আকাশ জোড়া মেঘ -হুমায়ূন আহমেদ -(পর্ব-২৭)

অপালা বলল, দরজাটা কি ভােলা যাবে?  খুট করে দরজা খুলল, তাও পুরােপুরি নয়। অল্প একটু ফাঁক করে বার-তের বছরের মেয়েটি মুখ বের করে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। এই মেয়েটিকেই অপালা তাদের গেটের বাইরে দেখেছে। মেয়েটি কী-যে অবাক হয়েছে! চোখ বড়-বড় করে তাকিয়ে আছে। নিঃশ্বাস পর্যন্ত ফেলছে না। অপালাকে কোনাে কথা বলার সুযােগ না দিয়ে ছুটে ভেতরে চলে গেল। তার পরপরই অনেকগুলাে পায়ের শব্দ পাওয়া গেল। 

আকাশ জোড়া মেঘ

বাড়ির সবাই যেন একসঙ্গে ছুটে আসছে। অপালার লজ্জা করতে লাগল। 

এ-বাড়িতে বােধহয় কোনাে ছেলে নেই। পাঁচটি বিভিন্ন বয়সের মেয়ে তাকে ঘিরে আছে। এদের সবার মুখের দিকে খানিকক্ষণ করে তাকাল। একটি শীতল স্রোত বয়ে গেল অপালার গা দিয়ে। এই মেয়েগুলাে দেখতে তার মতে, বিশেষ করে বড় মেয়েটি। অপালা কাঁপা গলায় বলল, তােমরা কেমন আছ? কেউ কোনাে জবাব দিল না। বাড়ির ভেতর থেকে এক জন মহিলা বললেন, ‘ওকে ভেতরে নিয়ে আয়, ওকে ভেতরে নিয়ে আয়। বড় মেয়েটি চাপা গলায় বলল, “আস, ভেতরে আস।’ বলেই সে অপালার হাত ধরল। যেন সে এদের অনেক দিনের পরিচিত কেউ। অপালা বলল, তােমরা কি আমাকে চেন? তারা কেউ সে-প্রশ্নের জবাব দিল না। ভেতর থেকে ভদ্রমহিলা বললেন, ‘ওকে নিয়ে আয়, ওকে ভেতরে নিয়ে আয়। 

চাদর গায়ে এক জন মহিলা বিছানায় শুয়ে আছেন। অপালা ঘরের ভেতর পা দেয়ামাত্র তিনি কাঁদতে শুরু করলেন। কান্নার দমকে তাঁর ছােট্ট শরীর থর-থর করে কাঁপছে। বড় মেয়েটি ছুটে গিয়ে তার মাকে ধরল। ফিসফিস করে বলল, কিছু হয় নাই মা, কিছু হয় নাই, তুমি চুপ কর। ভদ্রমহিলা চুপ করতে পারছেন না। 

আকাশ জোড়া মেঘ -হুমায়ূন আহমেদ

অপালা তীক্ষ্ণ গলায় বলল, “আপনি কি আমাকে চেনেন? ভদ্রমহিলা না-সূচক মাথা নাড়লেন। ‘আপনি তাহলে এ-রকম করছেন কেন? 

বড় মেয়েটি একটি হাতপাখা নিয়ে তার মাকে দ্রুত হাওয়া করছে। মেজো। মেয়েটি অপালার হাত ধরে বলল, “তুমি বস। চেয়ারটায় বস। 

অপালা বসল। হাতের শাড়ির প্যাকেটটি নামিয়ে রেখে ক্লান্ত গলায় বলল, ‘এ বাড়ির যে মেয়েটির বিয়ে, তার জন্যে এই শাড়িটা এনেছি। বিয়ের দিন তাে আসতে পারব না, তাই। বেশি লােকজন আমার ভালাে লাগে না। | অপালা কী বলছে নিজেও বুঝতে পারছে না। সে যেন ঘােরের মধ্যে কথা বলছে। পাঁচটি মেয়ের কেউই তার কথা শুনছে বলে মনে হল না। সবাই চোখ বড়-বড় করে অপালার দিকে তাকিয়ে আছে। শুধু বড় মেয়েটি তার মাকে নিয়ে ব্যস্ত। ভদ্রমহিলা এখন আর কোনাে সাড়াশব্দ করছেন না। তাঁর চোখ বন্ধ। হয়তো ঘুমিয়ে পড়েছেন। বড় মেয়েটি তার মা’র গলা পর্যন্ত চাদর টেনে মৃদু স্বরে বলল, এস, আমরা পাশের ঘরে। 

যাই।’ 

উনি কি ঘুমিয়ে পড়েছেন? ‘হ্যা। মার শরীর খুব খারাপ। মাঝে-মাঝে তাঁর এ-রকম হয়। 

উনি আমাকে দেখে এ-রকম করলেন কেন?’ বড় মেয়েটি তার জবাব না দিয়ে বলল, ‘চল, পাশের ঘরে যাই।’ 

অপালা বলল, ‘না, আমি পাশের ঘরে যাব না। আমি এখন চলে যাব। আমার ভালাে লাগছে না। আমার একটুও ভালাে লাগছে না। 

সে উঠে দাঁড়াল। আবার বলল, তােমরা কি আমাকে চেন? বড় মেয়েটি বলল, না, চিনি না।’ “সত্যি চেন না? 

তােমার বাবা আমার বাবাকে অনেক সাহায্য করেছেন, সেইভাবে চিনি। আমার বাবার কোনাে টাকাপয়সা ছিল না। প্রায় না-খেয়ে ছিলেন। বাবা-মা আর তাদের তিন মেয়ে। তখন তােমার বাবা আমাদের সাহায্য করেন। টাকাপয়সা দেন। বাবাকে একটা দোকান দিয়ে দেন। সেইভাবে তােমাকে চিনি।

 সেই রকম চেনায় কেউ কি আমাকে তুমি বলবে? 

‘তুমি বলায় কি রাগ করেছ?’ 

আকাশ জোড়া মেঘ -হুমায়ূন আহমেদ

অপালা জবাব না-দিয়ে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এল। সে ঠিকভাবে পা ফেলতে পারছে । তার যেন প্রচণ্ড জ্বর আসছে। নিঃশ্বাসও ঠিকমতাে ফেলতে পারছে না। অপালার সঙ্গে-সঙ্গে ওরা পাঁচ জনও বেরিয়ে এসেছে। মেজো মেয়েটি অপালার হাত ধরে কী বলতে চাইল। অপালা সেই হাত কাঁপা ভঙ্গিতে সরিয়ে প্রায় ছুটে গেল রাস্তার দিকে। তার মনে হচ্ছে, সে রাস্তা পর্যন্ত যেতে পারবে না, তার আগেই জ্ঞান হারিয়ে লুটিয়ে পড়বে। তৃষ্ণায় তার বুক ফেটে যাচ্ছে। 

পাঁচ বােন দরজা ধরে মূর্তির মতাে দাঁড়িয়ে আছে, যেন তারা কোনাে কারণে খুব ভয় পেয়েছে। 

রাত দশটা। 

নিশানাথবাবু দোতলায় উঠে এসে অপালার দরজায় ধাক্কা দিলেন। 

“মা, একটু দরজা খুলবে? 

অপালা দরজা খুলল। তার চোখ লাল। দৃষ্টি এলােমেলাে। নিশানাথবাবু মৃদু স্বরে বললেন, কি হয়েছে? 

‘কই, কিছু হয় নি তাে! কী হবে? ‘আজ তুমি কোথায় গিয়েছিলে? 

‘ম্যানেজারকাকু, আজ আমার কথা বলতে ভালাে লাগছে না। আপনি এখন যান। আপনার পায়ে পড়ি। 

নিশানাথবাবু আবার নিচে নেমে গেলেন। সেই রাতে তিনি আর বাড়ি ফিরলেন না। একতলার গেস্টরুমে রাত কাটালেন। 

ফখরুদ্দিন সাহেব গভীর রাতে টেলিফোন করলেন। গভীর রাতের টেলিফোনে গলা অন্যরকম শােনা যায়। চেনা মানুষকেও অচেনা মনে হয়। অপালা বলল, আপনি 

কে? 

ফখরুদ্দিন সাহেব বিস্মিত হয়ে বললেন, তুমি কি আমাকে চিনতে পারছ না, মা?’ 

ও, বাবা তুমি? ‘হ্যা, আমি। তােমার কী হয়েছে? ‘কই, কিছু হয় নি তাে! ‘মা, সত্যি করে বল তাে। ‘সত্যি বলছি, আমার কিছু হয় নি, শুধু…’ 

‘আমার খুব একা-একা লাগছে বাবা। 

ফখরুদ্দিন সাহেব টেলিফোনেই কান্নার শব্দ শুনতে পেলেন। তাঁর অসম্ভব মন খারাপ হয়ে গেল। 

“মা, তুমি কি কাঁদছ? ‘হ্যা, কাঁদছি। আর কাঁদব না।’ ‘কিছু-একটা তােমার হয়েছে। সেটা কী? 

অপালা চুপ করে রইল। ফখরুদ্দিন সাহেব বললেন, ‘আমাকে বলতে কি তােমার কোনাে বাধা আছে? 

বলার মতাে কিছু হয় নি বাবা। ‘কোনাে ছেলের সঙ্গে কি তােমার ভাব হয়েছে? নিশানাথ বলছিল আর্টিস্ট একটা ছেলে নাকি আসে প্রায়ই।

 

Read more

আকাশ জোড়া মেঘ -হুমায়ূন আহমেদ -(পর্ব-২৮)

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *