আকাশ জোড়া মেঘ -হুমায়ূন আহমেদ -(পর্ব-১৭)

ফিরােজ সঙ্গে-সঙ্গে বসে পড়ল। একবার ভেবেছিল রাগ দেখিয়ে বলবে—চা লাগবে না। সেটা বিরাট বােকামি হত। এ যে-ধরনের মেয়ে, দ্বিতীয় বার অনুরােধ করবে না। দু’ জন চুপচাপ বসে আছে। মেয়েটি চায়ের কথা বলার জন্যে ভেতরে যাচ্ছে , কিংবা কাউকে ডেকেও কিছু বলছে না। এই পয়েন্টটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

আকাশ জোড়া মেঘ এর মানে হল, মেয়েটি তাকে ডাকতে পাঠাবার আগেই বলে দিয়েছে—আমরা খানিকক্ষণ গল্প করব, তখন আমাদের চা দেবে। অর্থাৎ কিছুক্ষণ সে গল্প করবে। 

অপালা বলল, ‘আসুন, আমরা বারান্দায় বসে চা খাই। আমার চা খাবার একটা আলাদা জায়গা আছে। বিকেলের চা বন্ধ ঘরের ভেতর বসে খেতে ইচ্ছা করে না। 

চা খাবার জায়গাটি অপূর্ব। যেন একটি পিকনিক স্পট। চারদিকে ফুলের টব। বড় বড় কসমস ফুটে রয়েছে। দিনের সামান্য আলােতেও তারা আনন্দে ঝলমল করছে। টেবিলে চায়ের সরঞ্জাম। সেই সরঞ্জাম দেখে ফিরােজ একটি দীর্ঘনিঃশ্বাস চাপল। কারণ একটিমাত্র চায়ের কাপ। ওরা এক জনের চা-ই দিয়েছে। | অপালা টেবিলের পাশে দাঁড়ানাে মেয়েটিকে বলল, অরুণা ও বরুণাকে বেঁধে রাখতে বল। আরেকটি চায়ের কাপ দিয়ে যাও।’ 

কাজের মেয়েটি সন্দেহজনক দৃষ্টি ফেলতে-ফেলতে যাচ্ছে। কর্মচারীর মতাে যে ঢুকেছে, সে মুনিবের মেয়ের সঙ্গে চা খাচ্ছে, দৃশ্যটিতে সন্দেহ করার মতাে অনেক কিছুই আছে।। 

‘আমার চায়ের জায়গাটা আপনার কেমন লাগছে? 

খুব ভালাে লাগছে।’ ‘আপনার বােধহয় একটু শীত-শীত লাগছে। এরকম একটা পাতলা জামা পরে কেউ শীতের দিনে বের হয়। | আহ্, কী সহজ-স্বাভাবিক সুরে মেয়েটি কথা বলছে! কী প্রচুর মমতা তার গলায়। ফিরােজের মন কেমন যেন অন্য রকম হয়ে গেল। 

‘আপনার বিয়েটা এখনাে হয় নি, তাই না? 

আকাশ জোড়া মেঘ -হুমায়ূন আহমেদ

কোন বিয়ে ? ‘ঐ যে একটি মেয়ের ছবি দেখালেন। বলছিলেন, এক সপ্তাহের মধ্যে বিয়ে হবে। 

‘ও, আচ্ছা। না, এখনাে হয় নি। সামনের মাসে হবার সম্ভাবনা। মেয়ের এক চাচা আমেরিকাতে থাকেন। ছুটি পাচ্ছেন না বলে আসতে পারছেন না। মেয়ে আবার খুব আদরের। কেউ চায় না যে, তার অনুপস্থিতিতে বিয়ে হােক। বাঙালি হচ্ছে সেন্টিমেন্টাল জাত, বুঝতেই পারছেন। | প্রচুর মিথ্যা বলতে হয় বলেই মিথ্যা বলার আর্ট ফিরােজের খুব ভালাে জানা। মিথ্যা কখনাে এক লাইনে বলা যায় না। মিথ্যা বলতে হয় আঁটঘাট বেধে। সত্যি কথার 

কোনাে ডিটেল ওয়ার্কের প্রয়ােজন হয় না, কিন্তু মিথ্যা মানেই প্রচুর ডিটেল কাজ। 

 অপালা বলল, আপনি যে এখনাে বিয়ে করেন নি, সেটা কীভাবে বুঝলাম বলুন 

কীভাবে বুঝলেন? ‘আপনার গায়ের পাতলা জামা দেখে। এই ঠাণ্ডায় আপনার স্ত্রী কিছুতেই এমন একটা জামা গায়ে বাইরে ছাড়তেন না। 

ফিরােজ লক্ষ করল, মেয়েটি ছেলেমানুষি ভঙ্গিতে হাসছে, যেন এই বিরাট আবিষ্কারে সে উল্লসিত। 

আপনি কি আরেক কাপ চা খাবেন? ‘হ্যা, খাব। এক কাপ খেলে খালে পড়ার সম্ভাবনা। 

‘আপনি নিশ্চয়ই আমাকে খুব অহঙ্কারী মেয়ে ভেবে বসে আছেন, তাই না? আমি কিন্তু মােটেই অহঙ্কারী না।’ 

তাই তাে দেখছি।’ ‘একা-একা থাকতে-থাকতে স্বভাবটা আমার কেমন অন্য রকম হয়ে গেছে। 

একা-একা থাকেন কেন? ‘ইচ্ছা করে কি আর থাকি? বাধ্য হয়ে থাকতে হয়। মা অসুস্থ। বাবা সারাক্ষণই বাইরে-বারে ঘুরছেন। 

‘অন্য আত্মীয়স্বজনরা আসেন না? 

‘কেন? ‘জানি না কেন। আমাকে বােধহয় পছন্দ করেন না। | ‘আপনাকে পছন্দ না-করার কী আছে? আমার তাে মনে হয় আপনার মতাে চমৎকার মেয়ে এই গ্রহে খুব বেশি নেই।’ 

ফিরােজ লক্ষ করল, মেয়েটি আবার রেগে যাচ্ছে। তার মুখে আগের কাঠিন্য ফিরে 

আসছে। ফিরােজের আফসােসের সীমা রইল না। অপালা বলল, ‘আসুন, আপনাকে গেট পর্যন্ত আগিয়ে দিই। 

অর্থাৎ অত্যন্ত ভদ্র ভাষায় বলা—বিদেয় হােন। ফিরােজের মন-খারাপ হয়ে গেল। আরেক বার আসার আর কোনাে উপলক্ষ নেই। দিন সাতেক পর সে যদি এসে বলে—ঐদিন একটা খাম কি আপনার এখানে ফেলে গেছি—তাহলে তা কি বিশ্বাসযােগ্য হবে? মনে হয় না। এই মেয়েটি অসম্ভব বুদ্ধিমতী।’ 

আকাশ জোড়া মেঘ -হুমায়ূন আহমেদ

সে গেট পর্যন্ত ফিরােজের সঙ্গে-সঙ্গে এল, কিন্তু একটি কথাও বলল না। ফিরােজ যখন বলল, ‘যাই তাহলে। সে তার জবাবেও চুপ করে রইল। শুধু দারােয়ানকে বলল, ‘অরুণা এবং বরুণাকে এখন ছেড়ে দাও। 

নিশানাথবাবু রাতের বেলা খবর নিতে এলেন। এই মানুষটি সাধারণত খুব হাসিখুশি। কিন্তু আজ কেমন যেন গম্ভীর লাগছে। মুখে খুব চিন্তিত একটা ভঙ্গি। অপালা বলল, ‘ম্যানেজারকাকু, আপনার কি শরীর খারাপ? 

‘না, শরীর ভালােই আছে। ‘বাবার কোনাে খবর পেয়েছেন? 

‘না। ইংল্যাণ্ডে পৌছেছেন, সেই খবর জানি। তারপর আর কিছু জানি না। স্যার মাঝে-মাঝে এ-রকম ডুব মারেন, তখন সব সমস্যা একসঙ্গে শুরু হয়। 

কোনাে সমস্যা হচ্ছে কি? ‘না, তেমন কিছু না। 

নিশানাথবাবু এড়িয়ে গেলেন। অপালার মনে হল, বড় কোনাে সমস্যা হয়েছে। কারখানাসংক্রান্ত কোনাে সমস্যা, যা এরা অপালাকে বলবে না। অপালারও এ-সব শুনতে ইচ্ছে করে না। সমস্যা থেকে যত দূরে থাকা যায় ততই ভালাে। 

ম্যানেজারকাকু! ‘কি মা? 

আকাশ জোড়া মেঘ -হুমায়ূন আহমেদ

‘ফিরােজ বলে যে-ছেলেটি আমাদের ঘর ঠিক করে দিল, তাকে একটি চিঠি দিতে বলেছিলাম, দেন নি কেন? 

নিশানাথবাবু বিস্মিত হয়ে বললেন, ‘দিয়েছি তাে! ‘ও, তাহলে উনি বােধহয় পান নি। রেজিস্ট্রি করে দেয়া দরকার ছিল। 

‘রেজিস্ট্রি করেই তাে দিয়েছি। চিঠির সঙ্গে একটা রেভিনিউ স্ট্যাম্প-বসানাে রিসিট ছিল। উনি তাে সেখানে সই করে ফেরত পাঠিয়েছেন। কাজেই আমার চিঠি না পাওয়ার তাে কোনাে কারণ নেই। আমি বরং কাল তাঁকে জিজ্ঞেস করব। 

‘না, জিজ্ঞেস করার দরকার নেই। নিশানাথবাবু ইতস্তত করে বললেন, ‘ছেলেটি আজ এখানে এসেছিল, তাই না? ‘হা।। 

এদের বেশি প্রশ্রয় দেয়া ঠিক না, মা। কাজ করেছে টাকা নিয়েছে, ব্যস, ফুরিয়ে গেল। আবার এসে এত কিসের চা খাওয়াখাওয়ি। * অপালা অবাক চোখে তাকিয়ে রইল। নিশানাথবাবুর হঠাৎ এখানে আসার উদ্দেশ্য স্পষ্ট হচ্ছে। তিনি এমনি-এমনি আসেন নি। নিশ্চয়ই তাঁকে খবর দেয়া হয়েছে। 

টেলিফোনে জানানাে হয়েছে।

 

Read more

আকাশ জোড়া মেঘ -হুমায়ূন আহমেদ -(পর্ব-১৮)

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *