সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের কর্নেল সমগ্র ২য় খণ্ড এর অংশ-১৮

“তারপর?” 

“তারপর আর কী! রমলা মেয়েকে মানুষ করতে লাগলাে। রমলা স্টেনাে টাইপিস্টের চাকরি পেয়েছিল। আলাদা বাসা নিয়ে থাকত।” 

রমলার মেয়ের এখন বয়স কত?” “বছর আট-নয় হবে বােধ করি। ক্লাস ফোরে পড়ে।” “এখন সে কোথায়?”

কর্নেল সমগ্র 

পরিতােষ এতক্ষণে সিগারেট ধরালাে। কিছুক্ষণ সিগারেট টানার পর বলল, “আমার ভাগ্নীর ডাক নাম ছিল মিমি। আসল নাম জয়িতা। রমলা কেন এ নাম রেখেছিল, বুঝতে পারছেন তাে? 

“পারছি। মিমি এখন কোথায়?” 

“মিমিকে বালিগঞ্জে একটা আবাসিক স্কুলে রেখেছিল রমলা। মাঝেমাঝে দেখে আসত। আমার নামে হুলিয়া। লুকিয়ে বেড়াচ্ছি। সম্প্রতি কলকাতা গিয়ে রমলার সঙ্গে দেখা করতে গেলুম। গিয়ে দেখি, তার ফ্ল্যাট তালাবন্ধ। পাশের ফ্ল্যাটে খোঁজ নিলুম। এক ভদ্রমহিলা বললেন, রমলা কদিন থেকে নেই। কোথায় গেছে বলে যায়নি। মিমিদের স্কুলে গেলুম। মিমি আমাকে দেখে কাঁদতে শুরু করল। বলল, মাম্মি কেন আসছে না। তখন আমার সন্দেহ হল, কানাজোলে যায়নি তাে? মিমির স্কুলে পরদিন থেকে পুজোর ছুটি শুরু হচ্ছে। সুপারিন্টেন্ডেন্ট মহিলা—”। 

কর্নেল বাধা দিয়ে বললেন, “মিমি আপনাকে চিনত?”। 

“হ্যা। আমি ফেরারি হয়ে বেড়ালেও মাঝেমাঝে গিয়ে রমলা আর মিমির খােজ নিতুম। রমলার সঙ্গে বারকৃতক মিমিকে দেখতে গেছি। তাই সুপারিন্টেন্ডেন্ট মহিলা আমাকে চিনতেন। তবে জানতেন না আমি ফেরারি আসামি।” পরিতােষ থেমে আঙুল ফুটতে থাকল। 

“বেশ। বলুন।” 

কর্নেল সমগ্র ২য় খণ্ড এর অংশ-১৮

“ভদ্রমহিলা বললেন, “বরং মিমিকে নিয়ে যান। কাল থেকে হােস্টেল বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। ওর মা আজও এলেন না। আমি তাে সমস্যায় পড়েছি কী করব ওকে নিয়ে।” 

“আপনি মিমিকে নিয়ে এলেন?” 

“হ্যা। সােজা কানাজোলে চলে এলুম। রাজবাড়িতে বিপ্রদাসবাবুর সঙ্গে আলাপ হল। ওঁকে সব কথা বললুম। উনি প্রথমে তাে পাত্তাই দিলেন না। তারপর জয়কে ডেকে পাঠালেন।” 

“কোন তারিখে এবং কখ?” “১২ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যা ৭টা-টাতটা হবে।” “তারপর কী হল বলুন?” 

“জয় এসে আমাকে দেখে চমকে গেল। তারপর মিমিকে কোলে তুলে নিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ল।” 

“একমিনিট।” বলে কর্নেল জানালার দিকে লক্ষ্য করে বললেন, “জয় আসছে। ও আসার আগে সংক্ষেপে বলুন।” 

পরিতােষ রুমালে নাক ঝেড়ে বলল, “জয় মিমিকে কিছুতেই ছাড়বে না। কিন্তু বিপ্রদাসবাবু বললেন–কেন বললেন এখনও বুঝতে পারিনি, মিমিকে রাজবাড়িতে রাখা আপাতত ঠিক হবে না। ভাগলপুরে ওঁর বােনর কাছে কিছুদিন রেখে আসা ভাল। তখনও জানি না, রমলা খুন হয়েছে। তাে জয় বিপ্রদাসবাবুর কথায় সায় দিল। তখনই বিপ্রদাসবাবু আমাকে আর মিমিকে নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন। আটটার ট্রেনে আমরা ভাগলপুর গেলুম। বিপ্রদাসবাবুর বােনের বাড়িতে রাত্তিরটা আমি থাকলুম।

বিপ্রদাসবাবু সেই রাত্তিরেই ফিরে এলেন কানাজোল। মিমি ওখানেই থাকল। আমি পরদিন চলে এলাম কানাজোলে। এই আউটহাউসে জয়ের সঙ্গে দেখা হল। তখন জয় বলল, ৯ তারিখে রমলা আসবে লিখেছিল। স্টেশনে তাকে থাকতে বলেছিল। কিন্তু স্টেশনে যেতে দেরি হয়ে যায়। তারপর রমলার কী হয়েছে, সে জানে না। শুনেই আমার বুকটা—”। 

কর্নেল সমগ্র ২য় খণ্ড এর অংশ-১৮

বাইরে জয়ের সাড়া পাওয়া গেল। সনি গরগর করে উঠল। জয় সােজা এসে ঘরে ঢুকেই থমকে দাঁড়াল।  কর্নেল হাসলেন। “এস জয়। তুমি তাে রমলার দাদার সঙ্গে আমার পরিচয় করিয়ে দাওনি। তাই নিজে থেকেই পরিচয় করতে এসেছিলুম।” 

 জয় ভুরু কুঁচকে বলল, “আপনি কেমন ডিটেকটিভ মশাই, আপনার নাকের ডগায় আবার একটা খুনখারাপি হয় আর আপনি শুধু বকরবকর করে ঘুরে বেড়ান?” 

কর্নেল মুহূর্তে শক্ত হয়ে বললেন, “মাধবজি খুন হয়েছেন কি?” | জয় বিকৃতস্বরে বলল, “আপনার মাথা! বিজয়টা একটা বুদ্ধ। তাই কার পরামর্শে আপনার মতাে একটা গবেট গােয়েন্দা ভাড়া করে এনেছে। যান, গিয়ে দেখুন—কাকাবাবুর ঘরে কাকাবাবুর ডেডবডি পড়ে আছে। পচা গন্ধে অস্থির। আপনার নাকও নেই মশাই! কলাবতী টের না পেলে 

কর্নেল সবেগে বেরিয়ে গেলেন ঘর থেকে  রহস্যের শেষ প্রান্তে । 

সুড়ে ছড়াটা সত্যি হল তাহলে ! কালের সত্যিই দাড়ি ছেড়ার অবস্থা। কলাবত। রােজ সকালে সব ঘরে ঝাড় দেয়। ওপরতলার তিনটে বন্ধ ঘর বাদে সব ঘরে তাকে ঝাড় দিতে হয়। হলঘর আর বিপ্রদাসজির ঘরের একটা করে ডুপ্লিকেট চাবি তার কাছে থাকে। বিপ্রদাসজি তাকে বিশ্বাস করতেন। গতকাল সকালে যখন সে বিপ্রদাসজির ঘরে ঝাড় দেয়, তখন বিপ্রদাসজি ঘরে ছিলেন। বলেছিলেন, জরুরি কাজে ভাগলপুর বহিনজির বাড়ি যাবেন আটটার ট্রেনে।

দুদিন থাকবেন। আজ সকালে কলাবতী প্রথমে হলঘর ঝাড় দিতে গিয়ে ‘বদ গন্ধ পায়। সে ভেবেছিল কোথাও চুহা মরে পড়ে আছে। হলঘর থেকে বিপ্রদাসজির ঘরে ঢােকা যায়। কিন্তু সে দরজাটা বন্ধু। তার সন্দেহ হয়, তাহলে বিপ্রদাসজির ঘরে চুহা মরেছে। সে বারান্দায় এসে বিপ্রদাসজির ঘরের তালা খােলে। জানালা বন্ধ ছিল। পচা গন্ধে অস্থির হয়ে সে জানালা, ওপাশের দরজা—সব খুলে দেয়। আলাে জ্বেলে চুহাটাকে খুঁজতে থাকে। তারপর তার চোখে পড়ে, খাটের তলা থেকে মানুষের একটা পা বেরিয়ে আছে। সে ভয় পেয়ে চেঁচামেচি শুরু করে।

কর্নেল সমগ্র ২য় খণ্ড এর অংশ-১৮

তখন নছি সিং, বৈজু, তারপর জয়া দৌড়ে আসে। রঙ্গিয়া ইদারায় পাম্প চালিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। সেও দৌড়ে আসে। শেযে আসে বিজয়। এসে হুকুম দেয় টেনে বের করতে। নছি সিং টেনে বের করলে সবাই চমকে উঠে দ্যাখে, বিপ্রদাসজির মাথার মাঝখানটা খাতলানাে। রক্ত জমাট বেঁধে আছে। হাতুড়ি বা ওইরকম কিছু শক্ত ভারী জিনিস দিয়ে মাথায় মারা হয়েছে। মেরে বডিটা খাটের তলায় ঢােকানাে হয়েছে। 

জয় আসে অনেক পরে। একটু দাঁড়িয়েই সে চলে যায়। কর্নেল গিয়েই নছি সিংকে থানার পাঠিয়েছিলেন। পুলিশের গাড়ি এল প্রায় আধঘণ্টা পরে। জয়া তার ঘরে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েছিল। তাকে কলাবতী সান্ত্বনা দিচ্ছিল। বিজয়ও দুহাতে মুখ ঢেকে শিশুর মতাে কাঁদছিল হলঘরে বসে। 

কানাজোল পুলিশ স্টেশনের ও সি রাঘবেন্দ্র শর্মা কর্নেলকে দেখে অবাক হয়েছিলেন। হাসতে হাসতে বললেন, “প্রবাদ শুনেছিলুম, “যাহা ভি যাতা হ্যায় কর্নেল, উহাভি খুনখারাপিকা খেল। ক্ষমা করবেন কর্নেল সরকার। গতবছর কলকাতার ডিটেকটিভ ট্রেনিং সেন্টারে একটা কনফারেন্সে গিয়ে প্রবাদটা শুনেছিলুম। যাই হােক, ব্যাকগ্রাউন্ড তে ইতিমধ্যে আপনার নিশ্চয় জানা হয়ে গেছে। বলুন—হাউ টু প্রসিড!”

 

Read More

সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের কর্নেল সমগ্র ২য় খণ্ড এর অংশ-১৯

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *