এপিটাফ পর্ব:১৪ হুমায়ূন আহমেদ

এপিটাফ পর্ব:১৪

বেশিরভাগ মানুষের স্বভাব হচ্ছে বিড়ালের মতো। তারা সুখের সময় পাশে থাকে। দুঃখ-কষ্ট যখন আসে তখন দুঃখ কষ্টের ভাগ নিতে হবে এই ভয়ে চুপি চুপি সরে পড়ে। তাদের কোনো দোষ নেই– আল্লাহ মানুষকে এমন করেই তৈরি করেছেন।তারপরেও কিছু কিছু মানুষ আছে যারা দুঃখ-কষ্টের সময় পাশে এসে দাঁড়ায়। দুঃখ-কষ্টের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার মতো বড় কোনো অস্ত্র তাদের হাতে থাকে না তাদের থাকে শুধু হৃদয়পূর্ণ ভালোবাসা।তুমি আমার চরম দুঃখের এবং চরম কষ্টের সময়ে আমার পাশে দাঁড়ালে। যেন আমি নাতাশা নামের কোনো মেয়ে না– আমি তোমার ফুলি।

আমার প্রচণ্ড মাথাব্যথার সময় তুমি সব কাজ ফেলে ছুটে এসে যখন দুহাতে আমাকে কোলে তুলে নিতে তখন তোমার মুখটা আমার মার মুখের মতো হয়ে যেত। আমার মা’র গা থেকে যেমন গন্ধ বের হয় তোমার গা থেকেও তখন ঠিক সেই রকম গন্ধ বের হতো। এটা একটা আশ্চর্য ব্যাপার।ফুলির মা বুয়া, আমি তোমার কথা মনে রাখব। যে কদিন বাঁচব মনে রাখব। আমার এই মনে রাখা-না-রাখায় কিছু যায় আসে না। কিন্তু এর বেশি তো আমার কিছু করার নেই।

ভালোবাসা ডাবল করে ফেরত দিতে হয়। তোমার ভালোবাসা আমি ডাবল করে ফেরত দিতে পারব না। এত ভালোবাসা আমার নেই। কিন্তু আমি নিশ্চিত, পৃথিবীর মানুষ আমার হয়ে তোমাকে তোমার ভালোবাসা ডাবল করে ফেরত দেবে।মৃত্যুর পর আমি তোমার মেয়েকে খুঁজে বের করব। তাকে বলব তোমার মা একজন অসাধারণ মহিলা ছিলেন। এই পৃথিবী তাঁর মতো ভালো মহিলা খুব কম তৈরি করেছে। ফুলি এই কথা শুনে নিশ্চয়ই খুব খুশি হবে।

তাহলে আজ যাই ফুলির মা বুয়া।

যাই কেমন?

ইতি—

তোমার আদরের

টিয়া পাখি নাতাশা।

প্রিয় নানিজান,

আসসালামু আলাইকুম।

দেখলেন নানিজান, আপনার কথা আমি ভুলি নি। অনেক দিন আগে আপনাকে একটা চিঠি লিখেছিলাম। আপনি বলেছেন আমাদের ‘নাতু’ এত গুছিয়ে চিঠি লিখে, শুধু একটাই ত্রুটি– চিঠির শুরুতে আসোলামু আলাইকুম লেখে না।এবার আপনি আর সেটা বলতে পারবেন না। নানিজান, আমার অসুখের পর আপনি শুধু দুবার আমাকে দেখতে এসেছেন। এই দুবারই যে আমার কী ভালো লেগেছিল! আপনি যে কত ভালো তা আপনি নিজে কি জানেন নানিজান? যেই আপনার কাছে আসে তারই মন ভালো হয়ে যায়।আপনি হাসতে হাসতে গল্প করেন। কুট কুট করে পান খান। সামান্য কথায় হেসে ভেঙে পড়েন।

তখন ঠোঁট বেয়ে লাল পানের পিক গড়িয়ে পড়ে। দেখতে কী যে সুন্দর লাগে।আমরা বইপত্রে সবসময় পড়ি মানুষ সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব। সেই শ্রেষ্ঠ যে আসলে কী তা আপনাকে না দেখলে বোঝা যাবে না। আমাদের বাংলা রচনা ক্লাসে একবার রচনা লিখতে দেয়া হলো তোমার জীবনের আদর্শ মানব। কেউ লিখল মহাত্মা গান্ধী, কেউ লিখল শেখ মুজিবুর রহমান। একজন লিখল, ফ্লোরেন্স নাইটিংগেল, একজন লিখল মাদার তেরেসা। শুধু আমি লিখলাম—- আমার নানিজান।বাংলা আপা আমার সেই রচনা ক্লাসে সবাইকে পড়ে শুনালেন। তারপর বললেন, নাতাশা, তোমার নানিজান সারাক্ষণ শুধু হাসেন এইজন্যেই কি তিনি তোমার জীবনের আদর্শ মানব?

আমি বললাম, চরম দুঃখেও তিনি হাসেন।বাংলা আপা বললেন, তোমার রচনা খুব সুন্দর হয়েছে। দশের ভেতর আমি তোমাকে সাড়ে ছয় দিলাম, কিন্তু নাতাশা, একটা কথা মনে রাখবে- আদর্শ মানব তিনিই হবেন যিনি তার কর্ম নিজের এবং নিজের সংসারের বাইরে ছড়িয়ে দেবেন। বিরাট একটা মানবগোষ্ঠী যাতে উপকৃত হবে। তোমার নানিজান কি এমন কিছু করেছেন যাতে বিরাট মানবগোষ্ঠী উপকৃত হয়েছে?জি-না।এইখানেই সমস্যা, বুঝলে নাতাশা। তোমার রচনা পড়ে আমি নিশ্চিত তোমার নানিজান অসাধারণ একজন মহিলা। তাঁকে আমার দেখতেও ইচ্ছা করছে। কিন্তু তিনি তাঁর অসাধারণত্ব বাইরে ছড়িয়ে দিতে পারেন নি। নিজের সংসারের ক্ষুদ্র গণ্ডিতে আটকে রেখেছেন। কাজেই তাকে তুমি আদর্শ মানুষ হিসেবে নিও না।

আমি বললাম, জি আচ্ছা।বাংলা আপা বললেন, তোমার নানিজানকে বাদ দিয়ে তোমার জীবনে আদর্শ মানব কে এখন বলল দেখি।আমি অনেক ভাবলাম, তারপরেও মনে হলো– নানিজান। অবশ্যি আপাকে বললাম– বেগম রোকেয়া আপা একটু লজ্জা পেলেন কারণ তাঁর নামও রোকেয়া।আমি জানি, আপনি আমার চিঠি পড়ে লজ্জা পাচ্ছেন। আপনার প্রশংসা করে কেউ কিছু বললেই আপনি লজ্জা পান। এবং আপনি যখন ভালো কিছু করেন এমনভাবে করেন যে কেউ বুঝতে পারে না ভালো কাজের পেছনের মানুষটা আপনি।নানাভাই একটা স্কুলে এক লক্ষ টাকা দিয়েছেন। আমার তখনি সন্দেহ হলো এর পেছনে আছেন আপনি। নানাভাই একদিন আমাকে দেখতে এলেন, আমি জিজ্ঞেস করলাম, এতগুলি টাকা হঠাৎ স্কুলে দিলেন কেন নানাভাই?

তিনি বিরক্ত মুখে বললেন, আরে তোর নানিজান একদিন ভোরবেলা আমাকে বলে সে আমার বাবাকে স্বপ্নে দেখেছে। তিনি বলছেন– বৌমা, দীর্ঘদিন আমি এই স্কুলে শিক্ষকতা করেছি। আজ স্কুলের ভগ্নদশা দেখে আমার মনটা খারাপ হয়েছে। তুমি স্কুলের সাহায্যের একটা ব্যবস্থা কর।তখন টাকাটা দিলেন? আরে না। তোর নানিজানের যা স্বভাব, রোজ কানের কাছে ঘ্যান ঘ্যান ঘ্যান ঘ্যানে জীবন অতিষ্ঠ। টাকাটা দিয়ে ঘ্যানঘ্যানানির হাত থেকে বেঁচেছি।তখন আমার মনে হলো স্বপ্নের ব্যাপারটাও আপনি বানিয়ে বলেছেন।

আপনি কোনো স্বপ্ন-টপ্ন দেখেন নি। আপনার স্কুলে সাহায্য করার ইচ্ছা হয়েছে, তাই মিথ্যা একটা গল্প বলে নানাভাইয়ের হাত থেকে টাকা বের করেছেন।নানিজান, আমি যখন আমার সন্দেহের কথা আপনাকে বললাম- তখন আপনি হাসতে হাসতে বিছানায় প্রায় গড়িয়ে পড়ে যেতে যেতে বললেন, আল্লাহপাক তোকে এত বুদ্ধি কেন দিল রে নাতু? নানিজান, আপনার সব কথার মধ্যে শুধু আল্লাহপাক। সুন্দর একটা ফুল দেখেও আপনি বলেন- আহা রে আল্লাহপাক কী সুন্দর করেই না ফুলটা বানিয়েছে! শুধু তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছা করে।

নানিজান, আপনার মতো আল্লাহ-ভক্ত মানুষ বাংলাদেশে নিশ্চয়ই আরো অনেক আছে, কিন্তু আপনার মতো এত সুন্দর করে আল্লাহর কথা আর কেউ বলে, তা আমার মনে হয় না। শেষবার যখন আপনি আমাকে দেখতে এলেন, তখন আপনাকে আমি একটা কঠিন প্রশ্ন করেছিলাম। আমি ভেবেছিলাম, আপনি সেই প্রশ্নের জবাব দিতে পারবেন না। কিন্তু আপনি হাসিমুখে জবাব দিলেন। আমি বললাম, আচ্ছা নানিজান, আমার এই কঠিন অসুখটা কি আল্লাহ দিয়েছেন? কেন দিলেন? আমি তো কোনো অন্যায় করি নি। কোনো পাপ করি নি। তিনি কেন আমাকে শাস্তি দিচ্ছেন? আর শাস্তি তো তিনি শুধু আমাকে দিচ্ছেন না, আমার সঙ্গে মা-বাবাকেও শাস্তি দিচ্ছেন এমনকি আপনি শাস্তি পাচ্ছেন। কেন?

আপনি তখন আমার গায়ে হাত বুলাতে বুলাতে বললেন, কঠিন যে পাপী তাকে শাস্তি দিতেও আল্লাহপাক দ্বিধাবোধ করেন। তিনি নিজে সুন্দর। যা কিছু তিনি সৃষ্টি করেন তাও সুন্দর। রোগব্যাধি অসুন্দর। আমার মনে হয় না– এই রোগ এই ব্যাধি তার তৈরি। তিনি প্রকৃতি সৃষ্টি করেছেন। তাকে আপন মনে চলতে দিয়েছেন। রোগব্যাধি জন্মেছে। তিনি সেখানে হাত দেন নি। সবকিছুকেই তিনি তাঁর মতো চলতে দিয়েছেন। তাঁর সৃষ্ট জীবন যখন রোগব্যাধিতে কষ্ট পায় তখন তিনিও কষ্ট পান।সেই কষ্ট তিনি দূর করেন না কেন?

দূর করবেন না কেন– করেন। সেই জন্যেই তো চিকিৎসার ব্যবস্থা আছে। তবে হুট করে তিনি কিছু করেন না। তাতে জগতের নিয়ম ভঙ্গ করা হয়। জগতের আইনকানুনগুলিও তাঁর সৃষ্টি, কিন্তু তিনি তা ভাঙেন না। আইন ভাঙা মানেই অরাজক অবস্থা সৃষ্টি করা। সৃষ্টিকর্তা তা হতে দিতে পারেন না।তবে ইচ্ছা করলে তিনি পারেন। তাই না নানিজান? অবশ্যই পারেন। পারেন বলেই তো আমরা সবসময় তার কাছে প্রার্থনা করি। মানুষ যখন মহাবিপদে পড়ে, যখন চরম দুঃসময়ের মুখোমুখি হয়, তখন তারা আল্লাহর উপর রাগ করে। তাদের দুঃখকষ্টের জন্যে আল্লাহকে দায়ী করে। মানুষের দুঃখকষ্টের দায়িত্ব মানুষের, আল্লাহ দুঃখকষ্ট সৃষ্টি করেন না। তিনি সুন্দরের সৃষ্টিকর্তা। তিনি সুন্দর সৃষ্টি করেন। বুঝতে পারছিস?

হুঁ।নানিজান, আপনি তখন আমার চুলে বিলি দিতে দিতে আরো অনেক কথা বলতে লাগলেন। আপনি গভীর বিশ্বাস থেকে কথা বলেন বলেই সহজে সেইসব কথা মনে গেঁথে যায়।আপনার সব কথা সেদিন আমি মনে গেঁথে নিয়েছি। আমার মনটা হালকা হয়ে গেছে। তখন নানিজান, আপনি আমার কানে কানে অদ্ভুত একটা কথা বললেন, আপনি বললেন…। কী বললেন তা তো আপনার মনেই আছে, তাই না? মৃত্যু আমার পাশে এসে যখন বসবে তখন আপনার কথাগুলি ভেবে আমি মনে সাহস পাব।নানিজান, আপনি আমাকে যেভাবে সাহস দিলেন, আমার মা এবং বাবাকেও এইভাবেই সাহস দেবেন। আপনার কাছে এই আমার শেষ অনুরোধ।

ইতি

আপনার নাতু

প্রিয় বাবা,

বাবা, তোমাকে আমি কতটা ভালোবাসি সেটা কি তুমি জানো? জানো না, তাই না? আমিও জানি না। ভালোবাসা যদি তরল পানির মতো কোনো বস্তু হতো তাহলে সেই ভালোবাসায় সমস্ত পৃথিবী তলিয়ে যেত। এমনকি হিমালয় পর্বতও।বাবা, আমি যখন থাকব না তখন তুমি আমার কথা ভেবে কষ্ট পেও না। তুমি কষ্ট পেলে সেই কষ্ট কোনো না কোনো ভাবে আমার কাছে পৌঁছবে। তখন আমার খুব খারাপ লাগবে।বাবা, তুমি মাকে সাহস দিও। আদর-ভালোবাসা দিয়ে তুমি মা’র মনের সব কষ্ট দূর করে দিও।মনে রেখো বাবা, তোমাকে অবশ্যই লাল রঙের একটা গাড়ি কিনে আগের দিনের মতো মা’কে পাশে বসিয়ে হাইওয়ে দিয়ে শো শো করে চালাতে হবে। মনে থাকবে তো বাবা?

তোমার টিয়া পাখি।

প্রিয় মা-মণি,

মা, আমি তোমাকে ছেড়ে কখনো যাব না। মৃত্যুর পরেও আমি থাকব তোমার খুব কাছে। তোমার আনন্দ দেখে আমি হাসব আবার তুমি যখন দুঃখ পাবে তখন আমিও খুব দুঃখ পাব। কাজেই মা দুঃখ পেও না। মন খারাপ করো না। বাবা যখন লাল গাড়ি কিনবে তখন তুমি বাবার পাশে হাসতে হাসতে বসবে। বাবা যখন শ শ করে গাড়ি চালাবে তখন তুমি চুল বেঁধে রাখবে না, চুল ছেড়ে দিও। বাতাসে মাথার চুল উড়লে খুব সুন্দর লাগবে দেখতে। সেই সুন্দর দৃশ্য আমি একদিন দেখব ভাবতেই ভালো লাগছে।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *