অর্ধেক নারী অর্ধেক ঈশ্বরী পর্ব:১৩ আহমদ ছফা

অর্ধেক নারী অর্ধেক ঈশ্বরী পর্ব:১৩

অর্ধেক নারী অর্ধেক ঈশ্বরী পর্ব:১৩

ইউনুস জোয়ারদার খুন হয়ে আমার মধ্যে গোপন রাজনীতির প্রতি অনুরাগের বীজটি বুনে দিয়ে গিয়েছিলেন। সেই বীজের রাজনীতির জল-হাওয়া লেগে অঙ্কুরিত হতে সময় লাগে নি। ইউনুস জোয়ারদারের অবর্তমানে তার পার্টিতে যোগ দেয়ার সাহস আমার হয়নি। কারণ খুন করা এবং খুন হওয়া দুটোর কোনোটার সাহস আমার ছিল না। আমি এমন একটা পার্টি বেছে নিলাম যেটা অর্ধেক গোপন এবং অর্ধেক প্রকাশ্য। তার মানে পার্টির গোপন সেল আছে এবং সেখান থেকে সিদ্ধান্তগুলো গ্রহণ করা হয়। আর প্রকাশ্য অংশের কাজ হলো সেগুলোকে চলতি রাজনীতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে তার অনুকূলে জনমত সৃষ্টি করা। লেখক, সাহিত্যিক এবং শিক্ষকদের ভেতর যোগাযোগ করার দায়িত্ব আমাকে দেয়া হয়েছিল।

আমার সঙ্গে প্রকাশ্য অংশের বিশেষ সম্পর্ক ছিল না, মিটিং-মিছিলে অংশগ্রহণ করা ছাড়া।আমি সরাসরি পার্টির বস কমরেড এনামুল হকের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করতাম। তিনি বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া জনসমক্ষে দেখা দিতেন না। এই রহস্যময় পুরুষ, যার কথায় বিপ্লব, হাসিতে কাশিতে বিপ্লব, এমন এক মহাপুরুষের সঙ্গে আমার বিশেষ সম্পর্ক আছে মনে করলে আমি মনের মধ্যে একটা জোর অনুভব করতাম । ভাবতাম, আমি কখনো একা নই। এই রহস্যময় পুরুষ অদৃশ্যভাবে আমার সঙ্গে অবস্থান করছেন। কমরেড এনামুল হকের কাছে প্রতি পনের দিন অন্তর আমার কাজকর্মের রিপোর্ট দিতাম। শামায়োখের সঙ্গে পরিচয় হওয়ার পর তিনমাস কোথা দিয়ে কিভাবে পার হয়ে গেল, আমি বুঝতে পারি নি।

একদিনও কমরেড এনামুল হকের কাছে যাওয়া হয়নি। অথচ তিনি তিন-চারবার দেখা করতে সংবাদ পাঠিয়েছেন।শেষ পর্যন্ত আমি খিলগাঁও চৌধুরী পাড়ায় কমরেড এনামুল হকের গোপন আস্তানায় তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গেলাম। আমাকে সংবাদ জানানো হলো কমরেড অন্য কমরেডদের সঙ্গে জরুরি বিষয়ে আলাপ করছেন। আমাকে একটু অপেক্ষা করতে হবে। আমি বাইরের ঘরে হাতল ভাঙা চেয়ারের ওপর বসে পড়লাম। ঘণ্টাখানেক পর আমাকে ভেতরে ডাকা হলো। কমরেড এনামুল হকের ঘরে দেখলাম আধোয়া প্লেটের স্তূপ। মাংসের হাড়গোড় সরিয়ে নেয়া হয়নি। সারা ঘরে ছড়ানো স্টার সিগারেটের বটি। দেয়ালে মার্ক্স, এঙ্গেলস, লেনিন, স্টালিন এবং মাও সে তুংয়ের ছবি।

আমরা যারা কমরেড এনামুল হকের চ্যালা, সঙ্গত কারণেই বিশ্বাস করি, বাংলাদেশে যদি সর্বহারার সফল বিপ্লব হয়, মার্কস, এঙ্গেলস, লেনিন, স্টালিন, মাসে তুং-এর পাশে কমরেড এনামুল হকও একটা স্থান দখল করে নেবেন।আমি তিনমাস আসি নি। এই সময়ের মধ্যে কমরেড এনামুল হকের দাড়ি-গোঁফ আরো লম্বা হয়েছে। তার সুদূরপ্রসারী দৃষ্টির রহস্যময়তা আরো গাঢ় হয়েছে। যে হাতের বজ্রমুষ্টিতে তিনি সমাজের সমস্ত বন্ধন চূর্ণ করবেন বলে আমরা মনে করি, সেই হাত দিয়ে কমরেড এনামুল হক আমার হাত চেপে ধরলেন। পুরুষের হাত। এই হাতের স্পর্শ একবার যে পেয়েছে, কমরেড হকের প্রতি আকৃষ্ট না হয়ে পারে নি।

কমরেড হক তার তেজোব্যঞ্জক রহস্যময় দৃষ্টি এমনভাবে আমার ওপর প্রয়োগ করলেন, আমার মনে হলো, শরীরের নাড়িভুঁড়ি পর্যন্ত দেখে ফেলতে পারেন। তার সেই দিব্য দৃষ্টি থেকে কোনো কিছুই আমরা লুকোতে পারি নে।এবার কমরেড হক কথা বললেন, আমরা মনে করলাম, কমরেড জাহিদ বিপ্লবী দায়িত্ব ভুলে গিয়েছেন এবং আমাদের ছেড়ে দিয়েছেন। আমি ভীষণ লজ্জিত হয়ে পড়লাম। আমতা-আমতা করে একটা কৈফিয়ত দাঁড় করাতে চেষ্টা করলাম, শরীর ভাল ছিল না, তাছাড়া গবেষণার কাজে মনোযোগ দিতে হয়েছিল।

আমার খোঁড়া কৈফিয়ত শুনে বললেন, কমরেড জাহিদ, আপনাকে আর বানিয়ে বানিয়ে কৈফিয়ৎ দিতে হবে না। আমরা জানি একজন সুন্দরী মহিলাকে নিয়ে আপনাকে অত্যন্ত ব্যস্ত থাকতে হয়েছিল না, সেজন্য আপনাকে দোষারোপ করব না বরং আপনার তারিফ করব। মনে আছে কমরেড, প্লেটো বলেছিলেন, সুন্দরী মহিলারা সমাজের এজমালি সম্পত্তি। আপনার বান্ধবীকেও পার্টিতে নিয়ে আসুন। ভয় পাবেন না, বান্ধবী আপনার ঠিকই থাকবে, কিন্তু কাজ করবে পার্টির।

আমার মনে হলো, কমরেড এনামুল হকের সঙ্গে খোলাখুলি কথা বলা ভাল। আমি বললাম, কমরেড, এই ভদ্রমহিলা তো বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার কাজ চাইছেন। কমরেড এনামুল হক আবার ঠা-ঠা করে হেসে উঠলেন। তারপর বললেন, কমরেড, রাগ করবেন না, আপনার চিন্তা-চেতনা এখনো বুর্জোয়া ধ্যান-ধারণায় আচ্ছন্ন। এই সুন্দরী মহিলা বিশ্ববিদ্যালয়ে কি করবে? আপনি কি চান ওই বস্তাপচা জিনিস পড়িয়ে মহিলা তার জীবন অপচয় করবেন? বিপ্লবের তাজা কাজে লাগিয়ে দিন। আমি বললাম, তার থাকার অসুবিধা আছে, চলার কোন সঙ্গতি নেই। কমরেড এনামুল হক বললেন, সেই দুশ্চিন্তা আপনার নয়। পার্টি সব ভার বহন করবে।

তারপর তিনি আমার কাঁধে হাত দিয়ে গোপন কিছু ফাঁস করছেন, এমনভাবে বললেন, কমরেড, জানেন, একজন সুশিক্ষিত সুন্দর মহিলা আমাদের পার্টিতে থাকলে আমাদের কত সুবিধে হয়। আমাদের শত্রুদের খবরাখবর সংগ্রহ করতে হয়, চাঁদা ওঠাতে হয়। ভয় পাবেন না কমরেড, আপনার বান্ধবী আপনারই থাকবে, লাগিয়ে দিন পার্টির কাজে। একটু অবসর সময়ে আসবেন, আমি লেনিনের রচনাবলি খুলে আপনাকে দেখাবো, মহামতি লেনিন পরিষ্কার বলেছেন, বিপ্লব সফল করতে হলে সৌন্দর্য, শক্তি, অর্থ, মেধা, কৌশল সবকিছু একযোগে কাজে লাগাতে হবে। নিয়ে আসুন আপনার বান্ধবীকে।

আমি নিস্পৃহভাবে বললাম, কমরেড, ওই মহিলার মাথার মধ্যে একটা দুটো নয়, অনেকগুলো ছিট আছে। এ ধরনের মহিলা বিপ্লবী কাজ-কর্মের মোটেই উপযুক্ত হবে না। কমরেড হক একটা চুরুট জ্বালালেন এবং টান দিয়ে বললেন, কমরেড জাহিদ, বললে আপনি অসন্তুষ্ট হবেন, বুর্জোয়া ধ্যান ধারণা আপনার মনে এমনভাবে শেকড় গেড়েছে যে, বিপ্লবী দৃষ্টিভঙ্গি আপনার মধ্যে এখন পর্যন্ত জন্মাতে পারে নি ।মানুষের যত রকম ব্যাধি আছে তার অর্ধেক সামাজিক ব্যাধি। বিপ্লবী কর্মকাণ্ড হলো এ ধরনের রোগ-ব্যাধি নিরাময়ের মোক্ষম ওষুধ।

পার্টিতে নিয়ে আসেন, দেখবেন, এক সপ্তাহের মধ্যে আপনার বান্ধবী সুস্থ হয়ে উঠবেন।বুঝলাম, শামারোখের অবস্থা হয়েছে গোল আলুর মতো। গোল আলু যেমন মাছ, মাংস, সুটকি সব কিছুর জন্য প্রয়োজন, তেমনি শামায়োখকেও সবার প্রয়োজন। বিপ্লবের জন্য, কবিতার জন্য, রাজনীতির জন্য, এমনকি লুচ্চামি তাঁদরামোর জন্যও শামারোখের প্রয়োজন। দিনে দিনে নানা স্তরের মানুষের মধ্যে তার চাহিদা বাড়তে থাকবে। ভার বইবার দায়িত্বটুকু কেন একা আমার! যদি পারতাম কেঁদে মনের বোঝা হাল্কা করতাম।

একদিন দুপুরবেলা শামারোখ এসে বলল, আপনি আজ আমাকে খাওয়াবেন। আমি বিব্রতকর একটা অবস্থার মধ্যে পড়ে গেলাম। এই মহিলা দিনে দিনে আমার সমস্ত দীনতার কথা জেনে যাচ্ছে। আমি এই ভেবে শঙ্কিত হলাম যে, বজলুর মেসে যে খাবার খাই দেখলে ভদ্রমহিলা নিশ্চিতই তার নাক কুঁচকাবে। অথচ সে আজ নিজের থেকে কিছু খেতে চাওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। এটাকে আমার সৌভাগ্য বলে ধরে নিলাম। আমি জামা-কাপড় পরতে আরম্ভ করলাম। ভদ্রমহিলা আমার দিকে বড় বড় চোখ মেলে মন্তব্য করে বলল, আপনি এরকম উদ্ভট জামা-কাপড় পরেন কেন?

শুনে আমার ভীষণ রাগ হলো। কিন্তু সামলে নিলাম। বললাম, জামা-কাপড় আমি নিজে কিনি নে। বন্ধু-বান্ধবদের কাছ থেকে যখন যেটা পাওয়া যায় পরে ফেলি। আমি আলনার দিকে তার দৃষ্টি আকর্ষণ করে বললাম, এখানে যে শার্ট-প্যান্ট দেখছেন, তার কোনোটাই আমার কেনা নয়। সবগুলোই কারো না কারো কাছ থেকে পাওয়া। তাই আমার জামা-কাপড়ের কোনোটাই আমার গায়ের সঙ্গে খাপ খায় না। কোনোটা শরীরের মাপে ছোট, কোনোটা বড়। কিন্তু আমি দিব্যি পরে বেড়াচ্ছি। গায়ের মাপের চাইতে ছোটবড় জামা-কাপড় পরা যেন মস্ত একটা মজার ব্যাপার, এরকম একটা ভঙ্গি করে উচ্চকণ্ঠে হেসে উঠলাম।

মহিলা কোনো কথা বলল না। শুধু আমার দিকে ঠাণ্ডা চোখে তাকালো একবার। আমি বললাম, চলুন। শামারোখ জানতে চাইল, কোথায়? আমি বললাম, বাইরে। সে বলল, বাইরে থেকেই তো এলাম। আবার বাইরে যাব কেন? আমি বললাম, আপনি তো খেতে চাইলেন। তাই কোনো রেস্টুরেন্টে চলুন। শামারাৈখ বলল, আপনার হোস্টেলে খাবার পাওয়া যায় না? আমি বললাম, সে খাবার খেতে আপনার রুচি হবে না। শামারোখ বলল, আপনারা সবাই দু’বেলা ওই খাবার খেয়েই তো বেঁচে আছেন। আমি শামারোখের চোখে চোখে তাকিয়ে প্রশ্ন করলাম, আমাদের মেসের খাবার খেলে আমার প্রতি আপনার ঘৃণা জন্মাবে। সে কপট ক্রোধের ভান করে বলল, জাহিদ সাহেব, আপনি ইনকরিজিবল। চলুন, আপনাদের মেসে যাই।

আমি মনে মনে প্রমাদ গুণলাম। এখন মেসের অধিকাংশ বোর্ডার খেতে বসেছে। এই সময়ে যদি তাকে নিয়ে যাই একটা দৃশ্যের অবতারণা করা হবে। আমাদের মেসে পুরুষদের পাশাপাশি মহিলাদের খেতে আপত্তি নেই। অনেক সময় স্বামী-স্ত্রী দুজন রান্নার ঝামেলা এড়াবার জন্য দুই’বেলাই মেসে এসে খাওয়া-দাওয়া করে। কেউ কেউ তাদের বান্ধবী এবং আত্মীয়দের নিয়েও মেসে খেয়ে থাকে। কিন্তু শামারোখের ব্যাপারে যে ভয় আমি করছিলাম, তাকে যদি মেসে নিয়ে আসি, হঠাৎ কেউ কিছু বলে ফেলতে পারে। এমনিতেই শামারোখকে নিয়ে মানুষজন এতসব আজেবাজে কথা বলে যে, শুনতে শুনতে আমার কান ঝালাপালা হয়ে গেছে। আজ শামারোখের উপস্থিতিতে কেউ যদি উল্টোসিধে কিছু বলে বসে, সে ঝগড়া করার জন্য মুখিয়ে উঠবে। মাঝখানে আমি বেচারি বিপদের মধ্যে পড়ে যাব ।

শামারোখকে বললাম, আপনি হাত-পা ধুতে থাকুন, আমি মেস থেকে খাবার নিয়ে আসি। সে বলল, আপনি না-হক কষ্ট করতে যাবেন কেন? চলুন মেসে গিয়েই খেয়ে আসি। অগত্যা তাকে নিয়ে আমাকে মেসে যেতে হলো। তখন বোর্ডাররা সবাই খেতে বসেছে। সবগুলো টেবিলই ভর্তি। তিন নম্বর টেবিলের কোণার দিকটা খালি। ওখানেই আমি শামারোখকে নিয়ে বসলাম। আমি তাকে মেসে নিয়ে যেতে পারি, এটা কেউ চিন্তাও করতে পারে নি। প্রায় সবগুলো দৃষ্টি শামায়োখের দিকে তাকিয়ে আছে। সেটা তার দৃষ্টি এড়ায় নি। শামারোখ খেতে খেতে বলল, আচ্ছা, সবাই আমার দিকে এমনভাবে তাকাচ্ছে কেন, আমি কি চিড়িয়াখানা থেকে এসেছি?

আমার বলতে ইচ্ছে হয়েছিল, সুন্দর মহিলাদের দিকে সবাই তাকিয়ে থাকে, এটাতো খুব মামুলি ব্যাপার। কিন্তু চেপে গেলাম। আমার পাশে বসেছিল রিয়াজুল সাহেব। আচার-আচরণে তিনি পারফেক্ট জেন্টলম্যান। শামারোখকে উদ্দেশ্য করে বললেন, আপনাকে আগে কেউ দেখে নি, সে জন্যই তাকাচ্ছে। আপনি কিছু মনে করবেন না। শামারোখ রিয়াজুল হক সাহেবের সঙ্গেই আলাপ জুড়ে দিলেন। আপনি কি ভাই টিচার? রিয়াজুল হক সাহেব জবাব দিলেন, তিনি ফিজিক্সের টিচার। কথাবার্তা আর বিশেষ এগুলো না । খাওয়ার পর যখন ঘরে এসেছি, শামারোখ বলল, আপনি এককাপ চা করে খাওয়ান।

খাবারের গুণাগুণ নিয়ে কোনো কথা বলল না দেখে আমি মনে মনে হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম। আমি চা বানিয়ে দিলে খেতে খেতে সে বলল, আজ বেশিক্ষণ বসব না। আমাকে এক জায়গায় যেতে হবে। আমি বললাম, আপনি কি সরাসরি বাড়ি থেকে আসছেন? শামারোখ বলল, নারে ভাই, অন্য জায়গা থেকে এসেছি। আমার নানা সমস্যা, যাকে বলে মাথার ঘায়ে কুত্তা পাগল- আমারও সে অবস্থা। আমি জানতে চাইলাম কি রকম সমস্যা। সে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, বলব একদিন। তারপর বলল আমি মাঝে মাঝে রান্না করে আপনার জন্য খাবার নিয়ে আসব। আমি কথাটা শুনলাম, শুনে ভাল লাগল। কিন্তু হ্যাঁ বা না কিছু বলতে পারলাম না।

একদিন সন্ধ্যে বেলা আমার এক আত্মীয়কে ট্রেনে উঠিয়ে দিতে কমলাপুর যেতে হয়েছিল। ট্রেন ছাড়তে অনেক দেরি করল। ফিরতে ফিরতে অনেক রাত হয়ে গেল। আমি মেসে খাবার পাওয়া যাবে কিনা এ নিয়ে চিন্তিত ছিলাম। বাইরের কোনো হোটেল থেকে খেয়ে নেব কিনা চিন্তা করেও কেন জানি খেতে পারলাম না। হোস্টেলে যখন ফিরলাম, রাত দশটা বেজে গেছে। গেট পেরিয়ে ভেতরে পা দিতেই দারোয়ান আকর্ণ বিস্তৃত একখানা হাসি দিয়ে জানালো, ছাব আপনার কপাল বহুত ভালা আছে। সেই সোন্দর মেমছাব এই জিনিসগুলো আপনার লাইগ্যা রাইখ্যা গেছে। আমার ডিউটি শেষ, নয়টা বাজে। মগর আপনার লাইগ্যা বইসা আছি। হাফিজ আমার হাতে একটা টিফিন ক্যারিয়ার এবং আঙ্কারা স্টোর্স লেখা একটা শপিং ব্যাগও গছিয়ে দিল।

ঘরে এসে প্রথম শপিং ব্যাগটাই খুলোম। দেখি দুটো শার্ট এবং একটা পুরোহাতা সোয়েটার। আমার সেই গ্রামীণ রাগটা আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। আমার জামা-কাপড় মানানসই নয় বলেই ভদ্রমহিলা আমাকে দোকান থেকে শার্ট সোয়েটার কিনে দিয়ে করুণা প্রদর্শন করেছে। ছুঁড়ে ফেলতে ইচ্ছে হলো। কিন্তু পারলাম না। সুন্দর জিনিসের আলাদা একটা মন হরণ করার ক্ষমতা আছে। পুরোহাতা শার্টটা নেড়েচেড়ে দেখে আমার মন ভীষণ খুশি হয়ে উঠল। শার্টটা অপূর্ব! সিল্কের সাদা জমিনে লালের ছিটে। পরে দেখলাম আমার গায়ের সঙ্গে একেবারে মানিয়ে গেছে।

সুতির হাফ শার্টটাও মনে ধরে গেল। পুরোহাতা সোয়েটারটা আমাকে সবচাইতে মুগ্ধ করল। নরম মোলায়েম উলের তৈরি আকাশী রঙে ছোপানো। শামারোখের রুচি আছে বলতে হবে! সে অন্যের জন্যও পছন্দ করে জামা-কাপড় কিনতে জানে। হঠাৎ আমার মনে একটা শিহরন খেলে গেল। তাহলে শামারোখ কি আমাকে ভালোবাসে? আমার হৃৎপিণ্ডটা আশ্চর্য সাংঘাতিক ধ্বনিতে বেজে উঠতে থাকল। শরীরের রক্ত সভায় একটা উচ্ছ্বাসের সাড়া জেগেছে। আমি নিজেকে নিজের মধ্যে আর ধরে রাখতে পারছি নে। কী সুখ, কী আনন্দ! এই অসহ্য আনন্দের ভার কী করে বহন করি?

কোনোরকমে জুতো জোড়া পা থেকে গলিয়ে বিছানার ওপর সটান শুয়ে থাকার পর টের পেলাম, এখনো রাতের খাওয়া শেষ করিনি। চার থাকঅলা শামারোখের টিফিন ক্যারিয়ার খুলোম। প্রথম থাকে দেখি কয়েক টুকরো কাটা শশা। একটা কাঁচামরিচ এবং একটা আস্ত পাতাসুদ্ধ পেঁয়াজ। একপাশে সামান্য পরিমাণ আমের ঝাল আচার। এগুলো মহামূল্য পদার্থ নয়। কিন্তু টিফিন ক্যারিয়ারে যেভাবে সাজিয়ে রাখা হয়েছে, সেই সুন্দর যত্নটাই আমাকে অভিভূত করে ফেলল। দ্বিতীয় তাকে সরু চালের ভাত এবং ওপরে দুফালি বেগুন ভাজা। তৃতীয় তাকে আট-দশটা ভাজা চাপিলা মাছ এবং চতুর্থ তাকে ঘন মুগের ডাল । সহসা আমার চোখ দিয়ে পানি বেরিয়ে আসতে চাইল । আহা, কতকাল ঘরের খাবার খাইনি!

প্রতিরাতে হোস্টেলে ফিরে দেখি, দরজার সামনে বজলু টিফিন ক্যারিয়ার থুয়ে গেছে। ঢাকনা খুললেই দেখি বাটির মধ্যে একটা মুরগির ঠ্যাং চিৎ হয়ে শুয়ে রয়েছে। ওই মুরগির ঠ্যাং দেখতে দেখতে, আর মুরগির ঠ্যাং খেতে খেতে স্বয়ং আল্লাহতায়ালার বিরুদ্ধে আমার মনে অনেক নালিশ জমা হয়ে গেছে। আল্লাহ খাওয়ার সময় নিছক আমার বিরক্তি উৎপাদন করার জন্য ওই দু ঠেঙে পাখিটাকে সৃষ্টি করেছেন। শামায়োখের রেখে যাওয়া ছিমছাম পরিপাটি খাবার খেতে খেতে যত্ন এবং মমতা দিয়ে ঢাকা একখানা ঘরের কথা মনে হতে লাগল । আমার কি ঘর হবে?

সে রাতে অনেকক্ষণ পর্যন্ত আমি ঘুমুতে পারি নি। এক সময় ঘরে থাকা অসহ্য হয়ে দাঁড়ালো। দরজা খুলে বেরিয়ে এলাম। দারোয়ানকে ঘুম থেকে জাগিয়ে গেট খোলালাম। উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে বেরিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে টের পেলাম ভীষণ ঠাণ্ডা হাওয়া বইছে। এই ঠাণ্ডার মধ্যেই একাকী লনে পায়চারি করতে লাগলাম। রাতের পৃথিবী চুপচাপ । গাড়ি ঘোড়ার শব্দও কানে আসছে না।আকাশের দিকে দৃষ্টিপাত করে দেখলাম লাখ কোটি গ্রহ-নক্ষত্রের দেয়ালি চলছে। আমার হৃদয়ে যে হৃৎস্পন্দন জাগছে তার সঙ্গে আকাশের গ্রহ-নক্ষত্রের কাঁপা কাঁপা আলোর একটা সম্পর্ক আবিষ্কার করলাম।

এই তারা-ভরা আকাশের নিচে একা একা পায়চারি করতে করতে কেন জানি মনে হলো, গাছপালা, পশুপাখি, গ্রহ-নক্ষত্র কোনো কিছুর থেকে আমি আলাদা নই, বিচ্ছিন্ন নই । নিসর্গের মধ্যে সব সময় একটা পরিপূর্ণতা বিরাজ করছে। আমার নিজেকেও ওই চরাচর পরিব্যাপ্ত পূর্ণতার অংশ মনে হলো। আমি অনুভব করলাম, আমার ভেতরে শূন্যতা কিংবা অপূর্ণতার লেশমাত্রও নেই। এই পরিপূর্ণতার বোধটি আমার মনে মৌমাছির চাকের মতো জমেছে। শরীরে-মনে একটা আশ্চর্য শান্তির দোলা লাগছে। এক সময় অনুভব করলাম ঘুমে চোখ দুটো ভারি হয়ে আসছে।

সপ্তাহখানেক পরে হবে। এক সন্ধ্যেবেলা শামারোখ এসে বলল, জামা-কাপড় পরে তৈরি হয়ে নিন। আপনাকে আমার সঙ্গে এক জায়গায় যেতে হবে। আমি আড়চোখে তাকিয়ে দেখলাম, শামায়োখ খুব সূক্ষ্ম যত্নে সাজগোজ করে এসেছে। সূক্ষ্ম যত্ন শব্দ দুটো একারণে বললাম, সে যে সাজগোজ করেছে সেটা প্রথম দৃষ্টিতে ধরা পড়বে না। চুলগুলো পিঠের ওপর ছড়িয়ে দিয়েছে। একটা সাদা সিল্কের শাড়ি পরেছে এবং শাড়ির সঙ্গে ম্যাচ করে পরেছে ব্লাউজ। তার পরনের স্যান্ডেলের স্ট্রাইপগুলো সাদা। হাতের ব্যাগটিও সাদা রঙের। ওই শুভ্রতাময়ীর দিকে আমি অপলক চোখে তাকিয়ে রইলাম।

তার শরীর থেকে একটা মৃদু মন্থর ঘ্রাণ বেরিয়ে এসে ঘরের বাতাস পর্যন্ত সুবাসিত করে তুলছে। শামারোখকে এত সুন্দর দেখাচ্ছে যে, আমি চোখ ফিরিয়ে নিতে পারছিলাম না। শামায়োখ বলল, অমন হাঁ করে কি দেখছেন? বললাম না, তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নিতে। আমি লজ্জা পেয়ে চোখ নামিয়ে নিলাম। তারপর সেই পুরনো জামা-কাপড়গুলো আবার পরতে আরম্ভ করলে সে বলল, ওগুলো আবার পরছেন কেন? আপনার জন্য সেদিন শার্ট-সোয়েটার রেখে গেলাম না, সেগুলো কোথায়? আমি পলিথিনের ব্যাগটা শামারোখের হাতে দিয়ে বললাম, এর মধ্যে সব আছে। শামায়োখ ঝাঁঝের সঙ্গে বলল, এগুলো রেখে গিয়েছি পরার জন্য, ব্যাগের মধ্যে ঘুম পাড়িয়ে রাখার জন্য নয়। আমার কেমন বাধো-বাধো ঠেকছিল ।

শামায়োখের দেয়া কাপড়-চোপড় পরে পুরোদস্তুর ভদ্রলোক সেজে তার সঙ্গে বাইরে যাওয়ার মধ্যে একটা সূক্ষ্ম লজ্জার ব্যাপার আছে। সেটা আমি তাড়াতে পারছিলাম না। শামারোখের শার্ট পরব-কি-পরব না, এই ইতস্তত ভাবটা কাটিয়ে উঠতে পারছিলাম না। শামারোখ হঠাৎ দাঁড়িয়ে আমার শরীর থেকে এক ঝটকায় পুরনো জামাটা খুলে ফেলল। আমি বাধা দিতে পারলাম না। তারপর সে সিল্কের পুরোহাতা শার্টটার বোতাম খুলে আমার সামনে বাড়িয়ে দিয়ে বলল, শিগগির এটা পরে ফেলুন। বিনাবাক্যে শার্টটা পরে নিলাম। শামারোখ বোতামগুলো লাগিয়ে দিল। এ সময় তার ভোলা চুলগুলো এলোমেলো উড়ে আমার গায়ে জড়িয়ে যাচ্ছিল। আমি তার স্পর্শ পাচ্ছিলাম। আমার ইচ্ছে করছিল, তার সুন্দর চিবুকখানা স্পর্শ করি, মুখমণ্ডলে একটা চুমু দিয়ে বসি।

শামারোখ সোয়েটারটা আমার হাতে তুলে দিয়ে বলল, এটাও পরুন। বাইরে ভীষণ ঠাণ্ডা। অগত্যা আমাকে পরতে হলো। সে আমার সামনে ঝুঁকে পড়া চুলের গোছাটি পেছনে সরিয়ে দিতে দিতে বলল, আপনি কি পরিমাণ হ্যান্ডসাম, আয়নার সামনে গিয়ে দেখে আসুন। অথচ চেহারাখানা সবসময় এমন করে রাখেন, মনে হয়, সাতজন-পাঁচজনে ধরে কিলিয়েছে।আমরা দুজন বাইরে এসে একটা রিকশা নিলাম। আমি জিজ্ঞেস করলাম, আমরা কোথায় যাচ্ছি? শামারোখ বলল, কলাবাগানের একটা বাড়িতে। ভিসিআর-এ আপনাকে একটা ছবি দেখাবো। এ ধরনের ছবি ঢাকায় দেখানো হয় না। ফরাসি বিপ্লবের নায়ক দাঁতোর ওপর ছবি। আমার এক বন্ধু বিদেশ থেকে ক্যাসেট নিয়ে এসেছে।

আমাদের কলাবাগান পৌঁছুতে বেশি সময় লাগল না। রিকশা ভাড়া মিটিয়ে দিয়ে যখন বাড়ির ড্রয়িং রুমে প্রবেশ করলাম, দেখি, একপাশে বসে চারজন ব্রিজ খেলছে। টেবিলে বিয়ারের গ্লাস। এই চারজনের একজন সোলেমান চৌধুরী। আমাকে দেখামাত্রই তার মুখটা কঠিন হয়ে উঠল। শামারোখের দিকে তাকিয়ে বললেন, তোমার দেরি করার কারণটা বোঝা গেল। শামায়োখ জবাব দিল না। নাদুসনুদুস চেহারার ফ্রেঞ্চকাট দাড়িঅলা টাকমাথার ভদ্রলোকটি বিয়ার পান করতে করতে জিজ্ঞেস করলেন, উনি কে? শামারোখ বলল, উনি আমার বন্ধু এবং একজন ভালো লেখক। সোলেমান চৌধুরী শ্লেষাত্মক স্বরে বললেন, আসল কথাটি এড়িয়ে যাচ্ছ। বলো না কেন তোমার কবিতা লেখার পার্টনার।

 

Read more

অর্ধেক নারী অর্ধেক ঈশ্বরী শেষ : পর্ব আহমদ ছফা

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *