এই যে ব্রাদার, অনেকক্ষণ ধরে অপেক্ষা করছি। রমিজ সাহেব খুকখুক করে দু’ বার কাশলেন। ‘আজ অফিসে যান নি? এগারটা বাজে, এখনাে বাথরুমে বসে আছেন?
আবার খুকখুক কাশি। নাক ঝাড়ার শব্দ।
বেরিয়ে আসুন ভাই। খানিকক্ষণ পর না-হয় নতুন উদ্যমে আবার যাবেন। বাথরুম তাে পালিয়ে যাচ্ছে না।’ রমিজ সাহেব ভয়ঙ্কর বিরক্ত হয়ে বের হয়ে এলেন। কড়া গলায় বললেন, ‘রােজ রােজ এইসব কী বাজে কথা বলেন ?
“বাজে কথা কি বললাম?
‘এইসব আমি পছন্দ করি না। খুবই অপছন্দ করি। দরজায় ধাক্কাধাক্কি করেন কেন? এইটা কী ধরনের ভদ্রতা? ‘আজ কিন্তু ধাক্কা দিই নি।
অভদ্র ছােকরা।
রমিজ সাহেব রাগে গরগর করতে-করতে নিজের ঘরে গেলেন। ভদ্রলােক সম্ভবত অসুস্থ। গলায় মােটা মাফলার। চোখমুখ ফোলাফোলা। অফিসেও যান নি। ফিরােজ কিঞ্চিৎ লজ্জিত বােধ করল। এক জন অসুস্থ মানুষকে নিয়ে রসিকতা করা ঠিক হচ্ছে না। রসিকতার প্রচুর বিষয় আছে। | বেরুতে-বেরুতে সাড়ে বারটা বেজে গেল। একতলার বারান্দায় বাড়িওয়ালা বসে আছেন। আজ তাঁকে দেখে চট করে সরে যাওয়ার প্রয়ােজন নেই। দু’ মাসের বাড়ি ভাড়া বাকি ছিল। গত সপ্তাহেই সেটা দিয়ে দেয়া হয়েছে। শুধু তাই নয়, বাড়িওয়ালার ছােট মেয়েটির জন্যে সে এক জন পাত্রের খোঁজে আছে, এমনও বলেছে। এটা বলার দরকার ছিল। কারণ বাড়িওয়ালা হাজি আসমত আলি ওপরের দু’ জন ভাড়াটেকে। উৎখাত করতে চাইছেন। সেখানে নাকি তাঁর বড় জামাই আসবেন। বড় জামাইয়ের
আকাশ জোড়া মেঘ -হুমায়ূন আহমেদ
চাকরি নেই। বাড়িভাড়া দিয়ে থাকতে পারছেন না। চাকরিবাকরির কোনাে ব্যবস্থানা হওয়া পর্যন্ত এখানেই থাকবেন।
ফিরােজ আঁতকে উঠে বলেছে, খাল কেটে লােকজন কুমির আনে, আপনি তাে হাঙর আনার ব্যবস্থা করছেন। জামাই এক বার ঢুকলে উপায় আছে?
হাজি আসমত আলি বলেছেন, “করব কী তাহলে, ফেলে দেব?’
‘অফকোর্স ফেলে দেবেন। জামাই, শালা এবং ভাগ্নে—এই তিন জিনিসকে কাছে ঘেঁষতে দেবেন না যদি বাঁচতে চান।
‘আপনি সবসময় বড় আজেবাজে কথা বলেন।
কোন কথাটা আজেবাজে বললাম?”
এই নিয়ে আপনার সঙ্গে বকবক করতে চাই না। আপনি ভাই ডিসেম্বর মাসের ত্রিশ তারিখে বাড়ি ছেড়ে দেবেন। এক মাসের নােটিশ দেবার কথা দিলাম।
‘আচ্ছা, ছেড়ে দেব। ঊনত্রিশ তারিখেই ছেড়ে দেব। এক দিন আগে।
মেয়ে বিয়ের প্রসঙ্গ এর পরপরই ফিরােজকে আনতে হয়েছে। কাল্পনিক এক পাত্র দাঁড় করাতে হয়েছে। এই ব্যাপারে হাজি সাহেব যে-আগ্রহ দেখাবেন বলে আশা করা গিয়েছিল, তার চেয়েও বেশি দেখালেন। ফিরােজ যথাযোেগ্য গাম্ভীর্যের সঙ্গে বলল, ছেলে এম এ পাশ করেছে গত বছর। ফার্স্ট ক্লাস পাওয়ার কথা ছিল, পায় নি। সেকেণ্ড ক্লাস ফোর্থ হয়েছে। একটা পেপার খুবই খারাপ করেছে। দেখতে রাজপুত্র নয়, সেটা আগেই বলে দিচ্ছি। চেহারা মােটামুটি, তবে ভালাে ফ্যামিলির ছেলে। ঢাকায় নিজের বাড়ি। পুরনাে ধরনের বাড়ি। তবে ময়মনসিংহ শহরে বিরাট বাড়ি। চার বােন তিন ভাই। ছােট বােনের বিয়ে হয় নি। ভাইরা সবাই স্ট্যাব্লিশড।
‘ছেলে করে কী?’ | ‘এখনাে কিছু করে না। মাত্র তাে পাস করল। তবে পারিবারিক অবস্থা যা, কিছুনা করলেও হেসে-খেলে দু’-তিন পুরুষ কেটে যাবে।’
আকাশ জোড়া মেঘ -হুমায়ূন আহমেদ
ওদের সঙ্গে আপনার পরিচয় কীভাবে? ‘আমার আপন ফুপাতাে ভাই। আপনি আপনার মেয়ের একটি ছবি দিয়ে দেবেন, বাকি যা করার আমি করব। আরাে ছেলে আছে আমার হাতে, নাে প্রবলেম। ভালাে কথা, ব্ল্যাক এ্যাণ্ড হােয়াইট এবং কালার—দু’ ধরনের ছবিই দেবেন।’
“আচ্ছা দেব। ছবি দেব। যদি মেয়ে দেখতে চান, কোনাে অসুবিধা নাই, যেখানে বলবেন। কালার ছবি ঘরে নাই, স্টুডিওতে তুলতে হবে।
‘তুলে ফেলুন। কালারের যুগ এখন।
বিয়ের ঐ আলাপ-আলােচনার পর বাড়ি ছাড়ার প্রসঙ্গ চাপা পড়ে গেল। দু মাসের ভাড়াও হাজি সাহেব চাওয়া বন্ধ করলেন। অবশ্যি ভাড়া দিয়ে দেয়া হয়েছে, তবু মনে সন্দেহ, আবার বাড়ি ছাড়ার প্রসঙ্গ ওঠে কি না।’
হাজি সাহেব ফিরােজকে বেরুতে দেখেও কিছু বললেন না। বিষন্ন ভঙ্গিতে বসে রইলেন। ফিরােজ এগিয়ে এল, রােদ পােহাচ্ছেন?
খুব ভালাে, শরীরে ভিটামিন সি প্রডিউস হচ্ছে।’ ঐ ছেলের ব্যাপারে তাে আর কোনাে খবর দিলেন না।
ছবি ? ছবি চাচ্ছে তাে!’ ছবি তাে তুলে রেখেছি। চান না, তাই…… ‘কী মুশকিল, চাইব না কেন। যান, নিয়ে আসুন। আজ ছেলের বড় ভাইয়ের সঙ্গে আমার দেখা হবার সম্ভাবনা আছে। দেখা যে হবেই তা বলছি না—একটা প্রবাবিলিটি।
Read more