লিলি গেট পার হয়ে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। লজ্জিত গলায় বলল, চাচাজি আমি খুব দুঃখিত।
মিসির আলি বললেন, কেন বলতো ?
আমি বুঝতে পারছিলাম আপনি আমার উপর খুব বিরক্ত হচ্ছেন, তারপরেও আমি চলে যাই নি। বরং আপনি যেন আরাে বিরক্ত হন সেই চেষ্টা করেছি।
আসলে আপনার সামনে থেকে চলে যেতে ইচ্ছা করছিল না।
মিসির আলি বললেন, আমি যতটা বিরক্ত হয়েছি বলে তুমি ভাবছ, তত বিরক্ত কিন্তু আমি হই নি। বরং তােমাকে আমার ইন্টারেস্টিং একটি মেয়ে বলে মনে হয়েছে।
তাহলে চলুন আবার ঘরে ফিরে যাই। কিছুক্ষণ গল্প করি ।
বলতে বলতে লিলি হেসে ফেলল। মিসির আলিও হাসলেন। লিলি বলল, আপনাকে ভয় দেখাবার জন্যে বললাম, আপনি কি ভেবেছিলেন ? আমি আরাে ঘন্টাদুই আপনার সঙ্গে বকবক করব ? আপনার মাইগ্রেনের ব্যথা তুলে তারপর বিদেয় নেব ?
লিলি হাসছে। এই মেয়েটার হাসি একটু অন্যরকম। সে যখন হাসে তার চোখে পানি জমে। এই হাসির একটা নামও আছে— অশ্রু হাসি।
আমিই মিসির আলি-পর্ব-(৪)-হুমায়ূন আহমেদ
জনাব মিসির আলি শ্রদ্ধাস্পদেষ্ণু,
আমার স্ত্রী লিলি নিশ্চয়ই অনেক নাটকীয়তা করে এই চিঠি আপনার হাতে দিয়েছে। সে এমন এক মেয়ে যে কোনাে রকম নাটকীয়তা ছাড়া কিছু করতে পারে না। খুব সহজ কথাও সে সহজে বলবে না। দু‘তিন জায়গায় প্যাচ দিয়ে বলবে। সহজ কথাটাকেই তখন মনে হবে ভয়ঙ্কর জটিল। আপনি খুব বড় সাইকিয়াট্রিস্ট, আপনার কাছে হয়তাে এর ব্যাখ্যা আছে, আমার কাছে কোনাে ব্যাখ্যা নেই।
যাই হােক মূল প্রসঙ্গে আসি। আমি এবং আমার স্ত্রী আমরা দুজনই আপনার মহাভক্ত । আপনার বিষয়ে প্রকাশিত প্রতিটি গ্রন্থ আমার স্ত্রী কয়েকবার করে পড়েছে, এবং আমাকেও পড়তে বাধ্য করেছে। আমি আপনার সঙ্গে নিরিবিলিতে কিছু কথা বলার জন্যে অত্যন্ত আগ্রহী। সবচে’ ভালাে হতাে আমি যদি লিলির সঙ্গে ঢাকায় চলে আসতে পারতাম। তা সম্ভব হচ্ছে না, কারণ আমি বন্দি–জীবনযাপন করছি। গত সাত বছর ধরেই আমি হুইল চেয়ারে আছি ।
আমিই মিসির আলি-পর্ব-(৪)-হুমায়ূন আহমেদ
রােড এ্যাকসিডেন্টে স্পাইনাল কর্ড জখম হয়েছিল। আপনি তাে জানেন স্পাইনাল কর্ডের জীবকোষ কখনাে রিজেনারেট করে না। আমাকে আমার ভাগ্য মেনে নিতে হয়েছে। চাকার জীবনে অভ্যস্ত হবার চেষ্টা করছি। অভ্যস্ত হওয়া সম্ভব হচ্ছে না। কখনাে হবে তাও মনে হয় না। নিজেকে এখন আর আমার মানুষ বলে মনে হয় না। মনে হয় আমি একটা দু’চাকরি রিকশা।
আপনাকে ভুলিয়ে ভালিয়ে এখানে আনার একটি পরিকল্পনা আমি এবং আমার স্ত্রী দুজনে মিলে করেছি। জানি আপনাকে কনভিন্স করতে পারব কি না। চেষ্টা করে দেখা যাক। আমার এখানে আসার জন্যে তিনটি টোপ আমি ফেলছি। কেন জানি আমার মনে হচ্ছে প্রথম দুটি টোপ কাজ না করলেও শেষটি করবে। টোপ দিয়ে মাছের মতাে মানুষও ধরা যায়।
আমিই মিসির আলি-পর্ব-(৪)-হুমায়ূন আহমেদ
টোপ নাম্বার এক
আমাদের বসতবাড়িটা মেঘনার পাড়ে। উঁচু পাঁচিল দিয়ে ঘেরা দোতলা পাকা দালান। দোতলায় প্রশস্ত টানা বারান্দা। বারান্দা থেকে মেঘনা দেখা যায়। না দেখা গেলেই ভালাে হতাে। কারণ এই মেঘনা জমি গ্রাস করতে করতে দ্রুত এগিয়ে আসছে। যে–কোনাে সময় (হয়ত এ বছরই) আমাদের এই অতি চমৎকার বাগানবাড়িটা গ্রাস করবে। আমাদের বাড়িটা চমৎকার। বাড়ির সামনের বাগান চমক্কার। আমি নিশ্চিত একবার আপনি এসে উপস্থিত হলে অবাক বিস্ময়ে বলবেন— বাকি জীবনটা এখানে কাটিয়ে দিতে পারলে কী ভালােই–না হতাে!
আমাদের বাড়ির পেছনে কিছু অদ্ভুত গাছ বাড়ির আদি মালিক বাবু অশ্বিনী রায় (আমার দাদাজান এই বাড়ি পরে তাঁর কাছ থেকে কিনে নিয়ে ছিলেন।) লাগিয়েছিলেন। গাছগুলির নাম এখানে কেউ জানে না। এর মধ্যে একটা গাছের গা থেকে নীল বর্ণের কষ বের হয়। দু‘বছর পরপর মরিচের ফুলের মতাে নীল রঙের ফুল ফোটে। আমার স্ত্রী এই গাছটির নাম দিয়েছে নীল মরিচ গাছ। আমার এখানে যে–ই আসে সে–ই এই গাছটার একটা নাম দেয়। আপনিও হয়তাে একটা নাম দেবেন।
আমিই মিসির আলি-পর্ব-(৪)-হুমায়ূন আহমেদ
টোপ নাম্বার দুই
আপনার বিষয়ে একটা বইয়ে পড়েছি আপনার সারা জীবনের শখের বস্তু হলাে ভালাে একটা টেলিস্কোপ। যে টেলিস্কোপে আপনি বৃহস্পতির চাঁদ দেখতে পারবেন, শনির বলয় দেখতে পারবেন। আপনার অবগতির জন্যে জানাচ্ছি টেলিস্কোপ চোখে দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকা বর্তমানে আমার একমাত্র শখ। বৃহস্পতি গ্রহের চাঁদ দেখা বা শনির বলয় দেখার চেয়েও বিস্ময়কর দৃশ্য এড্রোমিডা নক্ষত্রপুঞ্জ দেখা। নক্ষত্রপুঞ্জের স্পাইরালে শত শত নক্ষত্র ঝলমল করছে।
এই দৃশ্য একবার দেখলে সারা জীবনের জন্যে আকাশের গায়ে আটকে থাকতে হবে। আমি সর্বশেষ যে টেলিস্কোপটি এনেছি তার সঙ্গে ট্রেকার যুক্ত। পৃথিবীর ঘূর্ণনের সঙ্গে টেলিস্কোপও ঘুরবে, কাজেই আকাশে যে বস্তুটিকে ফোকাস করা হয়েছে সেই বস্তু কখনাে দৃষ্টির আড়াল হবে না। আপনি যদি আসেন দুজনে মিলে আকাশের তারা দেখব। দুজনে মিলে দেখব কারণ লিলির তারা দেখার বিষয়ে কোনাে আগ্রহ নেই।
আমি ঠিক করে রেখেছি আমার চারটা টেলিস্কোপের একটা আমি আপনাকে উপহার দেব। চারটা টেলিস্কোপই আমার অত্যন্ত প্রিয়। সেখান থেকে আপনাকে একটা উপহার হিসেবে দিতে আমার কষ্ট যে হবে না তা–না। কষ্ট হবে তবে আপনি এই টেলিস্কোপ চোখে লাগিয়ে গাঢ় আনন্দ পাবেন এটা ভেবেই সেই কষ্ট দূর করব ।
আমিই মিসির আলি-পর্ব-(৪)-হুমায়ূন আহমেদ
টোপ নাম্বার তিন
এইটিই শেষ টোপ। আমি নিশ্চিত এই টোপে আপনি কাবু হবেন। ইএসপি ক্ষমতাসম্পন্ন মানুষ সম্পর্কে আপনার প্রবল কৌতূহল। সালমা নামের একটি ১৪/১৫ বছরের মেয়ে আমাদের সন্ধানে আছে। গ্রামেরই মেয়ে।
মেয়েটি অতীন্দ্রিয় ক্ষমতাসম্পন্ন। আমি নানানভাবে পরীক্ষা করেছি। এবং নিশ্চিত হয়েছি। একটি পরীক্ষা হলাে বিখ্যাত জেনার টেস্ট। তার ক্ষমতা কোন পর্যায়ের সেটা এখন আর ব্যাখ্যা করলাম না। কিছুটা রহস্য রেখে দিলাম।
Read more
