আমি বিসমিল্লাহ বলে সুইচ টিপে আতংক নিয়ে অপেক্ষা করছি। আমার ধারণা, সুইচ টেপামাত্র নামাজঘর পুরোপুরি পশ্চিম দিকে ঘুরবে। তা হল না। যা হল সেটাও কম বিস্ময়কর না। কোরান তেলাওয়াত হতে লাগল।রেশমা খালা বললেন, পুরো কোরান শরীফ রেকর্ড করা আছে। একবার বোতাম টিপে দিলে অটোমেটিক কোরান খতম হয়ে যায়।
‘সেই কোরান খতমের সোয়াব তো তুমি পাও না, সোয়াব পায় তোমার ক্যাসেট রেকর্ডার। এই ক্যাসেট রেকর্ডারের বেহেশতে যাবার খুবই উঁচু সম্ভবনা দেখা যাচ্ছে।’ ‘খবরদার, নামাজঘরে কোন ঠাট্টা-ফাজলামি করবি না।’ নামাজঘরে কোরান পাঠ চলতে লাগল। খালা আমাকে ছাদের চিলেকোঠায় বার দেখাতে নিয়ে গেলেন। শ্বেত পাথরের কাউন্টার টেবিল। পেছনে আলমারী ভর্তি নানা আকারের এবং নানা রঙের বোতল ঝিকমিক করছে।
‘কালেকশান কেমন, দেখেছিস?’
‘হুঁ। আক্কেল গুড়ুম অবস্থা। শুধু আক্কেল গুড়ুম না, একই সঙ্গে বে-আক্কেল গুড়ুম।’
‘বে-আক্কেল গুড়ুম আবার কি?’
‘কথায় কথা আর কি! করেছ কি তুমি? দুনিয়ার বোতল জোগাড় করে ফেলেছ।’
‘খাওয়ার লোক নেই তো। শুধুই জমছে।’
‘তোমার এখানে সবচে’ দামী বোতল কোন্টা খালা?’
‘পেটমোটা বোতলটা—ঐ যে দেখে মনে হচ্ছে মাটির বোতল। পঞ্চাশ বছরের পুরানো রেড ওয়াইন। ইংল্যান্ডের রাজপরিবারের বিশেষ বিশেষ উৎসবে এই জিনিস খাওয়া হয়।’ ‘দাম কত তা তো বললে না।’ ‘দাম শোনার দরকার নেই। দাম শুনলে তুই ভিরমি খাবি।’ ‘এম্নিতেই ভিরমি খাচ্ছি। আজ আর আমার ভাত খেতে হবে না। ভিরমি খেয়ে পেট ভরে গেছে।আনন্দে খালার মুখ উজ্জ্বল হয়ে গেল। আমার মুখ হয়ে গেল অন্ধকার। এক সপ্তাহ এ বাড়িতে থাকা যাবে না। আজই পালাতে হবে। রাতটা কোনমতে পার করে সকালে সূর্য ওঠার আগেই ‘হ্যাপিশ’।
‘আয়, লাইব্রেরি ঘর দেখি।’
‘আবার লাইব্রেরি ঘরও আছে?’
‘বলিস কি! লাইব্রেরি ঘর থাকবে না? লাইব্রেরি ঘর পুরোটা কাঠের করেছি। মেঝেও কাঠের। সব রকম বইপত্র আছে; ঘণ্টার পর ঘণ্টা তুই বই পড়ে কাটাতে পারবি। নিউ মার্কেটের এক দোকানের সঙ্গে কন্ট্রাক্ট করে রেখেছি—ভাল ভাল বই এলেই পাঠিয়ে দেয়। লাইব্রেরি ঘরে কম্পউটার বসিয়েছি। তুই কম্পউটার চালাতে জানিস?’
‘না।’ ‘আমিও জানি না। যাদের কাছ থেকে কিনেছি ওদের বলা আছে, অবসর পেলেই খবর দেবে, ওরা এসে শিখিয়ে দেবে।’ ‘অবসর পাচ্ছ না?’ ‘অবসর পাব কোথায়? সকালটায় একটু অবসর থাকে। দুপুরে খাওয়ার পর ঘুমুতে যাই—সন্ধ্যা পর্যন্ত ঘুমাই। সারারাত জেগে থাকি—দুপুরে না ঘুমালে চলবে কেন?’
‘সারারাত জেগে থাক কেন?’
‘ঘুম না হলে জেগে থাক কেন?’
‘ঘুম না হলে জেগে থেকে করব কি?’
‘ঘুম হয় না?’
‘না।’
‘ডাক্তার দেখিয়েছ?’ ‘ডাক্তারের পেছনে জলের মত টাকা খরচ করেছি। এখনো করছি। এখনো চিকিৎসা চলছে। সাইকিয়াট্রিস্ট চিকিৎসা করছেন।’ ‘তারা কিছু পাচ্ছে না?’ ‘পাচ্ছে কি পাচ্ছে না ওরাই জানে। ওদের চিকিৎসার লাভ হচ্ছে না। এখন তুই হলি ভরসা।’ ‘আমি ভরসা মানে? আমি কি ডাক্তার না-কি?’ ‘ডাক্তার না হলেও তোর নাকি অনেক ক্ষমতা। সবাই বলে। তুই আমাকে রাতে ঘুমের ব্যবস্থা দে। তুই যা চাইবি তা-ই পাবি। ওয়াইনের ঐ বোতলটা তোকে না হয় দিয়ে দেব।’
পঞ্চাশ বছরের পুরানো মদের বোতল পাব এই আনন্দ আমাকে তেমন অভিভূত করতে পারল না। আমার ভয় হল এই ভেবে যে রেশমা খালা আমার উপর ভর করেছেন। সিন্দাবাদের ভূত সিন্দাবাদের উপর একা চেপেছিল। রেশমা খালা আমার উপর এক চাপেন নি, তাঁর পুরো বাড়ি নিয়ে চেপেছেন। একদিনই আমার চ্যাপ্টা হয়ে যাবার কথা। চ্যাপ্টা হওয়া শুরু করেছি।
‘হিমু!’
‘জ্বি।’
‘আমার ব্যাপারটা কখন শুনবি?’ ‘তোমার কোন ব্যাপারটা?’ ‘ওমা, এতক্ষণ কি বললাম—রাতে ঘুম না হওয়ার ব্যাপারটা।’ ‘একসময় শুনলেই হবে। তাড়াতো কিছু নেই।’ ‘এখন তুই কি করবি।’
‘বুঝতে পারছি না। নিজের ঘরে কিছুক্ষণ শুয়ে থাকব বলে ভাবছি। যে বিছানা বানিয়েছ শুতে সাহসও হচ্ছে না।’ ‘রেশমা খালা বললেন, বিছানা এমন কিছু না। সাধারণ ফোমের তোষক। তবে বালিশ হচ্ছে পাখির পালকের।’ ‘বল কি?’ ‘খুব এক্সপেনসিভ বালিশ। জ্যান্ত পাখির পাখা থেকে এইসব বালিশ তৈরি হয়। মরা পাখির পালকে বালিশ হয় না।’ ‘একটা পালকের বালিশ জন্যে ক’টা পাখির পালক লাগে?’
‘কি করে বলব ক’টা—কুড়ি পঁচিশটা নিশ্চয়ই লাগে।’ ‘একটা বালিশের জন্যে তাহলে পঁচিশটা পাখির আকাশে উড়ে যাওয়া বন্ধ হয়ে গেলো?’ ‘আধ্যাত্মিক ধরনের কথা বলবি না তো হিমু। এইসব কথা আমার কাছে ফাজলামীর মত লাগে।’ ‘ফাজলামীর মত লাগলে আর বলব না।’ ‘যা, তুই রেস্ট নে। চা কফি কিছু খেতে চাইলে ইন্টারকমে বলে দিবি।’ ‘তুমি কি বেরুচ্ছ?’
‘হুঁ। বললাম না সকালে আমি একটু বের হই। দিন রাত ঘরে বসে থাকলে দম বন্ধ হয়ে আসবে না। তুই তো এখন বের হবি না?’ ‘না।’ ‘তাহলে তালা দিয়ে যাই।’ আমি অবাক হয়ে বললাম, তালা দিয়ে যাবে মানে? খালা আমার চেয়েও অবাক হয়ে বললেন, তুই আমার মুল বাড়িতে থাকবি তোকে তালা দিয়ে যাব না? লক্ষ লক্ষ টাকার জিনিস চারদিকে। ‘ঘরে যদি আগূন টাগূন লেগে যায় তখন কি হবে?’
‘খামাখা আগূন লাগবে কেন? আর যদি লাগে প্রতি ফ্লোরে ফায়ার এক্সটিংগূইসার আছে।’ ‘তালা দেয়া অবস্থায় কতক্ষণ থাকব।’ ‘আমি না আসা পযর্ন্ত থাকবি। আমি তো আর সারাজীবনের জন্যে চলে যাচ্ছি না। ঘণ্টাখানিক ঘোরাঘুরি করে চলে আসব। সামান্য কিছুক্ষণ তালাবন্ধ থাকবি মুখ চোখ শুকিয়ে কি করে ফেলেছিস।’
‘খালা আমি হচ্ছি মুক্ত মানুষ। এটাই সমস্যা।’ ‘বিছানায় শুয়ে বই টই পড়, টিভি দেখ। আমি তোকে কফি দিতে বলে যাচ্ছি।’ আমি বিছানায় শুয়ে শুয়েই ঘটাং ঘটাং শব্দে তালা দেয়ার আওয়াজ পেলাম। এ বাড়ির সব কিছু আধুনিক হলেও তালাগূলি সম্ভবত মান্ধাতার আমলের। বড্ড শব্দ হয়।
পালকের বিছানায় মাথা রেখে শুয়ে আছি। আমাকে কফি দিয়ে গেছে। চাইনীজ খাবার কি খাব বাবুর্চি জানতে এসেছিল, হাতে নোট-বুক, পেন্সিল। আমি গম্ভীর গলায় বলেছি আরশোলা দিয়ে হট এন্ড সাওয়ার করে একটা স্যুপ খাব। চাইনীজ শুনেছি আরশোলার স্যুপ খুব সখ করে খায়। আমি কখনো খেয়ে দেখিনি।বাবুর্চি হতভম্ব গলায় বলল, স্যারের কথা বুঝতে পারলাম না। কিসের স্যুপ? ককরোচ স্যুপ। সঙ্গে মাশরুম দিতে পারেন, বেবী কর্ণ ঠিক ততটুকু, বেশিও না কমও দেবেন না।’
‘আমি স্যার আসলে আপনার কথা বঝুতে পারছি না।’
‘বঝুতে না পারলে বিদায় হয়ে যান।’
‘জ্বি আচ্ছা, স্যার।’
তালাবদ্ধ বাড়িতে পড়ে আছি। আইনস্টাইনের থিওরি অব রিলেটিভিটি কাজ করতে শুরু করেছে। সময় থেমে গেছে। টামই ডাইলেশন। তালাবদ্ধ অবস্থায় যে এর আগে থাকিনি তা না। তবে হাজত তালাবন্ধ থাকবে এটা স্বীকৃত সত্য বলে খারাপ লাগে না। তালা খোলা অবস্থায় হাজতে বসে থাকাটা বরং অস্বস্তিকর। কিন্তু স্বর্গপুরীতে তালাবন্ধ অসহনীয়।
শুয়ে শুয়ে ভাবাছি বেহেশত কেমন হবে? সেখানেও কি এ রকম তালা সিস্টেম থাকবে। না-কি বেহেশতবাসীরা মুক্ত স্বাধীন অবস্থায় ঘুরে বেড়াতে পারবে। কারো ইচ্ছা সে দোজখে তার কোন পুরানো বন্ধুর সঙ্গে দেখা করে এল। বেহেশতের বর্ণনা ভাল মত জেনে নিতে হবে। খালার নামাজ ঘরে প্রচুর ধর্মের বই-টই আছে। সেখানে বেহেশত সম্পর্কে কি লেখা আছে পড়তে হবে।
কফি খাচ্ছি, কফিতে কোন স্বাদ পাচ্ছি না। স্বাদ যেমন নেই, গন্ধও নেই। একটু পর পর চোখ চলে যাচ্ছে ঘড়ির দিকে। ঘড়ি মনে হচ্ছে সত্যি সত্যি বন্ধ হয়ে গেছে।আমার বিখ্যাত বাবা আমাকে বন্দি থাকার ট্রেনিং অতি শৈশবে দিয়ে দিয়েছেলেন। তাঁর কাছে মনে হয়েছিল মহাপুরুষ বানানোর জন্যে এই ট্রেনিং অতি জরুরি। বন্দি না থাকলে ‘মুক্তি’র স্বরুপ বোঝা যায় না।
কাজেই একদিন আমাকে ঘরে ঢুকিয়ে তালা দিয়ে দিলেন—তখন আমি ক্লাস ফোরে পড়ি। যতটা অবাক হওয়ার কথা ততটা হলাম না। বাবার পাগলামীর সঙ্গে ততদিনে পরিচিত হয়ে পড়েছি। আমার ধারণা সন্ধ্যা নাগাদ তালা খোলা হবে। আতংকে অস্থির হয়ে লক্ষ্য করলাম সন্ধ্যার পর পর বাবা বাড়ি ছেড়েই চলে গেলেন। যাবার সময় মেইন সুইচ অফ করে দিলেন। একেবারে কবরের অন্ধকার। ঐটা ছিল আমার বাবার ভয় জয় করা ট্রেনিং-এর প্রাথমিক অংশ। তাঁর ডায়েরীতে তিনি লিখেছিলেন—
“অদ্য রাজনীতে হিমালয়কে জয় করিবার প্রস্তুতিসূচক ট্রেনিং
দেওয়া হইবে। মানুষের প্রধান ভয় অন্ধকারকে। যে অন্ধকারের
স্মৃতি সে অন্য কোন ভূবন হইতে লইয়া আসিয়াছে। অন্ধকারকে
জয় করার অর্থ সমস্ত ভয় জয় করা। অদ্যকার অন্ধকার জয়
করা বিষয়ক প্রাথমিক ট্রেনিং হিমালয় কিভাবে গ্রহণ করিবে
বুঝিতে পারিতেছি না। এই শক গ্রহণ করিবার মানসিক শক্তি কি
তাহার আছে? বুঝিতে পারিতেছি না। কাহাকেও বাহির হইতে
দেখিয়া তাহার মানসিক শক্তি সম্পর্কে ধারণা করা যায় না। সেই
দিব্য দৃষ্টি প্রকৃতি মানব সম্প্রদায়কে দেয় নাই……”
আমি ইন্টারকম টিপে বাবুর্চিকে ডাকলাম। ইন্টারভ্যু নেয়ার ভঙ্গিতে বললাম,কি নাম? ‘ইদ্রিস।’ শুরুতে তাকে আপনি করে বলেছিলাম, এখন তুমি। ‘শোন ইদ্রিস! এ বাড়ি থেকে পালিয়ে যাওয়ার কোন ব্যবস্থা আছে? বাথরুম থেকে পাইপ বেয়ে নেমে পড়া বা এ জাতীয় কিছু?’ ‘জ্বি না।’ ‘টেলিফোন নিয়ে আস। দমকল অফিসে টেলিফোন করে দি। ওরা তালা খুলে উদ্ভার করবে।’
‘টেলিফোন নাই স্যার।’
‘টেলিফোন নাই মানে?’
‘এই বাড়িতে সব আছে টেলিফোন নাই। টেলিফোনে লোকজন বিরক্ত করে। ম্যাডামের ভাল লাগে না।’ ‘ও, আচ্ছা।’ ‘স্যার, আরেক কাপ কফি এনে দেই। চিন্তার কিছু নাই ম্যাডাম চলে আসবে। উনি বেশীক্ষণ বাডীর বাইরে থাকেন না। চলে আসেন। কফি দিব স্যার?’ ‘দাও।’
বাবুর্চি কফি এনে দিল। আমি কফি খেয়ে রেশমা খালার অপেক্ষা করতে করতে এক সময় ঘুমিয়ে পড়লাম। সেই ঘুম যখন ভাঙ্গল তখন দেখি রাত হয়ে গেছে। ঘর অন্ধকার। ‘কিরে ঘুম ভেঙ্গেছে? রেশমা খালা ঘরে ঢুকে বাতি জ্জালালেন। তিনি মাথার নকল চুল খুলে ফেলেছেন। তাঁকে মোটামুটি বীভৎস দেখাচ্ছে। তাঁর মাথার আদি চুলের এই অবস্থা কে জানত। কিছু আছে কিছু নেই। যেখানটার মাথার হলুদ চামড়া চকচক করছে।
‘ঘরে ফিরে দেখি তুই মরার মত ঘুমুচ্ছিস। তাই আর ঘুম ভাঙ্গালাম না। ঘুমের মুল্য কি তা আর কেউ না জানুক আমি তো জানি। এতক্ষণ ধরে কেউ ঘুমুতে পারে তাও জানতাম না। তোর কোন অসুখ বিসুখ নেই তো?’ ‘কটা বাজে খালা?’ ‘নটার কাচাকাছি। তুই এক নাগাড়ে প্রায় দশঘণ্টা ঘুমুলি। ক্ষিধে লেগেছে নিশ্চয়ই। হাত-মুখ ধুয়ে আয় ভাত খাই।’ আমি উঠলাম। শান্ত গলায় বললাম, ভাত খেয়েই আমি একটু বেরুব খেলা।
‘বের হতে চাইলে বের হবি। আমি কি তোকে আটকে রেখেছি না-কি? বাবুর্চি বলছিল তালা দিয়ে যাওয়ায় তুই নাকি অস্থির হয়ে পড়েছিলি। আশ্চার্য। তুই কি ছেলেমানুষ না-কি? তুই আবার তাকে বলেছিস তেলাপোকার স্যুপ খেতে চাস। হি হি হি। বাবুচিটা বোকা টাইপের, ও সত্যি ভেবে বসে আছে। ঠাট্টা বুঝতে পারেনি।’ ‘তেলাপোকার স্যুপ তৈরি করেছে? আমি ঠাট্টা করিনি। আসলেই খেতে চেয়েছিলাম।’
‘তুই দেখি আচ্ছা পাগল। আয় খেতে আয়। খেতে খেতে আমার ভয়ংকর গল্পটা বলব। তুই আবার চারদিকে বলে বেড়াবি না।’ ডাইনিং রুম ছাড়াও ছোট্ট একটা খাবার জায়গা আছে। শ্বেত পাথরের টেবিলে দু’টা মাত্র চেয়ার। মোমবাতি জ্বালিয়ে ক্যান্ডেল লাইট ডিনার। টেবিলে নানান ধরনের পদ সাজানো।
বাবুর্চি পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। খালা বললেন, ‘তুমি চলে যাও, তোমাকে আর লাগবে না। খাওয়া শেষ হলে ঘণ্টা বাজাব তখন সব পরিষ্কার করবে।’ ‘ঘণ্টার ব্যবস্থাও আছে?’ ‘আছে, সব ব্যবস্থাই আছে। খাওয়া শুরু কর। বাবুর্চির রান্না কেমন বলবি। রান্না পছন্দ না হলে ব্যাটাকে বিদেয় করে দেব। ব্যাটার চোখের চাউনি ভাল না। স্যুপটা কেমন?’ ‘ভাল। খুব ভাল।’ ‘তুই তো এখনো মুখেই দিস নি। মুখে না নিয়েই বলে ফেললি ভাল?’
‘গন্ধে গন্ধে বলে ফেলেছি। চায়নীজ খাবারের আসল স্বাদ গন্ধে। গন্ধে ঠিক আছে। বাবুর্চি রেখে দাও।’ ‘চোখেরা চাউনিটা যে খারাপ। মাঝে মাঝে ভয়ংকর করে তাকায়।’ ‘বু্দ্ধিটা খারাপ না। ভাল বলেছিস হিমু। এটা আমার মাথায় আসেনি। কথায় আছে না এক মাথার থেকে দুমাথা ভাল—আসলেই তাই। এখন আমার সমস্যাটা শোন। খু্ব মন দিয়ে শুনবি।’ ‘খাওয়া শেষ হোক তারপর শুনি…’
‘খেতে খেতেই শোন। আমি আবার চুপচাপ খেতে পারি না। ব্যাপারটা কি হয়েছে শোন। তোর খালু মারা যাবার পর বাড়ি ভর্তি হয়ে গেল ফালতু লোকে। অমুক আত্নীয় তমুক আত্নীয়। এক্কেবারে খুঁটি গেড়ে বসেছে। মতলব আর কিছু না—টাকা পয়সা হাতানো। টাটকা মধু পড়ে আছে—পিঁপড়ার দল চারদিক থেকে এসে পড়েছে। আমি একে একে ঝোঁটিয়ে সব বিদায় করলাম।
বাড়ি খালি করে ফেললাম। চব্বিশঘণ্টা গেটে তালার ব্যবস্থা করলাম। একজনের জায়গায় দু’জন দারোয়ান রাখলাম। চব্বিশ ঘণ্টা ডিউটি। কাউকে ঢুকতে দেবে না।কেউ যদি ঢুকে সঙ্গে সঙ্গে চাকরি নট। আমার যদি কারোর সঙ্গে কথা বলার ইচ্ছে হয় আমি নিজেই দেখা করতে যাব। কিন্তু কেউ আমার সঙ্গে দেখা করতে পারবে না। লোকজন টেলিফোনে বিরক্ত করে। দিলাম টেলিফোন লাইন কেটে।
এত বড় বাড়িতে আমি একা । একটু যে ভয় ভয় লাগে না, তা না। লাগে কিন্তু আত্মীয় স্বজনের যন্ত্রণায় চেয়ে ভয় পাওয়া ভাল। লক্ষ গুণ ভাল।তারপর একদিন কি হয়েছে শোন । রাত এগারোটার মত বাজে । খুব দেখি মশা কামড়াচ্ছে। দরজায়, জানালায় নেট আছে তারপরেও এত মশা ঢুকল কি ভাবে? আমার মেজাজ খারাপ। কারণ আমি আবার মশারির ভেতর ঘুমাতে পারি না। আমার একটা কাজের মেয়ে ছিল রেবা। ওকে বললাম মশারি খাটিয়ে দিতে।
ও মশারি খাটিয়ে দিল। মেজাজ টেজাজ খারাপ করে ঘুমুতে গেছি। বাতি নিভিয়ে মশারির কাছে গেলাম, মশারি তুলে দেখি মশারীর ভিতর ও বসে আছে। তোর খালু। নেংটা হয়ে বসে আছে। গুটিসুটি মেরে বসা। মাথা ঘুরিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে হাসল। আমি চিৎকার দিয়ে অজ্ঞান। সেই থেকে শুরু। কখনো তাকে দেখি খাটের নিচে।কখনো বাথরুমের বাথটবে। একদিন পেলাম ডীপ ফ্রীজে।
‘কোথায়, ডীপ ফ্রীজে?’ ‘হ্যাঁ। ডীপ ফ্রীজ সব সময় বাবুর্চি খোলে। সেদিন ফ্রীজে জিনিসপত্র কি আছে দেখার জন্যে ডালটা তুললাম—দেখি একেবারে খালি ফ্রীজ, সেখানে ও বসে ঠাণ্ডায় থরথর করে কাঁপছে। এই হল ব্যাপার, বুঝলি। এরপর থেকে রাতে ঘুমুতে পারি না।’
‘রোজই দেখ?’
‘প্রায়ই রোজই দেখি।’
‘আজ দেখেছ?’
‘এখনো দেখিনি। তবে দেখব তো বটেই। এর মানেটা কি বল তো হিমু? এই অত্যাচারের কারণ কি? ভূত প্রেত বলে সত্যি কিছু আছে? মানুষ মরলে ভূত হয়?’ আমি দেখলাম রেশমা খালা আর কিছু খেতে পারছেন না। মুখ শুকিয়ে গেছে। হাত কাঁপছে। তিনি কাঁপা কাঁপা গলায় বললেন, হিমু কথা বলছিস না কেন?
‘তুমি একাই উনাকে দেখ না আরো অনেকেই দেখে?’ ‘সবাই দেখে। রেবা দেখেছ। দেখে চাকরি-টাকরি ছেড়ে চলে গেছে। আমার সাথে যারা আছে তারাও দেখেছে। এরা কেউ রাতে দোতলায় ওঠে না। তুই রাতটা আমার সঙ্গে থাক। তুইও দেখবি।’
আমি খালার দিকে তাকিয়ে রইলাম। এই প্রথম বেচারীর জন্যে মায়া লাগছে।রেশমা খালার ‘প্যালেসে’ এক সপ্তাহ পার করে দিলাম। সমস্যামুক্ত জীবন যাপন। আহার, বাসস্থান নামক দু’টি প্রধান মৌলিক দাবি মিটে গেছে। এই দু্’টি দাবি মিটালেই বিনোদনের দাবি ওঠে। খালার এখানে বিনোদনের ব্যবস্থাও প্রচুর আছে। আমার ভালই লাগছে।
ট্রাক দেখলে লোকে রাস্তা ছেড়ে পালিয়ে যায়, কিন্তু সেই খোলা ট্রাক করে ভ্রমণের আনন্দ অন্য রকম। আমার অবস্থা হয়েছে এরকমই। রেশমা খালার সঙ্গে গল্পগুজব করতে এখন ভালই লাগে। শুধু রাতে একটু সমস্যা হয়। রেশমা খালা আমার দরজায় ধাক্কা দিতে দিতে বলেন, আয় আয় দেখে যা, নিজের চোখে দেখে যা। বসে আছে, খাটে পা দুলিয়ে বসে আছে।
Read more
