আকাশ জোড়া মেঘ -হুমায়ূন আহমেদ -(পর্ব-৩৩)

আমাদের দু’ জনের মধ্যে কে বেশি সুন্দর ? তােমাদের ঘৱে বড় আয়না আছে? এস না, দু’ জন পাশাপাশি দাঁড়াই। 

সােমা যেভাবে বসেছিল, সেভাবেই বসে রইল। অপালা অস্পষ্ট স্বরে বলল, আমি যদি ফিরে আসি, তাহলে কার সঙ্গে ঘুমুবাে? তােমার সঙ্গে? 

ভেতর থেকে সােমার মা তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বললেন, ‘কে কথা বলে ?

আকাশ জোড়া মেঘকে ওখানে? সােমা বলল, ‘কেউ না মা, কেউ না।’ “আমি স্পষ্ট শুনলাম। 

ভদ্রমহিলা নিজে নিজেই বিছানা থেকে উঠলেন। পা টেনে-টেনে সােমাদের ঘরের দরজার সামনে এসে থমকে দাঁড়ালেন। অপালা বলল, “আপনি ভালাে আছেন? 

এই বলেই সে অস্পষ্টভাবে হাসল। ভদ্রমহিলা দাঁড়িয়ে থাকতে পারছেন না। উলে পড়ে যাচ্ছেন। সােমা ছুটে গিয়ে তার মাকে ধরল। একা সে সামলাতে পারছে না। সে তাকাল অপালার দিকে। অপালা নড়ল না, যেভাবে বসে ছিল, সেভাবেই বসে রইল। সােমা বলল, তুমি একটু পানি এনে দেবে? মুখে পানির ছিটা দেব।’ 

অপালা উঠে দাঁড়াল। হালকা পায়ে বারান্দায় চলে এল। ঐ তাে পানির কল। মগে করে পানি নিয়ে আসা যায়। সে পানির কলের দিকে গেল না। নিঃশব্দে ঘর ছেড়ে চলে এল। তার খুব কাঁদতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু কান্না আসছে না। 

ফখরুদ্দিন সাহেব ঘন্টাখানেক আগে এসে পৌঁছেছেন। হেলেনারও টিকিট ছিল। তিনি আসতে পারেন নি। ডাক্তাররা শেষ মুহূর্তে ঠিক করেছেন হার্টে বাই পাস সার্জারির প্রয়ােজন, এবং তা অল্পদিনের মধ্যেই করতে হবে। ফখরুদ্দিন সাহেব সব ব্যবস্থা করে এসেছেন। দিন সাতেকের মধ্যে তিনি অপালাকে নিয়ে ফিরে যাবেন। 

আকাশ জোড়া মেঘ -হুমায়ূন আহমেদ

বাড়িতে পা দিয়েই তিনি মেয়ের খোঁজ করলেন। মেয়ে বাড়িতে নেই। কোথায় গিয়েছে কেউ বলতে পারে নি। গাড়ি নিয়ে যায় নি। আজকাল প্রায়ই গাড়ি ছাড়া বের হয়। ফখরুদ্দিন সাহেব কিছুই বললেন না। সারপ্রাইজ দেবার জন্যে খবর না-দিয়ে এসেছেন। সেই সারপ্রাইজটি দেয়া গেল না। 

তিনি দীর্ঘ সময় নিয়ে গােসল সারলেন। পরপর তিন কাপ বিস্বাদ কালাে কফি খেলেন। চুরুট ধরিয়ে নিচে নেমে এলেন। নিশানাথবাবুর সঙ্গে আগেই তার দেখা হয়েছে। তিনি কোনাে কথা বলেন নি, এখন বললেন। 

কেমন আছেন? 

‘জ্বি স্যার, ভালাে। 

বসার ঘরটির এই অবস্থা করেছে? ‘অপালা মা খুব পছন্দ করেছে। 

তার জন্যে এ-রকম ঘর একটা সাজিয়ে দেয়া যাবে। আপনি এক্ষুণি আগের ডেকোরেশনে ফিরে যাবার ব্যবস্থা করুন। 

“স্যার, করছি। ‘আর্টিস্ট লােকটি কি প্রায়ই এ-বাড়িতে আসে? ‘কার কথা বলছেন স্যার? ‘যে এই অদ্ভুত ডেকোরেশন করেছে, তার কথাই বলছি। ‘জি-না স্যার। ‘আপনি না-জেনে বলছেন। দারােয়ানকে ডেকে নিয়ে আসুন। 

নিশানাথবাবু ছুটে গেলেন। দারােয়ানের কাছে একটা বড় খাতা থাকার কথা। সেখানে সে লিখে রাখবে কে আসছে কে যাচ্ছে। কখন আসছে কখন যাচ্ছে। দারােয়ান খাতা নিয়ে এল। ফখরুদ্দিন সাহেব গম্ভীর গলায় বললেন, ‘যাও, আমার ঘরে রেখে এস। নিশানাথবাবু। ‘জ্বি স্যার। 

আপনার স্ত্রী এখানে কেন? ‘অপালা মা একা-একা থাকে……।। ‘সে কি বলেছিল তাঁকে আনবার কথা? 

