আমিন মন খারাপ করে জুমার নামাজ পড়তে গেলেন। তার মন খারাপের প্রধান কারণ কুমিল্লার রসমালাই, দ্বিতীয় কারণ সামিনা বাসায় নেই। কোথায় গেছে তাও কাউকে বলে যায়নি। রুস্তম খেতে বসে দেখবে তার বোন নেই। বেচারার মনটা নিশ্চয়ই খারাপ হবে। রুস্তম নিঃশব্দে দুলাভাইয়ের সঙ্গে দুপুরের খাবার খেল। তার পছন্দের সব আইটেমই ছিল। যেমন–তেলচুপচুপ ইলিশ মাছের ভাজি, কচুর লতি দিয়ে চিংড়ি মাছ, ছোট মাছের টক, টাকি মাছ দিয়ে মাষকলাইয়ের ডাল।
মাষকলাইয়ের ডালের আইটেমটা আমিন নিজের হাতে বেঁধেছেন। আমিন বললেন, সবচেয়ে ভালো আইটেম কোনটা হয়েছে? রুস্তম বলল, আপনি যেটা বেঁধেছেন সেটা।আমি কোনটা বেঁধেছি? মাষকলাইয়ের ডাল।আমিন বিস্মিত হয়ে বললেন, বুঝলে কী করে?
রুস্তম জবাব দিল না। আমিন রুস্তমের এই বিষয়টা জানেন। রুস্তম কিছু কিছু বিষয় না জেনেই বলতে পারে। তিনি যখন হংকং শু প্যালেস কিনে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন, সেদিনই রুস্তমকে বললেন, একটা নতুন ব্যবসা শুরু করতে যাচ্ছি। কেমন হবে বুঝতে পারছি না।
রুস্তম বলল, এই ব্যবসা ভালো হবে।আমিন বললেন, কী ব্যবসা বলো তো? জুতার ব্যবসা।বুঝলে কিভাবে? মনে হয়েছে। তুমি তো দিন দিন পীর-ফকিরের পর্যায়ে চলে যাচ্ছ। তোমার কথাবার্তায় মাঝে মধ্যে এমন অবাক হই।
খাওয়া শেষ হওয়ার আগেই হাফিজ মিয়া রসমালাই এবং টকদই নিয়ে উপস্থিত হলো। রাস্তায় বাস এক্সিডেন্টের কারণে চার ঘণ্টা রোড ব্লক ছিল বলে দেরি হয়েছে।আমিন অত্যন্ত আনন্দিত। রসমালাই শেষ পর্যন্ত এসে পৌঁছেছে। তিনি রুস্তমের বাটিতে রসমালাই এবং দই দিতে দিতে বললেন, তোমার বুবু থাকলে ভালো হতো। কোথায় যেন গেছে। বলেও যায়নি। মোবাইল টেলিফোন করছি, ধরছে না।
রুস্তম স্বাভাবিক গলায় বলল, বুবু পালিয়ে গেছে। আর ফিরবে না।আমিন হতভম্ব গলায় বললেন, তুমি কী বললে? রুস্তম বলল, আপনার গায়ে ঘামের গন্ধ। বুবুর পছন্দ না। অনেকে থাকে এ রকম। তারা দুর্গন্ধ সহ্য করতে পারে না।আমার গায়ে দুর্গন্ধ? আমি পাই না, বুবু পায়। তার নাক অনেক সেনসেটিভ।তুমি কি এইসব অনুমানে বলছ, নাকি জেনে বলছ?
জেনে বলছি। আমাকে টেলিফোনে সব বলেছে।সে এখন আছে কোথায়? রুস্তম হাই তুলতে তুলতে বলল, আপনি যার কাছ থেকে হংকং শু প্যালেস কিনেছেন, বুবু আছে তার সঙ্গে। আফতাব চৌধুরী। দুলাভাই, একটা পান খাব। ঘরে পান আছে? পান খাবে? হুঁ।পান তো থাকার কথা। তোমার বুবু মাঝে মধ্যে পান খেত। দাঁড়াও দেখি।
আমিন পানের সন্ধানে গেলেন না। বসে রইলেন। রুস্তম বলল, আপনার মন কি বেশি খারাপ হয়েছে? হুঁ। আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, আফতাব চৌধুরীকে খুন করাব। ভাড়াটে খুনি লাগবে।দোষটা তো বুবুর। খুন করাতে চাইলে বুবুকে খুন করান। আপনার সন্ধানে কি ভাড়াটে খুনি আছে? না।আমার সন্ধানে আছে। আপনি চাইলে তাকে আপনার কাছে পাঠাতে পারি।তোমার সন্ধানে ভাড়াটে খুনি আছে?
বাবার পার্টনার গোলাম মওলা আংকেলের কাছে আছে। উনি মাঝে মধ্যে আমার সঙ্গে টেলিফোনে যোগাযোগ করেন। তাকে ভাড়াটে খুনির কথা বললে উনি ব্যবস্থা করে দেবেন।আমিন কিছু বললেন না। ঝিম ধরে রইলেন। রুস্তম আবারও বলল, দুলাভাই পান খাব।আমিন মনে হলো শুনতে পাননি। তিনি ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, তোমার স্ত্রীর সঙ্গে কি তোমার দেখা হয়? না। সে তো এখন আমার স্ত্রী না। তাকে স্ত্রী বলা উচিত না।তোমার ছেলে কত বড় হয়েছে তুমি জানো? না।
তোমার স্ত্রী এবং ছেলের সঙ্গে একবার আমার দেখা হয়েছিল। নিউমার্কেটে। তোমার স্ত্রী এমন ভাব করল যেন আমাকে চেনে না। স্ত্রী জাতিকে কোনো বিশ্বাস নাই। এটা মনে রাখবে।জি আচ্ছা, মনে রাখব।খনার বচনে নারী সম্পর্কে অনেক খারাপ খারাপ কথা বলা হয়েছে। খনা মেয়েমানুষ হয়েও বলে গেছেন।একটা বলুন শুনি।এখন মনে পড়ছে না। মনে হলে বলব।জি আচ্ছা।
তোমার ছেলের চেহারা তোমার মতোই হয়েছে। চোখে চশমা। এই বয়সে চোখ নষ্ট করে বসে আছে।দুলাভাই, আমার ছেলের প্রসঙ্গটা থাকুক। ডাক্তার আমাকে বলেছেন, আমি যেন সবসময় আনন্দে থাকি।চারদিকে নিরানন্দ, এর মধ্যে আনন্দে থাকা সম্ভব? তোমার এই ডাক্তার কিছু জানে না। ডাক্তার বদলাতে হবে।দুলাভাই! আপনার মন কি বেশি খারাপ? হ্যাঁ।সাইকেলে চড়বেন? সাইকেলে চড়লে মন ভালো হবে।কে বলেছে? তোমার ডাক্তার?
না। এটা আমি বের করেছি। সাইকেলে চড়লে কেন মন ভালো হয় ব্যাখ্যা করব?ব্যাখ্যা লাগবে না।বুবু আপনার জন্য একটা চিঠি লিখে রেখেছে।কোথায় রেখেছে? আমার কাছে রেখে গেছে।কী লিখেছে চিঠিতে? আমি পড়ি নাই। স্ত্রী চিঠি লিখেছে স্বামীকে, সেই চিঠি পড়া উচিত না।চিঠি সঙ্গে করে এনেছ? জি।আমিন চিঠি পড়লেন। তার মুখ অন্ধকার হয়ে গেল। নিঃশ্বাসেও সামান্য কষ্ট শুরু হলো। চিঠিটা এ রকম—
এই শোনো, তোমার কাছে লেখা এটা আমার প্রথম চিঠি এবং শেষ চিঠি। যেসব স্বামী-স্ত্রী চব্বিশ ঘণ্টা একসঙ্গে থাকে তারা চিঠি চালাচালি করে না।এখন আমি তোমাকে ল্যাং মেরে চলে গেছি, কাজেই দুএকটা চিঠি লেখা যেতে পারে। ল্যাং শব্দটা খুবই খারাপ শোনাচ্ছে। এই মুহূর্তে অন্য কোনো শব্দ মাথায় আসছে না। ল্যাং-এর বদলে ইংরেজি Kick ব্যবহার করা যেত। এটা ল্যাংয়ের চেয়েও খারাপ।
ল্যাং শব্দ ব্যবহারের জন্য সরি।তোমাকে ছেড়ে আসার সাতটা কারণ আমি বের করেছি। প্রধান কারণ তোমার গায়ে পাঠার মতো বোটকা গন্ধ।অন্য কারণগুলো বলছি—
১. ঘুমালেই নাক ডাকো, মনে হয় প্রেসার কুকার চলছে।
২. তুমি সবার সামনে নির্বিকার ভঙ্গিতে নাকের লোম ছিড়।
৩. বাথরুম করে ফ্ল্যাশ টানতে বেশিরভাগ সময় ভুলে যাও।
৪. নিজের ব্যবসা ছাড়া অন্য কোনো বিষয়ে তোমার আগ্রহ নেই।
৫. ঘুমানোর সময় তুমি হাঁ করে ঘুমাও।
৬. বাড়িতে যতক্ষণ থাকো, খালি গায়ে থাকো…।
৭. তুমি প্রথম শ্রেণীর নির্বোধ।
আমিন চিঠি পড়ার মাঝখানে বললেন, তোমার বুবুর মাথা খারাপ হয়ে গেছে। নয় বৎসর সে আমার গায়ে কোনো গন্ধ পেল না। এখন একেবারে পাঁঠার গন্ধ?রুস্তম বলল, গন্ধটা হয়তো আস্তে আস্তে ডেভেলপ করেছে।আমিন বললেন, পাঁঠার গন্ধ তোমার বোন চেনে? জীবনে কখনো পাঠা দেখেছে? দুলাভাই আপনি রেগে যাচ্ছেন। আপনাকে কখনো রাগতে দেখি না তো এই জন্যে অবাক লাগছে।
আগে গায়ে পাঁঠার গন্ধ ছিল না বলে রাগ করতাম না। এখন পাঁঠার গন্ধ কাজেই রাগ করছি।কিছুক্ষণ মুখ থেকে জিভ বের করে বসে থাকুন। দেখবেন রাগ কমে গেছে।কে বলেছে? আমার আর্ট টিচার। উনি প্রায়ই জিভ বের করে বসে থাকেন। মুখ থেকে জিভ বের করলে আমাদের মধ্যে কুকুর ভাব চলে আসে তখন রাগ পড়ে যায়।
আমিন বিরক্ত গলায় বললেন, উদ্ভট কর্মকাণ্ড তোমার আর্ট টিচার করুক। আমি করব না।রুস্তম বলল, একটা এক্সপেরিমেন্ট করায় তো দোষ নাই। মুখ থেকে কিছুক্ষণের জন্যে জিভ বের করা।আমিন জিভ বের করলেন। অদ্ভুত কাণ্ড। সঙ্গে সঙ্গেই তাঁর রাগ কমে গেল।দুলাভাই! রাগ কমেছে? হুঁ।
রুস্তম বলল, আমাকে খুব শিগগিরই একবার ডাক্তারের কাছে যাওয়া দরকার। কবে নিয়ে যাবেন? নতুন কোনো সমস্যা? রুস্তম বলল, আমার কবিতার বইয়ের প্রচ্ছদ নিয়ে সামান্য সমস্যা হচ্ছে। প্রচ্ছদে ছিল সাইকেলের চাকায় একটা পাখি বসে আছে। কয়েক দিন হলো দেখছি পাখিটা চায়ের কাপের উপর বসে আছে।বলো কি?
কবিতার বইটা আপনার কাছে আছে, নিয়ে আসুন না।আমিন চিন্তিত মুখে কবিতার বইয়ের সন্ধানে গেলেন।বই পাওয়া গেল। পাখিটা সাইকেলের চাকার উপরেই আছে। চা খেতে নিচে নামেনি। রুস্তম বই হাতে নিয়ে বলল, দুলাভাই দেখনু চায়ের কাপে বসে আছে।
আমিন ছোট্ট করে নিঃশ্বাস ফেললেন। রুস্তমের মাথা দ্রুত এলোমেলো হচ্ছে। আটকানোর বুদ্ধি কি কে জানে। তার ধারণা রুস্তমের ডাক্তার অবস্থাটা আরো খারাপ করে দিচ্ছে।রুস্তম বলল, দুলাভাই এটা কি পাখি? আমিন বললেন, জানি না। আমি পাখি চিনি না। ঢাকা শহরে যারা বাস করে তারা কাক ছাড়া আর কিছু চিনে না।
রুস্তম বলল, আমার ধারণা এটা ডাহুক পাখি। ডাহুক পাখি মারা গেলে কি করে জানেন? না।পা দুটা আকাশের দিকে তুলে রাখে।কেন? মৃত্যুর আগে আগে ডাহুক পাখি মনে করে আকাশ ভেঙে তার উপর পড়ছে। তখন সে দু পায়ে আকাশ আটকাতে চায়।
আমিন বললেন, এইসব কি তুমি নিজে নিজে বানাচ্ছ? রুস্তম হাসল। তার হাসি সুন্দর। দেখতে ভালো লাগে।দুলাভাই।বলো।আমার বইটার প্রচ্ছদ যে এঁকেছে তার সঙ্গে একটু দেখা করা দরকার।কেন? তাকে জিজ্ঞাস করতাম উনি কি পাখি এঁকেছেন।এর কি দরকার আছে? অবশ্যই দরকার আছে।
বাংলাবাজার চলে যাও। বই হাতে নিয়ে যাও। প্রেসের ঠিকানা দেয়া আছে। তুমি পান খেতে চেয়েছিলে। পান খুঁজে পেলাম না। দোকান থেকে একটা পান কিনে নিও।জি আচ্ছা।রুস্তমের কবিতার বইয়ের প্রচ্ছদ যিনি করেছেন তিনি বিরাট মাওলানা। চাপদাড়ি, চোখে সুরমা। বাংলাদেশের মাওলানারা মাথায় পাগড়ি কমই পরেন। ইনার মাথায় সবুজ রঙের পাগড়ি। মাওলানার নাম হাজি আসমত উল্লাহ।
রুস্তম বলল, মওলানা সাহেব এটা কি পাখি? হাজি আসমত উল্লাহ বললেন, মনের ধ্যান থেকে এঁকেছি জনাব। কি পাখি বলতে পারব না। তবে পাখি আঁকা ঠিক হয় নাই। গুনাহর কাজ হয়েছে? কেন? পশু পাখি মানুষ আঁকা নিষিদ্ধ। এদের জীবন দেয়া যায় না বলেই নিষিদ্ধ। আমি একটা পাপ কাজ করে ফেলে গুনাগার হয়েছি।আপনার আঁকা ছবি খুব সুন্দর হয়েছে। আমি একটা উপন্যাস লিখব বলে ঠিক করেছি। সেটার প্রচ্ছদও আপনি করবেন।
আল্লাহপাকের হুকুম হলে আমাকে করতেই হবে। উনার হুকুমের বাইরে যাওয়ার আমার উপায় নাই।সবকিছুতেই তাঁর হুকুম লাগবে? জি জনাব। এই যে আপনি নিঃশ্বাস নিচ্ছেন ফেলছেন তাও উনার হুকুমে চলছে। মনে করেন আপনি নিঃশ্বাস নিলেন তখনই আল্লাহপাক নিঃশ্বাস ফেলার হুকুম বন্ধ করলেন, আপনি আর নিঃশ্বাস ফেলতে পারবেন না। জনাব চা খাবেন? খাব।
একটু বসেন। আমি জোহরের নামাজ আদায় করে নিজের হাতে আপনাকে চা বানায়ে দেব। আল্লাহপাকের হুকুমে আমি খুব ভালো চা বানাতে পারি।গোলাম মওলা এসেছেন রুস্তমের কাছে। গোলাম মওলা রুস্তমের প্রাক্তন শ্বশুর। তাঁর কন্যা দিনার সঙ্গে রুস্তমের বিয়ে হয়েছিল। বিয়ে তিন বছর টিকেছিল।
গোলাম মওলা সাদা লুঙ্গির ওপর পাঞ্জাবি পরেছেন। গায়ে তসরের চাদর। কিছুদিন আগেও তার গালভর্তি দাড়ি ছিল, এখন নেই। মাথার চুলে মেন্দি দিয়েছেন। চুল টকটকে লাল। গোলাম মওলা জর্দা দিয়ে পান চিবুচ্ছেন বলে ঘরময় জর্দার গন্ধ। গন্ধটা কড়া না মিষ্টি। তিনি বসেছেন দোতলার বারান্দায়। তার কোলের কাছে বাঁকানো বেতের লাঠি। রুস্তম লাঠিটার দিকে তাকিয়ে আছে। তার কেন জানি মনে হচ্ছে, উনি লাঠিটা মেঝেতে ছেড়ে দিলেই এটা একটা সাপ হয়ে যাবে। রুস্তমের খানিকটা ভয় ভয়ও লাগছে।
রুস্তম ভালো আছ? জি।প্রায়ই তোমার কথা মনে হয়। আসা হয় না। আজ ঠিক করে রেখেছি। যত কাজই থাকুক তোমার এখানে একবার আসব।লাঠিটা কোত্থেকে কিনেছেন? ইন্দোনেশিয়ার বালিতে গিয়েছিলাম, সেখান থেকে কিনেছি। দিনা কিনে দিয়েছে। লাঠিটা কি তোমার পছন্দ হচ্ছে? জি।রেখে দাও।রুস্তম আগ্রহ করে লাঠি নিয়ে নিজের ঘরে ঢুকল। খাটের সঙ্গে লাঠি দাঁড়া করিয়ে ফিরে এলো।গোলাম মওলা বললেন, তোমার চিকিৎসা ঠিকমতো চলছে তো? জি চলছে।
চিকিৎসায় অবহেলা করবে না। রোজ খানিকক্ষণ হাঁটবে। যে কোনো রোগের জন্য হাঁটা এবং ঘুমানো হলো মহৌষধ। আমি এই বয়সেও ঘড়ি ধরে পঁয়তাল্লিশ মিনিট হাঁটি। ডাক্তার আধঘণ্টা হাঁটতে বলেছিলেন, আমি পনের মিনিট বেশি হাঁটি।রুস্তম বলল, অধিকন্ত ন দোষায়।কী বললে? বললাম, অধিকন্তু ন দোষায়, অর্থাৎ বেশিতে দোষ হয় না।এটা কোন ভাষা? সংস্কৃত।তুমি সংস্কৃত জানো নাকি? জি না। কিছু শ্লোক জানি।
গোলাম মওলা বললেন, তোমাদের বাড়ির ছাদ তো অনেক বড়, ছাদে নিয়ম করে হাঁটবে। সম্ভব হলে রোজ কালিজিরার ভর্তা খাবে। নবি-একরিম বলেছেন কালিজিরা মৃত্যু রোগ ছাড়া অন্য সব রোগের মহৌষধ জি আচ্ছা।এই বাড়ি নিয়ে তোমার সুঙ্গে আমার কিছু কথা আছে। গুরুত্বপূর্ণ কথা। আজই বলব নাকি অন্য একদিন আসব? আজই বলুন।
ব্যবসায় তোমার বাবা ছিলেন, আমার পার্টনার। সমান সমান পার্টনার। ধানমণ্ডির এই বাড়ির সন্ধান আমি তোমার বাবাকে দেই। বাড়ির মালিক থাকত অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে। হুন্ডির মাধ্যমে তাকে টাকা পাঠাই। তোমার বাবার হাতে তখন টাকা ছিল না, পুরো টাকাটা আমি দেই। এরপর আমি একটা পুলিশি ঝামেলায় পড়ি। দুই মাসের জন্য ইন্ডিয়া চলে যাই। ঝামেলা মেটার পর ফিরে এসে দেখি তোমার বাবা এই বাড়ি তোমার নামে কিনেছে। নামজারি পর্যন্ত করিয়ে ফেলেছে। তুমি কি আমার কথা মন দিয়ে শুনছ? জি আংকেল।তুমি তো অন্যদিকে তাকিয়ে আছ।আমি খুব মন দিয়ে যখন কথা শুনি তখন অন্যদিকে তাকিয়ে থাকি।
এটা জানতাম না। যাই হোক, শোনো, তোমার বাবা ভেবেছিল বাকি জীবন আমি ইন্ডিয়াতেই থাকব। দেশে ফিরতে পারব না। আমাকে ফিরে আসতে দেখে তার টনক নড়ল। একটা ফয়সালা হলো–বাড়ি সিক্সটি ফোর্টি মালিকানা হবে। সিক্সটি আমার ফোর্টি তোমার বাবার। তখন তোমার মা খুন হলেন। তোমার বাবা চলে গেলেন পুলিশ কাস্টডিতে। কথা কী বলছি মন দিয়ে শুনছ তো? জি।এই বাড়ি কেনার ইতিহাস নিয়ে তোমার বাবা কি কখনো তোমার সঙ্গে আলোচনা করেছে? জি না।আমার বিষয়ে কিছু বলেছে? আপনার কাছ থেকে একশ হাত দূরে থাকতে বলেছে।বলো কী?
আর বলেছেন, আপনার অবস্থান ইবলিশ শয়তানের তিন ধাপ নিচে।তোমাকে ঠাট্টা করে বলেছে, তুমি বোঝো নাই। তুমি তো আবার ঠাট্টাতামাশা বোঝে না। যাই হোক, এখন বললা বাড়ি নিয়ে তুমি কি আমার সঙ্গে ফয়সালায় আসবে? সিক্সটি মালিকানা আমাকে বুঝিয়ে দিবে?জি আচ্ছা।কী বললা?বললাম জি আচ্ছা।তাহলে আমি কি উকিলের সঙ্গে পরামর্শ করব কিভাবে কাজটা করা যায়?
পরামর্শ করুন।তোমার মনে আবার এমন সন্দেহ হচ্ছে না তো যে, আমি ভুলিয়েভালিয়ে তোমার বাড়ি নিয়ে নিচ্ছি? জি না।বরং একটা কাজ করি, ফিফটি-ফিফটিতে যাই। ঠিক আছে? জি ঠিক আছে।তোমার সঙ্গে কথা বলে আমি খুবই আনন্দ পেলাম। উকিলের সঙ্গে পরামর্শ করে আমি শিগগিরই একদিন আসব। এখন বলো তোমার কিছু লাগবে? একজন ভাড়াটে খুনি লাগবে।কী লাগবে?
একজন ভাড়াটে খুনি, যে টাকার বিনিময়ে খুন করবে।তোমার ভাড়াটে খুনি লাগবে? এইসব কী বলছ? আমার লাগবে না। দুলাভাইয়ের লাগবে। দুলাভাই একজনকে খুন করাবেন।কাকে খুন করাবে? আফতাব চৌধুরী নামের একজনকে। বুবু তার সঙ্গে পালিয়ে গেছে।কবে? গত শুক্রবারে।
বলো কী, সামিনা এই কাজ করেছে। ভাড়াটে খুনি-ফুনি এইসব ফালতু কথা। কাউন্সেলিং করে সব ঠিক করে ফেলব। তুমি তোমার দুলাভাই এবং সামিনার টেলিফোন নাম্বার দাও। আমি কথা বলব।তাদের টেলিফোন নাম্বার তো আমার কাছে নাই। তারা যখন টেলিফোন করে তখনি আমি কথা বলি।তোমার দুলাভাইয়ের বাসার ঠিকানা দাও।ঠিকানা তো জানি না। বাসা চিনি। কলাবাগানে বাসা।
আচ্ছা ঠিক আছে তোমাকে কিছুই দিতে হবে না। আমি বের করে ফেলব। তাহলে তোমার সঙ্গে এই কথা রইল–একজন উকিলের সঙ্গে পরামর্শ করে তাকে সঙ্গে করে তোমার কাছে আসব।জি আচ্ছা। একটা বই নিয়ে যান। আপনি আমাকে লাঠি দিয়েছেন। লাঠির বদলে বই।কী বই।
কবিতার বই। আমি একটা কবিতার বই লিখেছি, নাম রু আদের সাইকেল। রু আদের সাইকেল জিনিসটা কী? কবিতার বইয়ের নাম।আচ্ছা দাও তোমার কবিতার বই। যাওয়ার আগে একটা কথা বলে যাই, তোমার সঙ্গে যেসব বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছি, তা গোপন রাখবে।জি আচ্ছা।
Read more
