পুরােপুরি সারে নি। সারবসারব করছে। আপনার গাছে ফুল ফুটেছে দেখছি। মিরাকল করে ফেলেছেন।
‘ফুল পর্যন্তই, ফল হয় না। ফুল ফোটে, দু’দিন পর ঝরে যায়। আপনি যাচ্ছেন কোথায় ?
‘কোথাও না, রাস্তায়।
চা খাবেন? ‘না।’

ঐ ব্যাপারটা কিছু করেছেন? ‘আপনার মেয়ের কথা বলছেন? ‘জ্বি। ‘জ্বরে আটকা পড়ে সব জট পাকিয়ে গেছে। দেখি, কাল-পরশুর মধ্যে বেরুব। হাজি সাহেব বিরক্ত মুখে বললেন, ‘আরেকটা সম্বন্ধ এসেছে।
বলেন কী! ছেলে কী করে? ‘করে না কিছু। ক্যাশ টাকা পেলে বিজনেস করবে বলছে।” ‘ক্যাশ টাকা কে দেবে, আপনি? ‘আমি ছাড়া আর কে?
একেবারেই পাত্তা দেবেন না। নেকস্ট টাইম যখন আসবে, এক চড় দিয়ে বিদায় করে দেবেন। আমি তাে ব্যবস্থা করছিই। আমি কি বসে আছি নাকি? ভাবেন কী আমাকে কথা দিয়েছি না? কথার একটা দাম আছে না?
হাজি সাহেবকে দেখে মনে হচ্ছে, তিনি খুব-একটা ভরসা পাচ্ছেন না।
‘ঐ লােক এলে হাঁকিয়ে দেবেন, বুঝলেন? ব্যাটা আছে টাকার তালে। এদের ধরে ধরে জেলে ঢুকিয়ে দেয়া দরকার, তাহলে বিয়ের শখ ঘুচে যাবে।
রাস্তায় নেমে ফিরােজের মনে হল জ্বর আবার চেপে আসছে। রােদ চোখে লাগছে। মাথা হালকা মনে হচ্ছে। সিগারেটে টান দিয়ে মনে হল এক্ষুণি বমি করে সব ভাসাবে। পেটের ভেতর ক্রমাগত পাক দিচ্ছে। কী ভয়াবহ অবস্থা। দু’ টাকা দিয়ে কেনা বেনসন এ্যাণ্ড হেজেস। শুধুমাত্র মহাপুরুষরাই একটান দিয়ে দু’ টাকা দামের সিগারেট ফেলে দিতে পারেন। ফিরােজ মহাপুরুষ নয়, মহাপুরুষ হবার কোনাে আগ্রহও তার নেই।
আকাশ জোড়া মেঘ -হুমায়ূন আহমেদ
সে জ্বলন্ত সিগারেট হাতে এলোেমলাে পা ফেলতে লাগল।
‘আপনি এখানে কী করছেন?
ফিরােজ নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না। মনে হচ্ছে জ্বরের ঘােরে সব তালগােল পাকিয়ে গেছে। হ্যালুসিনেশন হচ্ছে। কারণ সে যে-দৃশ্যটি দেখছে, তা তার এই অবস্থায় দেখতে পাওয়ার কোনাে কারণ নেই। বাংলা সিনেমাতেও এই ঘটনাটাকে নাটকীয় মনে হবে।
‘আপনি কি আমকে চিনতে পারছেন না?
‘চিনতে পারব না কেন? আপনি, এক জন অসম্ভব রাগী হৃদয়হীন অহঙ্কারী তরুণী। এখানে কী করছেন? | অপালা হেসে ফেলল। হাসতে-হাসতেই বলল, বেশ কিছুক্ষণ থেকে আপনাকে লক্ষ করছি। এ-রকম পাগলের মত পা ফেলছেন কেন? আপনি কি অসুস্থ?
‘হা। তার আগে বলুন, এমন সহজ ভঙ্গিতে আপনি আমার সঙ্গে কথা বলছেন কেন? ঐ দিন এমন অপমান করলেন। নেহায়েত সাহসের অভাবে সুইসাইড করি নি।
‘আমি আপনার কথা বুঝতে পারছি না। কিসের অপমান?
ঐ যে ঐ দিন দেখা করতে গেলাম, আপনি বলে পাঠালেন দেখা হবে না।
ঐ দিন মন ভালাে ছিল না। কথা বলতে ভালাে লাগছিল না। এতে অপমান বােধ করার কী আছে?’
“আজ কি আপনার মন ভালাে? ‘হা, ভালাে। গতকাল আমার একটা পরীক্ষা ছিল। খুব ভালাে পরীক্ষা দিয়েছি।’ ‘এখানে কী করছেন? ‘এক জনকে খুঁজছি। ‘আমাকে না তাে? ‘না, আপনাকে কেন খুঁজব? এ-রকম করে কথা বলছেন কেন?
আকাশ জোড়া মেঘ -হুমায়ূন আহমেদ
‘শরীর খারাপ তাে, কাজেই উল্টোপাল্টা কথা বলছি। ঐ-সব ধরবেন না। আপনি এক-একা হাঁটছেন, আপনার বডিগার্ডরা কোথায়? গাড়ি কোথায়?
অপালা হাসতে-হাসতে বলল, ‘কাউকে না-বলে একা-একা বেরিয়েছি। এক জনকে একটা গিফট দেব। ঠিকানা লেখা আছে, খুঁজে বের করতে পারছি না।
‘দিন ঠিকানা, এক্ষুণি বের করে দিচ্ছি। এইভাবে লুঙ্গি পরে যাবেন? আমি এখানে দাঁড়াচ্ছি, আপনি চট করে কাপড় বদলে আসুন।
‘রাস্তায় দাঁড়িয়ে না-থেকে আপনিও বরং আমার সঙ্গে আসুন। কোথায় কীভাবে থাকি দেখে যান, কাজে লাগবে।
কী কাজে লাগবে? বাংলাদেশে কিছু দরিদ্র মানুষও থাকে, এটা জানবেন। ‘আপনার ধারণা, আমি জানি না? ‘আমার সে-রকমই ধারণা।’
খুবই আশ্চর্যের ব্যাপার, শাড়ির প্যাকেট হাতে অপালা ফিরােজের পিছনে-পিছনে আসছে। অপালার ভালােই লাগছে। কেন ভালাে লাগছে তাও ঠিক বুঝতে পারছে না। এই মানুষটি তাকে দেখে অসম্ভব খুশি হয়েছে। তা ফুটে উঠেছে তার চোখে-মুখে, কথা বলার ভঙ্গিতে। তার সিগারেটে আগুন নেই। সেই নেভাননা সিগারেটই সে টানছে। এবং ধোঁয়া ছাড়বার মতাে ভঙ্গি করছে। লােকটি জানে না যে তার সিগারেট নেতানাে। অপালার মনে ক্ষীণ একটা সন্দেহ খেলা করছে। এই সন্দেহটিকে প্রশ্রয় দেয়া বােধহয় ঠিক হবে না।
ফিরােজ হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ল। বিস্মিত গলায় বলল, ‘আপনি সত্যি-সত্যি আমার সঙ্গে আসছেন!
‘আপনি তাে আসতে বললেন।
Read more