আছে তবে তা সাধারণ মানুষের আবেগ না। অন্য ধরনের আবেগ। আপনাকে যদি লেখা হতাে— আমি মহাবিপদে পড়েছি। মারা যাচ্ছি। একমাত্র আপনি আমাকে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচাতে পারেন। তাহলে আপনি চলে যেতেন। কিন্তু সেটাতাে আর লেখা যাবে না কারণ ও মারা যাচ্ছে না।
মিসির আলি বললেন, লিলি তুমি এক কাজ কর। তােমাদের ঠিকানাটা লিখে রেখে যাও | সমুদ্র দেখা শেষ হলে তােমাদের ওখানে চলে যাব ।
আপনি একা একা খুঁজে বের করতে পারবেন না। যাওয়াও খুব ঝামেলা, ট্রেন, বাস– রিকশা—হাঁটা।
একটু ঝামেলা না হয় করলাম।
লিলি হেসে ফেলে বলল, থাক দরকার নেই। চাচাজি শুনুন আমি কিন্তু আজও পঞ্চাশ মিনিট থাকব। আমাকে আগেভাগে বিদায় করে দিতে চাইলেও আমি যাব না। তবে আজ যে গতদিনের মতাে শুধু বকবক করব তা না । আপনাকে কফি বানিয়ে খাওয়াব। আমি কফি নিয়ে এসেছি। আপনি কফি পছন্দ করেন তাে?
আমিই মিসির আলি-পর্ব-(৬)-হুমায়ূন আহমেদ
করি।
মিসির আলি দেখলেন লিলি তার কাঁধে ঝােলানাে পাটের ব্যাগ থেকে কফির কৌটা, মগ, চায়ের চামচ এবং ফ্লাক্স বের করছে। বােঝা যাচ্ছে কফি বানানাে হবে। মেয়েটা কফির সব সরঞ্জাম সঙ্গে নিয়ে এসেছে। গরম পানিও এনেছে। ফ্লাক্সে নিশ্চয়ই গরম পানি।
লিলি বলল, মেশিন ছাড়া এক্সপ্রেসাে কফি বানানাে যায় না, কিন্তু আমি বানাতে পারি। আপনাকে শিখিয়ে দিচ্ছি। আপনি প্রতিটি স্টেপ খুব ভালােভাবে লক্ষ করুন। এই দেখুন কী করছি এক চামচের চেয়ে সামান্য বেশি নিলাম কফি।– চিনি নিলাম তিন চামচ। এখন চিনি আর কফি মিক্স করছি। চামচ দিয়ে ঘষে ঘষে মেশানাে। এই মেশানাের কাজটা অনেকক্ষণ করতে হবে। যত ভালােমতাে মেশাবেন কফি তত ভালাে হবে। এত যন্ত্রণা ।
যন্ত্রণা ভাবলে যন্ত্রণা। আমি কখনাে যন্ত্রণা ভাবি না। যে লেখক লেখাকে। যন্ত্রণা মনে করেন তিনি কখনাে লেখক হতে পারেন না। ঠিক তেমনি যে রাঁধুনি রান্নাকে যন্ত্রণা মনে করেন তিনি রাঁধুনি হতে পারেন না। চাচাজি আপনার কাছে কি আলু আছে ?
না।
থাকলে ভালাে হতাে। আমি আপনাকে আলু ভাজা কী করে করতে হয় শিখিয়ে দিতাম। যে সব রান্না খুব সহজ মনে হয় সে সব রান্না আসলে খুব
কঠিন। আমার মতে পৃথিবীর সবচে’ কঠিন রান্না হলাে চা বানানাে, আর দ্বিতীয় কঠিন রান্না হলাে আলু ভাজা।
আমিই মিসির আলি-পর্ব-(৬)-হুমায়ূন আহমেদ
লিলি চিনির সঙ্গে কফি মিশিয়েই যাচ্ছে। ক্লান্তিহীন আঙুল নাড়াচাড়া করছে। তার মুখ উজ্জ্বল। যেন কোনাে বিশেষ কারণে সে আনন্দিত। আনন্দ চেপে রাখতে পারছে না। মিসির আলি ভুরু কুঁচকালেন। সেই বিশেষ কারণটা কী? তিনি তাদের বাগানবাড়িতে যাচ্ছেন না এটাই কি বিশেষ কারণ ?
লিলি বলল, চাচাজি আপনি কি লক্ষ করছেন কফির কাপ থেকে এখন চমৎকার কফির গন্ধ আসতে শুরু করেছে ?
আঁ লক্ষ করছি।
তার মানে হলাে এখন আমরা তৈরি পানি ঢালার জন্যে। এখন আমি ওয়ান থার্ড কাপ পানি ঢেলে, চামচ নেড়ে নেড়ে ফেনা করব। ফেনায় যখন কাপ ভর্তি হয়ে যাবে তখন বাকি পানিটা ঢালব।
তৈরি হয়ে যাবে এক্সপ্রেসাে কফি?
আগে তাে আর কফি বানানাের মেশিন ছিল না। এইভাবেই কফি বানানাে হতাে। এখন আর কেউ কষ্ট করতে চায় না। ফট করে মেশিন কিনে ফেলে । মিসির আলি সিগারেট ধরাতে ধরাতে বললেন, লিলি তােমাকে দেখে মনে হচ্ছে তুমি খুব আনন্দিত। তােমার মধ্যে একটা দুশ্চিন্তা ছিল। দুশ্চিন্তা হঠাৎ কেটে গেছে।
লিলি বলল, কফি বানাচ্ছি তাে এই জন্যেই আমাকে আনন্দিত মনে হচ্ছে। যে–কোনাে রান্নাবান্নার সময় আমি খুব আনন্দে থাকি।
আমিই মিসির আলি-পর্ব-(৬)-হুমায়ূন আহমেদ
মিসির আলি বললেন, ব্যাপারটা তা না। যেই মুহূর্তে আমি বললাম আমি তােমাদের বাগান বাড়িতে যেতে পারছি না, সেই মুহূর্তেই তােমার চোখ মুখ উজ্জ্বল হয়ে গেল। কারণ ব্যাখ্যা কর তাে।
আমি আমার হাসবেন্ডের সঙ্গে বাজি রেখেছিলাম যে আপনি যাবেন না। আপনি না যাওয়াতে আমি বাজি জিতেছি তাে এই জন্যেই হয়তাে আমার চোখে মুখে আনন্দ চলে এসেছে। পৃথিবীর সমস্ত স্ত্রীদের একটা চেষ্টা থাকে কোনাে না কোনােভাবে তাদের স্বামীদের হারিয়ে দেয়া। যেহেতু আপনি বিয়ে করেন নি আপনি এই ব্যাপারটা জানেন না।
লিলির কফি বানানাে শেষ হয়েছে। ফেনা-ওঠা কফির কাপ মিসির আলির সামনে রাখতে রাখতে সে বলল, চাচাজি চুমুক দিয়ে দেখুন। মিষ্টি একটু বেশি লাগবে। উপায় নেই, এক্সপ্রেসাে কফি কড়া মিষ্টি না হলে ভালাে লাগে না।
মিসির আলি কফির কাপ হাতে নিতে নিতে বললেন, লিলি আমি সিদ্ধান্ত পাল্টেছি। তােমাদের বাগানবাড়িতে যাব। শেষ পর্যন্ত তুমি তােমার স্বামীর কাছে বাজিতে হারলে।
লিলি বলল, কফিতে চুমুক দিন। এত কষ্ট করে বানালাম আর আপনি কাপ হাতে নিয়ে বসে আছেন ?
মিসির আলি কফিতে চুমুক দিয়ে বললেন, এখন যদি আমরা রওনা দেই কতক্ষণে পৌছব ?
আমিই মিসির আলি-পর্ব-(৬)-হুমায়ূন আহমেদ
পৌছতে পৌছতে রাত ন‘টা দশটা বেজে যাবে। তাতে কোনাে সমস্যা নেই তাে? জ্বি না সমস্যা নেই। তাহলে চল কফি শেষ করে রওনা দিয়ে দেই। কফি খেতে কেমন হয়েছে আপনি কিন্তু এখনাে বলেন নি।
মিসির আলি নিচু গলায় বললেন, এত ভালাে কফি আমি আমার জীবনে খেয়েছি বলে মনে পড়ে না।
লিলি ক্লান্ত গলায় বলল, থ্যাংক য়ু।
সে তার মাথার নীল স্কার্ফ খুলে বিশেষ কায়দায় মাথা আঁকি দিয়েছে। তার চুল ছড়িয়ে পড়েছে চারদিকে। চেহারা আবার পাল্টে গেছে।
মিসির আলির মনে হলাে মেয়েটা কখন কি করবে সব আগে থেকে ঠিক করা। সে যে একটানে মাথা থেকে স্কার্ফ খুলে মাথা ঝাকাবে এটাও সে আগে থেকেই ঠিক করে এসেছে।
মিসির আলি হঠাৎ লক্ষ করলেন তার গা ছমছম করছে।
Read more