জ্বি-না স্যার। ‘তাহলে…..? 

নিশানাথবাবু ঘামতে লাগলেন। ফখরুদ্দিন সাহেব বিরক্ত মুখে বললেন, ‘খবরের কাগজে এত কেচ্ছা-কাহিনী ছাপা হল, আপনারা ছিলেন কোথায়? পি-আর-ও সাহেবকে আসতে বলুন। যে-সব পুলিশ অফিসার এই ঘটনার তদন্ত করছেন, তাঁদেরকে খবর দিন যে আমি এসেছি। তাঁরা ইচ্ছা করলে আমার সঙ্গে কথা বলতে পারেন। | পুলিশ অফিসার ভদ্রলােক এক ঘন্টার মধ্যেই চলে এলেন। পুলিশ অফিসার বলে মনে হয় না, অধ্যাপক-অধ্যাপক চেহারা। পায়জামা-পাঞ্জাবির ওপর একটা শাল চাপাননা। শাল গায়ে দিয়ে কেউ অপরাধের তদন্ত করতে আসে! ফখরুদ্দিন সাহেব বিরক্তি চেপে রেখে মুখে হাসি ফুটিয়ে তুললেন। 

‘কি জানতে চান আমার কাছ থেকে, বলুন? 

আকাশ জোড়া মেঘ -হুমায়ূন আহমেদ

একটা তারিখ আপনার সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে চাই। আসামী বলছে, সে আপনার নির্দেশে এই কাজ করেছে। কোন তারিখে সে আপনার সঙ্গে কথাবার্তা বলেছে, তাও 

সে বলেছে। আমরা দেখতে চাই, ঐ তারিখে আপনি দেশে ছিলেন কি না। 

‘আমার কাছ থেকেই জানতে চান? ‘জি স্যার। 

‘এটা একটা কাঁচা কাজ হচ্ছে না কি? এয়ারপাের্টে কাগজপত্র দেখলেই তাে তা জানতে পারেন। আমার মুখের কথার চেয়ে ঐ-সব প্রমাণ নিশ্চয়ই অনেক মূল্যবান। 

তাও স্যার করা হবে। আপনার একটা স্টেটমেন্ট নেব। ‘ভালাে কথা, নেবেন। আপনার নাম কি? ‘রশিদ। আব্দুর রশিদ। 

‘শুনুন রশিদ সাহেব, এই ধরনের কোনাে কিছু আমার বলার ইচ্ছা যদি থাকে, তাহলে আমি কি তা সরাসরি বলব? অন্যদের দিয়ে বলাব। এমন একটা কাঁচা কাজ কি আমি করতে পারি ? 

‘মাঝে-মাঝে খুব পাকা লােকও স্যার কাঁচা কাজ করে ফেলে। ‘হ্যা, তা করে। কথাটা আপনি ভালােই বলেছেন। ওয়েল সেইড। 

পুলিশ অফিসার আধ ঘন্টা সময় নিয়ে স্টেটমেন্ট নিলেন। তাঁকে চা-বিসকিট কিছু দেয়া হল না। ভদ্রলােক চলে যাবার পরপরই পি.আর.ও. আবসার সাহেবকে ফখরুদ্দিন সাহেব ডেকে পাঠালেন। 

আবসার সাহেব। জ্বি স্যার। ‘পুলিশ অফিসার আব্দুর রশিদ সম্পর্কে খোঁজখবর নিন। লােকটির টাকা নেয়ার অভ্যেস আছে কি না দেখুন। পুলিশ অফিসারদের মধ্যে কেউ-কেউ আবার ত্যাদড় ধরনের থাকে। টাকাপয়সা নেয় না। তবে আমার ধারণা, এ নেয়। এর গায়ের শালটি বেশ দামি। বেতনের টাকায় এ-রকম শাল কেনার কথা নয়। 

‘আমি স্যার খোঁজ নেব।’ 

‘আজ সন্ধ্যার মধ্যে নেবেন। ইনভেসটিগেশন টীমে আর কে-কে আছে দেখুন। ডি.আই.জি. রহমতউল্লাহ সাহেব এখন কোথায় আছেন, কোন সেকশনে, তাও দেখবেন।’ 

‘জ্বি স্যার। ‘আটচব্বিশ ঘন্টার মধ্যে আমি এই সমস্যার পুরাে সমাধান চাই।” ‘জি স্যার। ‘আপনি এখন যান। ‘অফিসে আসবেন স্যার? ‘হা।

 

Read more

আকাশ জোড়া মেঘ -হুমায়ূন আহমেদ -(পর্ব-৩৪)

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *