এখন ব্যালকনিটা অন্ধকার। পিছনে ঘরের আলো। তাই রাস্তা থেকে কল্যাণীকে ছায়ার মতো দেখায়। পাগলটা মুখ তুলে ছায়াময়ী কল্যাণীকে দেখে। টুপটাপ বুকুল ঝরে পড়ে। অবিকল পাগলটা হাত বাড়িয়ে ফুল তুলে নেয়। লম্বা নোংরা নখে ছিঁড়ে ফেলতে থাকে ফুল। রাত বাড়ছে। তার খিদে পাচ্ছে।পুরোনো বাড়িটার সিঁড়ি বেয়ে অনেকক্ষণ হল রাস্তায় নেমে এসেছে তুষার।
কখনও নির্জন শেক্সপিয়র সরণি, কখনও চলাচলকারী মানুষের মধ্যে চৌরঙ্গি রোড ধরে বহুক্ষণ হাঁটল সে। এখনও মাঝে-মাঝে উঁচু বাড়ির লোহার কাঠামোর ভিতরে ঘনায়মান অন্ধকার তার মনে পড়ছে, মাঝে-মাঝে শুনতে পাচ্ছে, নেপথ্যে কে যেন নুড়ি ছুঁড়ে মারছে লোহার বিমের গায়ে। তার মন বলছে, এখানে নয় এখানে নয়। চলো সমুদ্রে যাই।
কিংবা চলো পাহাড়ে। ছুটি নাও। মুক্তি নাও। বৃথা বয়ে যাচ্ছে সময়।কেন যে এই ভূতুড়ে মুক্তির ইচ্ছা? সে কি চাকরি করতে-করতে ক্লান্ত? সে কি সংসারের একঘেয়েমি আর পছন্দ করছে না? কল্যাণীর আকর্ষণ সব কি নষ্ট হয়ে গেল? বেশ রাত করে সে বাড়ি ফিরল। সোমা ঘুমিয়ে পড়েছে। কল্যাণী দরজা খুলে মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
–মদ খেয়েছ? –খেয়েছি। –আর কোথায় গিয়েছিলে? –কোথায় আবার? কল্যাণী বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে কাঁদতে থাকে।ভারী বিরক্ত হয় তুষার কাঁদছ কেন? মদ তো আমি প্রথম খাচ্ছি না? আমদের যা স্ট্রেইন হয় তাতে না খেলে চলে না-কাঁদতে–কাঁদতেই হঠাৎ তীব্র মুখ তোলে কল্যাণী–শুধু মদ! মেয়েমানুষের কাছ যাওনি? তোমার ঠোঁটে গালে শার্টে লিপস্টিকের দাগ তোমার গায়ে সেন্টের গন্ধ যা তুমি জন্মে মাখো না- তুষার অপেক্ষা করতে লাগল। এখন অপেক্ষা করা ছাড়া কিছু করার নেই।
অনেক রাত হল আরও। বেশ পরিশ্রম করতে হল তুষারকে। তারপর রাগ ভাঙল কল্যাণীর। উঠে ভাত দিল।বাইরে বকুল গাছের তলায় তখন পাগলটা অনেকগুলি ফুল নখে ছিঁড়ে স্কুপ করেছে। উগ্র চোখে সে চেয়ে আছে অন্ধকার ব্যালকনিটার দিকে। ঘরের দরজা বন্ধ। তার খিদে পেয়েছে। মাঝে-মাঝে সে চেঁচিয়ে বলছে–অন্ধকার। ভীষণ অন্ধকার! কোই হ্যায়।
সে ডাক শুনতে পেল তুষার। খেতে-খেতে জিগ্যেস করল–পাগলটাকে রাতের খাবার দাওনি? –কী করে দেব। রোজ মঙ্গলা রাতে একবার আসে খাবারটা দিয়ে আসতে। আজ আসেনি, ওর ছেলের অসুখ।–আমার কাছে দাও, দিয়ে আসছি।–তুমি দেবে? অবাক হয় কল্যাণী।–নয় কেন? –শুধু দিয়ে আসা তো নয় বাবুর খাওয়া হলে এঁটো বাসন নিয়ে আসতে হবে।
পাগলের এঁটো তুমি ছোঁবে? তুষার হাসল–তোমার জন্য ও অনেক দিয়েছে ওর জন্য আমরা কিছু দিই— থালায় নয়, একটা খবরের কাগজে ভাত বেড়ে দিল কল্যাণী। তুষার সেই খবরের কাগজের পোঁটলা নিয়ে বকুল গাছটার তলায় গেল।পাগলটা তুষারের দিকে তাকালও না। হাত বাড়িয়ে পেঁটলাটা নিল। খুলে খেতে লাগল গোগ্রাসে।
একটুদূরে দাঁড়িয়ে দৃশ্যটা সিগারেট খেতে-খেতে দেখতে লাগল তুষার। –খাওয়া ছাড়া তুমি আর কিছু বোঝো না অরুণ? পাগলটা মুখ তুলল না। তার খিদে পেয়েছে। সে খেতে লাগল।–ওইখানে, ওই ব্যালকনিতে মাঝে-মাঝে কল্যাণী এসে দাঁড়ায়। তাকে দেখ না? তার বাঁ গালে সেই সুন্দর কালো আঁচিলটা এখনও মাছির মতো বসে থাকে দ্যাখো না? এখনও আগের মতোই ভারী তার চোখের পাতা, দীর্ঘ গ্রীবা, এখনও তেমনি উজ্জ্বল রঙ।
চেয়ে দ্যাখো না অরুণ? পাগল গ্রাহ্য করে না। তার খিদে পেয়েছে। সে খাচ্ছে।আকাশে মেঘ করেছে খুব। তুষার মুখ তুলে দেখল! পিঙ্গল আকাশ, বাতাস থম ধরে আছে। ঝড় উঠবে। এই ঝড়বৃষ্টির রাতেও বাইরেই থাকবে পাগল। হয়তো কোনও গাড়ি বারান্দার তলায় গিয়ে দাঁড়াবে। ঝড় খাবে। আর অবিরল নিজের মধ্যবর্তী বিচ্ছিন্ন চিন্তার এক স্রোতস্বিনীকে করবে প্রত্যক্ষ।
তোমার কোনও নিয়ম না মানলেও চলে, তবু কেমন নিয়মে বাঁধা পড়ে গেছ অরুণ। তোমার মুক্তি নেই? ডাল তরকারিতে মাখা কাগজটা ছিঁড়ে গেছে। ফুটপাথের ধুলোয় পড়েছে ভাত। পাগল তার নোংরা হাতে, নখে খুঁটে খাচ্ছে। একটা রাস্তার কুকুর বসে আছে অদূরে, আর দুটো দাঁড়িয়ে আছে। তুষার চোখ ফিরিয়ে নিল।
ঘর অন্ধকার হতেই সেই লোহার কাঠামো, তার ভিতরকার ঝুঁঝুকো আঁধার আর একবার দেখা গেল। লোহার বিমের গায়ে নুড়ি পাথরের টুং–টুং শব্দ। অবিরল অবিশ্রাম। বুকে খামচে ধরে মুক্তির তীব্র সাধ। কীসের মুক্তি? কেমন মুক্তি? কে জানে! কিন্তু তার ইচ্ছা উত্তপ্ত পিরদের মতো লাফিয়ে ওঠে।
আকুল আগ্রহে সে আবার বাতি জ্বালে। কল্যাণী বলে–কী হল? উত্তেজিত গলায় তুষার ডাকে–এসো তো, এসো তো কল্যাণী।তারপর সে নিজেই হাত বাড়িয়ে মশারির ভিতর থেকে টেনে আনে কল্যাণীকে। আনে নিজের বিছানায়। কল্যাণী ঘেমে ওঠে। উজ্জ্বল আলোয় কল্যাণীকে পাগলের মতো দেখে তুষার, চুমু খায়, তীব্র আগ্রহে রিরংসায় তাকে মন্থন করে।
বিড়বিড় করে বলে–কেন তোমার জন্যে ও পাগল? কী আছে তোমার মধ্যে? কী সেই মহামূল্যবান। আমাকে দিতে পারো তা? বৃথা। সব শেষে ঘোরতর ক্লান্তি নামে।এইটুকু। আর কিছু নয়! ওরা ঘুমোয়। বাইরে ঝড়ের প্রথম বাতাসটি বয়ে যায়! প্রথম বৃষ্টির ফোঁটাটি একটি পোকার মতো উড়ে এসে বসে পাগলটার ঠোঁটে। বসে-বসে ঝিমোয় পাগল।
তার রক্তবর্ণ চুলগুলি নিয়ে খেলা করে বাতাস। বিদুৎ উদ্ভাসিত করে তার মুখ। তার মাথায় অবিরল বকুল ঝরিয়ে দিতে থাকে গাছ।বহু উঁচু থেকে ক্রেন হ্যামারটা ধম করে নেমে আসে। চমকে উঠে বসে তুষার। বুকের ভিতরটা ধকধক করতে থাকে। এত জোরে বুক কাঁপতে থাকে যে দুহাতে বুক চেপে ধরে কাতরতার একটা অস্ফুট শব্দ করে সে।
কীসের শব্দ ওটা? অন্ধকারে উঁচু উটের গ্রীবার মতো নিস্তব্ধ ক্রেন হ্যামারটা সে কোথায় দেখেছে? কবে? বাইরে ঝড়ের প্রচণ্ড শব্দ বাড়ি–বাড়ি কড়া নেড়ে ফিরছে। একা-একা উল্লাসে ফেটে পড়ছে ঝড়। সেই শব্দে মাঝরাতে ঘুমভাঙা তুষার চেয়ে থাকে বেভুল মানুষের মতো। বুক কাঁপে। আস্তে-আস্তে মনে পড়ে একটা বিশাল লোহার কাঠামো, তাতে ঘনায়মান অন্ধকার, উঁচু ক্রেন হ্যামার।
অমনি ব্যথিয়ে ওঠে বুক। তীব্র মুক্তির ইচ্ছায় ছটফট করতে থাকে সে। তার মন বলে–চলো সমুদ্রে। চলো পাহাড়ে! চলো ছড়িয়ে পড়ি।বুক চেপে ধরে তুষার। আস্তে-আস্তে হাঁপায়।বাইরে খর বিদুৎ দিয়ে মেঘ স্পর্শ করে মাটিকে।এই ঝড়ের রাতে তুষারের খুব ইচ্ছে হয়, একবার উঠে গিয়ে পাগলটাকে দেখে আসে।
কিন্তু ওঠে না। নিরাপদ ঘরে ভীরু গৃহস্থের মতো সে বসে থাকে। বাইরে ভিখিরি, পাগলদের ঘরে ঝড় ফেটে পড়ে। তাদের ঘিরে নেমে আসে অঝোর বৃষ্টির ধারা।পরদিন আবার বুকলতলায় পাগলকে দেখা যায়। অফিস যাওয়ার আগে পানের পিক ফেলতে এসে উত্তরের ব্যালকনি থেকে তাকে দেখে তুষার। একটু বেলায় কল্যাণী আসে। দ্যাখে। অভ্যাস।
কাজের মধ্যে ডুবে থাকে সে। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে তুষার মাঝে-মাঝে অস্বস্তি বোধ করে। অফিসের পর বাদুড়ের পাখনার মতো অন্ধকার ক্লান্তি নামে চার ধারে। অনেক দূর হেঁটে যায় তুষার। ট্যাক্সিতে ওঠে, কোনওদিন ওঠে না। হেঁটে-হেঁটে চলে যায় বহু দূর। কী একটা কাজ বাকি রয়ে গেল জীবনে! করা হল না! এক রোমাঞ্চকর আনন্দময় মুক্তি পাওয়ার কথা ছিল আমার।
পেলাম না। অস্থিরতা বেড়ালের থাবার মতো বুক আঁচড়ায়।মাঝে-মাঝে রাতে ঘুম ভেঙে যায় তার। উঠে বসে। সিগারেট খায়। জল পান করে। কখনও বা উত্তরের দরজা খুলে ব্যালকনিতে এসে দাঁড়ায়। মোমবাতির মতো স্থির দাঁড়িয়ে আছে সাদা বাতিস্তম্ভ, তার নীচে বকুলগাছ। তার ছায়া। অন্ধকারে একটা পুঁটলির মতো পড়ে আছে পাগল।
আবার ফিরে আসে ঘরে। বাতি জ্বালে। পাতলা নেট-এর মশারির ভিতর দিয়ে তৃষিত চোখে ঘুমন্ত কল্যাণীকে দেখে। তার বুক ঘেঁষে জড়সড়ো হয়ে শুয়ে আছে বাচ্চা সোমা। সোমার মাথার কাছে দুটো কাগজ, তাতে ছবি আঁকা। একটাতে নদী, নৌকো, গাছপালা। অন্যটাতে খোঁপাসুষ্ঠু একটা মেয়ের মুখ, নীচে লেখা সোমা।
অনেকক্ষণ ছবি দুটোর দিকে চেয়ে রইল তুষার। একটা শ্বাস ফেলল।কল্যাণী শান্তভাবে ঘুমোচ্ছে। মুখে নিশ্চিন্ত কমনীয়তা। চেয়ে থাকে তুষার। আস্তে-আস্তে বলে –কী করে ঘুমোও? চলো, বাইরে যাই। কিছুদিন ঘুরে আসি। এক সকালে চায়ের টেবিলে কল্যাণীকে এই কথা বলল অবসন্ন তুষার।
চলো। কোথায় যাবে? –কোথাও। দূরে। সমুদ্রে বা পাহাড়ে।–পুরীর সমুদ্র তো দেখেছি। দার্জিলিং শিলং-ও দেখা।–অন্য কোথাও। অচেনা নির্জন জায়গায়। বলে তুষার। কিন্তু সে জানে মনে-মনে, ঠিক জানে –যাওয়া বৃথা। সে কতবার গেছে বাইরে, সমুদ্রে, পাহাড়ে। তার মধ্যে মুক্তি নেই, জানে। মুক্তি এখানেই আছে। আছে দুর্লভ ইচ্ছাপূরণ। খুঁজে দেখতে হবে।
তবু তারা বাইরে গেল। এক মাস ধরে তারা ঘুরল নানা জায়গায়। পাহাড়ে, সমুদ্রেও। ফিরে এল একদিন।পাগলটা ঠিক বসে আছে। উত্তরের ব্যালকনিটার দিকে চেয়ে।মাঝে-মাঝে কাজের মধ্যেও তুষার হঠাৎ বলে ওঠে না নাঃ। বলেই চমকায়। কীসের না? কেন না? ছোঁকরা স্টেনোগ্রাফারটিকে জরুরি ডিকটেশন দিতে দিতে বলে ওঠে–নাঃ–নাঃ। স্টেনোগ্রাফারটি বিনীতভাবে থেমে থাকে।
তুষার চারিদিকে চায়। অদৃশ্য মশারির মতো কী একটা ঘিরে আছে চারদিকে। ওটা কী! ওটা কেন! কী আছে ওর বাইরে? নির্জন শেক্সপিয়ার সরণি ধরে হাঁটে তুষার, হাঁটে নির্জন ময়দানে, হাঁটে ভিড়ের মধ্যে। বহু দূরে-দূরে চলে যায়। কিন্তু সেই অলীক মশারির বাইরে কিছুতেই যেতে পারে না। ট্যাক্সিতে উঠে বলে জোরে চালাও ভাই। আরও জোরে–আরও জোরে…
ট্যাক্সি উড়ে যায়। তবু চারদিকে অলীক সূক্ষ্ম জাল।হতাশ হয়ে ভাবে–আছে কোথাও বাইরে যাওয়ার পথ। খুঁজে দেখতে হবে। চোখ বুজে ভাবে। উটের মতো একটা ক্রেন হ্যামার আকাশে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে, পিছনে বিশাল লোহার কাঠামো, সেইখানে একটা লোহার বিমে নুড়ি ছুঁড়ে শব্দ তুলছে বাচ্চা একটা ছেলে।
এক-একদিন রাতে ভাত দিতে নেমে আসে তুষার। ভাত রেখে একটু দূরে দাঁড়ায়। সিগারেট খায়।–অরুণ, তোমার কি ইচ্ছে করে আমার ঘরে যেতে? পাগল খায়। উত্তর দেয় না।–ইচ্ছে করে না কল্যাণীকে একবার কাছ থেকে দেখতে? পাগল খায়। কথা বলে না।–জানতে চাও না সে কেমন আছে? ফিরেও তাকায় না পাগল। খেয়ে যায়।
একদিন তোমাকে নিয়ে যাব আমাদের ঘরে! যাবে অরুণ? একজন প্রতিবেশী পথ চলতে-চলতে দাঁড়ায়। হঠাৎ বলে–আপনার বড় দয়া। রোজ দেখি দুবেলা পাগলটাকে আপনারা ভাত দেন। আজকাল কেউ এতটা করে না কারও জন্য! আমরা আমাদের ছেলে মেয়েদের কাছে আপনার কথা বলি।
কৌতূহলে প্রশ্ন করে তুষারকী বলেন? –বলি, ওইরকম মহাপ্রাণ হয়ে ওঠো। আমরা তো নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত। আমাদের দ্বারা কিছু হল না পৃথিবীর। কাছাকাছি আপনি আছেন–এটাই আমাদের বড় লাভ।তুষার মূক হয়ে যায়। এ কেমন মিথ্যা প্রচার! দয়া! দয়া কথাটা কেমন অদ্ভুত! এমন কথা সে তো ভাবেওনি! কিন্তু ভাবে তুষার! ভাবতে থাকে।
কাজকর্মের ফাঁকে-ফাঁকে তেমনি বলে ওঠেনা না। চমকায়! জালবদ্ধ এক অস্থিরতায় অন্যমনস্ক হয়ে যায়। ঝড়বৃষ্টি হলে এখনও মাঝে-মাঝে ক্রেন হ্যামারটা ধম করে নেমে আসে। জেগে উঠে যন্ত্রণায় বুক চেপে কাতরতার শব্দ করে সে।এত রাতে সত্যিই তুষার কল্যাণীকে ভাত বাড়তে বলে নিঃশব্দে সিঁড়ি বেয়ে নেমে গেল। রাস্তা পার হয়ে এল বকুল গাছটার তলায়।
চলো অরুণ। একবার আমার ঘরে চলো। কোনও দিন তুমি যেতে চাওনি। আজ চলো। আমি নিয়ে যাচ্ছি তোমাকে। আজ তোমার নিমন্ত্রণ।বলে হাত ধরল পাগলের। পরিষ্কার সুন্দর হাতে ধরল নোংরা হাতখানা।কে জানে কী বুঝল পাগল, কিন্তু উঠল!সাবধানে তার হাত ধরে রাস্তা পার করল তুষার। সিঁড়ি বেয়ে উঠে এল। দাঁড়াল এসে খাবার ঘরের দরজায়।
কল্যাণী, দ্যাখো কাকে এনেছি।–কল্যাণীর হাত থেকে পড়ে গেল একটা চামচ। ভয়ঙ্কর ঠিঠিন শব্দ হল। কেঁপে উঠল কল্যাণীর বুক। শরীর কাঁপতে লাগল। ভয়ে সাদা হয়ে গেল তার ঠোঁট।–মা গো! চিৎকার করল সে। নরম গলায় তুষার বলল –ভয় নেই, ভয় নেই কল্যাণী। তুমি খাবার সাজিয়ে দাও। অরুণ আজ আমার অতিথি।
নীরবে দাঁড়িয়ে রইল কল্যাণী। জলে তার চোখ ভরে গেল। তুষারের হাতে–ধরা পাগল নতমুখে দাঁড়িয়ে রইল।এত কাছ থেকে অরুণকে অনেকদিন দেখেনি কল্যাণী। কী বিপুল দারিদ্র্যের চেহারা। খালাসিদের যে নীল জামাটা ওর গায়ে তা বিবর্ণ হয়ে ছিঁড়ে ফালা–ফালা। খাকি প্যান্টের রং পালটে ধূসর হয়ে এসেছে। কী পিঙ্গল ওর ভয়ঙ্কর রাঙা চুল।
পৃথিবীর সব ধুলো আর নোংরা ওর গায়ে লেগে আছে। কেবল তখনও অকৃপণ, সুন্দর, সুগন্ধ বকুল ফুলে ছেয়ে আছে ওর মাথায় জটায় ঘাড়ে।কাঁপা হাতে খাবার সাজিয়ে দিল কল্যাণী। তার চোখ দিয়ে অবিরল জল গড়িয়ে পড়ছে। পাগল তার দিকে তাকালই না। চোখ নীচু রেখে খেয়ে যেতে লাগল।
মাঝে-মাঝে বিড়বিড় করে তুষার বলছিল–খাও অরুণ, খাও।খাওয়া শেষ হলে তাকে আবার হাত ধরে তুলল তুষার। নিয়ে এল ঘরে।–এই দ্যাখো আমার ঘরদোর। ওই যে মশারির নীচে শুয়ে আছে, ও আমার মেয়ে সোমা। এই দ্যাখো, ওর হাতে আঁকা ছবি। এই দ্যাখো ওয়ার্ডরোব, ফ্রিজিডেয়ার। ওই ড্রেসিং টেবিল।
এই দ্যাখো, আরও কত কী– ঘুরে-ঘুরে অরুণকে সব দেখায় তুষার।মাঝে-মাঝে প্রশ্ন করে–এখানে এই সুন্দর ঘরে থাকতে ইচ্ছে করে না অরুণ? ইচ্ছে করে না এই সব জিনিসপত্রের মালিক হতে? তুমি আর চাও না কল্যাণীর মতো সুন্দর বউ? সোমার মতো মেয়ে।অরুণের হাতে জোর ঝাঁকুনি দেয় তুষার–বলো অরুণ, ইচ্ছে করে না! –অন্ধকার! ভীষণ অন্ধকার! পাগল বলে।
কোথায়–কোথায় অন্ধকার? –এইখানে।বলে চারদিকে চায় পাগল। –আর কোথায়? –চারদিকে।–থাকবে না অরুণ। থাকো থাকো। থেকে দ্যাখো।পাগল কিছু বলে না।হতাশ হয়ে তার হাত ছেড়ে দেয় তুষার!পাগলটা আস্তে-আস্তে সদর পার হয়। সিঁড়ি ভাঙে। রাস্তা পেরিয়ে চলে যায় বকুল গাছটার তলায়। পা ছড়িয়ে বসে। পঁড়িতে হেলান দেয়।কুলকুল করে বয়ে চলে তার অন্যলগ্ন চিন্তার স্রোতস্বিনী।
চোখ বুজে অনাবিল আনন্দে সে সেই স্রোত প্রত্যক্ষ করে।উত্তরের ব্যালকনিতে এসে দাঁড়াল তুষার। চেয়ে দেখে নিশ্চিন্তে বুকুল গাছের ছায়ায় আবার বসেছে পাগল। টুপটাপ বকুল ঝরছে তার মাথায়।উত্তরের ব্যালকনি থেকে দৃশ্যটা দেখে তুষার। তার দুই চোখ ভরে আসে জলে।–কিছুই চাও না অরুণ? বকুল গাছের তলায় তোমার হৃদয় জুড়িয়ে গেছে।
হায় পাগল, ভালোবাসা নয়, এখন কেবল ভাতের জন্য তোমার বসে থাকা।এখন আর কল্যাণীর কোনও সন্দেহ নেই। সে কাছ থেকে অরুণকে দেখেছে। সে কেঁপেছিল থরথর করে। দুঃখে ভয়ে উৎকণ্ঠায়। কিন্তু অরুণের মুখে সে দেখেছে বিস্মৃতি তাকে আর মনে নেই অরুণের।
বড় শীত পড়েছে এবার। বকুল গাছ থেকে শুকনো পাতা খসে পড়ছে পাগলের গায়ে? ছোঁড়া জামা দিয়ে হু-হু করে উত্তরের হাওয়া লাগছে শরীরে। বড় দয়া হয়। মঙ্গলার হাত দিয়ে একটা পুরোনো কম্বল পাঠিয়ে দেয় কল্যাণী! পাগল সেই কম্বল মুড়ি দিয়ে নির্বিকার বসে থাকে।মাঝে-মাঝে কল্যাণীরও বুক ব্যথিয়ে ওঠে।
ভালোবাসার কথা মনে পড়ে। তুষার কি তাকে ভালবাসে এখনও! কে জানে? মাঝে-মাঝে উগ্র হিংসায় তাকে মন্থন করে তুষার। কখনও দিনের পরদিন থাকে নিঃস্পৃহ। আর ওই যে ভালোবাসার জন্য পাগল অরুণ–ও বসে আছে ভাতের প্রত্যাশায়। কল্যাণীকে চেনেও না।তাহলে কী করে বাঁচবে কল্যাণী। বুক খামচে ধরে এক ভয়।
আবার, বেঁচেও থাকে কল্যাণী। বাঁচতে হয় বলে।মাথার ওপর সব সময়ে উদ্যত নিস্তব্ধ ক্রেন হ্যামারটাকে টের পায় তুষার। অস্বস্তি! কখন যে ধম করে নেমে আসে। অকারণে বুক কাঁপে। ব্যথায় ককিয়ে উঠে তুষার।ঠিক সকাল ন’টায় পিক ফেলতে এসে উত্তরের ব্যালকনি থেকে বকুল গাছটার গোড়ায় পাগলকে দেখে। দুজনে দুজনের দিকে চেয়ে থাকে।
কোম্পানি এবার উনিশ লক্ষ টাকা লাভ করেছে! ক্লান্তি বাড়ে। দিন শেষে তার শরীর জুড়ে নেমে আসে বাদুড়ের ডানার মতো অন্ধকার ক্লান্তি। তার ডালপালা ধরে কেবলই নাড়া দেয় এক তীব্র ইচ্ছা। নাড়া দেয়, নাড়া দিতে থাকে। অলীক ছুটি, মিথ্যা অবসর, অবিশ্বাস্য মুক্তির জন্য খামোকা আকুল হয় সে। পৃথিবী ঘুরে যাচ্ছে। বয়ে যাচ্ছে সময়। বয়স বাড়ছে।তুষার অস্থির হয়। অস্থিরতা নিয়ে বেঁচে থাকে।
ঠিক যেন এক নদীর পাড়ে বসে আছে পাগল। কী সুন্দর আবছায়া নদীটি। চারদিকে আধো আলো আধো অন্ধকার। অনন্ত সন্ধ্যা। নদীটি বয়ে যায় অবিরল। স্মৃতি বিস্মৃতিময় তার স্রোত। পাগল প্রত্যক্ষ করে। ক্লান্তি আসে না। বকুলের গাছ থেকে পাতা খসে পড়ে, কখনও ফুল, বৃষ্টি আসে, ঝড় বয়ে যায়, আবার দেখা দেয় রোদ। তবু আবছায়ায় নদীটি বয়ে যায়। বয়ে যায়।পাগল বসে থাকে।
( সমাপ্ত )
Read more
