এই আমি পর্ব:০৮ হুমায়ূন আহমেদ

এই আমি

জরী পরী তিলু বিলু নীলু ও রানু নারী চরিত্রে এই নামগুলি আমি বারবার ব্যবহার করেছি।এবং এখনও করছি।বার বার ব্যবহার করলেও এরা একই চরিত্র নয়।আলাদা চরিত্র।উদাহরণ দিলেই বিষয়টি পরিষ্কার হবে। এইসব দিনরাত্রির নীলু হল বড় ভাবী।আর নীল হাতীর নীলুর বয়স হল সাত।সেই যাই হোক,আমার নায়িকারা সবাই অসম্ভব রূপবতী।ওরকম কেন?রূপ দেওয়ার ক্ষমতা যখন আমার হাতে তখন কেন জানি কার্পণ্য করতে ইচ্ছা করে না।

আমার ছাব্বিশ বছর পযর্ন্ত যত লেখালেখি তার বেশিরভাগ নায়িকা পরী,তিলু,বিলু,নীলু,রানু।নাম গুলো সহজ এবং ঘরোয়া।ব্যবহার করতে ভালো লাগে।খুব পরিচিত মনে হয়।ছাব্বিশ বছর বয়সের একটা বালিকার সঙ্গে পরিচয় হবার পর নতুন একটা নায়িকা উঠে আসে।তার নাম জরী।বলাই বাহুল্য সেও অসম্ভব রূপবতী।এই নায়িকা আমার পরবর্তী সব লেখাকে দারুণ ভাবে প্রভাবিত করতে শুরু করে।

কারণ যে বালিকার ছায়া দিয়ে জরী নামক চরিত্রের সৃষ্টি,সেই বালিকাটি আমার জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে যায়।সাতাশ বছর বয়সে তাকে আমি বিয়ে করি।তখন তার বয়স মাত্র পনেরো।এই মেয়েটি আমার লেখালেখিতে খুব কাজে আসে।না,রাত জেগে চা বানানোর কথা বলছি না।আমি তাকে খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ পাই বলেই কিশোরীর বিচিত্র মনোজগত সম্পর্কে জানতে পারি।একজন কিশোরীর তরুণীতে রুপান্তরের সেই বিস্ময়কর প্রক্রিয়াটি দেখা হয়।সবই উঠে আসে লেখায়।

আমার প্রথম দিকের নায়িকাদের বয়স খুব কম-কারণ আমার স্ত্রী তার বয়স কম।আস্তে আস্তে আমার নায়িকাদের বয়স বাড়ে,কারণ আমার স্ত্রীর বয়স বাড়ছে। ইদানিংকালের উপন্যাসে আমার নায়িকারা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছে।কারণ গুলতেকিন(আমার স্ত্রীর কথা বলছি) বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে।তাহলে কি এই দাঁড়াবে যে সে যখন বৃদ্ধা হয়ে যাবে তখন আমার নায়িক-নায়িকারা হবে বৃদ্ধ বৃদ্ধা?

নিজেকে এই ভেবে সান্ত্বনা দেই-না তা কেন হবে? আমার মেয়েরা এখন বড় হচ্ছে।আবারো খুব কাছ থেকে তাদের দেখছি।এরা হবে আমার ভবিষ্যৎ উপন্যাসের নায়িকা।এখনো আমার কত কথা জমা হয়ে আছে।মাঝে মাঝে মনে হয়,কিছুই তো বলা হয়নি,অথচ সময় কত দূত চলে যাচ্ছে।মহান মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে লেখার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একবছরের ছুটি নিয়েছিলাম।

সেই ছুটিও ফুরিয়ে যাচ্ছে,অথচ একটা পৃষ্টাও লেখা হয়নি।মাঝে মাঝে গভীর রাতে ঘুম ভেঙ্গে যায়।বুকের ভেতর ধক করে ওঠে। মনে হয় – ফুরায় বেলা,ফুরায় খেলা,সন্ধ্যা হয়ে আছে।আমি প্রার্থনা করি-হে মঙ্গলময়,তুমি আমাকে শক্তি দাও।ক্ষমতা দাও যেন আমি আমার কাজ শেষ করতে পারি।তুমি আমাকে পথ দেখাও।আমি পথ দেখতে পাচ্ছি না।গুলতেকিন একসময় জেগে উঠে বলে কি হয়েছে?

আমি হেসে তাকে আশ্বস্ত করি।সে আবার ঘুমিয়ে পড়ে।আমি জেগে থাকি।আমার ঘুম আসে না।কয়েক বৎসর আগের কথা।ঢাকার শহরের এক কম্যুনিটি সেন্টারে বিয়ে খেতে গিয়েছি।চমৎকার ব্যবস্থা।অতিথীর সংখ্যা কম।প্রচুর আয়োজন।থালা বাসুনগুলো পরিষ্কার।যারা পোলাও খাবে না তাদের জন্য সরু চালের ভাতের ব্যবস্থা। নিমন্ত্রিতদের মধ্যে দেখলাম বেশ কিছু বিদেশি মানুষ ও আছেন।তারা বিয়ের অনুষ্ঠান দেখতে আগ্রহী।দেখবার মতো কোনো অনুষ্ঠান নেই বলে কন্যা কর্তা খানিকটা বিব্রত।

এটা শুধুমাত্র খাওয়ার অনুষ্ঠান তা বলতে বোধহয় কন্যা কর্তার খারাপ লাগছে।বিদেশীরা যতবারই জানতে চাচ্ছে,মূল অনুষ্ঠান কখন শুরু হবে?ততবারই তাদের বলা হচ্ছে হবে হবে।কোণার দিকের এক ফাঁকা টেবিলে খেতে বসেছি।আমার পাশের চেয়ারে এক বিদেশি ভদ্রলোক এসে বসলেন।আমার কিছুটা মেজাজ খারাপ হল।মেজাজ খারাপ হবার প্রধান কারণ-ইনি সঙ্গে করে কাঁটা চামচ নিয়ে এসেছেন।

এদের এই আদিখ্যেতা সহ্য করা মুশকিল।কাঁটা চামচ নিশ্চয়ই এখানে আছে।সঙ্গে করে নিয়ে আসার প্রয়োজন ছিল না।আমি আঘেও লক্ষ করেছি যারা কাটা চামচ দিয়ে খায় তারা হাতে যারা খায় তাদের বর্বর গণ্য করে।যেন সভ্যজাতীর একমাত্র লগো হল কাটা চামচ।পাশের বিদেশি তার পরিচয় দিলেন।নাম পল আরসন।নিবাস নিউমেক্সিকোর লেক সিটি।কোনো এক এনজিওর সাথে যুক্ত আছেন। বাংলাদেশে এসেছেন অল্প দিন হল।এখনো ঢাকার বাইরে যাননি।বিমানের টিকিট পাওয়া গেলে সামনের সপ্তাহে কক্সবাজার যাবেন।কিছু জিঙ্গেসা না করলে অভদ্রতা হয় বলেই বললাম, বাংলাদেশ কেমন লাগছে?

পল অরসন চোখ বড় বড় করে বলল, oh, wonderful ! এদের মুখে oh wonderful শুনে আহ্লাদীত হওয়ার কিছু নেই।এরা এমন বলেই থাকে।এরা যখন এদেশে আসে তখন এদের বলে দেওয়া হয়, নরকের মত একটা জায়গায় যাচ্ছ।প্রচন্ড গরম। মশা মাছি।কলেরা ডায়ারিয়া।মানুষগুলিও খারাপ।বেশির ভাগই চোর।যারা চোর না তারা ঘুষখোর।এরা প্রোগ্রাম করা অবস্থায় আসে।সেই প্রোগ্রাম ঠিক রেখৃই বিদেয় হয়।মাঝখানে oh wonderful জাতীয় কিছু ফাঁকা বুলি আওড়ায়।

আমি পল আরসনের দিকে তাকিয়ে শুকনো গলায় বললাম,তুমি যে ওয়ান্ডারফুল বললে,শুনে খুশি হলাম। বাংলাদেশের কোনো জিনিসটা তোমার কাছে ওয়ান্ডারফুল মনে হয়েছে।পল বলল, তোমাদের বর্ষা।আমি হকচকিয়ে গেলাম।এ বলে কি।আমি আগ্রহ নিয়ে পলের দিকে তাকালাম।পল বলল,বৃষ্টি যে এতো সুন্দর হতে পারে এদেশে আসার আগে আমি বুঝতে পারিনি।বৃষ্টি মনে হয় তোমাদের দেশের জন্যই তৈরি করা হয়েছে।

তুমি শুনলে আবাক হবে আমি একবার প্রচণ্ড বৃষ্টির মধ্যে রিকশার হুড ফেলে মতিঝিল থেকে গুলশানে গিয়েছি।আমার রিকশাওয়ালা ভেবেছে আমি পাগল।আমি পলের দিকে ঝুকে এসে বললাম,তোমার কথা শুনে খুব ভালো লাগল।অনেক বিদেশির অনেক সুন্দর কথা আমি শুনেছি কিন্তু তোমার মত সুন্দর কথা আমাকে এর আগে কেউ বলেনি।এতো চমৎকার একটা কথা বলার জন্য  তোমার অপরাধ ক্ষমা করা হল।পল অবাক হয়ে বলল,আমি কি অপরাধ করলাম?

পকেট থেকে কাটা চামচ বের করে অপরাধ করেছ।পল হো হো করে হেসে ফেলল। বিদেশিরা এমন প্রাণখোলা হাসি হাসে না বল্রই আমার ধারণা।পল অরসনের আরো কিছু ব্যাপার আমার পছন্দ হল।যেমন, খাওয়া শেষ হওয়া মাত্র পকেট থেকে সিগারেট প্যাকেট বের করে বলল নাও সিগারেট নাও।বিদেশিরা এখন সিগারেট ছেড়ে দিয়েছে।তারা সিগারেট তৈরি করে গরিব দেশগুলোতে পাঠায়। ভাবটা এইরকম -অন্যর মরুক, আমরা বেঁচে থাকব।তারপরেও কেউ কেউ খায়। তবে তারা কখনো অন্যদের সাধে না।

আমি পলের প্যাকেট থেকে সিগারেট নিলাম। পানের ডালা সাজানো ছিল।পল নিতান্ত পরিচিত ভঙ্গিতে পান মুখে দিয়ে চুন খুঁজতে লাগল।এধরনের সাহেবদের সঙ্গে কিছুক্ষণ গল্প করা যায়।বর্ষা নিয়ে কথা বলা যেতে পারে। তাছাড়া গরম পড়েছে প্রচণ্ড।এই গরমে বৃষ্টির কথা ভাবতেও ভালো লাগে।আমি বললাম,পল,বৃষ্টি তোমার কখন ভালো লাগে?

পল অরসন অবিকল বৃদ্ধ মহিলাদের মত পানের পিক ফেলে হাসিমুখে বলল,সেই একটা ইন্টারেস্টিং ব্যাপার।লন্ডন এয়ারপোর্ট থেকে ঢাকা এসে পৌছেসি দুপুরে।প্লেন থেকে নেমেই দেখি প্রচণ্ড রোদ,প্রচণ্ড গরম। কিছুক্ষণের মধ্যেই গা বেয়ে ঘাম ঝরতে লাগল।আমি ভাবলাম, সর্বনাশ হয়েছে।এই দেশে থাকবো কি করে?বনানীতে আমার জন্য বাসা ঠিক করে রাখা হয়েছিল।

সেখানে এয়ারকুলার আছে বলে আমাকে চিঠি লিখে জানানো হয়েছে।আমি ভেবেছি,কোনোমতে বাসার পৌঁছে এয়ারকুলার ছেড়ে চুপচাপ বসে থাকব।ঘরে কোনো চৌবাচ্চা থাকলে সেখানেও গলা ডুবিয়ে বসে থাকা যায়। বাসায় পৌঁছে দেখি,এয়ারকুলার নষ্ট।সারাই করা জন্য ওয়ার্কশপে দেওয়া হয়েছে। মেজাজ কি সে খারাপ হল বলার না। ছটফট করতে লাগলাম।এক ফোঁটা বাতাস নেই।ফ্যান ছেড়ে দিয়েছি, ফ্যানের বাতাসও গরম।

বিকেলে এক মির‍্যাকল ঘটে গেল।দেখি আকাশে মেঘ জমেছে।ঘন কালো মেঘ।আমার বাবুর্চি ইয়াছিন দাঁত বের করে বলল,কালবৈশাখি কামিং স্যার। ব্যাপার কিছুই বুঝলাম না।মনে হল,আনন্দদায়ক কিছু ঘটতে যাচ্ছে। হটাৎ ঝপ করে গরম কমে গেল।হিম শীতল হাওয়া বইতে  লাগল।শরীর জুড়িয়ে গেল। তারপর নামল বৃষ্টি।প্রচন্ড বর্ষণ।সেই সঙ্গে ঝড়ো হাওয়া।বাবুর্চি ইয়াসিন বলল,স্যার শিল পড়তাছে শিল। বলেই ছাদের দিকে ছুটে গেল।আমিও গেলাম পেছন পেছনে।

ছাদে উঠেই দেখি,চারিদিকে মহাআনন্দময় পরিবেশ।আশে পাশের বাড়ির ছেলে মেয়েরা ছোটাছুটি করে শিল কুড়াচ্ছে।আমি এবং আমার বাবুর্চি দুজনে মিলে এক ব্যাগ শিল কুড়িয়ে ফেললাম।আমি ইয়াসিনকে বললাম,এখন আমরা এগুলো দিয়ে কি করব? ইয়াসিন দাঁত বের করে বলল,ফেলে দিব।আমার ছেলেবেলার কথা মনে পড়ল।প্রথম তুষারপাতের সময় আমরা তুষারের ভেতরে ছুটাছুটি করলাম। তুষার বল বানিয়ে একে অন্যের গায়ে ছুড়ে দিতাম।এখানেও তাই হচ্ছে।সবাই বৃষ্টির পানিতে ভিজে প্রকৃতির সঙ্গে মিশে যাচ্ছে।আমি পলকে থামিয়ে দিয়ে বললাম,

     এসো করি স্নান নবধারা জলে

       এসো নীপবনে ছায়াবীথি তলে।

পল বলল,তুমি কি বললে? রবীন্দ্রনাথের গানের দুটি লাইন বললাম।তিনি সবাইকে আহ্বান করেছেন -বর্ষার প্রথম জলে স্নান করার জন্য।বল কি। তিনি সবাইকে বৃষ্টির পানিতে ভিজতে বলেছেন? হ্যাঁ।তিনি আর কি বলেছেন? আরো অনেক কিছু বলেছেন।তার কাব্যের একটা বড় অংশ জুড়ে রয়েছে বর্ষা।বল কি?

শুধু তার না,এদেশে যত কবি জন্মেছেন তাদের তাদের কাব্যের বড় একটা অংশ জুড়ে আছে বর্ষা।পল খুব আগ্রহ নিয়ে বলল,বর্ষা নিয়ে এ পর্যন্ত সবচেয়ে সুন্দর কবিতাটি আমাকে বল তো,প্লিজ।আমি তৎক্ষণাৎ বললাম,

বৃষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর নদেয় এলো বান

এই এক লাইন?

হ্যাঁ এক লাইন।

এর ইংরেজি কি?

এর ইংরেজি হয় না।

ইংরেজি হবেনা কেন?

আক্ষরিক অনুবাদ হয়।তবে তার থেকে কিছু বুঝা যায় না। আক্ষরিক অনুবাদ হচ্ছে – patter patter rain drops, flood in the river. পল বিস্মত হয়ে বলল,আমার কাছে তো মনে হচ্ছে খুবই সাধারণ একটা লাইন।সাধারন তো বটেই।তবে অন্যরকম সাধারণ।এই একটা লাইন শুনলেই আমাদের মনে তীব্র আনন্দ এবং তীব্র ব্যথাবোধ হয়।কেন হয় তা আমরা নিজেরাও ঠিক জানি না।পল হা করে তাকিয়ে রইল।এক সময় বলল,বর্ষা সম্পর্কে এরকম মজার আর কিছু আছে?

আমি হাসিমুখে বললাম বর্ষার প্রথম মেয়ের ডাকের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের দেশের কিছু মাছের মাথা খারাপের মতো হয়ে যায়।তারা পানি ছেড়ে শুকনায় ওঠে আছে।আশা করি তুমি আমার লেগ পুলিং করছ না।না লেগ পুলিং করছি না।আমাদের দেশে একরকম ফুল আছে যা শুধু বর্ষাকালেই ফুটে।অদ্ভুত ফুল।পৃথিবীর আর কোনো ফুলের সঙ্গে এর মিল নেই।

দেখতে সোনালী একটা টেনিস বলের মতো। যতদিন বর্ষা থাকবে ততদিন এই ফুল থাকবে।বর্ষা শেষ এই ফুলও শেষ।ফুলের নাম কি? কদম।আমি বললাম,এই ফুল সম্পর্কে একটা মজার ব্যাপার হল- বর্ষার প্রথম কদম ফুল যদি কোন প্রেমিক তার প্রেমিকাকে দেয় তাহলে তাদের সম্পর্ক হয় বিষাদমাখা।কাজেই এই ফুল কেউ কাউকে দেয় না।

এটা কি একটা মীথ?

হ্যাঁ মীথ বলতে পারো।

পল তার নোটবই বের করে কদম ফুলের নাম লিখে নিল।আমি সেখানে রবীন্দ্রনাথের গানের চারটি চরণও লিখে দিলাম।

          তুমি যদি দেখা না দাও

           করো আমায় হেলা।

           কেমন করে কাটবে আমার

            এমন বাদল বেলা।

            (If thou showest me not thy face,

             If thou leavest me wholly aside,

               I know not how I am to pass

               These long rainy hours.)

পল অরসনের সঙ্গে আর আমার দেখা হয়নি।তবে ঘোর বর্ষার সময় আমি যখন রাস্তায় থাকি তখন খুব আগ্রহ নিয়ে চারিদিকে তাকাই,যদি রিকশার হুড-ফেলা অবস্থায় ভিজতে ভিজতে কোনো সাহেবকে যেতে দেখা যায়।আমি কি করে এক দানব তৈরী করলাম সেই গল্প আপনাদের বলি। অয়োময়ের পর দুবছর কেটৃ গেছে।হাতে কিছু সময় আছে।ভাবলাম সময়টা কাজে লাগানো যাক।

টিভির বরকত উল্লাহ সাহেব অনেক দিন থেকেই তাকে একটা নাটক দেবার কথা বলছেন।ভাবলাম ছয় সাত এপিসোডের একটা সিরিজ নাটক তাকে দিয়ে আবার শুরু করা যাক।এক সকালবেলা তার সঙ্গে চা খেতে খেতে সব ঠিক করে ফেললাম। নাটক লেখা হবে ভূত প্রেত নিয়ে।নাম ছায়াসঙ্গী। দেখলাম নাটকের বিষয়বস্তু শুনে তিনি তেমন ভরসা পাচ্ছেন না।আমি বললাম ভাই আপনি কিছু ভাববেন না।এই নাটক দিয়ে আমরা লোকজনদের এমন ভয় পাইয়ে দেব যে তারা রাতে বাতি নিভিয়ে ঘুমুতে পারবে না।বরকতউল্লাহ সাহেব বিরস গলায় বললেন, মানুষদের ভয় দেখিয়ে লাভ কি?

অত্যন্ত যুক্তি সংগত প্রশ্ন।যেভাবে তিনি প্রশ্ন করলেন তিতে যে কেউ ঘাবড়ে যাবে।আমি অবশ্য দীর্ঘ বক্তৃতা দিয়ে তাকে বুঝাতে সক্ষম হলাম যে ভয় পাবার মধ্যে ও আনন্দ আছে।কে না জানে সুকুমার কলার মূল ব্যাপারটাই হল অনন্দ।বরকতউল্লাহ সাহেব নিমরাজি হলেন।আমি পরদিনই গা ছমছমানো ভূতের নাটক নিয়ে তার কাছে উপস্থিত।নাটক পড়ে শুনালাম। নিজের নাটক পড়ে আমার নিজেরই গা ছমছম করতে লাগল।বরকতউল্লাহ সাহেব বললেন অসম্ভব।

এই নাটক বানানোর মতো টেকনিক্যাল সাপোর্ট আমাদের নেই।আপনি সহজ কোনো নাটক দিন।আমার মনটা গেল খারাপ হয়ে।আমি বললাম দেখি।দেখাদেখি নেই।আপনাকে আজই নাটকের নাম দিতে হবে।টিভি গাইডে নাম ছাপা হবে।আমি একটা কাগজ টেনে লিখলাম,কোথাও কেউ নেই।বরকত সাহেব বললেন,কোথাও কেউ নেই মানে কি?আমি তো আপনার সামন্রই বসে আছি।

আমি বললাম,এটাই আমার নাটকের নাম।এই নামে আমার একটা উপন্যাস আছে। উপন্যাসটাই আমি নাটকে রুপান্তরিত করে দেব।বরকত সাহেব আতকে উঠে বললেন,না না নতুন কিছু দিন। উপন্যাস তো অনেকের পড়া থাকবে।গল্প আগেই পত্রিকায় ছাপা হয়ে যাবে।আমি বললাম,এটা আমার খুব প্রিয় লেখার একটি।আপনি দেখুন সুবর্ণাকে পাওয়া যায় কি না। সুবর্ণাকে যদি পাওয়া যায় তাহলে কম পরিশ্রমে সুন্দর একটা নাটক দাঁড়া হবে।সুবর্ণাকে যদি না পাওয়া যায় তাহলে কি আপনি নতুন নাটক লিখবেন?

হ্যাঁ লিখবো।সুবর্ণাকে পাওয়া গেল। আসাদুজ্জামান নূর বললেন,তিনি বাকেরের চরিত্রটি করতে চান। বাকেরের চরিত্রটি তাকেই দেওয়া হল। ফ্রাংকেনস্টাইন তৈরির দিকে আমি খানিকটা এগিয়ে গেলাম।বিজ্ঞানী ভিক্টর ফ্রাংকেনস্টাইনের দানোবটা তো মানুষ এক নামে চেনে।বাকের হল সেই ফ্রাংকেনস্টাইন।

নাটকটির সপ্তম পর্ব প্রচারের পর থেকে আমি অদ্ভুত ব্যাপার লক্ষ করলাম।সবাই জানতে চাচ্ছে  বাকেরের ফাঁসি হবে কি না।রোজ গাদা গাদা চিঠি। টেলিফোনের পর টেলিফোন।তুচ্ছ ব্যাপার নিয়ে এই ব্যকুলতার মানে কি? আমি নাটক লিখতে গিয়ে মূল বই অনুসরণ করছি।বই-এ বাকেরের ফাঁসি আছে।নাটকেও তাই হবে।যারা আমাকে চিঠি লিখেছেন তাদের সবাইকেই আমি জানালাম,হ্যাঁ ফাঁসি হবে। আমার কিন্তু বক্তব্য আছে।

বাকেরকে ফাঁসিতে না ঝুলালে সেই বক্তব্য আমি দিতে পারবো না।তাছাড়া আমাকে মূল বই অনুসরণ করতে হবে।এই অধ্যাপিকা আমাকে জানালেন, শেক্সপিয়ারের রোমিও জুলিয়েট বিয়োগান্তক লেখা।কিন্তু যখন রোমিও জুলিয়েট ছবি করা হল তখন নায়ক নায়িকার মিল দেখানো হল।আপনি কেন দেখাবেন না?আপনাকে দেখাতেই হবে।

একি যন্ত্রণা ! তবে এটা যন্ত্রণার শুধু শুরু।তবলার ঠুকঠাক।মূল বাদ্য শুরু হল নবম পর্ব প্রচারের পর।আমি দশ বছর ধরে টিভিতে নাটক লিখছি এই ব্যাপার আগে দেখিনি।পোষ্টার,মিটিং,মিছিল- হুমায়ূনের চামড়া তুলে নেব আমরা।রাতে ঘুমতে পারি না।দুটা তিনটাই টেলিফোন।কিছু টেলিফোন তো রীতিমতো ভয়াবহ।বাকের ভাইয়ের কিছু হলে রাস্তায় লাশ পড়ে যাবে।আপাত দৃষ্টিতে এইসব কান্ড কারখানা আমার খারাপ লাগার কথা না।বরং ভালো লাগাই স্বাভাবিক।আমার একটি নাটক নিয়ে এতসব হচ্ছে এতে অহংবোধ তৃপ্তি হওয়ারই কথা।

আমার তেমন ভালো লাগল না।আমার মনে হল একটা কিছু ব্যাপার আমি ধরতে পারছি।দর্শক রূপকথা দেখতে চাচ্ছে কেন?তারা কেন তাদের মতামত আমার উপর চাপিয়ে দিতে চাচ্ছে?আমি কি লিখবসবা না লিখব সেটা তো আমি ঠিক করব।অন্য কেউ আমাকে বলৃ দেবৃ কেন? বাকেরের মতো মানুষদের কি ফাঁসি হচ্ছে না? এ দেশে কি সাজানো মামলা হয় না? নিরপরাধ মানুষ কি ফাঁসির দড়িতে ঝুলে না? ঐ তো সেদিনই পত্রিকায় দেখলাম ৯০ বছর পর প্রমাণিত হল লোকটি নির্দোষ।অথচ হত্যার দায়ে ৪০ বছর আগেই তার ফাঁসি হয়ে গেছে।

সাহিত্যের একটি প্রচলিত ধারা আছে যেখানে সত্যের জয় দেখানো হয়। অত্যাচারী মোড়ল শেষ পর্যায়ে এসে মৃত্যুবরণ করেন জাগ্রত জনতার কাছে।বাস্তব কিন্তু সেরকম নয়। বাস্তবে অধিকাংশ মোড়লরা মৃত্যুবরণ করেন না।বরং বেশ সুখে শান্তিতেই থাকেন।৭১-এর রাজাকাররা এখন কি খুব খারাপ আছেন?আমার তো মনে হয় না।কুত্তাওয়ালীরা মরেন না,তাদের কেউ মারতে পারে না। ক্ষমতাবান লোকদের নিয়ে তারা মচ্ছব বসায়। দূর থেকে আমাদের তারা নিয়ন্ত্রণ করে।

আমি আমার নাটকে কুত্তাওয়ালির প্রতি ঘৃণা তৈরি করতে চেয়েছি। তৈরি করেছিও। কুত্তিওয়ালীকে মেরে ফেলে কিন্তু সেই ঘৃণা আবারও কমিয়ে দিয়েছি। আমরা হাফ সেড়ে ভেবেছি-যাক দুষ্টু শাস্তি পেয়েছে।কিন্তু কুত্তিওয়ালী যদি বেঁচে থাকতো তাহলে আমাদের ঘৃণা থেমে যেত না।প্রবহমান থাকত। দর্শকরা এক ধরনের চাপ নিয়ে ঘুমতে যেতেন।

আমার মূল উপন্যাসে কুত্তিওয়ালীর মৃত্যু হয়নি, উপন্যাসে হয়েছে।কেন হয়েছে? হয়েছে কারণ মানুষের দাবীর কাছে আমি মাথা নত করেছি। কেনই বা করব না? মানুষই তো সব।তাদের জন্যই তো আমার লেখালেখি।তাদের তীব্র আবেগকে আমি মূল্য দেব না তা তো হয় না।তবে তাদের আবেগকে মূল্য দিতে গিয়ে আমার কষ্ট হয়েছে।কারণ আমি জানি,আমি যা করেছি তা ভুল।আমার লক্ষ্য মানুষের বিবেকের চাপ সৃষ্টি করা।সেই চাপ সৃষ্টি করতে হলে দেখাতে হবে যে কুত্তাওয়ালীর বেচে থাকা।মারা যায় বাকেররা।

যে কারণে নাটকে কুত্তাওয়ালীর বেঁচে থাকা প্রয়োজন ছিল ঠিক সেই কারণেই বাকেরের মৃত্যুর প্রয়োজন ছিল।বাকেরের মৃত্যু না হলে আমি কিছুতেই দেখাতে পারতাম না যে এই সমাজে কত ভয়াবহ অন্যায় হয়।আপনাদের কি মনে আছে যে একজন মানুষ (?) পনেরো বছর জেলে ছিল যার কোনো বিচারই হয়নি। কোর্টে তার মামলাই ওঠেনি।ভিন দেশের কোনো কথা না। আমাদের দেশেরই কথা।ভয়াবহ অন্যায়গুলো আমরাই করি। আমাদের মতো মানুষরাই করে এবং করায়।কিছু কিছু মামলায় দেখা গেছে পুলিশ অন্যায় করে, পোস্টমর্টেম যে ডাক্তার করেন তিনি অন্যায় করেন, ধুরন্ধর উকিল করেন।রহিমের গামছা চলে যায় করিমের কাঁধে।

পত্রিকায় দেখলাম,১৮০ জন আইনজীবী আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন আমি নাকি এই নাটকে খারাপ উকিল দেখিয়ে তাদের মর্যাদাহানি করেছি।আমি ক্ষমা প্রার্থনা না করলে তারা আদালতের আশ্রয় নেবেন।উকিল সাহেবদের অতি বিনয়ের সঙ্গে বলছি,এই নাটকে একজন অসম্ভব ভালো উকিলও ছিলেন।মুনার উকিল। যিনি প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে গেছেন সত্যি প্রতিষ্ঠার।একশত আশি জন আইনজীবী নিজেদেরকে সেই উকিলের সঙ্গে সম্পর্কিত না করে বদ উকিলের সঙ্গে করলেন কেন?

আমাদের সমাজে কি কুত্তাওয়ালীর উকিলের মত উকিল নেই?এমন আইনজীবী কি একজনও নেই যারা দিনকে রাত করার চেষ্টা চালাচ্ছেন না? মিথ্যা সাক্ষী কি আইনজীবীদেরই কেউ কেউ তৈরী করে দেন না?যদি না দেন,তা হলে বিচারের বানী নিরবে নিভৃতে কেন কাঁদে?

অতি অল্পতেই দেখা যাচ্ছে সবার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হচ্ছে।আমরা কি করি না করি তাতে কিছু যায় আসে না।আমাদের ভাবমূর্তি বজায় থাকলেই হল। হায়রে ভাবমূর্তি ! আমি মনে হয় মূল প্রসঙ্গ থেকে সরে যাচ্ছি।মূল প্রসঙ্গে ফিরে আসি।নাটকটির শেষ পর্যায়ে আমি টেলিভিশন কর্তৃপক্ষের কাছে একটি আবেদন করলাম।শেষ পর্বের জন্য আমি দুই ঘন্টা সময় চাইলাম।আমার পরিকল্পনা ছিল প্রথম এক ঘন্টায় শুধু কোর্ট দেখাব,পরের এক ঘন্টা যাবে বাকি নাটক। কোর্ট দৃশ্যের পর পনেরো দিন অপেক্ষা করা দর্শকদের জন্য কষ্টকর,নাটকের জন্যও শুভ নয়।

যে টেনশন কোর্ট দৃশ্য শুরু হবে,পনেরো দিনের বিরতিতে তা নিচে নেমে যাবে। টেনশন তৈরি করতে হবে আবার গোড়া থেকে।আমার বিশ্বাস ছিল টেলিভিশন আমার যুক্তি মেনে নিবে।অতীতে আমার ‘অয়োময়’ নাটকের শেষ পর্বের জন্য দুঘন্টা সময় দেওয়া হয়েছিল।তাছাড়া আমার সবসময় মনে হয়েছে,টেলিভিশানের উপর আমার খানিকটা দাবী আছে।গত দশ বছরে টিভির জন্য তো কম সময় দেই নি।

আবেদনে লাভ হলো না।টিভি জানিয়ে দিল-এই নাটকের জন্য বাড়তি সময় দেওয়া হবে না। দর্শকদের জন্য টিভি,টিভির জন্য দর্শক নয়-এই কথাটা টিভির কর্তাব্যক্তিরা কবে বুঝবেন কে জানে।আমি ৭০ মিনিটে গল্পের শেষ অংশ বলার প্রস্তুতি নিলাম।কোর্টের দৃশ্য, কুত্তাওয়ালীর হত্যার দৃশ্য,বাকেরের ফাঁসি সব এর মধ্যেই দেখাতে হবে।শুধু দেখালেই হবে না-সুন্দর করে দেখাতে হবে।দর্শকদের মনে জাগিয়ে তুলতে হবে গভীর বেদনাবোধ।

 

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *