আকাশ জোড়া মেঘ -হুমায়ূন আহমেদ -(পর্ব-১১)

ক্লাস নাইনে হাফ-ইয়ারলি পরীক্ষার শেষ দিনে সে প্রথম বারের মতাে লিখল। সাধু ভাষায় লেখা সেই অংশটিই এই 

আজ আমার পরীক্ষা শেষ হইয়াছে। আমার মনে কোনাে আনন্দ হইতেছে না। পরীক্ষা বেশ ভালাে হইয়াছে। তবে কেন আমার আনন্দ হইতেছে না? আমি সঠিক জানি না। মাঝে-মাঝে খুব আনন্দের সময় আমার দুঃখ লাগে।

আকাশ জোড়া মেঘআমি কাঁদিয়া ফেলি। গত বছর আমরা নেপালের পােখরা’ নামক একটি স্থানে গিয়াছিলাম। চারিদিকে বিশাল পাহাড়। কত সুন্দর দৃশ্য। বাবা এবং মা’র মনে কত আনন্দ হইল। বাবা ক্যামেরা দিয়া একের পর এক ছবি তুলিতে লাগিলেন। কিন্তু কোনাে কারণ ছাড়াই আমার মনে খুব দুঃখ হইল। গলা ভার-ভার হইল। চোখ দিয়া পানি আসিতে লাগিল। ভাগ্যিস কেহ দেখিতে পায় নাই।” | অপালার খাতাটি ক্রমে ভরে উঠতে লাগল। ক্লাস টেনে উঠে প্রথম গল্প লিখল। বয়সের সঙ্গে তার গল্পটি মিশ খায় না। গল্পের নাম রাজ-নর্তকী। গল্পের বিষয়বস্তু পনের বছরের মেয়ের কলমে ঠিক আসার কথা নয়। শুরুটা এ-রকম ? 

রাজ-নর্তকী মহিমগড়ের রাজপ্রাসাদে থাকে এক নর্তকী। রাজসভাতে গান করে, নাচে। তার নাচ যে-ই দেখে সে-ই মুগ্ধ হয়। সেই রাজসভায় এক দিন এলেন ভিনদেশি এক কবি। তিনি নর্তকীর নাচ দেখে মুগ্ধ হলেন। হাত জোড় করে বললেন, ‘দেবী, আমি কি আপনার নাম জানতে পারি? নর্তকী হাসিমুখে বলল, আমার নাম অপালা। ‘দেবী, আমি কি নিভৃতে আপনার সঙ্গে কথা বলতে পারি? 

হ্যা, পারেন। আসুন গােলাপ বাগানে।। তারা দু জন গােলাপ বাগানে গেল। ফুলে-ফুলে চারদিক আলাে হয়ে আছে। রাজ-নর্তকী অপালা বলল, ‘কী আপনার নিবেদন, কবি? আপনি আমার কাছে কী চান? 

আকাশ জোড়া মেঘ -হুমায়ূন আহমেদ

যা চাই তাই কি আমি পাব? এত বড় সৌভাগ্য সত্যিই কি আমার আছে? তা তো বলতে পারছি না। আগে আমাকে বলতে হবে, আপনি কী চান? ‘আমি আপনাকে নিয়ে একটি কবিতা লিখতে চাই।’ ‘বেশ তাে, লিখুন‘আপনার অপূর্ব দেহ-সুষমা নিয়ে একটি কবিতা লিখতে চাই। 

বেশ তাে।’ কিন্তু দেবী, তার জন্যে আপনার দেহটিকে তাে আমার দেখতে হবে। দেখতেই তাে পাচ্ছেন। পাচ্ছেন না? ‘না, পাচ্ছি না। আপনার অপূর্ব দেহটি আড়াল করে রেখেছে কিছু অপ্রয়ােজীয়-পােশাক। এইগুলি। খুলে ফেলুন। পােশাক আপনার জন্যে বাহুল্য। এত সুন্দর একটি শরীরকে পােশাক ঢেকে রাখবে এটা কিছুতেই আমি মেনে নিতে পারি না। সে খানিকক্ষণ ভাবল, তারপর একে একে খুলে ফেলল সব।

শুধু গলায় রইল একটি চন্দ্রহার। সে চলুহারও খুলে ফেলতে গেল। কিন্তু কবি চেচিয়ে উঠলেন, না না, চন্দ্রহার খােলার সরকার নেই। চন্দ্রহার সরিয়ে ফেললে দেহের সমস্ত সৌন্দর্য একসঙ্গে আমার চোখে এসে পড়বে। আমি তা সহ করতে পারব না। গলায় শুধুমাত্র চন্দ্রহার পরে সে বাগানে হাঁটতে লাগল। আর রাজকবি একটি গাছের ছায়ায় তাঁর কবিতার খাতা নিয়ে বসলেন। আকাশ ঘন নীল। সূর্য তার হলুদ ফুল ছুঁড়ে দিচ্ছে চারদিকে। বাতাসে সেই হলুদ ফুলের নেশা ধরানাে গন্ধ। গাছে-গাছে পাখি ডাকছে। 

গল্পের শেষ অংশ বেশ নাটকীয়হঠাৎ বাগানে প্রবেশ করলেন রাজা। এই অদ্ভুত দৃশ্য দেখে স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। রাজ-নর্তকী অপালার মৃত্যুদণ্ড ইল | কবির চোখ অন্ধ করে দেয়া হল। অন্ধ কবি পথে-পথে ঘুরে বেড়ান এবং নর্তকীকে নিয়ে গীত রচনা করেন। অপূর্ব সব গীত। তিনি নিজেই তাতে সুর দেন। নিজেই গান। বনের পশু পাখিরা পর্যন্ত সেই গান শুনে চোখের জল ফেলে। 

আকাশ জোড়া মেঘ -হুমায়ূন আহমেদ

পরবতী কয়েক পৃষ্ঠা জুড়ে কবির লেখা গীত। গীতগুলি গদ্যের মতাে সরল নয়। ছেলেমানুষি ছড়া। 

এই লেখার পর প্রায় দু বছর আর কিছু লেখা হয় নি। দু’ বছর পর হঠাৎ লেখা—আমার জীবন। গদ্য এখানে অনেক স্বচ্ছ, গতিময়। হাতের লেখাও বদলে গেছে। আগের গােটা-গােটা হরফ উধাও হয়েছে। এসেছে প্যাচানাে ধরনের অক্ষর। আগের কোনাে লেখায় কোনাে রকম কাটাকুটি নেই। মনে হয় আগে অন্য কোথাও লিখে পরে খাতায় তােলা হত। আমার জীবন লেখাটিতে প্রচুর কাটাকুটি। 

আমার জীবন আমি কি খুব বুদ্ধিমতী ? মনে হয় না। কেউ কোনাে হাসির কথা বললে আমি বুঝতে পারি না। আজ বড় খালার বাসায় সবাই আমাকে নিয়ে ঠাট্টা করছিল। এটা যে ঠাট্টা, আমি বুঝতে পারি নি। কী নিয়ে কথা হচ্ছে তাও বুঝতে পারছি না। অবাক হয়ে সবার মুখের দিকে তাকাচ্ছি। বড় খালার মেয়ে বিনু হেসে গড়িয়ে পড়ছে। আমি অবাক হয়ে বললাম, আমি তাে কিছু বুঝতে পারছি না। বড় খালা বললেন, কম বােঝাই তােমার জন্যে ভালাে।

বেশি বুঝলে বা বুঝতে চাইলে ঝামেলায় পড়বে। আমি এই কথার মানে বুঝলাম না। মন-খারাপ করে বাসায় চলে এলাম। সারা দুপুর ডাবলাম। তখন একটা জিনিস আমার কাছে পরিষ্কার হল আমাকে বাবা এবং মা ছাড়া কেউ পছন্দ করেন না। যেমন বড় খালা, তিনি ছােট খালার ছেলেমেয়েকে তুই করে বলেন, মেজো খালার ছেলেমেয়েকে তুই করে বলেন; আমাকে বলেন তুমি করে।। সন্ধ্যাবেলা বাবাকে আমি এই কথাটা বললাম।

আকাশ জোড়া মেঘ -হুমায়ূন আহমেদ

বাবা চট করে খালাদের উপর রেগে গেলেন এবং বলতে লাগলেন—যা কেন তাদের বাসায় ? আর যাবে না। ‘ওঁরাও এ-বাড়িতে আসবে না। দারােয়ানকে বলে দেব এলে যেন গেট খােলা না হয়। বাবার রাগ যেমন চট করে ওঠে তেমনি চট করে নেমে যায়। এইবার তা হল না। কী লজ্জার কাণ্ড! পরদিন সকালবেলা বাবা বড় খালাকে টেলিফোন করে বললেন—আপনি সবাইকে তুই-তুই করে বলেন, আমার মেয়েটাকে তুমি বলেন কেন? ভাগ্যিস বাবার এসব কাণ্ডকারখানা মা জানতে পারেন নি।

জানলে খুব মন খারাপ করতেন। মার হার্টের অসুখ খুব বেড়েছে। নড়াচড়াই করতে পারেন না। এই অবস্থায় মল-খারাপ করার মতো কোনাে ঘটনা ঘটতে দেয়া উচিত নয়। কিন্তু বাৰা এসব কিছু শুনবেন না। যা তাঁর মনে আসে, করবেন। আমার মাঝে-মাঝে মনে হয় মার এই অসুখের মূল কারণ হয়তাে-বা বাবা। কী লিখছি আবােল-তাবােল, হার্টের অসুখের কারণ বাবা হতে যাবেন কেন? তাঁর মতাে ভালাে মানুষ ক’জন আছে? 

আজ অনেক দিন পর অপালা তার খাতা নিয়ে বসেছে। কোনাে কিছু লেখার উদ্দেশ্যে নয়। পুরনাে লেখায় চোখ বােলানাের জন্যে। রাজ-নর্তকী গল্পটি সে পড়ছিল। এ-রকম একটা অদ্ভুত গল্প এত অল্প বয়সে সে কেন লিখেছিল ভাবতে-ভাবতে লজ্জায় গাল লাল হয়ে উঠল। এই গল্পটি ছিড়ে ফেলতে হবে। কিন্তু খাতা থেকে পাতা ছিড়তে মায়া লাগে। এই গল্পটি এখন ভালাে লাগছে না, আজ থেকে কুড়ি বছর পর 

হয়তাে-বা ভালাে লাগবে। 

আকাশ জোড়া মেঘ -হুমায়ূন আহমেদ

‘আফা। 

অপালা চমকে তাকাল। রমিলা যে উঠে এসেছে, তার পিছনে দাঁড়িয়ে আছে, সে লক্ষই করে নি। 

‘আফনেরে নিচে ডাকে। 

কে? ‘ঐ যে দাড়িওয়ালা লােকটা, ঘর ঠিক করে যে। 

ও আচ্ছা। বসতে বল, আমি আসছি।’ 

রমিলা গেল না, দাঁড়িয়ে রইল। অপালা শান্ত স্বরে বলল, ‘দাঁড়িয়ে আছ কেন? কিছু বলবে? 

‘আপনে দুপুরে কিছু খাইলেন না আফা। ‘খিদে ছিল না।” ‘অখন এটু নাস্তাপানি আনি? 

‘আন। আর ঐ লােকটাকে আগামী কাল আসতে বল। আমার নিচে নামতে ইচ্ছা। করছে না। 

‘জি আচ্ছা। 

ফিরােজ ঘড়ি আনতে ভুলে গিয়েছে, কাজেই কতক্ষণ পার হয়েছে বলতে পারছে না। এই অতি আধুনিক বসার ঘরটিতে কোনাে ঘড়ি নেই। সাধারণত থাকে। কোকিল-ঘড়ি বা এই জাতীয় কিছু। এক ঘন্টা পার হলেই খুকরে দরজা খুলে একটা কোকিল বের হয়। কুকু করে মাথা ধরিয়ে দেয়। সময় পার হয়ে যাচ্ছে, ব্যাপাটাই যন্ত্রণাদায়ক। এর মধ্যে কু-কু করে কেউ যদি সেটা মনে করিয়ে দেয়, তাহলে আরাে খারাপ লাগার কথা। ঘড়ি চলবে নিঃশব্দে। কেউ জানতে চাইলে সময় দেখবে। যদি কেউ জানতে না চায়, তাকে জোর করে জানানাের দরকার কী? 

 

Read more

আকাশ জোড়া মেঘ -হুমায়ূন আহমেদ -(পর্ব-১২)

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *