আমিই মিসির আলি-পর্ব-(৭)-হুমায়ূন আহমেদ

আমিই মিসির আলি

যেন অশুভ কিছু তার জন্যে অপেক্ষা করছেভয়ঙ্কর কিছুলৌকিক কিছু না, অলৌকিক কিছুঅনেককাল আগে তার একবার রকম অনুভূতি হয়েছিলশ্যামগঞ্জ রেলস্টেশনে অপেক্ষা করছেনগভীর রাততিনি এগারাে সিন্ধুর এক্সপ্রেসে ভৈরব যাবেনট্রেন আসবে ভাের রাতেপৌষ মাসের মাঝামাঝিপ্রচণ্ড শীতওয়েটিং রুমে বসে সময় কাটানাের জন্যে ঢুকতে যাবেন হঠাৎ তার পা জমে গেলবুক ধকধক করতে লাগলমনে হলাে ওয়েটিং রুমে অশুভ কিছু আছেভয়ঙ্কর কিছুযে ভয়ঙ্করের কোনাে ব্যাখ্যা নেইতার উচিত কিছুতেই ওয়েটিং রুমে না ঢােকাএকবার ঢুকলে আর বের হতে পারবেন না। 

কৌতূহল সব সময় ভয়কে অতিক্রম করেতার বেলাতেও তাই হলাে। তিনি কৌতূহলী হয়েই উঁকি দিলেনওয়েটিং রুমের ইজি চেয়ারে একজন বৃদ্ধ, হলুদ কম্বল গায়ে দিয়ে শুয়ে আছেবৃদ্ধের হাতে জ্বলন্ত সিগারেটবৃদ্ধ চোখ বন্ধ করে সিগারেট টানছেমিসির আলি ঘরে ঢুকলেনবৃদ্ধ চোখ মেলল না, তবে তার ঠোটের কোণায় সামান্য হাসি দেখা গেলশরীর জমিয়ে দেয়া তীব্র ভয় মিসির আলিকে আবারাে আচ্ছন্ন করল তিনি প্রায় ছিটকে বের হয়ে এলেন

আমিই মিসির আলি-পর্ব-(৭)-হুমায়ূন আহমেদ

বাকি রাতটা কাটালেন প্ল্যাটফরমে পায়চারি করেএগারাে সিন্ধু এক্সপ্রেস ভাের চারটা চল্লিশে প্ল্যাটফরমে ইন করলমিসির আলি ট্রেনে ওঠার আগে আরেকবার ওয়েটিং রুমে উকি দিলেনবৃদ্ধ যাত্রী ঠিক আগের জায়গাতেই আছেমাথা নিচু এবং চোখ বন্ধ করে আগের মতােই সিগারেট টানছেঠোটের কোণায় আগের মতােই অস্পষ্ট হাসি। 

মিসির আলি তাঁর জীবনের এই ভয় পাওয়া ঘটনাকে নানানভাবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছেনসবচেকাছাকাছি ব্যাখ্যা যেটা দাঁড় করিয়েছিলেন সেটা হলাে কিশাের বয়সে তিনি নিশ্চয়ই নির্জন স্টেশনের ওয়েটিং রুমের কোনাে ভূতের গল্প পড়ে ভয় পেয়েছিলেন। ভয়টা এতােই তীব্র ছিল যে, মস্তিষ্কের নিউরােন সেই স্মৃতি মূল্যবান কোনাে স্মৃতি মনে করে যত্ন করে মেমােরিসেলে ঢুকিয়ে রেখেছেনষ্ট হতে দেয় নিঅনেককাল পরে আরেকটি নির্জন স্টেশন দেখামাত্র মস্তিষ্ক মনে করল রকম একটা স্মৃতি তাে আছেস্মৃতিটা বের করে বর্তমানের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা যাক

যেহেতু অনেকদিনের স্মৃতি বের করতে গিয়ে সমস্যা হলােস্মৃতির কিছু অংশ নষ্ট হয়ে গেলকিছু অন্য রকম হয়ে গেলমস্তিষ্ক শুধু যে স্মৃতি বের করে আনল তানা, স্মৃতির মনে জড়িত ভয়ঙ্কর ভীতিও বের করে আনলরকম কাণ্ডকারখানা মস্তিষ্ক মাঝে মাঝে করেএর যেমন মন্দ দিক আছেভালাে দিকও আছে, মস্তিষ্কের ভেতর হঠাৎ নিউরােনের প্রবল ঝড় সৃষ্টি হয়এতে ক্ষতিকারক স্মৃতি উড়ে চলে যায়স্মৃতি জমা করে রাখা মেমরিসেল খালি হয়। 

আমিই মিসির আলি-পর্ব-(৭)-হুমায়ূন আহমেদ

আজ যে ভয়টা পাচ্ছেন তার পেছনের কারণটা কী? তিনি দাঁড়িয়ে আছেন পাঁচিলঘেরা প্রকাণ্ড একটা বাড়ির গেটের কাছেঅন্ধকারে পাঁচিলঘেরা বাড়িটাকে জেলখানার মতাে লাগছেতিনি দাঁড়িয়ে আছেন একাএতক্ষণ লিলি তার সঙ্গে ছিলঅনেকক্ষণ ডাকাডাকি করে সে দারােয়ান শ্রেণীর কাউকে দিয়ে গেট খুলিয়েছে। 

তাও পুরাে গেট নাগেটের অংশ যার ভেতর ছােটখাট মানুষ হয়তােবা কষ্ট করে ঢুকতে পারেগেট খুলতেই লিলি তাঁর দিকে ফিরে বলল, স্যার আপনি দাঁড়ানপাঁচছয় মিনিট লাগবেআমি কুকুর বেঁধে আসিআমাদের তিনটা কুকুর আছেখুবই উগ্র স্বভাব, অপরিচিত কাউকে দেখলে কী করবে কে জানে ? আমাকেই একবার কামড়ে দিয়েছিল। 

মিসির আলি তারপর থেকে দাঁড়িয়ে আছেনতিনি ঘড়ি দেখেন নি কিন্তু তার কাছে মনে হচ্ছে পাঁচছু মিনিটের অনেক বেশি সময় পার হয়েছেকোনাে সাড়াশব্দ পাওয়া যাচ্ছে নাবিশাল বাড়ি কিন্তু পুরােপুরি নিঃশব্দতিনটা ভয়ঙ্কর কুকুর অথচ তারা একবারও শব্দ করবে না এটা কেমন কথা? তাছাড়া বাড়ি অন্ধকারে ডুবে আছেবিশাল এই বাড়ির একটি ঘরেও বাতি জ্বলবে না, এটাই কেমন কথাএমন তাে না যে, এই বাড়িতে মানুষজন থাকে নারাত তাে বেশি হয় নিখুব বেশি হলে দশটাযে দারােয়ান গেট খুলেছে তার হাতে কি একটা টর্চ থাকবে না

আমিই মিসির আলি-পর্ব-(৭)-হুমায়ূন আহমেদ

এমন গাঢ় অন্ধকার মিসির আলি অনেকদিন দেখেন নিনক্ষত্রের আলাে পর্যন্ত নেইআকাশ মেঘে ঢাকাপ্রবল অন্ধকারে জোনাকি বের হয়জোনাকিও নেইঅনেকদিন তিনি জোনাকি দেখেন নিজোনাকি দেখতে পেলে ভালাে লাগত। 

নদীর আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছেস্রোতের শব্দহঠাৎ করেই কি নদী সাড়াশব্দ শুরু করল ? এতক্ষণ এই নদী ছিল কোথায় ? বকুল ফুলের গন্ধ আসছেএটা কি বকুল ফুলের সময় ? শহরবাসী হয়ে ছােটখাট ব্যাপারগুলি ভুলতে বসেছেন। 

গন্ধটা হয়তাে বকুল ফুলের নাঅন্য কোনাে বুনাে ফুলেরজায়গাটা বন তাে বটেইআশপাশে লােকালয় নেই। 

ঘড়ঘড় শব্দ হলােমিসির আলির চোখ হঠাৎ ধাঁধিয়ে গেলগেট খুলেছেগেটের ওপাশে জাহাজি লণ্ঠন হাতে লিলি দাড়িয়ে আছেতার পাশে দারােয়ানদারােয়ানের হাতে লম্বা টর্চপাঁচ ব্যাটারির টর্চ নিশ্চয়ইএই টর্চে আলাে ফেলে দেখতে ইচ্ছা করছেআলাে কেমন হয় । 

আমিই মিসির আলি-পর্ব-(৭)-হুমায়ূন আহমেদ

লিলি বলল, স্যার আসুনওর শরীরটা খারাপ বলে বাতি নিভিয়ে শুয়ে পড়েছেআর আমি খুঁজে পাচ্ছি না হারিকেনবরকতকে দেখুন এত লম্বা টর্চ নিয়ে ঘুরছেটর্চে নেই ব্যাটারিব্যাটারি ছাড়া টর্চ হাতে নিয়ে ঘােরার দরকারটা কী স্যার আপনিই বলুনআপনাকে ব্যাগ হাতে নিতে হবে নাবরকত নেবে। 

মিসির আলি বললেন, তােমার কুকুর কি বাধা হয়েছে

বাঁধা হয়েছেসকালে কুকুরগুলির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেব তখন আর আপনাকে কিছু বলবে নাআপনার থাকার ব্যবস্থা করেছি দোতলার সবচেদক্ষিণের ঘরেঘরটা তেমন ভালাে না, তবে খুব বড় ঘরএই ঘরের খাটটা সুন্দরঅন্য ঘরগুলিতে এত সুন্দর রেলিং দেয়া খাট নেই। 

লণ্ঠনের আলােয় বাড়িঘর কিছু দেখা যাচ্ছে নালণ্ঠন তার চারপাশ আলাে করছেদূরে আলাে ফেলতে পারছে নালণ্ঠন এবং টর্চের এই হলাে তফাৎ লণ্ঠন নিজেকে আলােকিত করেনিজেকে দেখায়টর্চ অন্যকে আলােকিত করে। 

আমিই মিসির আলি-পর্ব-(৭)-হুমায়ূন আহমেদ

সিঁড়িটা সাবধানে উঠবেন স্যারশ্যাওলা জমে কেমন পিছল হয়ে গেছেরেলিং ধরে উঠুনআপনার নিশ্চয়ই খুব ক্ষিধে লেগেছেক্ষিধে লেগেছে না স্যার

হু লেগেছে। 

আপনি হাতমুখ ধুয়ে একটু বিশ্রাম করুনআমি খাবার রেডি করে ফেলব। এর মধ্যে কোনাে কিছুর দরকার হলে দোতলার বারান্দায় রেলিং ধরে দাঁড়াবেনমাথা নিচু করে বরকত বরকত করে ডাক দেবেনআমাদের একটাই কাজের লােক বরকতএকের ভেতর চারসেদারোয়ান, সেকেয়ারটেকার, সে মালী, সেকুকুরপালকভাত খাবার আগে চাকফি কিছু খাবেন

খেতে পারিআমি এক্ষুণি বরকতকে দিয়ে পাঠিয়ে দিচ্ছিতােমার হাসবেন্ডের সঙ্গে কি রাতে দেখা হবে ? অবশ্যই হবে। 

অসুস্থ বলছিলেঅসুস্থ হােক যাই হােক গেস্টের সঙ্গে দেখা করবে না

 

Read more

আমিই মিসির আলি-পর্ব-(৮)-হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *