চাচা ডাকব না, চাচাজি ডাকব। চাচাজি ডাকের মধ্যে আন্তরিকতা আছে। চাচা ডাকের মধ্যে নেই। তাই না? ……….লিলি ঝুঁকে এসে বলল, জ্বি লাগালেই যে আন্তরিক হয়ে যায় তা কিন্তু না। যেমন ধরুন বাবাজি, বাবাজি শুনতে ফাজলামির মতাে লাগে না ? ……….লিলি মুখ টিপে টিপে হাসছে। মেয়েটাকে এখন খুবই সুন্দর লাগছে। মনে
হচ্ছে বেতের চেয়ারে একটা পরী বসে আছে। হঠাৎ মেয়েটাকে এত সুন্দর লাগছে কেন মিসির আলি বুঝতে পারলেন না। মানুষের চেহারাও কি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলায় ? বদলাতে পারে। দিনের একেক সময় তার মুখে একেক রকম আলাে পড়ে। সেই আলাের কারণেই চেহারা বদলায়। এনসেল আডামের একটা ফটোগ্রাফির বইতে পড়েছিলেন— তিনটা স্পট লাইট দিয়ে যে–কোনাে মানুষের চেহারা নিয়ে খেলা করা যায়। চাচাজি পান মসলা খাবেন ?
আমিই মিসির আলি-পর্ব-(২)-হুমায়ূন আহমেদ
একটু খেয়ে দেখুন খুব ভালাে। আমি নিজে বানিয়েছি। আমার নিজের ফর্মুলা। আমি এই ফর্মুলার নাম দিয়েছি লিলিস পান পাউডার। কারণ আমার জিনিসটা পাউডারের মতাে। মুখে দিয়ে কুটুর কুটুর করে চাবাতে হয় না। বুড়াে মানুষ যাদের দাঁতের অবস্থা ভালাে না তাদের জন্যে খুব সুবিধা। চাবাতে হবে লিলি পান পাউডারের কৌটা বাড়িয়ে দিল। হাতের মুঠোর ভেতর রাখা যায় এমন কৌটা। দেখতে খুবই সুন্দর। কৌটার গায়ে ময়ূরের পালকের ডিজাইন। মনে হয় ছােট্ট একটা ময়ূর হাতের মুঠোয় শুয়ে আছে।
মিসির আলি বললেন, তােমার কৌটাটা খুব সুন্দর। আপনার পছন্দ হয়েছে? হা পছন্দ হয়েছে। ….কৌটাটা আমি আপনাকে দিয়ে দিতাম, কিন্তু দেয়া ঠিক হবে না। আপনার কাছে এই কৌটা দেখলে সবাই হাসাহাসি করবে। ……….কেন বল তাে ? …..কারণ কৌটাটা মেয়েদের। মেয়েরা এই ধরনের কৌটায় পিল রাখে। কোন ধরনের পিল বুঝতে পারছেন তাে? বার্থ কনট্রোল পিল।
ও আচ্ছা। ……..আপনি কি আমার কথায় লজ্জা পেয়েছেন? প্লীজ লজ্জা পাবেন না। আমার স্বভাব হচ্ছে— মুখে যা আসে বলে ফেলি। চিন্তা–ভাবনা করে কিছু বলি না। আপনি নিশ্চয়ই আমার মতাে না। আমার মনে হয় আপনি আপনার প্রতিটি কথা খুব চিন্তা–ভাবনা করে বলেন। ছাকনি দিয়ে কথাগুলি ছকেন।
মিসির আলি ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বললেন, লিলি তুমি তােমার জরুরি চিঠিটা আমাকে দিয়ে দাও। আমার আজ একটু বের হতে হবে। আমার কিছু কেনাকাটা আছে।
আমিই মিসির আলি-পর্ব-(২)-হুমায়ূন আহমেদ
কেরােসিনের চুলা কিনবেন? | মিসির আলি খুবই চমকালেন, কিন্তু মুখের ভাবে কিছুই প্রকাশ করলেন না। তিনি কেরােসিনের চুলা ঠিকই কিনবেন, কিন্তু এই তথ্য মেয়েটির জানার কথা
টেবিলের উপর কোনাে কাগজের টুকরাও নেই, যেখানে কেরােসিনের চুলা লেখা। থট রিডিং জাতীয় কিছু? সেই সম্ভাবনাও ক্ষীণ। ইএসপির কথা খুব শােনা যায়। বাস্তবে দেখা যায় না ।
মিসির আলি মনের বিস্ময় চেপে রেখে বললেন, হ্যা একটা কেরােসিনের চুলা কিনব। ……..আমি যে বলে দিতে পারলাম এতে অবাক হন নি ? প্রথমে অবাক হয়েছিলাম। এখন অবাক হচ্ছি না।
এখন অবাক হচ্ছেন না কেন? আমি কীভাবে কেরােসিনের চুলার ব্যাপারটা বলে ফেলেছি তা ধরে ফেলেছেন— এই জন্যে অবাক হচ্ছেন না ? ……….হ। আচ্ছা বলুন, আমি কীভাবে বলতে পারলাম কেরােসিনের চুলা ?
আমি লক্ষ করেছি তুমি কথা বলার সময় যতটা না আমার চোখের দিকে তাকাও তারচে‘ বেশি তাকাও আমার ঠোটের দিকে। কথা বলার সময় ঠোটের দিকে তাকানাের প্রয়ােজন পড়ে না, কারণ শব্দটা আমরা কানে শুনতে পাই। তুমি ঠোটের দিকে তাকাচ্ছি তার মানে তুমি লিপ রিডিং জান। আমি নিশ্চয়ই তােমার সঙ্গে কথা বলার সময় বিড়বিড় করে কেরােসিনের চুলা বলেছি। তুমি ঠোট নাড়া দেখে বুঝে ফেলেছ। …লিলি হাসতে হাসতে বলল, আপনাকে আমি দশে সাড়ে নয় দিলাম। আসলেই আপনার বুদ্ধি আছে।
আমিই মিসির আলি-পর্ব-(২)-হুমায়ূন আহমেদ
তােমার কি ধারণা হয়েছিল বুদ্ধি নেই ? ……আপনাকে তাে আমি খুব ভালােমতাে জানি না। যা জানি বইপত্র পড়ে জানি। বইপত্রে সব সময় বাড়িয়ে বাড়িয়ে লেখা হয়। তাছাড়া চাচাজি আপনি কিছু মনে করবেন না। আপনার চেহারায় হালকা বােকা ভাব আছে। আপনি নিজে তাে নিজেকে আয়নায় দেখেন। ঠিক বলছি না চাচাজি ?
হ্যা ঠিক বলছ। ……আমি বুঝতে পারছি আমাকে বিদায় করতে পারলে আপনি খুশি হন। আমি আর মাত্র বারাে মিনিট থাকব। তারপর চলে যাব। …….হিসেব করে বারাে মিনিট কেন? লিলি হাসিমুখে বলল, একটা বাজার ঠিক দশ মিনিট আগে আপনাকে আমি
চিঠিটা দেব । এই চিঠি আগেও দেয়া যাবে না, পরেও দেয়া যাবে না। একটা বাজার ঠিক দশ মিনিট আগেই দিতে হবে। কারণটা হচ্ছে আজ মে মাসের ছয় তারিখ। এই তারিখে সূর্য ঠিক মাথার উপর আসবে একটা বেজে দশ মিনিটে। যিনি চিঠিটা আমার কাছে দিয়েছেন, তিনি এইসব বিষয় খুব ভালাে জানেন। সূর্য মাথার উপর আসার ব্যাপারটা আমি তার কাছ থেকে জেনেছি।
চিঠিটা কে দিয়েছে তােমার হাসবেন্ড? জ্বি। ……তাঁর শখ কি আকাশের তারা দেখা ? যারা আকাশের তারা দেখে এইসব ব্যাপার তারাই খুব ভালাে জানে।
আমিই মিসির আলি-পর্ব-(২)-হুমায়ূন আহমেদ
হ্যা তিনি আকাশের তারা দেখেন। তাঁর তিন–চারটা টেলিস্কোপ আছে। আচ্ছা চাচাজি বইপত্রে পড়ি আপনার অবজারভেশন ক্ষমতা অস্বাভাবিক। দেখি ততা কেমন? আমাকে দেখে আমার হাসবেন্ড সম্পর্কে বলুন। বলা কি সম্ভব?
সম্ভব না । কিছু নিশ্চয়ই বলা সম্ভব। এই যে আমি বললাম তিনি আকাশের তারা দেখেন। এই বাক্যটায় আমি সম্মানসূচক তিনি ব্যবহার করেছি। এখান থেকেই তাে আপনি বলতে পারবেন যে, আমার স্বামীর বয়স বেশি। সমবয়সী হলে বলতাম, ও আকাশের তারা দেখে। | মিসির আলি নড়েচড়ে বসলেন। এই মেয়েটির সহজ সরল চোখের ভেতরে তীক্ষ্ণ চোখ লুকিয়ে আছে। এই চোখকে অগ্রাহ্য করা ঠিক না। কেরােসিনের চুলা কিনতে চাচ্ছেন কেন? ………..আমি কয়েক দিনের জন্যে বাইরে যাব। নিজে রান্নাবান্না করে খেতে হবে। তার প্রস্তুতি।
Read more
