কিন্তু জীবন গল্প-উপন্যাস নয়। জীবনে কুৎসিত সব ব্যাপারগুলি সহজভাবে ঘটে যায়। অপরূপ রূপবতী একটি মেয়ে হাসতে-হাসতে কঠিন-কঠিন কথা বলে।

‘চা নিন।
ফিরােজ দেখল, কাজের মেয়েটি ট্রেতে করে এক কাপ চা নিয়ে এসেছে। ফিরােজ ঠাণ্ডা গলায় বলল, ‘চা কেন?
‘আপা দিতে বললেন।
তার এক বার ইচ্ছা হল বলে—চা খাব না। কিন্তু এ-রকম বলার কোনাে মানে হয় না। শীতের সকালবেলা এক কাপ চা মন্দ লাগবে না। সে হাত বাড়িয়ে চায়ের কাপ নিল। চা খাওয়া শেষ হলে আছাড় দিয়ে কাপটা ভেঙে ফেললেই হবে।
বি. করিম সাহেব বেশ কিছুক্ষণ মুখ ছুঁচালাে করে রাখলেন। | চেঁচামেচি হৈচৈ কিছুই করলেন না। করলে ভালাে হত। স্টীম বের হয়ে যেত। স্টীম বের হল না—এর ফল মারাত্মক হতে পারে। ফিরােজ ফলাফলের অপেক্ষা করছে। তার মুখ দার্শনিকের মতাে। যা হবার হবে এই রকম একটা ভাব।।
‘ফিরােজ সাহেব।
‘হাজার পাঁচেক টাকার ক্ষতি হয়ে গেল, কি বলেন? ‘ক্ষতি হবে কেন? মতিন এইগুলি দিয়েই কাজ করবে। ‘পাগল, মতিন এই সব ছোঁবে? সে সবকিছু আবার নতুন করে করাবে। ‘তা অবশ্যি ঠিক। ‘বেকায়দা অবস্থা হয়ে গেল ফিরােজ সাহেব। ‘তা খানিকটা হল।
আকাশ জোড়া মেঘ -হুমায়ূন আহমেদ
‘আপনাকে আগেই বলেছিলাম, যাবেন না। কথা শুনলেন না। রক্ত গরম, কারাে কথা কানে নেন না।
‘রক্ত এক সময় গরম ছিল, এখন ঠাণ্ডা মেরে গেছে।
আমার যা সবচেয়ে খারাপ লাগছে তা হচ্ছে, আপনি আমার সঙ্গে মিথ্যা কথা বলেছেন। আপনি বলেছিলেন, ফখরুদ্দিন সাহেবের মেয়ের সঙ্গে কথা হয়েছে। আপনার কথার উপর ভরসা করে……’
করিম সাহেব বাক্য শেষ করলেন না। পেনসিল চাঁছতে শুরু করলেন! এটি খুব অশুভ লক্ষণ। পেনসিল চাঁছা শেষ হওয়ামাত্র বুলেটের মতাে কিছু কঠিন বাক্য বের হবে। তার ফল সদূরপ্রসারী হতে পারে।
ফিরােজ সাহেব।
‘আপনি বরং সিনেমা লাইনে চলে যান। ‘অভিনয় করার কথা বলছেন?
“আরে না! অভিনয়ের কথা বলব কেন? সেট-টেট তৈরি করবেন। আপনি ক্রিয়েটিভ লােক, অল্প সময়েই নাম করবেন। জাতীয় পুরস্কার এক বার পেয়ে গেলে
দেখবেন কাঁচা পয়সা আসছে।
ফিরােজ মনে-মনে দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলল। কাঁচা পয়সা জিনিসটা কী, কে জানে? পয়সার কাঁচা-পাকা নেই। পয়সা হচ্ছে পয়সা।
‘ফিরােজ সাহেব।
‘ঐ করুন। ‘সিনেমা লাইনে চলে যেতে বলছেন?
‘হ্যা। আমরা বড়-বড় কাজটাজ পেলে আপনাকে ডাকব তাে বটেই। আপনি হচ্ছেন খুবই ডিপেণ্ডেবল। এটা আমি সবসময় স্বীকার করি।‘
‘শুনে অত্যন্ত খুশি হলাম। আগে জানতাম না। ‘সিনেমা লাইনের লােকজন আপনাকে লুফে নেবে।’ ‘কেন বলুন তাে?
আকাশ জোড়া মেঘ -হুমায়ূন আহমেদ
‘সবচেয়ে বড় কারণ হচ্ছে, আপনার আর্ট কলেজের ডিগ্রি নেই। ডিগ্রিধারী কাউকে এরা নিতে চায় না। ওদের তেল বেশি থাকে। ডিরেক্টারের উপর মারি করতে চায়। আপনি তা করবেন না।
‘ডিগ্রি না-থাকার তাে বিরাট সুবিধা দেখছি! এই ফার্মের চাকরি কি আমার
শেষ?
করিম সাহেব কথার উত্তর দিলেন না। তাঁর পেনসিল চাঁছা শেষ হয়েছে। তিনি সেই পেনসিলে কী যেন লিখতে শুরু করেছেন। ফিরােজ হাই তুলে বলল, আপনি কি আমাকে আরাে কিছু বলবেন, না আমি উঠব?’
‘আমার পরিচিত একজন ডিরেক্টর আছে। তার কাছে আমি একটা চিঠি লিখে দিচ্ছি। চিঠি নিয়ে দেখা করুন, একটা ব্যবস্থা হয়ে যাবে।
‘আপনি তাে দেখছি রীতিমতাে মহাপুরুষ ব্যক্তি। চিঠিটা পেনসিলে না লিখে দয়া করে কলম দিয়ে লিখুন।
‘ইচ্ছা করেই পেনসিল দিয়ে লিখছি। পেনসিলের চিঠিতে একটা পারসােনাল টাচ থাকে, যে-জিনিসটা টাইপ করা চিঠিতে বা কলমের লেখায় থাকে না।
‘গুড। এটা জানতাম না। এখন থেকে যাবতীয় প্রেমপত্র পেনসিলে লিখব।
ডিরেক্টর সাহেবের বাসা কল্যাণপুর। সারা দুপুর খুঁজে সেই বাড়ি বার করতে হল। ডিরেক্টর সাহেবকে পাওয়া গেল না। অত্যন্ত ক্রুদ্ধ বাড়িওয়ালার কাছে জানা গেল, ডিরেক্টর সাহেব ছ’ মাসের বাড়িভাড়া বাকি ফেলে চলে গেছেন। শুধু তাই নয়, যাবার সময় বাথরুমের দু’টি কমােড হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে ভেঙেছেন।’
ফিরােজ চোখ কপালে তুলে বলল, ‘বলেন কী! ‘ফিল্ম লাইনের পােক। বাড়িভাড়া দেয়াই উচিত হয় নি। আপনি তার কে হন? ‘আমি কেউ হই না। আমিও এক জন পাওনাদার।
আকাশ জোড়া মেঘ -হুমায়ূন আহমেদ
কত টাকা গেছে? ‘প্রায় হাজার দশেক।’
‘ঐ টাকার আশা ছেড়ে দিন। ঐটা আর পাবেন? টাকা এবং স্ত্রী—এই দুই জিনিস হাতছাড়া হলে আর পাওয়া যায় না।’
ফিরােজ প্রায় বলেই বসছিল—আপনার স্ত্রীও কি তাঁর সাথে ভ্যানিশ হয়েছেন? শেষ মুহুর্তে নিজেকে সামলাল। এখন রসিকতা করতে ইচ্ছা করছে না। সে ক্লান্ত স্বরে বলল, ‘এক গ্লাস পানি খাওয়াতে পারেন ?
‘নিশ্চয়ই পারি। আসুন, ভেতরে এসে বসুন। এত মন-খারাপ করবেন না। কী। করবেন বলুন, দেশ ভরে গেছে জোচ্চোরে। আমার মতাে পুরনাে লােক মানুষ চিনতে পারে না, আর আপনি হচ্ছেন দুধের ছেলে!
শুধু পানি নয়। পানির সঙ্গে সন্দেশ ও লুচি চলে এল। ভদ্রলােকের স্ত্রী পর্দার ও পাশ থেকে উকি দিচ্ছেন। দেখছেন। দেখছেন কৌতূহলী চোখে।
Read more