আকাশ জোড়া মেঘ -হুমায়ূন আহমেদ -(পর্ব-৩)

হুট করে হয় না। হুট করে প্রেম হয় কনজারভেটিভ ফ্যামিলিগুলিতে। ঐ সব ফ্যামিলির মেয়েরা পুরুষদের সঙ্গে মিশতে পারে না, হঠাৎ যদি সুযােগ ঘটে যায়—তাহলেই বড়শিতে আটকে গেল। উপরতলার মেয়েদের এই সমস্যা নেই। কত ধরনের ছেলের সঙ্গে মিশছে! | ফিরােজ উঠে দাঁড়াল। শশা-কেসটির সামনে কিছুক্ষণ কাটানাে যায়। ভদ্রলােক দেশ-বিদেশ ঘুরে এত সব জিনিস এনেছেন, কেউ এক জন দেখুক। এই বাড়িতে যারা বেড়াতে আসে তাদের শাে-কেসও এ-রকম জিনিসে ভর্তি।আকাশ জোড়া মেঘ
এরা নিশ্চয়ই দেখার ব্যাপারে কোনাে উৎসাহ বােধ করে না। আর থাকা যায় না, চলে যাওয়া উচিত। ডেকোরেশনের ফার্মটা ভার হলে এতক্ষণে চলেই যেত। দুর্ভাগ্যের ব্যাপার, ফার্মটা তার নয়। এক দিন যে এ-রকম একটা ফার্ম তার হবে, সে-রকম কোনাে নমুনাও বােঝ যাচ্ছে না। 

ম্যানেজার বাবু ঠিক দেড়টার সময় এলেন। ফিরােজ প্রথম যে-কথাটি বলল, তা হচ্ছে—বাথরুমটা কোথায়, আপনার কি জানা আছে? 

অনেকক্ষণ থেকেই টেলিফোন বাজছে। | অপালা বারান্দায় ছিল, শুনতে পায় নি। ঘরের দিকে রওনা হওয়ামাত্র শুনল। টেলিফোন বেজেই যাচ্ছে, আহানা জনি কে টেলিফোনের রিং হলেই অপালার কেন জানি মনে হয়, কেউ ব্যাকুল হয়ে ডাকছে। তার খুব একটা বড় সমস্যা। এই মুহূর্তেতার কথা শােনা দরকার। এক বার সত্যি-সত্যি হলও তাই। রিসিভার তুলতেই ভারি মিষ্টি গলায় একটি মেয়ে বলল, ‘সালাম ভাইকে কি একটু ডেকে দেবেন? আমার খুব বিপদ।’ 

অপালা বলল, ‘সালাম ভাই কে? ‘আপনাদের একতলায় থাকে। প্লীজ, আপনার পায়ে পড়ি। আমাদের একতলায় তাে সালাম বলে কেউ থাকে না। ‘তাহলে এখন আমি কী করব ?

আকাশ জোড়া মেঘ -হুমায়ূন আহমেদ 

বলতে-বলতে সত্যি-সত্যি মেয়েটি কেঁদে ফেলল। অপালা নরম স্বরে বলল, আপনার রং নাম্বার হয়েছে, আবার করুন, পেয়ে যাবেন। আমি রিসিভার উঠিয়ে 

রাখছি, তাহলে আর এই নাম্বারে চলে আসবে না।’ 

মেয়েটি ফোঁপাতে-ফোঁপাতে বলল, নাম্বার ঠিক হলেও লাভ হবে না। ওরা ডেকে দেয় না।’ 

‘তাই নাকি? 

‘হ্যা। শুধু যূথী বলে একটা মেয়ে আছে, ও ডেকে দেয়। কে জানে, আজ হয়তাে যূথী নেই। 

‘থাকতেও তাে পারে, আপনি করে দেখুন। | ‘আমাকে আপনি-আপনি করে বলছেন কেন? আমি মাত্র ক্লাস টেনে উঠেছি। আমাকে তুমি করে বলবেন। 

মেয়েটির সঙ্গে তুমি-তুমি করে কথা বলার আর সুযােগ হয় নি। তার টেলিফোন নাম্বার জানা নেই। মেয়েটিও অপালার নাম্বার জানে না। রং নাম্বারের একটি ব্যাপারে অল্প পরিচয়। কত দিন হয়ে গেল, এখনও সেই মিষ্টি গলার স্বর অপালার কানে লেগে আছে। টেলিফোন বেজে উঠলেই মনে হয়, ঐ মেয়েটি নয়তাে?  ঐ মেয়ে না। সিঙ্গাপুর থেকে অপালার বাবা ফখরুদ্দিন টেলিফোন করেছেন। ‘কেমন আছ মা? ‘খুব ভালাে। ‘তােমার মা’র কোনাে চিঠি পেয়েছ? 

আজ সকালেই একটি পেয়েছি। মা এখন প্রায় সুস্থ। সেকেও অপারেশনের ডেট পড়েছে? সে-সব কিছু তাে লেখেন নি। ‘এই মহিলা প্রয়ােজনীয় কথাগুলি কখনাে লেখে না। তুমি সন্ধ্যা সাতটা-সাড়ে সাতটার দিকে টেলিফোন করে জেনে নিও। এখানে সন্ধ্যা সাতটা মানে লণ্ডনে ভাের ছয়টা। 

আকাশ জোড়া মেঘ -হুমায়ূন আহমেদ 

‘আচ্ছা, আমি করব।’ ‘খুব একা-একা লাগছে নাকি?” “না, লাগছে না। তুমি আসছ কবে? ‘আরাে দু’দিন দেরি হবে। কোনাে খবর আছে? 

না, কোনাে খবর নেই।’ বসার ঘরটা নতুন করে সাজাতে বলে গিয়েছিলাম। কিছু হচ্ছে? ‘হা, হচ্ছে। ভীষণ রােগা আর লম্বা একটা ছেলে রােজ এসে কী—সব যেন করছে। তার সাথে মিস্ত্রি-টিস্ত্রিও আছে।” 

কাজকর্ম কতদূর এগােচ্ছে? ‘তা তাে জানি না বাবা! আমি নিচে বিশেষ যাই না। 

একটু বলে দিও তাে, যাতে আমি আসার আগে-আগে কমপ্লিট হয়ে থাকে। আমি এক্ষুণি বলছি। আর শােন, তােমার মাকে কিছু জানিও না। সে এসে সারপ্রাইজড় হবে। ‘আচ্ছা।’ 

ঐ ছেলেটার নাম কি? 

কোন ছেলেটার? ‘কাজ করছে যে। ‘নাম তাে বাবা জানি না। জিজ্ঞেস করি নি। নাম দিয়ে তােমার কী দরকা

‘কোনাে দরকার নেই। মতিন বলে একটা ছেলেকে দিতে বলেছিলাম। ওর কাজ ভালাে। কিন্তু তুমি তাে বলছ রােগা, লম্বা। ঐ ছেলে তাে তেমন লম্বা নয়। 

‘আমি নাম জিজ্ঞেস করব। যদি দেখি ও মতিন নয়, তাহলে কী করব? 

‘কাজ বন্ধ রাখতে বলবে। আমি স্পেসিফিক্যালি বলেছি মতিনের কথা। তােমার পরীক্ষা কেমন হচ্ছে মা? 

‘তালাে হচ্ছে না। 

খুব বেশি খারাপ হচ্ছে? ‘কেমন যেন মাঝামাঝি হচ্ছে! মাঝামাঝি কোনাে কিছুই আমার ভালাে লাগে না। 

 

Read more

আকাশ জোড়া মেঘ -হুমায়ূন আহমেদ -(পর্ব-৪)

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *