অর্ধেক নারী অর্ধেক ঈশ্বরী পর্ব:১২
দুদিন পর শান্তিনগরে শামারোখদের বাড়িতে গেলাম। বাড়ি চিনে নিতে বিশেষ কষ্ট হয়নি। আবুলের হোটেলের সামনের পানের দোকানটিতে যখন জিজ্ঞেস করলাম, দোকানদার আমার মুখ থেকে কথা কেড়ে নিয়েই বলল, যে বাড়িতে তিনজন সুন্দরী। মাইয়া মানুষ আর একটা বুইড়া মানুষ থাকে, হেই বাড়ি তালাশ করতাছেন? নাক বরাবর সিধা যাইবেন, তারপর বামে ঘুইরবেন, গেইটের সামনে দেখবেন একটা জলপাই গাছ, সেই বাড়ি। জলপাই গাছ দেখে আমি ভেতরে ঢুকলাম। এক বিঘের মতো জমির মাঝখানে একটা ছোট একতলা ঘর। আর জমির চারপাশে বাউন্ডারি দেয়াল দেয়া আছে। একপাশে তরিতরকারির বাগান।
এক ভদ্রমহিলা প্লাস্টিকের পাইপ দিয়ে পানি দিচ্ছেন। অনিন্দ্যসুন্দরী মহিলা, চোখ ফেরানো যায় না। মুখমণ্ডলটা ভাল করে তাকালে শামায়োখের সঙ্গে একটা মিল খুঁজে পাওয়া যাবে। এই ধরনের ভদ্রমহিলার সঙ্গে কথা বলতে গেলে হঠাৎ করে মুখ দিয়ে আওয়াজ বেরিয়ে আসতে চায় না। আমি ডান হাতটা তুলে সালাম দেয়ার ভঙ্গি করলাম। ভদ্রমহিলা আমার দিকে মুখ তুলে তাকালে আমি জিজ্ঞেস করলাম, আচ্ছা এটা কি শামারোখদের বাড়ি? মহিলা কথা শুনে বিরক্ত হলেন মনে হলো। আঙুল দিয়ে সামনের দরজা দেখিয়ে বললেন, ওদিক দিয়ে ঢোকেন।
ঘরের দরজা খোলা ছিল। আমি জুতো না খুলেই ভেতরে প্রবেশ করলাম। দেখলাম একেবারে সাধারণ একটি তক্তপোশের ওপর একজন প্রবীণ ভদ্রলোক ঝুঁকে পড়ে কি সব লিখছেন। চারপাশে ছড়ানো অজস্র ধর্মীয় পুস্তক। ভদ্রলোকের মুখের দাড়ি একেবারে বুকের ধার অবধি নেমে এসেছে এবং সবগুলো পেকে গেছে। ভদ্রলোককে আমি সালাম দিলাম। তিনি হাত তুলে আমার সালাম নিলেন এবং কড়া পাওয়ারের চশমার ভেতর দিয়ে আমার আপাদমস্তক ভাল করে লক্ষ্য করলেন। ভদ্রলোক খুবই নরম জবানে জানতে চাইলেন, আমি কেন এসেছি? আমি বিনয় সহকারে বললাম, শামারোখ আমাকে আসতে বলেছিল। এবার ভদ্রলোক আমার দিকে তাকিয়ে খুব সুন্দর করে হাসলেন। গামছা দিয়ে ঝেড়ে একটা কাঠের চেয়ার এগিয়ে দিয়ে বললেন, বসুন। আমি বসলাম।
কিন্তু বাড়ির ভেতরে শামায়োখের উত্তপ্ত চিৎকার শুনতে পেলাম। আরেক মহিলার সঙ্গে শামায়োখ চেঁচিয়ে ঝগড়া করছে। দুজনে কেউ কাউকে ছেড়ে কথা কইছে না। এমন সব খারাপ শব্দ তাদের মুখ থেকে বেরিয়ে আসছে, শুনলে কানে আঙুল দেয়ার প্রয়োজন হয়। ভদ্রলোক টুলু টুলু বলে কয়েকবার ডাকলেন। ঝগড়ার আওয়াজের মধ্যে ভদ্রলোকের ডাক চাপা পড়ে গেল। আমার দিকে তাকিয়ে করুণ হাসি হেসে বললেন, আজ সকালবেলা থেকে আমার মেয়ে এবং পুত্রবধূ তুমুল ঝগড়াঝাটি করছে। এই প্রচণ্ড চিল্কারের মধ্যেও ভদ্রলোককে নির্বিকার পড়াশোনা করে যেতে দেখে আমি বিস্মিত হয়ে গেলাম। জিজ্ঞেস করলাম, আপনি কি লিখছেন?
তার চোখে-মুখে একটা লজ্জার আভাস খেলে গেল। বললেন, আমি কোরআন শরিফের ইয়াসিন সুরাটা বাংলায় অনুবাদ করার চেষ্টা করছি। আমি জিজ্ঞেস করলাম, আপনি আরবি জানেন? তিনি বললেন, এক সময় তো ভালই জানতাম। পঁচিশ বছর সরকারি চাকরি করেছি। ভাবছিলাম রিটায়ার করার পর শান্তমনে আল্লা-রসুলের কাজ করব। তা আর হচ্ছে কই! সব সময় অশান্তি। দেখছেন না মেয়ে এবং ছেলের বউ কিভাবে ঝগড়া করছে। ভদ্রলোককে আমার মরুভূমির মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা মসজিদের নির্জন গম্বুজের মতো মনে হলো। ভদ্রলোক অনুবাদের কিছু অংশ আমাকে দেখালেন। পড়তে আমার বেশ লাগল। তিনি বললেন, কোরআনের ভাষা-রীতির মধ্যে একটা কবিত্ব আছে।
সেই জিনিসটা ফুটিয়ে তুলতে না পারলে অনুবাদ সঠিক হয় না। আমি ভাষার অর্থটা বুঝি, কিন্তু সুপ্ত কবিত্ববোধটুকু বাংলা ভাষায় আনতে পারিনে, আল্লাহ আমাকে সে শক্তি দান করেন নি।তরকারি বাগানে যে ভদ্রমহিলা পানি দিচ্ছিলেন, তিনি এসে বললেন, আল্লুজান, আজ বিকেলে আমি মেজো আপার কাছে চলে যাচ্ছি। এই জাহান্নামের মধ্যে আমার থাকা সম্ভব হবে না। ভদ্রলোক বললেন, আজ বিকেলেই যেতে চাও? তিনি বললেন, হা। ভদ্রলোক বললেন, আচ্ছা। ভদ্রমহিলা কেঁদে ফেললেন, তার আয়ত চোখ দুটো পানিতে ভরে উঠল, আপনি যে যাই করুক সব সময়ে আচ্ছা বলে পাশ কাটিয়ে যান। আম্মাজান বেঁচে থাকলে এরকম আচ্ছা বলে চোখ বন্ধ করে থাকতে পারতেন? ভদ্রলোক কোনোরকম উচ্চবাচ্য না করে চুপ করে রইলেন।
আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, আমার ছোট মেয়ে বানু।ভেতরের ঘর থেকে আর কোনো আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে না। মনে হয় দুজনেই ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। আমি চলে আসব কিনা চিন্তা করছিলাম। শামারোখের বাবা বললেন, আপনি একটু বসুন, আমি ভেতরে গিয়ে দেখে আসি কি অবস্থা। ভদ্রলোক ভেতরে গেলেন। অতর্কিতে শামায়োখ বাড়ির ভেতর থেকে বেরিয়ে এসে বলল, এই যে জাহিদ সাহেব, কখন এসেছেন? সহসা আমি কোনো কথা বলতে পারলাম না। শামারোখকে এই অবস্থায় না দেখলে আমাদের দুজনের জন্যই ভাল হতো।
শামারোখ বলল, আপনি এসেছেন, খুবই ভাল হয়েছে। আমাকে থানায় নিয়ে চলুন। আমি তো আকাশ থেকে পড়লাম, থানায় কেন? শামারোখ তার ডান বাহুটা আমার সামনে তুলে ধরে দেখালো, দেখছেন, হারামজাদি কামড়ে আমার কি দশা করেছে। আমি দেখলাম শামায়রাখের সুন্দর বাহুর মাংসের ওপর মনুষ্য দন্তের ছাপ। মাংস কেটে ভেতরে প্রবেশ করেছে এবং দরদর করে রক্ত বেরিয়ে আসছে। আমি কি করব ঠিক করে উঠতে পারলাম না।
বললাম, বাড়িতে ডেটল জাতীয় কিছু থাকলে লাগিয়ে আগে রক্তপাত বন্ধ করুন। শামারোখ বলল, না, না, রক্তপাত বন্ধ করলে থানা কেস নিতে চাইবে না। আগে হারামজাদিকে অ্যারেস্ট করাই, তারপর অন্য কিছু।শামায়োখের ছোট বোন বানু এসে আমাকে সরাসরি বলল, আমাদের বাড়ির ব্যাপারে আপনি নাক গলাবার কে? আমার বোন, আমার ভাবির সঙ্গে ঝগড়া করেছে, সেও আমার চাচাতো বোন। আমাদের পারিবারিক ব্যাপারে আপনি বাইরে থেকে এসে বাগড়া দেবার কে? বানুর কথায় কোনোরকম কান না দিয়ে আমি শামায়োখকে নিয়ে আমার এক পরিচিত ডাক্তারের ডিসপেনসারিতে ছুটলাম।
শামারোখ আমাকে মস্ত একটা গোলক ধাঁধার মধ্যে ছুঁড়ে দিয়েছে। তার ব্যাপারে আমি কোনো ধারণা নির্মাণ করতে পারছি নে। তার কবিতা পড়ে মনে হয়েছে সে খুবই অসহায় এবং দুঃখী মহিলা। এই দুঃখবোধটাই তার কবিতায় অগ্নিশিখার মতো উজ্জ্বল হয়ে জ্বলে ওঠে। প্রস্ফুটিত পদ্মফুলের পাপড়িতে শেষ রাতের ঝরে-পড়া শিশিরের মতো সূর্যালোকে দীপ্তিমান হয়। তার মুখমণ্ডলের অমলিন সৌন্দর্যের প্রতি যখন দৃষ্টিপাত করি, পিঠময় ছড়িয়ে পড়া কালো কেশের দিকে যখন তাকাই, যখন নিশি রাতের নিশ্বাসের মতো তার আবেগী কবিতা পাঠ শ্রবণ করি, আমার মনে ঢেউ দিয়ে একটা বাসনাই প্রবল হয়ে জেগে ওঠে, এই নারীর শুধু অঙ্গুলি হেলনে আমি দুনিয়ার অপর প্রান্ত পর্যন্ত ছুটে যেতে পারি।
এই সময়ের মধ্যে শামায়োখের বিষয়ে আমার কিছু বাস্তব অভিজ্ঞতাও হয়েছে। শামারোখ আমার ঘরে সোলেমান চৌধুরীকে নিয়ে এসেছিল। এই চৌধুরীর সঙ্গে আমাকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান পর্যন্ত যেতে হয়েছে এবং একসঙ্গে বসে শামারোখের কবিতা পাঠ শুনতে হয়েছে। শামারোখ এবং সোলেমানের সম্পর্কটি কি ধরনের? শামায়োখ যদি আমাকে টেনে না নিত, এই ধরনের নাসিক্য উচ্চারণে কথা বলা বঙ্গীয় ইংরেজের সঙ্গে কখনো আমি সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অবধি যেতাম না। তারপর শামারোখ আমাকে কি কারণে সেই গ্রিন রোডের উদ্ধত অর্থবান আদিলের বাড়িতে নিয়ে গেল, তাও আমার বোধবুদ্ধির সম্পূর্ণ বাইরে। একবার সোলেমান, একবার আদিল, এই ধরনের মানুষদের সামনে শামারোখ আমাকে উপস্থিত করছে কেন?
তার কি কোনো গোপন মতলব আছে? মাঝে মাঝে মনের কোণে একটা সন্দেহ কালো ফুলের মতো ফুটে উঠতে চায়। শামারোখ আমাকে এসব মানুষকে আটকাবার জন্য টোপ হিশেবে ব্যবহার করতে চায় কিনা।শামারোখদের শান্তিনগরের বাড়িতে গিয়ে যে অভিজ্ঞতা হলো, তাতে মহিলার মানসিক সুস্থতার ব্যাপারে আমার মনে প্রশ্ন জেগেছে। ক্যামব্রিজ থেকে পাস করে আসা একজন মহিলা কী করে তার আপন ভাইয়ের বউয়ের সঙ্গে জন্তুর মতো কামড়াকামড়ি করে থানা-পুলিশ করার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করতে পারে! মনে মনে ভেবে দেখতে চেষ্টা করি, এই মহিলা আমাকে কতদূর নিয়ে যেতে পারে। এই দুই বিপরীতমুখী ভাবনায় আমার ভেতরটা দুটুকরো হয়ে যাচ্ছে।
শামারোধের মুখটা যখন আমার স্মরণে আসে, সমগ্র শরীরের মধ্য দিয়ে একটা আবেগ প্রবাহিত হয়। আমি থর থর করে কেঁপে উঠতে থাকি। আমার ইচ্ছে হয়, এই সুন্দর নারী, প্রতি চরণপাতে যে পুষ্প ফুটিয়ে তোলে, তার জন্য জীবন মনপ্রাণ। সবকিছু উজাড় করে দিই। আবার যখন তার বিবিধ অনুষঙ্গের কথা চিন্তা করি এক ধরনের বিবমিষা আমার সমস্ত চেতনা আচ্ছন্ন করে ফেলে। এই মহিলাকে প্রাণের ভেতরে গ্রহণ করা যেমন অসম্ভব, তেমনি প্রাণ থেকে ডালেমূলে উপড়ে তুলে বিষাক্ত আগাছার মতো ছুঁড়ে ফেলাও ততধিক অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। তার সম্পর্কে চোখ বন্ধ করে চিন্তা করলে কখনো অনুভব করি সে অমৃতের পেয়ালা হাতে দাঁড়িয়ে আছে, আবার কখনো মারাত্মক প্লেগের জীবাণুর মতো অস্পৃশ্য মনে হয়। এই দোলাচলবৃত্তির মধ্যেই আমি দিন অতিবাহিত করছিলাম।
আমার গ্রামের এক ভদ্রলোকের সঙ্গে বায়তুল মোকাররম গিয়েছিলাম। ভদ্রলোক গ্রামের বাড়িতে যাচ্ছে। পরিবার-পরিজনের কাপড়-চোপড় কেনার জন্য আমাকে ধরে নিয়ে গিয়েছিলেন। বাজার থেকে কাপড়-চোপড় কেনার কাজটি আমি অপছন্দ করি। অথচ মানুষ সেই অপছন্দের কাজটি করার জন্য আমাকে বার বার ধরে নিয়ে যায়। এ-দোকান সে-দোকান ঘুরে ভীষণ ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম। ঘোরার চাইতে পাঁচমিশেলি মানুষের ভিড়ই হয়রান করেছে বেশি। গ্রামের ভদ্রলোককে বিদেয় করার পর ভাবলাম, যাক বাঁচা গেল!
আমি বায়তুল মোকাররমের সামনে এসে মুক্ত বাতাসে শ্বাস নিলাম। সন্ধ্যের বাতি জ্বলে উঠেছে। গাড়ি-ঘোড়ার আওয়াজ, মানুষের আওয়াজ, বিচিত্র বর্ণের আলোর উদ্ভাস সবকিছু মিলিয়ে আমার মনে হলো, সন্ধ্যেবেলার ঢাকা যেন ভূতপ্রেতের বাগানবাড়ি। এখানে সবকিছুই ভুতুড়ে। আমি পথ দিয়ে হেঁটে আসছিলাম। একা একা পথ চলার সময় মনে নানারকম ভাবনার উদয় হতে থাকে। জেনারেল পোস্টাফিস ছাড়িয়ে আমি আব্দুল গনি রোডে চলে এলাম। এই রাস্তাটিতে রিকশা চলে না। সুতরাং অল্পস্বল্প ফাঁকা থাকে। হঠাৎ করে পেছন থেকে কে একজন আমার শরীরে হাত রাখল। আমি চমকে উঠলাম।
হাইজ্যাকারের পাল্লায় পড়ে গেলাম না তো! এ মাসের স্কলারশিপের পুরো টাকাটা এখনো আমার পকেটে। যদি নিয়ে যায় সারা মাস আমার চলবে কেমন করে? পেছনে তাকিয়ে দেখি অর্থনীতি বিভাগের প্রফেসর তায়েবউদ্দিন সাহেব। তিনি আমার দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছেন। অদূরে তার সাদা ফিয়াটখানা দাঁড়িয়ে। তিনি বললেন, কি ভায়া, তোমার ভাবনার ব্যাঘাত ঘটালাম নাকি? বেশ হেলতে-দুলতে যাচ্ছে একাকী। আমি একটুখানি লজ্জিত হলাম। বললাম, না স্যার, এই সন্ধ্যেবেলায় এই ফাঁকা রাস্তায় হাঁটতে ভাল লাগে। তিনি বললেন, তুমি তো আবার ভাবুক মানুষ। গাড়িতে উঠতে বললে রাগ করবে?
আমি বললাম, রাগ করব কেন স্যার। আমি গাড়ির পেছনে বসতে যাচ্ছিলাম। তায়েবউদ্দিন সাহেব তার পাশের সিটটি দেখিয়ে বললেন, এখানেই বসো, কথা বলতে সুবিধে হবে। গাড়ি চলতে আরম্ভ করল। তিনি বনানীর স্কাইলার্ক রেস্টুরেন্ট-কাম বারের গেটের সামনে গাড়ি দাঁড় করিয়ে বললেন, তোমাকে পেয়ে খুবই ভাল হলো। আজকে তোমার সঙ্গেই চুটিয়ে আড্ডা দেব। এত ব্যস্ত থাকতে হয় শিল্প-সাহিত্য সম্বন্ধে কোনো খবরাখবর রাখাই সম্ভব হয় না। তোমার মুখ থেকেই এ বিষয়ে কিছু শুনব। প্রফেসর তায়েবউদ্দিন লিফটে উঠে বোতাম টিপলেন। আমার কেমন বাধোবাধো ঠেকছিল। একজন নামকরা প্রফেসরের সঙ্গে রেস্টুরেন্টে এসে আড্ডা দেয়া, এরকম কিছু আমাদের দেশে সচরাচর ঘটে না।
রেস্টুরেন্টে ঢুকে আমি অবাক হয়ে গেলাম। দেশী-বিদেশী নারী-পুরুষ জোড়ায় জোড়ায় বসে আছে। প্রায় প্রত্যেক টেবিলের সামনেই গ্লাস। কোনোটা ভর্তি, ফেনা উঠছে। কোনোটা অর্ধেক শেষ হয়েছে। এ ধরনের জায়গায় আমি আগে কোনোদিন আসি নি। রেস্টুরেন্টটিতে প্রবেশ করার পর আমার মনে হলো আমি অন্য কোনো দেশে এসে গেছি। তায়েবউদ্দিন সাহেব উত্তর-পশ্চিম কোণার দিকের একটা খালি টেবিলের সামনে এসে বসলেন। আমাকে তার বিপরীত দিকের চেয়ারটি দেখিয়ে বললেন, ওখানেই বসো। আমি যখন বসলাম, তিনি জানালার দিকে আঙুল প্রসারিত করে বললেন, এই জায়গাটা খুবই ভাল।
এখান থেকে ঢাকা শহরের স্কাই লাইন খুব স্পষ্টভাবে দেখা যায়। প্রফেসর তায়েবের পর্যবেক্ষণ শক্তির তারিফ করতে হয়। সত্যিই, এই জানালার সামনে দাঁড়ালে ঢাকা শহরের একটা সুন্দর ছবি চোখে পড়ে। এই সন্ধ্যেবেলায় রাজপথের ছুটন্ত গাড়িগুলোর দিকে তাকিয়ে মনে হলো যেন দ্রুতগামী গবাদিপশুর সারি। ধাতব আওয়াজ, কর্কশ চিত্তার, ট্রাক ড্রাইভারের খিস্তি কোন্ মায়াবশে যেন উধাও। এয়ারকন্ডিশন্ড রেস্টুরেন্টের কাঁচের জানালা দিয়ে গমনাগমনের মৃদুমন্দ ছন্দটিই শুধু ধরা পড়ছিল।
ইউনিফর্ম পরা বেয়ারা সামনে এসে দাঁড়ালে তায়েবউদ্দিন সাহেব আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, আমি একটু হুইস্কি খাব। তুমি কি খাবে বলো? আমি বললাম, আমি এক কাপ চা খেতে চাই। তিনি বললেন, চা খেতে গেলে নিচের তলায় যেতে হবে। আমি বললাম, তাহলে স্যার আমি কিছুই খাব না। তিনি বললেন, তা কি করে হয়, অন্তত একটা বিয়ার খাও। বেয়ারাকে বললেন, আমাকে চার পেগ হুইস্কি দাও, সঙ্গে সোডা। আর এই সাহেবকে একটা বিয়ার। সঙ্গে খাবার কি আছে? বেয়ারা কাছে এসে বলল, বটি কাবাব এবং হাঁসের ফ্রাই করা মাংস আছে। তায়েবউদ্দিন সাহেব বললেন, হাঁসের ফ্রাই-ই দাও।
তায়েবউদ্দিন সাহেব চেয়ার থেকে উঠে বললেন, তুমি বসো। আমি একটু টয়লেট থেকে আসি। বেয়ারা গ্লাসে হুইস্কি ঢেলে দিল। সোডার গ্লাসটি পাশে রাখল। তারপর বিয়ারের টিনটি আমার সামনে রেখে ভেতরে চলে গেল। অল্পক্ষণের মধ্যেই ড্রাগন আঁকা সোনালি বর্ডার দেয়া চীনেমাটির প্লেটে ফ্রাই করা হাঁসের মাংস অত্যন্ত তরিবৎ সহকারে বসিয়ে দিল। তায়েবউদ্দিন সাহেব ন্যাপকিনে হাত মুছতে মুছতে চেয়ারে বসে বললেন, বাহ্ হাঁসের মাংসের গন্ধ তো ভারি চমৎকার! আমার মুখ দিয়ে কথা বেরুলো না। কারণ এই স্বপ্নপুরীর রেস্টুরেন্ট, এই তরল হুইস্কির গ্লাস, ড্রাগন আঁকা প্লেটে ধূমায়িত হাঁসের মাংসের ফ্রাই, বুকে সোনালি তকমা আঁটা বেয়ারা- সবকিছুই আমার কাছে নতুন এবং অপরিচিত।
এই পরিবেশে আমার আসার কথা নয়। যদিও আমি টেবিলের সামনে হাজির আছি, আমার একটা অংশ মনে হচ্ছে আব্দুল গনি রোডে রেখে এসেছি। প্রফেসর তায়েব হুইস্কিতে সোডা মিশিয়ে চুমুক দিলেন এবং কাঁটা চামচ দিয়ে এক টুকরো হাঁসের ফ্রাই মুখের মধ্যে পুরে দিলেন। তার মুখ থেকে আহ্ শব্দটি বেরিয়ে এল। বোঝা গেল মাংসের স্বাদ তার ভাল লেগেছে। তার দেখাদেখি আমিও কাঁটা চামচ দিয়ে একখণ্ড হাঁসের ফ্রাই মুখে ঢুকিয়ে দিলাম। প্রফেসর সাহেব হুইস্কির গ্লাসে চুমুক দেয়ার ফাঁকে ফাঁকে আমার দিকে তাকাচ্ছিলেন। গ্লাসটা টেবিলে রেখে হঠাৎ তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করে বসলেন, ওকি, তুমি বিয়ারের টিনটা খোল নি কেন?
আমি চুপ করে রইলাম। বিয়ারের টিন কি করে কোনদিক দিয়ে খুলতে হয়, তাও আমি জানি নে। তিনি সেটা বুঝে গেলেন এবং নিজেই টিনটা খুলে আমার হাতে তুলে দিলেন। আমি টিনটা কাত করে গ্লাসে ঢালতে গিয়ে দেখি ভুসভুস করে ফেনা বেরিয়ে এসে টেবিলে ছড়িয়ে যাচ্ছে। আমি রীতিমতো অপ্রস্তুত বোধ করতে থাকলাম। প্রফেসর তায়েব বললেন, ও কিছু না, এক মিনিটের মধ্যেই কেটে যাবে। আমি যখন বিয়ারের গ্লাস তুলে সামান্য পান করলাম, এক ধরনের তেঁতো স্বাদে আমার জিভ একরকম অসাড় হয়ে গেল। বমি বমি ভাব অনুভব করছিলাম। অন্য জায়গায় অন্য পরিবেশে হলে হয়তো হড়হড় করে বমি করে ফেলতাম। কিন্তু এই রেস্টুরেন্টে আসার পর থেকেই একটা ভীতি আমার শরীরে ভর করেছে, সেই কারণেই বমি করে সবকিছু উগড়ে দেয়া সম্ভব হলো না।
থেমে থেমে আমি বিয়ার গলায় ঢেলে দিচ্ছিলাম।প্রফেসর তায়েব একটা সিগারেট জ্বালিয়ে বললেন, তোমরা যারা শিল্প-সাহিত্যের সঙ্গে যুক্ত আছ, মাঝেমধ্যে এসব জায়গায় আসা উচিত। মানুষ কিভাবে লাইফ এনজয় করে, সেটাও তোমাদের জানা উচিত। অভিজ্ঞতা না থাকলে ইনসাইট জন্মাবে কেমন করে? হুইস্কির ঘোরেই তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তা তুমি এখন কি লিখছ? আমি বললাম, কিছুদিন থেকে লিখতে পারছিনে। মনে মনে আমি প্রফেসর তায়েবকে ধন্যবাদ দিলাম। তিনি আমার নিজের বিষয়ে বিশেষ ধারণা পোষণ করেন। আমি বললাম, স্যার, আমার মাঝে মাঝে এমন হয়। চেষ্টা করেও একলাইন লিখতে পারি নে।
প্রফেসর হাতের ইশারায় বেয়ারাকে ডেকে তার গ্লাসে আরো তিন পেগ হুইস্কি দেয়ার নির্দেশ দিলেন। তারপর আমার দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন, কিন্তু বাজারে তোমার নামে একটা দুর্নাম রটেছে যে আজকাল তুমি কিছুই করছ না, লিখছ না এবং গবেষণার কাজও করছ না। সকাল-সন্ধ্যে এক সুন্দরী মহিলাকে নিয়ে নাকি কোথায় কোথায় ঘুরে বেড়াচ্ছে!তার মুখে এই কথা শোনার পর আমার ভেতরে প্রচণ্ড একটা ঝাঁকুনি খেলে গেল। আমার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় বলে দিল, প্রফেসর তায়েব আমাকে গাড়িতে চড়িয়ে এই রেস্টুরেন্টে নিয়ে এসেছেন শুধু এই একটি কারণে। শামারোখ সম্পর্কে সব ধরনের খবরাখবর সংগ্রহ করাই তার অভিপ্রায়। এবার আমি তার দিকে ভাল করে তাকালাম।
বিশ্ববিদ্যালয়ে তার সম্পর্কে যতগুলো গল্প চালু আছে একে একে আমার মনে পড়তে লাগল। প্রফেসর তায়েবের স্ত্রী তাকে ছেড়ে চলে গেছেন এবং তিনি আলাদা বাড়িতে বাস করেন। তার বাড়িতে স্থায়ীভাবে কোনো কাজের মেয়ে থাকতে পারে না। কোনোটাকে তায়েব সাহেব নিজে তাড়িয়ে দেন, কোনোটা আপনা থেকেই চলে যায়। কোনো কোনো কাজের মেয়েকে আবার ভীষণ জমকালো সাজপোশাকে সাজিয়ে রাখেন। অন্য শিক্ষকদের বেগমেরাও সেটা লক্ষ্য না করে পারেন না। এতদিন আমি বিশ্বাস করে এসেছি এই প্রতিভাবান শিক্ষকের খোলামেলা স্বভাবের জন্য ঈর্ষাপরায়ণ শত্রুরা তার নামে অপবাদ রটিয়ে দিয়েছে। এখন আমার মনে হলো, তার নামে যেসব গুজব রটেছে, তার সবগুলো না হলেও অনেকগুলো সত্যি।
তার সম্পর্কে যে শ্রদ্ধার ভাবটি এতদিন পোষণ করে আসছিলাম, ভেঙে খান খান হয়ে গেল। আমার সারা শরীর থেকে ঘাম নির্গত হচ্ছিল। নিজের অজান্তেই গ্লাসের বিয়ার কখন শেষ করে ফেলেছি, টেরও পাইনি।প্রফেসর তায়েবের দিকে তাকিয়ে দেখি, তিনি এখনো আমার দিকে তাকিয়ে উত্তরের প্রতীক্ষা করছেন। এই প্রথমবার তার বাঁকা নাকটা দেখে আমার শকুনের কথা মনে পড়ে গেল, আমাদের দেশে বিশেষ সাপ এবং শকুনের বিশেষ প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে- এই সংবাদ কোনো একটা প্রাণীবিষয়ক ম্যাগাজিনের মাধ্যমে জেনে গিয়েছিলাম।
তায়েব সাহেবের মুখের দিকে ভাল করে তাকিয়ে মনে হলো, পৃথিবী থেকে সাপ এবং শকুনের বিশেষ প্রজাতি বিলুপ্ত হলে কোনো ক্ষতি-বৃদ্ধি হবে না, একেক টাইপের মানুষের মধ্যে এই সাপ-শকুনেরা নতুন জীবনলাভ করে বেঁচে থাকবে।তায়েব সাহেব আমাকে আব্দুল গনি রোড থেকে এই এতদূরে নিজে গাড়ি ড্রাইভ করে স্বপ্নপুরীর মতো এই রেস্টুরেন্টে নিয়ে এসেছেন। তার পয়সায় জীবনে প্রথমবার বিয়ার চেখে দেখার সুযোগ পেলাম। সুতরাং, শামারোখ সম্পর্কিত তথ্যাদি যদি তার কাছে তুলে না ধরি, তাহলে নেমকহারামি করা হবে। অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে রেখে ঢেকে শামারোখের গল্পটা তার কাছে বয়ান করলাম। সব কথা প্রকাশ করলাম । যেটুকু না বললে গাড়িতে চড়া এবং বিয়ার পান হালাল হয় না, সেটুকুই বললাম।
শরীফুল ইসলাম চৌধুরী সাহেব আমাকে ডেকে নিয়েছিলেন সে কথা জানালাম। বাংলা একাডেমিতে শামারোখের সাক্ষাৎ তারপর প্রফেসর হাসানাত প্রসঙ্গ এবং ড. মাসুদের বাড়ি থেকে আমার না খেয়ে চলে আসা- এ সব কিছুই তায়েব সাহেবকে জানালাম। তিনি শুনে ভীষণ রেগে উঠলেন। বললেন, জাহিদ, শোনো, এই বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্বর এবং স্যাডিস্ট মানুষেরা রাজত্ব করছে। একবার অ্যাপয়েন্টমেন্ট দিয়ে আবার নাকচ করা, এই নোংরা প্রাকটিস আমাদের দেশেই সম্ভব। ইউরোপ আমেরিকার কোথাও হলে সব ব্যাটাকে জেল খাটতে হতো। শামায়োখ কষ্টে পড়েছে সেজন্য তিনি চুক চুক করে আফসোস করলেন।
প্রফেসর তায়েব আমার কাঁধে হাত দিয়ে বললেন, জাহিদ, আই মাস্ট ব্যাংক ইউ । তোমার উদ্দেশ্য মহৎ। তোমার নামে যা কিছু শুনেছি, এখন বুঝতে পারছি সেসব সত্য নয়। ভদ্রমহিলা কষ্টে পড়েছেন। তার চাকরির ব্যাপারটা অত্যন্ত জেনুইন। কিন্তু তুমি তাকে সাহায্য করবে কিভাবে! বিশ্ববিদ্যালয়ে তোমার কাজটাও তো হয় নি। তোমার কথা শুনবে কে? এক কাজ করো, তুমি ভদ্রমহিলাকে আমার কাছে নিয়ে এসো।
সোনা চোরাচালানির পেছনে গোয়েন্দা লাগলে যেমন হয়, আমারও এখন সেই দশা। আমার অনুভব শক্তি যথেষ্ট প্রখর নয়। তবু বুঝতে বাকি রইল না প্রফেসর তায়েব প্রক্রিয়াটির সূচনা করে দিলেন। আরো অনেক মহাপুরুষ শামারোখকে সাহায্য করার জন্য উল্লাসের সঙ্গে এগিয়ে আসবেন। তখন শামারোখকে তাদের ঠিকানায় পৌঁছে দেয়াই হবে আমার কাজ।
Read more
