একটি সাইকেল এবং কয়েকটি ডাহুক পাখি-পর্ব-৩-হুমায়ুন আহমেদ

একটি সাইকেল এবং কয়েকটি ডাহুক পাখি

আমাদের উচিত সর্ববিষয়ে গোপনীয়তা রক্ষা করা। আল্লাহপাক নিজেও গোপনীয়তা পছন্দ করেন বলেই তার সবকিছুই বাতেনি। বাতেনি কি জানো? না।বাতেনি হলো গুপ্ত। আচ্ছা উঠি। লাঠিটা কি সত্যি তোমার পছন্দ হয়েছে? বয়সের কারণে আমি এখন লাঠি ছাড়া চলাফেরা করতে পারি না। তাছাড়া লাঠিটা আমার মেয়ে দিনা পছন্দ করে কিনেছে। আমি তার উপহার অন্যকে দিয়ে দিয়েছি জানলে মনে কষ্ট পাবে।

দিনা কি আপনার সঙ্গে থাকে? না। সে আলাদা থাকে। তার বাড়িতে যখন-তখন যাওয়াও যায় না। আর গেলেও সে তার ছেলেকে আমার সামনে আনে না।আনে না কেন? জানি না কেন। জিজ্ঞেস করি নাই। লাঠিটা নিয়ে আসো।লাঠিটা আমার পছন্দ হয়েছে।পছন্দ হলে আর কথা নাই। আচ্ছা শোনো, আমি যদি আগামীকাল সন্ধ্যায় উকিল নিয়ে আসি তোমার অসুবিধা হবে? না।আগামীকাল আসতে পারব মনে হচ্ছে না। অন্য অ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে, দেখি যত তাড়াতাড়ি পারি আসব।জি আচ্ছা।সামিনা তার স্বামীকে ছেড়ে চলে গেল কেন?

সাতটা কারণ আছে আংকেল। দুলাভাই সাতের ঝামেলায় পড়েছেন। দুলাভাইয়ের গায়ে পাঁঠার মতো দুর্গন্ধ, দুলাভাই হাঁ করে ঘুমান, সবের সামনে নাকের লোম ছিঁড়েন, বাথরুমে ফ্ল্যাশ টানেন না… বাদ দাও, এইসব শুনতে ভালো লাগছে না।গোলাম মওলা লাঠি ছাড়াই রওনা হলেন।রাত দশটা। রুস্তম ইজিচেয়ারে বসে আছে, তার কোলে মোটা বাঁধানো খাতা। উপন্যাসটা আজ শুরু করবে কি না তা নিয়ে গত চল্লিশ মিনিট ধরে চিন্তা করছে। একটা প্যারা লিখে ফেলা উচিত। সে চোখ বন্ধ করে উপন্যাসের প্রথম প্যারা মনে মনে সাজাল।

এক শ্রাবণ মাসের দুপুরে শলারাম বাথরুমে হুমড়ি খেয়ে পড়ল। বাড়িতে কেউ ছিল না। তার স্ত্রী সীতা গাউছিয়াতে সবুজ কাচের চুড়ি কিনতে গিয়েছিল। তার সব রঙের চুড়ি আছে কিন্তু সবুজ রঙের চুড়ি নাই। গাউছিয়ার এক চুড়ির দোকানে সে সবুজ চুড়ির অর্ডার দিয়ে রেখেছিল। দোকানদার বলেছে, আপা মঙ্গলবারে এসে নিয়ে যাবেন। আজ মঙ্গলবার।

আঠারটা সবুজ চুড়ি কিনে সীতা বাড়ি ফিরে দেখল স্বামী মৃত। এইসব ক্ষেত্রে স্ত্রীরা হাউমাউ করে কাঁদে। সীতা কাঁদল না। কারণ তার কান্না শোনার মতো ঘরে কেউ নাই। মেয়েরা একা একা কাঁদতে পারে না। সে তার আত্মীয়স্বজনদের খবর দিল। আত্মীয়স্বজন আসা, শুরু হওয়ার পরপর গলা ছেড়ে কাঁদতে বসল।

ডেডবডি রাতেই শ্মশানে দাহ করা হবে। মুখাগ্নি করবে শলারামের ছেলে প্রণব।প্রণব ক্লাস সিক্সে পড়ে। সে গিয়েছিল নারায়ণগঞ্জ তার জেঠির বাড়িতে। তাকে গাড়ি পাঠিয়ে আনা হলো। তাকে বলা হলো না যে তার বাবা মারা গেছেন। প্রণব ঘরে ঢুকেই বলল, বাবা! শলারাম বলল, কী? তোমার চোখ বন্ধ কেন? শলারাম বলল, আমি মারা গেছি এই জন্যে চোখ বন্ধ।

প্রণব বাবার চোখের পাতা খুলে বলল, তুমি কি দেখতে পাচ্ছ? শলারাম বলল, পাচ্ছি। ছায়া ছায়াভাবে দেখছি। মনে হচ্ছে সব ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট।চিন্তার এই পর্যায়ে মুনিয়া দরজা ধরে দাঁড়াল এবং মিষ্টি গলায় বলল, স্যার কিছু লাগবে? রুস্তম মুনিয়ার দিকে তাকিয়ে খানিকটা হকচকিয়ে গেল। মুনিয়া কালো রঙের গাউনের মতো একটা রাতপোশাক পরেছে। পোশাক পলিথিনের মতো স্বচ্ছ। মুনিয়ার নাভির ডান দিকের লাল তিলটা পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে।

রুস্তম চট করে চোখ ফিরিয়ে নিল। অস্বস্তির কারণে সে মুনিয়ার নাম ভুলে গেল। সে বিড়বিড় করে বলল, ময়ূরী। কিছু লাগবে না।স্যার আমার নাম মুনিয়া।ও আচ্ছা মুনিয়া। সরি নামটা ভুলে গেছি।আমাকে ময়ূরী ডাকতে যদি আপনার ভালো লাগে তাহলে ময়ূরী ডাকবেন। আমার কোনো সমস্যা নেই।আচ্ছা।

বিছানার চাদরটা কি পাল্টে দিব? না না চাদর পাল্টাতে হবে না।আপনার কাছে একটা কমপ্লেইন আছে। বলব? বলো।আপনার সামনে বসে বলি? সামনে আসতে হবে না, যেখানে আছ সেখান থেকে বলো।আপনার যে আর্টের টিচার, উনি আমাকে কুপ্রস্তাব দিয়েছেন। বলেছেন, এক ঘণ্টা করে নেংটো হয়ে তার সামনে বসে থাকতে। তিনি ছবি আঁকবেন। ঘণ্টায় পাঁচশ টাকা দিবেন।

রুস্তম বলল, এটা কোনো কুপ্রস্তাব না। আর্টিস্টরা ছবি আঁকার জন্য মডেল ব্যবহার করে।মুনিয়া বলল, আপনি যদি মডেল হতে বলতেন সেটা ভিন্ন কথা। চিনি জানি না তার সামনে নেংটো হয়ে বসে থাকব? তাকে না করে দাও।জি আচ্ছা। স্যার আমি কি চলে যাব? হ্যাঁ। গুড নাইট।চা-কফি কিছু খাবেন? না।স্যার আপনি কি কোনো কারণে আমার ওপর নারাজ? নারাজ হবো কেন?

আমার মধ্যে কোনো দোষ-ত্রুটি দেখলে নিজের মুখে বলবেন। আমি শোধরাব।আচ্ছা।আর এখন থেকে আপনি আমাকে ময়ূরী নামে ডাকবেন। অন্য কোনো নামে ডাকলে আমি রাগ করব। সবাই ডাকরে মুনিয়া শুধু আপনি ডাকবেন ময়ূরী।এখন যাও তো।ধমক দিচ্ছেন কেন স্যার? মিষ্টি করে বলুন, ময়ূরী এখন যাও।রুস্তম হতাশ গলায় বলল, ময়ূরী এখন যাও!

স্যার, আমি আমার ঘরের দরজা সবসময় খোলা রাখি। কোনো কিছুর দরকার হলে চলে আসবেন। দরজায় টোকা দিয়ে ঢুকবেন স্যার। আমার শোয়া খুব খারাপ। কাপড়-চোপড় ঠিক থাকে না। এই জন্যে বললাম।বলে ভালো করেছ। মুনিয়া এখন যাও। আমি জরুরি একটা কাজ করছি।মুনিয়া বলবেন না স্যার। আমি ময়ূরী।ময়ূরী এখন যাও। প্লিজ।মুনিয়ার ওপর খানিকটা মেজাজ খারাপ করে রুস্তম ঘুমুতে গেল। মেজাজ খারাপের একমাত্র কারণ উপন্যাসের শুরুটা সে এলোমলো করে দিয়েছে। আবার নতুন করে মাথায় গোছাতে হবে।

নতুন করে শুরু করা একদিক দিয়ে ভালো। কিছু কারেকশন করা হবে। বাথরুমে একা মরে পড়ে থাকাটা ভালো লাগছে না। মৃত্যু অনেকের সামনে হওয়া ভালো। ছুটির দিনে বাসার সবাই আছে। প্রণব তার বাবাকে গল্প শোনাচ্ছে, এই সময় হঠাৎ মাথা এলিয়ে শলারাম পড়ে গেল। শলারাম নামটাও এখন পছন্দ হচ্ছে না। প্রণব এবং সীতার সঙ্গে শলারাম যাচ্ছে না। এমন কোনো নাম খুঁজে বের করতে হবে যার অর্থ মৃত্যু। তার নাম প্রণাশ রাখা যেতে পারে। প্রণাশ শব্দের অর্থও মৃত্যু, বিনাশ। প্রণাশ চট্টোপাধ্যায়ের ছেলে প্রণব চট্টোপাধ্যায়। স্ত্রীর নাম সীতা।

বালিশের কাছে রাখা টেলিফোন বাজছে। রুস্তম টেলিফোন ধরে বলল, হ্যালো।ওপাশ থেকে নারী কণ্ঠ বলল, তোর খবর কী? রুস্তম টেলিফোনে গলা চিনতে পারে না। টেলিফোনে তার কাছে সব মেয়ের গলা একরকম মনে হয় আবার সব ছেলের গলা একরকম মনে হয়। রুস্তম বলল, কে?আরে গাধা, আমি তোর বুবু।বুবু কেমন আছ? ভালো। তুই কি ঘুমিয়ে পড়েছিলি? প্রায়।মাত্র এগারোটা বাজে এর মধ্যেই ঘুম? শরীর ভালো তো? হুঁ।তোর দুলাভাইয়ের সঙ্গে আমার বিষয়ে কোনো কথা হয়েছে? না।আমি চলে যাওয়াতে সে কী পরিমাণ আপসেটঃ

বুঝতে পারছি না। তবে আফতাব চৌধুরীর উপর দুলাভাই মনে হয় রাগ করেছেন। আমাকে বলেছেন ভাড়াটে গুণ্ডা দিয়ে খুন করাবেন।সিরিয়াসলি বলেছে? হুঁ।ওর পক্ষে অসম্ভব কিছু না।বুবু আমি রাখি। ঘুমে চোখ বন্ধ হয়ে আসছে।ইন্টারেস্টিং একটা কথা বলে টেলিফোন রাখ। হুট করে টেলিফোন রেখে দেওয়া ঠিক না।তুমি বলো, আমার ইন্টারেস্টিং কিছু মনে আসছে না। বুবু একটা মিনিট ধরো, আমি লাঠিটা সরিয়ে আসি।কী লাঠি?

আমার বিছানার কাছে একটা বেতের লাঠি। এখন মনে হচ্ছে লাঠিটা আমার দিকে তাকিয়ে আছে। ভয় ভয় লাগছে।লাঠি তাকিয়ে থাকবে কিভাবে? লাঠির কি চোখ আছে? তা জানি না, কিন্তু মনে হচ্ছে তাকিয়ে আছে।ডাক্তারের দেওয়া ওষুধগুলি কি তুই নিয়মিত খাচ্ছিস? খাচ্ছি।তুই এক কাজ কর। আমি সিঙ্গাপুরে যাচ্ছি। আমার সঙ্গে চল। মাউন্ট এলিজাবেথে বড় ডাক্তার দেখাবি।

বুবু আমি লাঠিটা সরিয়ে তারপর কথা বলব। সাবধানে সরাতে হবে। হাত ফসকে লাঠি যদি মেঝেতে পড়ে তাহলে সেটা সাপ হয়ে যাবে।Oh God. এইসব কী কথাবার্তা! লাঠি মেঝেতে পড়লে সাপ হবে pa? মুসা আলায়েস সালামের লাঠি মেঝেতে পড়লে সাপ হয়ে যেত।তুই কি মুসা আলায়েস সালাম? তা না, তারপরেও কিছু বলা যায় না।

রুস্তম টেলিফোন রেখে লাঠি সরাতে গেল। ফিরে এসে টেলিফোন ধরল না। সামিনা অনেকক্ষণ হ্যালো হ্যালো করে লাইন কেটে দিল।কড়া ঘুমের ওষুধ খায় বলেই বিছানায় যাওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই রুস্তম ঘুমিয়ে পড়ে। আজ ঘুম আসছে না। সাপের ভয়ের কারণেই মনে হয় ঘুম কেটে গেছে। লাঠিটা সে নিজে কাবার্ডে দাঁড় করিয়ে রেখেছে। পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা নেই। যদি পড়েও যায় কাবার্ড থেকে বের হতে পারবে না। তারপরেও ভয় যাচ্ছে না। কেন কে জানে!

রুস্তম উঠে বসল। বিছানার পাশের লাইট জ্বালাল। হাতের কাছে বেশ কিছু বই সাজানো। বেশিরভাগই ডিকশনারি। তার ডাক্তার বলেছেন, ঘুমের ওষুধ খাওয়ার পরেও যদি ঘুম না নাসে তাহলে চোখের পাতা না ফেলে ডিকশনারি পড়বেন। চোখ ক্লান্ত হবে। ঘুম আসবে। রুস্তম ডিকশনারি খুলল, সাপের প্রতিশব্দ বের করে মুখস্থ করে ফেলাটা একটা কাজের কাজ হবে। একজন লেখকের শব্দভাণ্ডার ভালো হতে হয়।

সাপ, সর্প, অহি, ভুজঙ্গ, ফণী, নাগ, ভুজগ, ভুজঙ্গম, আশীবিষ, উরগ, চক্রী, কুণ্ডলী, বিষধর, অকর্ণ, পল্লগ, কাকাদর, দ্বিরসন, দ্বিজিন, ফণধর, ফলাকার, ফণভুৎ, ফণাভুৎ, বিলশয়, ছকশ্রুতি, বিলেশয়, কাদ্রবেয়, পবনাশন, পবনাশ, উরঞ্চম, ব্যাল, কষ্ণুকী, উরঙ্গ, ভেকভুজ, কম্ভীস্ম, সর্পী, নাগিনী, সর্পিনী, ভুজঙ্গী, ভুজঙ্গিনী, ভুজগী, অহীরণি…

সাপের প্রতিশব্দ একচল্লিশটা পাওয়া গেল। একচল্লিশটা প্রতিশব্দ মুখস্থ করতে করতে রাত চারটা বেজে গেল। এখন ঘুমের চেষ্টা করেও লাভ নেই। রুস্তম বিছানা থেকে নেমে হাত-মুখ ধুয়ে ছাদে হাঁটতে গেল। গোলাম মওলা সাহেব তাকে ছাদে হাঁটতে বলেছেন। হাঁটা এবং ঘুম শরীরের জন্য মহৌষধ। এক ওষুধ কাজে লাগানো গেল না। এখন দ্বিতীয় ওষুধে যদি কিছু হয়। রুস্তম সূর্য না ওঠা পর্যন্ত ছাদে হটল। সাপের প্রতিশব্দ মনে করতে করতে হাঁটা। সাপ, সর্প, অহি, ভুজঙ্গ, ফণী, নাগ, ভুজগ, ভুজঙ্গম…

নাস্তার টেবিলে আর্ট টিচার হোসেন মিয়া উপস্থিত হলো। বিস্মিত গলায় বলল, আপনার চোখ টকটকে লাল। ঘুম হয়নি? রুস্তম বলল, না। ভয়ে ঘুমাতে পারিনি।কিসের ভয়? অহীরণির ভয়।অহীরণি কী বস্তু? সাপকে বলে অহীরণি।সাপকে অহীরণি বলে এই প্রথম শুনলাম। সাপকে সর্প বলে, ভুজঙ্গ বলে, অহীরণি তো কেউ বলে না।অহীরণি হলো সাপের প্রতিশব্দ। সাপের একচল্লিশটা প্রতিশব্দ আছে। 

না, না। একচল্লিশটা প্রতিশব্দ শোনার কোনো প্রয়োজন নাই। সাপের মতো একটা তুচ্ছ প্রাণীর একচল্লিশটা প্রতিশব্দ থাকারও প্রয়োজন নাই। সাপ এবং সর্প দুটাই যথেষ্ট। গত রাতে আপনি যেমন ঘুমাতে পারেন নাই, আমিও পারি নাই। আপনাকে সাপ ডিসটার্ব করেছে আমাকে মুনিয়া মেয়েটা ডিসটার্ব করেছে। ঘটনা শুনবেন?

রুস্তম হা-না কিছু বলল না, নাস্তা খাওয়া শুরু করল। এই বাড়িতে ত্রিশ দিন একই নাস্তা–চালের আটার রুটি, সবজি, একটা ডিম পোচ।হোসেন মিয়া বলল, রাত এগারোটার দিকে ঘুমাতে গেছি, দরজায় টোকা। দরজা খুলে দেখি মুনিয়া। একটা নাইট ড্রেস পরে এসেছে। এই ড্রেস থাকা না থাকা সমান। মুনিয়া বলল, সে মডেল হতে রাজি আছে। এক ঘণ্টা সময় দিবে।আমি বললাম, মুনিয়া আমি দুপুররাতে কাজ করব না। সানলাইটে কাজ করব। সকাল এগারোটার দিকে আসো।

মুনিয়া বলল, আপনি আমাকে মুনিয়া ডাকবেন না। স্যার আমার নতুন নাম দিয়েছেন। ময়ূরী। এখন থেকে ময়ূরী ডাকবেন। একটি সাইকেল।আমি বললাম, ঠিক আছে ময়ূরী ডাকব। এখন যাও, আমি সব রেডি করে রাখব। ঠিক এগারোটা থেকে বারোটা এই এক ঘণ্টা আমার সেশন। সাজগোজ কিছু করবে না, নো লিপস্টিক, নো মেকাপ।

মুনিয়া বলল, পাঁচশ টাকায় হবে না। ঘণ্টায় দুহাজার দিবেন।চিন্তা করেছেন অবস্থা! ঘণ্টায় দুই হাজার চায়। মেয়েটা কে বলুন তো? জানি না কে? কারোর আত্মীয় হবে।খোঁজ নেবেন। আমার তো তাকে ডেনজারাস মেয়ে বলে মনে হচ্ছে। কোনো একদিন সবাই ঘুমিয়ে থাকব, সে সবার গলা কেটে জিনিসপত্র নিয়ে চলে যাবে।

আমি খোঁজ নেব।হোসেন মিয়া বলল, আমি তাকে লাস্ট অফার দিয়েছি পার আওয়ার ওয়ান থাউজেন্ড। সে বলেছে চিন্তা করে দেখবে। যদি পুষে তাহলে আসবে। এখানে পুষপুষির কী তাই বুঝলাম না। চেয়ারে এক ঘণ্টা বসে এক হাজার টাকা নট এ মেটার অব জোক।

সকাল সাড়ে দশটা।হোসেন মিয়া ক্যানভাস গ্লসো দিয়ে রেডি করেছে। চারকোলের পেনসিল কেটে অপেক্ষা করছে। ঘরের আলোর ব্যাপারটা ঠিক করেছে। লাইটের সোর্স পূর্বদিকের জানালা। যে চেয়ারে মুনিয়া বসবে, সেটা রাখা হয়েছে জানালার পাশে। আলো এবং জানালার শিকের ছায়া পড়বে মুনিয়ার গায়ে। লাইট অ্যান্ড শেডের একটা খেলা। এক ঘণ্টায় লাইট অ্যান্ড শেডের অবস্থান বদলাবে। সূর্য তার এক্সিসে আরও ধীরগতিতে ঘুরলে আর্টিস্টদের সুবিধা হতো।

ঠিক এগারোটায় মুনিয়া উপস্থিত হলো। হোসেন মিয়া বলল, দেরি করবে না। কাঠের চেয়ারে বসো। তোমার সামনে আমি একটা লাল বল ঝুলিয়ে দিয়েছি। তুমি তাকিয়ে থাকবে লাল বলটার দিকে।মুনিয়া বলল, কাঠের চেয়ারে আমি বসব না। গদিওয়ালা চেয়ার ছাড়া আমি বসতে পারি না।চেয়ারের ওপর কুশন দিয়ে দিচ্ছি, কুশনে বসো।আজ বসব না।আজ সমস্যা কী?

আজ সোমবার। সোমবার আমার জন্যে অশুভ। এক পামিস্ট আমার হাত দেখে বলেছেন, সোমবার আর বুধবার অশুভ। আপনি যে লাল বল ঝুলিয়েছেন, ওই বলের দিকে আমি তাকিয়ে থাকতে পারব না। লাল রঙও আমার জন্যে অশুভ এই জন্যে। আপনি অন্য কালারের বল ঝুলাবেন। নীল হলে ভালো হয়। নীল রঙ আমার জন্য শুভ। আচ্ছা যাই।

মুনিয়া চলে গেল। হোসেন মিয়া বিড়বিড় করে যেসব কথা বলল তা লেখা যাবে না। পাঠকদের রুচিতে আঘাত করা হবে। পাঠকরা এ ধরনের কথা সবসময় শোনেন, কিন্তু লিখিত ভাষ্য পছন্দ করেন না।রুস্তম মুনিয়া মেয়েটির বিষয়ে খোঁজখবর করল। কেউ কিছু বলতে পারল না। বাবুর্চি মরিয়ম ঝাঁঝালো গলায় বলল, আমি এরে চিনব ক্যামনে? এ আমার কোনো আত্মীয় না, স্বজন না, আমার গেরামেরও না। আমার কথা যদি বিশ্বাস না হয়, পাক কোরান আনেন। পাক কোরানে হাত দিয়া বলব। আমার অজু আছে।

মরিয়মের স্বভাব হচ্ছে, যে কোনো কথাই পাক কোরানে হাত দিয়ে বলতে চায় এবং সবসময় তার অজু থাকে। একবার গ্যাস লিক করে রান্নাঘর ভর্তি হয়ে গেল মিথেন গ্যাসে। মরিয়মকে জিজ্ঞেস করায় সে বলল, আমি নিজের হাতে গ্যাসের চুলা বন্ধ করছি। বন্ধ কইরাও আমার শান্তি হয় নাই। দুইবার চেক করছি। যদি আমার কথা বিশ্বাস না হয় পাক কোরান আনেন। পাক কোরানে হাত দিয়া বলব। আমার অজু আছে।ড্রাইভার এবং ড্রাইভারের সঙ্গী চশমাপরা ফুলবাবুও বলল, এই মেয়ে তাদের কেউ না।

চণ্ডিবাবু বললেন, মেয়ের নাম মুনিয়া। মুসলমান কন্যা। এর বেশি কিছু জানি না। তবে মেয়ের স্বভাব-চরিত্র ভালো। আমারে দাদু ডাকে। একদিন মাথায় তিলের তেল মালিশ করে দিয়েছে। এমন আরামের মালিশ। মালিশের মাঝখানে দ্ৰিায় চলে গেছিলাম।বাড়ির দারোয়ান বলল, সে এই মেয়ে বিষয়ে কিছু জানে না। তার বাড়ি খুলনার বাগেরহাটে। এই তথ্য নাকি মেয়ে তাকে দিয়েছে।

একটা মেয়েকে কেউ চিনে না। অথচ চার-পাঁচ মাস ধরে সে এই বাড়িতে আছে। বিস্ময়কর ঘটনা। রুস্তমের উচিত এক্ষুনি তাকে ডেকে জিজ্ঞেস করা। রুস্তম ঠিক করল তাড়াহুড়ার কিছু নাই। রাতে মুনিয়া এসে জিজ্ঞেস করবে, স্যার কিছু লাগবে? তখন জিজ্ঞেস করলেই হবে।

রুস্তমের মোবাইল ফোন অনেকক্ষণ ধরে বাজছে। নিতান্ত অনিচ্ছায় সে টেলিফোন ধরল। টেলিফোন করেছেন তার দুলাভাই। তিনি কাঁদো কাঁদো গলায় বললেন, ঘটনা কিছু শুনেছ? তোমার বোন শুধু যে চলে গেছে মার্চ মাসের সতেরো তারিখে সাজ্জাদ আলী জেলার সাহেবকে একটি আবেদনপত্র পাঠান। ওই তারিখে তাঁর স্ত্রী খুন হয়েছিলেন। চিঠির বিষয়বস্তু ঘুরেফিরে একই, বিচার পুনর্বিবেচনার আবেদন। একটি আবেদনপত্রের নমুনা–

মাননীয় জেলার

ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার

ঢাকা

জনাব,

আজ আমার জন্য গভীর শোকের একটি দিন। প্রাণাধিক প্রিয় আত্মীয়র মৃত্যুদিবস। এই উপলক্ষে আমি নিজে রোজা আছি। জেলের মসজিদের ইমাম সাহেবকে বলেছি বাদ আসর মিলাদের আয়োজন করার জন্য।

অদৃষ্টের নির্মম পরিহাস, স্ত্রীকে খুনের দায়ে আজ আমি যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত। ফাসি হয়ে যাওয়াও বিচিত্র কিছু ছিল না। ফাসি হয়ে গেলে আপনাকে আমি আর এই পত্র দেওয়ার সুযোগ পেতাম না। ফাসি হয়ে যাওয়া একদিক থেকে ভালো ছিল। তিলে তিলে মৃত্যু না হয়ে একবারই শেষ।

জনাব, ওই দিনের ঘটনা আপনাকে বলতে চাই। ধানমণ্ডির আমার বাড়িটি দ্বিতল। কাজের মেয়ে, ড্রাইভার, মালী–এদের কারোরই দোতলায় ওঠার হুকুম নাই। ওই রাতে ঝুম বৃষ্টি হচ্ছিল। বৃষ্টির রাতে সবাই আরামে গভীর নিদ্রায় মগ্ন। শুধু সালমার মা এবং তার কন্যা সালমা জাগ্রত। এটা কি বিশ্বাসযোগ্য? জনাবের বাড়িতে নিশ্চয় কাজের বুয়া আছে। জনাব কি লক্ষ করেছেন সুযোগ পেলেই এরা নিদ্রায় চলে যায়।এখন মূল বিষয় বলি, যেখানে দোতলায় ওঠারই হুকুম নাই, সেখানে গভীর রাতে মাতা-কন্যা দোতলায় আসে কেন? দোতলায় তাদের কী প্রয়োজন, এই কথা কেন কারোর মনে আসে না?

জনাব, আমার স্ত্রীর মতো বলশালী এবং স্বাস্থ্যবতী মহিলা দুর্লভ। চট্টগ্রামে প্রতি বছর বলীখেলা হয়। মেয়েদের মধ্যে বলীখেলার প্রচলন থাকলে আমার স্ত্রী প্রতি বছর চ্যাম্পিয়ন হতো। এমন একজন কুস্তিগির টাইপ মহিলাকে আমার মতো দুবলা-পাতলা একজন গলা টিপে মারবে এবং সিলিং ফ্যানে দড়ি ঝুলায়ে তাকে ঝুলাবে, এটা কি বিশ্বাসযোগ্য? জনাব, আমি আল্লাহপাকের পবিত্র নামে শপথ করে বলছি, ফায়ার ব্রিগেডের ক্রেন ছাড়া ওই মহিলাকে ঝুলানো সম্ভব না। এখন আপনি বলুন আমার পক্ষে কি ফায়ার ব্রিগেড খবর দিয়ে আনা সম্ভব?…

চার পাতার দীর্ঘ চিঠি। চিঠির শেষে মামলা পুনর্বিবেচনার আকুল আবেদন।আজ মার্চের সতেরো তারিখ। সময় রাত দশটা। আজও ঝুম বৃষ্টি হচ্ছে। রুস্তম তার উপন্যাস নিয়ে বসেছে। উপন্যাসের প্রথম দুটি লাইন লেখা হয়েছে।প্রণাশ বাবু নিউমার্কেট কাঁচাবাজার থেকে একটা মাঝারি সাইজের ইলিশ এবং আধা কেজি রাই সরিষা কিনে বাড়ি ফিরলেন। আজ তাঁর সরষে ইলিশ খেতে ইচ্ছা করছে।মোবাইল ফোন একটু পরপর বাজছে। রুস্তম টেলিফোন কানে নিয়ে বলল, কে?আমি।আমিটা কে? তুই আমার গলা চিনতে পারিস না? আশ্চর্য কথা! আমি সামিনা।বুবু তুমি কোথায়?

আমি সিঙ্গাপুরে। মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে একটা ফুল চেকআপ করিয়ে মালয়েশিয়া বেড়াতে যাব। জাহাজে করে যাব। জাহাজে ক্যাসিনো আছে, অনেক দিন পর জুয়া খেলব।বুবু, আমি একটা জরুরি কাজ করছি।আমিও একটা জরুরি কাজেই টেলিফোন করেছি। আজ কত তারিখ জানিস? না।

আজ মার্চের সতেরো। মায়ের মৃত্যুদিন। আমিও তোর মতো ভুলে গিয়েছিলাম। হঠাৎ মনে হয়ে মনটা খারাপ হয়ে গেল। ভাবলাম তোকে টেলিফোন করি।ও আচ্ছা।আমরা সবাই ভুলে গেলেও তোর দুলাভাইয়ের কিন্তু সবসময় মনে থাকে। ওইদিন সে ফকির খাওয়ায়। মিলাদের আয়োজন করে। এইবার করেছে কি না কে জানে! মনে হয় না করেছে। প্রতিবার এইসব করত আমাকে খুশি করার জন্য। এখন তো আর আমাকে খুশি করার কিছু নাই।

সব বার যখন করে, তখন এইবারও নিশ্চয়ই করবে। মানুষ কোনো কিছুতে অভ্যস্ত হয়ে গেলে তার বাইরে যেতে পারে না।তুই কি তোর দুলাভাইকে একটা টেলিফোন করে আমাকে জানাবি? আমি টেলিফোন ধরে থাকলাম। বুবু, দুলাভাইয়ের নাম্বার আমার কাছে নেই। কারও নাম্বারই নেই। কেউ টেলিফোন করলেই শুধু আমি কথা বলি। নিজ থেকে কাউকে টেলিফোন করি না।আমি নাম্বার বলছি। তুমি কাগজে লেখ।বুবু, আমি জরুরি কাজ করছি। এখন টেলিফোন করতে পারব না। দুলাভাইয়ের সঙ্গে দেখা হলে আমি তার কাছ থেকে জেনে রাখব।

 

Read more

একটি সাইকেল এবং কয়েকটি ডাহুক পাখি-পর্ব-৪-হুমায়ুন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *