নাই,—নির্জন, নিস্তব্ধ। বাড়িখানা খাঁ-খাঁ করিতেছে। আশেপাশে ঘন অন্ধকার, কেবল তুলসীতলায় ওই মিটমিটে মাটির প্রদীপের আলোটুকু ছাড়া।
কেশব শুইবামাত্র ঘুমাইয়া পড়িল।অনেক রাত্রে ঘুমের মধ্যে কেশব স্বপ্ন দেখিতেছিল, বিদ্যুৎ আসিয়া উঠানের মাঝখানে দাঁড়াইয়া কাঁদো-কাঁদো মুখে বলিতেছে—কাকা, আজই বুঝি…একবার ভেবেছিলাম আসব, কিন্তু যে দুর্ভাবনা আমার ওপর দিয়ে আজ সারাদিন… বাহিরে ঝমঝম বৃষ্টির শব্দে তার ঘুম ভাঙিয়া গেল।
সে ধড়মড় করিয়া বিছানায় উঠিয়া বসিল—সর্বনাশ! ভয়ানক বৃষ্টি আসিয়াছে! খোকা, কচি ছেলে, নিউমোনিয়ার রোগী, বাঁশতলায় তার ঠান্ডা লাগিতেছে যে!…পরক্ষণেই ঘুমের ঘোরটুকু ছুটিয়া যাইতেই নিজের ভুল বুঝিয়া আবার শুইয়া পড়িল। ভাবিল—আহা, যখন পুঁতি, তখনও ওর গা গরম, বেশ গরম ছিল হঠাৎ দেখিল সে কাঁদিতেছে, আঝোর ধারে কাঁদিতেছে…বাহিরে ওই বৃষ্টিধারার মতো আধোর ধারে…বারা বার তার মনে হইতে লাগিল— তখনও ওর গা গরম ছিল…বেশ গরম ছিল… …..।
Read more
