মিসির আলির ঘর পছন্দ হলো। পুরনাে বাড়ির একটা সুন্দর ব্যাপার হলাে— ঘরগুলি প্রকাণ্ড । ছােটখাট ফুটবল খেলার মাঠ। কড়ি বর্গার ছাদ অনেক উঁচুতে। ছাদ থেকে লম্বা লম্বা লােহার রড নেমে এসেছে। ব্লডের মাথায় ফ্যান। এক শােবার ঘরেই চারটা ফ্যান। ইলেক্ট্রিসিটি ছাড়া এই ফ্যান চলার কথা না। কাজেই ধরে নেয়া যেতে পারে এদের জেনারেটর আছে। ফ্যানগুলি পুরনাে আমলের ডিসি ফ্যান না। আধুনিক কালের ফ্যান। ফ্যানের পাখায় জমে থাকা ময়লা থেকে বােঝা যায় যে ফ্যানগুলি ব্যবহার করা হয়।
ঘরে শােবার খাট দুটা। চারপাশে রেলিং দেয়া প্রকাণ্ড খাটটা ঘরের মাঝামাঝি রাখা। এই খাটে ওঠার জন্যে দুই ধাপ সিঁড়ি আছে। জানালার পাশে খাটের সাইজেরই একটা টেবিল। বিশাল টেবিলের সঙ্গে বেমানান ছােট একটা চেয়ার। চেয়ার টেবিলের উল্টোদিকে দু’টা আলমিরা। কাঠের আলমিরা তালাবন্ধ । চারটা সােফার চেয়ার। চেয়ারে সবুজ মখমলের গদি। চেয়ারের পাশে পুরনাে ডিজাইনের দু’টা আলনা। তারপরেও মনে হচ্ছে ঘরটা ফাঁকা। দুটা খাটেই বিছানা করা হয়েছে।
আমিই মিসির আলি-পর্ব-(৮)-হুমায়ূন আহমেদ
কিছুক্ষণ আগেই করা হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। একটায় বিছানাে হয়েছে ধবধবে সাদা চাদর। সাদা বালিশের ওয়ার। রেলিং দেয়া খাটে সবকিছুই রঙিন। তবে দুটো খাটেই কোলবালিশ আছে। মিসির আলি বাথরুমে উঁকি দিলেন। বাথরুমও প্রায় শােবার ঘরের মতােই বড়। খুবই আধুনিক বাথরুম। এই বাথরুম অবশ্যই পরে বানানাে হয়েছে। যে সময়ের বাড়ি সে সময়ে টাইলস নামক বস্তু বাজারে আসে নি।
বাথরুমটা শুধু যে ঝকঝক করছে তা না, বড় বড় হােটেলের মতাে করে গােছানাে। বেসিনের উপর সাবান, টুথপেস্ট এবং একটা মােড়ক–না–খােলা টুথব্রাশ। তােয়ালে রাখার জায়গায় তােয়ালে ঝুলছে। ময়লা নয়— মনে হচ্ছে এইমাত্র ধােপাখানা থেকে নিয়ে আসা।
মিসির আলি বেসিনের কলে পানি আশা করেন নি। দোতলায় পানি আসতে হলে ছাদে পানির ট্যাংক থাকতে হবে। সেই ট্যাংকে পানি তােলার ব্যবস্থা থাকতে হবে। ট্যাপ খুলতেই পানি পাওয়া গেল। অনেকদিন অব্যবহারের পর হঠাৎ কল খুললে লাল পানি বের হয়— সে রকম পানি না। পরিষ্কার পানি। মিসির আলি মুখে পানি ছিটালেন।
আমিই মিসির আলি-পর্ব-(৮)-হুমায়ূন আহমেদ
সিঁড়িতে থপথপ শব্দ করতে করতে কেউ–একজন আসছে। বাড়ির মালিক নিশ্চয় নন। তিনি হুইল চেয়ারে থাকেন। তাহলে কে আসছে— দারােয়ান ?
একেকটা সিড়ি ভাঙতে এত সময় নিচ্ছে কেন? নিশ্চয়ই ভারী কিছু নিয়ে আসছে । সেই ভারী বস্তুটা কী হতে পারে ? চেয়ার–টেবিল কাঁধে করে আনবে ।
তার ঘরে চেয়ার–টেবিল আছে। বালতিতে করে গরম পানি কি আছে ? রাতের বেলার অতিথিদের গরম পানি দেয়ার রেয়াজ আছে। অতিথি গরম পানিতে গােসল করবেন, কিংবা হাত–মুখ ধােবেন। তাঁর প্রতি যে বিশেষ যত্ন নেয়া হচ্ছে তাতে সেটা প্রকাশ পাবে।
না বালতি নিয়ে কেউ আসছে না। বালতি হলে মাঝে মাঝে সিঁড়িতে নামিয়ে রাখত। তার শব্দ পাওয়া যেত | সেই শব্দ পাওয়া যাচ্ছে না। মিসির আলি ঘর থেকে বের হয়ে বারান্দায় চলে এলেন।
দারােয়ান বরকত আসছে। তার কোমরে মাটির কলসি। কলসির মুখ দিয়ে ধোঁয়া বের হচ্ছে, তার মানে কলসিতে করে গরম পানিই আনা হচ্ছে । মিসির আলি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন। যাক লজিক শেষ পর্যন্ত কাজ করেছে। সিদ্ধান্তে ভুল হয় নি। আজকাল এই ব্যাপারটা তার প্রায়ই হচ্ছে। কোনাে বিষয়ে সিদ্ধান্তে আসার পরই টেনশান বােধ করা শুরু করছেন। লজিকের যে সিড়িগুলি গাঁথা হয়েছে সেই সিঁড়িগুলি কি ঠিক আছে ? সিঁড়ি বেয়ে ওঠা যাবে তাে ?
আমিই মিসির আলি-পর্ব-(৮)-হুমায়ূন আহমেদ
মিসির আলি জানেন এই সবই হচ্ছে বয়সের লক্ষণ। বয়স মানুষের সবচে‘ বড় ক্ষতি যা করে তা হলাে আস্থা কমিয়ে দেয়। যাই করা হয় মনে হয় ঠিকমতাে বুঝি করা হলাে না। ভুল থেকে গেল।
স্যার গরম জল। বুঝতে পারছি। সিনান করলে করেন। গােসল করব না। বড় সাব সিনান করতে বলেছেন। তােমার বড় সাহেব বললে তাে হবে না। আমার গোসল করতে ইচ্ছে করছে ।
আর কিছু লাগব ? না আর কিছু লাগবে না। ভালাে কথা— তুমি গরম পানি না বলে গরম জল বলছ কেন? তােমাদের এদিকে কি পানিকে জল বলা হয়? এটা কি হিন্দুপ্রধান অঞ্চল।
বরকত জবাব দিল না। সরু চোখে তাকিয়ে রইল। মিসির আলি বললেন, আচ্ছা ঠিক আছে তুমি যাও।
যাও বলার পরেও সে যাচ্ছে না। আগের মতােই সরু চোখে তাকিয়ে আছে। বলশালী একজন মানুষ। বয়স কত হবে ত্রিশ কিংবা পঁয়ত্রিশ । বেশিও হতে পারে। চুলে পাক ধরেছে। মানুষটার বুদ্ধি কেমন? চট করে মানুষের বুদ্ধি বের করার কোনাে উপায় এখনাে বের করা যায় নি। সাইকোলজিস্টরা নানান ধরনের পরীক্ষা অবশ্যি বের করেছেন। কোনাে পরীক্ষাই মিসির আলির কাছে গ্রহণযােগ্য মনে হয় না। আসলে বুদ্ধি পরীক্ষার ব্যবস্থা না থেকে থাকা উচিত ছিল বােকামি পরীক্ষার ব্যবস্থা। প্রথম শ্রেণীর বােকাদের জন্যে এক রকম পরীক্ষা। দ্বিতীয় শ্রেণীর বােকাদের জন্যে আরেক রকম পরীক্ষা।
আমিই মিসির আলি-পর্ব-(৮)-হুমায়ূন আহমেদ
বরকত চলে যাচ্ছে। যেতে যেতেও দু’বার ফিরে তাকাল। সিঁড়ির কাছে অন্ধকার। কাজেই তার চোখের দৃষ্টিতে কি আছে বােঝা যাচ্ছে না। কিছু একটা নিশ্চয়ই আছে। নয়তো এত বার করে তাকাত না।
মিসির আলি নিজের ঘরে ঢুকলেন। ঘরটা নিজের মতাে করে সাজিয়ে নেয়া দরকার । নিজের গায়ের গন্ধ ঘরময় ছড়িয়ে দিতে হবে। গন্ধ যত ছড়াবে ঘর হবে তত আপন। নিম্নশ্রেণীর পশুরা তাই করে। নিজের গায়ের গন্ধ দিয়ে সীমানা ঠিক করে দেয় । অদৃশ্য সাইনবাের্ড গন্ধ দিয়ে বলে— এই আমার সীমানা। এর ভেতর আর কেউ আসবে না। যদি ভুলে চলেও আস, বেশিক্ষণ থাকবে না। থাকলে সমূহ বিপদ।
মিসির আলি সুটকেস খুলে বই বের করলেন। চারটা বইয়ের মধ্যে একটা হলাে ক্লোজআপ ম্যাজিকের বই। দড়িকাটার খেলা, পিংপং বল অদৃশ্য করে দেবার খেলার মতাে ছােট ছােট ম্যাজিকের কৌশল দেয়া আছে। পড়তে ভালাে লাগে। তিনি বইগুলি টেবিলে সাজিয়ে রাখলেন। এত বড় টেবিলে চারটা মাত্র বই দেখতে হাস্যকর লাগছে।
Read more
