বাসায় হটাৎ এক পালকি উপস্থিত।সুন্দর করে সাজানো কাগজের রঙিন পালকি। পালকির দরজা খুলে দাওয়াতের চিঠি উদ্ধার করলাম, ‘অমুক আপুর গায়ে হলুদ।আপনি সবাইকে নিয়ে আসবেন।’ইত্যাদি।
সবকিছু বদলে দেখার জন্য চারদিকে ভালো হৈচৈ শুরু হয়েছে। অধ্যাপক আনিসুজ্জামানকেও দেখলাম নিজেকে বদলানোর জন্য কাগজপত্রে দন্তখত করছেন। লোকমুখে শুনেছি তার বাসার কাজের ছেলেকে তিনি এখন দুবেলা পড়ান। কাজের ছেলে চাকরি ছেড়ে পালিয়ে যাবার ধান্দায় আছে।তাকে ঘর থেকে বের হতে দেখা যাচ্ছে না। গ্রাজুয়েট হয়ে বের হবে,তার আগে না।
দেশ অবশ্যি নিজের নিয়মেই বদলাচ্ছে। পালকির ভেতরে নিমন্ত্রণ পত্র তার প্রমাণ। নিমন্ত্রণ ধরণ পাল্টাচ্ছে।বিয়ের আচার অনুষ্ঠান পাল্টাচ্ছে। আমার ছোট ভাই আহসান হাবিবের কাছে শুনলাম সে মাথায় টুপি পরে।কোনো এক কুলখানিতে গিয়েছিল। সেখানে মিলাদের পরিবর্তে হটাৎ করে মৃত ব্যক্তির প্রিয় গানের আসর বসল। আহসান হাবিব চট করে টুপি পাঞ্জাবির পকেটে লুকিয়ে ফেলল এবং গানের তালে তালে মাথা দুলাতে লাগল। আহসান হাবিব যেহেতু উন্মাদ নামক পত্রিকা চালায়,তার সব কথা বিশ্বাসযোগ্য নয়।
বিয়ের আচার অনুষ্ঠান কিভাবে বদলাচ্ছে সেই নিয়ে কিছুক্ষণ গল্প করি।আমার শৈশবের বিয়ের অনুষ্ঠানের প্রধান অনুসঙ্গ ছিল ‘প্রীতি-উপহার’ নামক এক যন্ত্রণা।কেন যন্ত্রণা বলছি তা ব্যাখ্যা করব,তবে তার আগে ‘প্রীতি-উপহার’ বিষয়ে বলি।বর-কনেকে আশির্বাদ এবং বরণসূচক ছড়ার সংকলনই ‘প্রীতি-উপহার’। সস্তা কোনো প্রেস থেকে এই জিনিস ছাপা হয়ে আসত। শুরুতে ছবি মেহেদী পরা একটা হাত পুরুষের গরিলা টাইপ একটা হাতকে হ্যান্ডসেক করছে। কিংবা একটা কিশোরী পরী ফুলের মালা হাতে আকাশে উড়ছে। প্রীতি উপহারের শুরুটা হয় এই ভাবে –
দোয়া মাপি তোমার হাতে ওগো দয়াময়
দুটি প্রাণের মিলন যেন পরম সুখের হয়।
এখন বলি কেন প্রীতি উপহারকে আমি যন্ত্রণা বলেছি। আমার বাবা তার সমস্ত আত্মীয়স্বজনের বিয়েতে প্রীতি উপহার দেওয়া আবশ্যকতা মনে করতেন।রাত জেগে নিজেই লিখতেন। বিয়ের আসরে এই কাব্য আমাকেই পাঠ করে শুনাতে হতো।পাঠ শেষে তা জনে জনে বিলি করা হতো। তারপর আমাকে প্রীতি উপহার নিয়ে পাঠানো হতো মেয়ে মহলে। কনেকে ঘিরে থাকতো তার বান্ধবীরা। তারা তখন আমাকে নিয়ে নানান রঙ্গ রসিকতা করতো। আমি যথেষ্ট আবেগ দিয়ে প্রীতি উপহার পড়ছি,এর মধ্যে কেউ একজন বলে বসল, ‘এই বান্দর চুপকর’।মেয়েরা সবাই হেসে এ ওর গায়ে গড়িয়ে পড়তো। আমি চোখ মুছতে মুছতে বিয়ের আসরে ফিরতাম।
ওখানকার পাঠকরা কেউ যেন ভুলেও মনে না করবেন প্রীতি উপহার কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল না। আমাদের এক আত্মীয়ের বিয়ে ভেঙ্গে গিয়েছিল,কারণ বরপক্ষ প্রীতি উপহার আনে নি। অনেকবার বরপক্ষের সাথে কনেপক্ষের হাতাহাতি শুরু হলো।কারণ প্রীতি উপহারে কনের বাবার নাম ‘সালাম’র জায়গায় ছাপার ভুলে লেখা হয়েছে ‘শালাম’। কনেপক্ষের ধারণা, ইচ্ছাকৃতভাবে কনের বাবাকে শালা ডাকা হয়েছে।
কবি শামসুর রহমানের বিয়েতে প্রীতি উপহার ছাপা হয়েছিল এবং দেশের কবিরা সবাই সেখানে লিখেছিল।এই তথ্য কি জানা আছে? যে সংকলনটি বের হয় তার নাম কবি শামসুর রহমানই দেয়। নাম ‘জীবনের আশ্চর্য ফাল্গুন’। সওগাত সম্পাদক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন তার প্রেসে ছেপে দেন।[সূত্র: বাংলাদেশের বিবাহ সাহিত্য। আবদুল গফফার চৌধুরী।]
প্রাচীনকালে বিয়ে কিভাবে হতো তা বললে বুঝা যাবে আমরা কতটা বদলেছি। বৈদিক যুগে কোনো তরুণীর বিয়ে একজনের সঙ্গে হতো না। তার সমস্ত ভাইদের সঙ্গে হতো। ঋগ্বেদে এবং অথর্ববেদে এমন কিছু শ্লোক আছে যা থেকে বুঝা যায় বড় ভাইয়ের স্ত্রীর সঙ্গে যৌনমিলনের অধিকার কনিষ্ঠ ভাইদেরও থাকতো।এই দুই গ্রন্থেই স্বামীর ছোট ভাইকে বলা হয়েছে দেবৃ অথবা দেবর। দ্বিতীয় বর।
বেদের জাতীত্ববাচক কয়েকটি শব্দ থেকে পরিষ্কার বুঝা যায় যে, স্ত্রীলোকের অনেক স্বামী থাকতো।এর কারণও কিন্তু আছে। আর্যরা যখন এই দেশে ঢুকলো,তখন তাদের সঙ্গে মেয়ের সংখ্যা ছিল খুবই কম। আর্যরা দেশী কৃষ্ণ রমনীদের প্রচন্ড ঘৃণার চোখে দেখতো। কাজেই তাদের সঙ্গে করে আনা মেয়েদের ভাগাভাগি করে গ্রহণ করা ছাড়া দ্বিতীয় বিকল্প ছিল না।[সূত্র: ভারতের বিবাহের ইতিহাস। অতুল সুর।]
রাহুল সাংস্কৃত্যায়নের বইতে পড়েছি, তিব্বতে সব ভাইরা মিলে একজন তরুণীকে স্ত্রী রূপে গ্রহণ করতো। তিব্বতে মেয়ের সংখ্যা কম না,তারপরেও এই অদ্ভূত নিয়মের কারণ হলো তিব্বতে জমির খুব অভাব।সব ভাই যদি আলাদা হয়ে সংসার শুরু করে,তাহলে জমি ভাগাভাগি হয়ে কিছুই থাকবে না। তিব্বতে সে সব মেয়েদের বিয়ে হবে না তাদের গতি কি হবে?তারা মন্দিরের সেবাদাসী হবে। অর্থাৎ বেশ্যাবৃত্তি করবে।একবার মন্দিরের দেবতার সঙ্গে বিয়ে হয়ে গেলে অন্য পুরুষদের সঙ্গে আনন্দ করতে বাঁধা নেই।
কী ভয়ঙ্কর! DFP থেকে প্রকাশিত সচিত্র বাংলাদেশ পত্রিকার নভেম্বর সংখ্যায় বিয়ের রীতিনীতি এবং ইতিহাস নিয়ে অনেক গুলো লেখা ছাপা হয়েছে। আমি পড়ে খুবই আনন্দ পেয়েছি। কৌতূহলী পাঠক সংখ্যাটি সংগ্রহ করে পড়লে খুবই আনন্দ পারেন। সেখান থেকে ‘উকিল বাপ’বিষয়ে লেখাটি তুলে দিচ্ছি।
আমাদের দেশে মুসলিম রীতির বিয়েতে ‘উকিল বাপ’ পদবিধারী একজন ব্যক্তিত্বের উপস্থিতি দেখতে পাওয়া যায়।যারা বিয়েতে মেয়ের কাছ থেকে অনুমতি আনে এবং বিয়ের মজলিসে এসে মেয়ের সম্মতির কথা জানায়।এই উকিল বাপকে এতই গুরুত্ব দেওয়া হয় যে,এটা না হলে বিবাহ হবে না বলে মনে করা হয় এবং পরবর্তীতে এই উকিল বাবাকে মেয়েরা নিজের বাবার মতো শ্রদ্ধা করে থাকে।তার নাম বিয়ের রেজিস্ট্রেশন ফরমেও তোলা হয়।
অধিকাংশ ক্ষেতেই দেখা যায়,এই উকিল বাপ ব্যক্তিত্বটা এমন একজন ব্যক্তি হয়ে থাকেন যার সাথে পিতৃতুল্য সম্পর্ক হওয়ার সম্ভবনা নয় বা মেয়ের তার সাথে দেখা সাক্ষাৎ জায়েজ নয়। পিতৃতুল্য শ্রদ্ধা দেখাতে গিয়ে মেয়েরা পদবি বিষয়টিকে বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন মনে করে না।এতে করে উভয়ই গুনাহগার হয়ে থাকেন। মুসলিম রীতির বিয়েতে উকিল বাপ পদবিটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসাবে প্রচলিত হলেও বিষয়টি শরিয়ত বিরোধী একটি প্রথা। কারণ শরিয়তে উকিল বাপের কোনো ধারণা নেই।
ইসলাম ধর্ম মতে, প্রতিটি মেয়ের জন্য পর্দা করা ফরজ হওয়ায় উকিল বাপ সম্পর্কটি হারাম বলে বিবেচিত হয়। মেয়ের কাছ থাকে অনুমতি নেওয়ার জন্য তৃতীয় পক্ষ উকিল বাপের চেয়ে তার বাবা অথবা ভাইয়ের এই দায়িত্ব পালন করাই শ্রেয়।
[উপরিউক্ত ফতোয়া সংগ্রহ করা হয়েছে মুফতি মানসুরুল হক:ইসলামী বিবাহ, রাহমানীয়া পাবলিকেশন্স,ঢাকা,২০০৫,পৃষ্টা ১৮-১৯ থেকে।] আমি অনেক মেয়ের উকিল বাপ হয়েছি। এখন ঠিক করেছি আর না। উকিল দাদু হওয়ার বিধান থাকলে অবশ্যি সেকেন্ড থট দেব।
বিয়ের গান হিসাবে ‘লীলাবালি লীলাবালি’ গানটি প্রায় গীত হয়। আমাদের ছবি ‘দুই দুয়ারী’তেও গানটি ব্যবহার করা হয়েছে। গানটি গাওয়া হয় –
লীলাবালি লীলাবালি
বড় যুবতী সই গো
কী দিয়া সাজাইমু তোরে?
গানের কথায় ভুল আছে।’বড় যুবতী’ হবে না, হবে ‘বর অযুবাতী’।এর অর্থ -বর আসছে।আমার ভুলের কারণে এখন অন্যরাও ভুল করছেন।শেষে দেখা যাবে ভুলটাই প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবে।আদি ভুলের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করছি।
অল্প কিছুদিনের মধ্যে কথাশিল্পী মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ওপর নানান পত্রিকায় বেশ কিছু লেখা পড়েছি। উনার জন্মশতবার্ষিকী এক বছর আগেই শেষ হয়েছে। তার পরেও একটি পত্রিকা ঘটা করে জন্মশতবার্ষিকী পালন করল। তাতে আমি কোনো সমস্যা দেখি না। একজন বড় লেখককে সম্মান দেখানো হচ্ছে, এটাই বড় কথা। আমাদেরমধ্যে সম্মান করা এবং অসম্মান করার দুটি প্রবণতাই প্রবলভাবে আছে। কাউকে পায়ের নিচে চেপে ধরতে লামাদের ভালো লাগে, আবার মাথায়। নিয়ে নাচানাচি করত্রে এ ভালো লাগে।
একটা সময় স্বয়ং রবীন্দ্রনাগকে নানান অসম্মানের ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছে। তাকে বাকবাকুম কবি বলা হয়েচ্ছে। কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা এমএ পরীক্ষায় তাঁর রচনার অংশবিশেষ তুলে ধরে বলা হয়েছে–শুদ্ধ বাংলায় লিখ।ভাগ্যিস উনি নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন। বাঙালিকে তিনি মাথায় তোলার সুযোগ করে দিয়েছেন। কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে বিশেষ্য বক্তৃতামালা দেবার আমন্ত্রণ জানিয়ে ধন্য হয়েছে।
পশ্চিমা দেশেও (যাদের আমরা সভ্য বলে আনন্দ পাই) এক প্রবণতা আছে। তরুণ আইনস্টাইন চাকরি চেয়ে নানান বিশ্ববিদ্যালয়ে দরখাস্ত করেছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়গুলি আবেদনের জবাব পর্যন্ত দেয় নি। আইনস্টাইন অতি বিখ্যাত হবার পর তাঁর চাকরির আবেদনগুলি বাঁধিয়ে অহঙ্কারের সঙ্গে প্রদর্শিত হচ্ছে। অহঙ্কারের বিষয় হলো, আইনস্টাইনের মতো লোক এই বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরির আবেদন করেছিলেন।
মানিক সাশ্যাপাধ্যায়ের কাছে ফিরে যাই। তাঁকে সম্মান দেখানোর আতিশয্যে এক প্রবন্ধকার লিখেছেন, সস্তাধারার জনপ্রিয় লেখক শরৎচন্দ্রকে পেছনে ফেলে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় এগিয়ে গেছেন কত দূর। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা মানেই পরাবাস্তবতা, জাদুবাস্তবতা ইত্যাদি।
সমস্যা হচ্ছে, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নিজের স্বীকারোক্তি আছে তিনি শরৎচন্দ্রকে কতটা শ্রদ্ধার চোখে সারাজীবন দেখেছেন। গবেষক সরোজ মোহন মিত্র তাঁর মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের জীবন ও সাহিত্য গ্রন্থে বলেছেন, মানিকের জীবনে শরৎচন্দ্রের প্রভাব ছিল অসীম।
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় শরৎচন্দ্রের চরিত্রহীন পড়ে অভিভুত ও বিচলিত হয়েছেন, তা লিখে গেছেন ‘সাহিত্য করার আগে’ নামের প্রবন্ধে।বেচারা শরৎচন্দ্রের সমস্যা, তাঁর রচনা সব বাঙালি মেয়েরা চোখের জল ফেলতে ফেলতে পড়ে। আমাদের ধারণা বহুলোক যা পছন্দ করে তা মধ্যম মাত্রার হবে। কারণ বেশির ভাগ মানুষের মেধা মধ্যম মাত্রার।
বাংলা ভাষার ঔপন্যাসিকদের প্রচুর ইন্টারভিউ পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়। একটি প্রশ্ন বেশির ভাগ সময়ই থাকে আপনার প্রিয় ঔপন্যাসিক কে? প্রশ্নের উত্তরে কেউ কখনো শরৎচন্দ্রের নাম দেন না। হয়তো ভয় করেন এই নাম দিলে নিজে মিডিওকার খাতায় নাম উঠাবেন।মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় কিন্তু কঠিন গলায় শরৎচন্দ্রের নাম বলতে দ্বিধা বোধ করেন নি। কারণ তিনি ভালোমতোই জানতেন তিনি যাই বলেন না কেন তাঁকে মিডিওকার ভাবার কোনো কারণ নেই।
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিয়ে আমি একটা লেখা শুরু করেছিলাম। কিছুটা লিখে থমকে গেছি। শুরুটা এরকম– সেটেলমেন্ট বিভাগের দরিদ্র কানুনগো হরিহর বন্দ্যোপাধ্যায়ের সর্বমোট ১৪টি সন্তান। পঞ্চমটির নাম প্রবোধ কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়। এই ছেলেটি পড়াশোনায় ভালো। প্রবেশিকা পরীক্ষায় গণিতে ডিসটিংশন নিয়ে প্রথম বিভাগে পাশ দিয়েছে। আইএসসিতে প্রথম বিভাগে পাশ করে অংকে অনার্স নিয়ে ভর্তি হয়েছে প্রেসিডেন্সি কলেজে।
হরিহর বাবু এবং তার স্ত্রী নীরদা সুন্দরী দেবী স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছেন এই ভেবে যে, পঞ্চমটির একটি গতি হয়ে গেল।সমস্যা বাঁধাল প্রবোধ কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ের কিছু বন্ধু। একদিন ক্লাসের ফাঁকে তুমুল তর্ক। তর্কের বিষয় বড় কোনো কাগজে নবীন লেখকদের লেখা ছাপা নিয়ে। তারা বলছে, নবীন লেখকদের লেখা সম্পাদকরা পড়েনই না।
প্রবোধ একা বলছে, নবীনদের কোনো ভালো গল্প পায় না বলেই ছাপা হয় না। ভালো গল্প পেলেই ছাপবে।অসম্ভব কথা।আয় আমার সঙ্গে বাজি রাখ। আমি একটা গল্প লিখে পাঠাব। কোলকাতার সবচেয়ে ভালো পত্রিকা বিচিত্রা। বিচিত্রাতেই পাঠাব। তারা অবশ্যই ছাপবে।তুই গল্প লিখবি?
বাজি জেতার জন্যে লিখ। আজ রাতেই লিখব।অঙ্কের বই সরিয়ে রেখে রাত জেগে গল্প লেখা হলো। গল্পের নাম অতসী মামী। লেখক হিসেবে প্রবোধ তাঁর ভালো নাম না দিয়ে মা তাঁকে যে নামে ডাকতেন সেই নাম দিলেন– মানিক।পৌষ সংখ্যা বিচিত্রায় (ডিসেম্বর ১৯২৮) অতসী মামী প্রকাশিত হলো। লেখকের নাম মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়।বাংলা কথাসাহিত্যের দিবাকর মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের যাত্রা শুরু অতসী মামীর হাত ধরে।
বিচিত্রা পত্রিকাতেই তাঁর আরো দুটি গল্প প্রকাশিত হয়। তিনি অঙ্কের বই পুরোপুরি শেলফে তুলে লিখতে শুরু করেন প্রথম উপন্যাস দিবারাত্রির কাব্য।সেবছরই তাঁকে কঠিন মৃগী রোগ কব্জা করে ফেলে। লেখার সময় Epilepsy-র আক্রমণ বেশি হয়। তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়ে থাকেন। একসময় জ্ঞান ফিরে, আবার লেখা শুরু করেন। ১৯৩৫ সালে মাত্র ২৭ বছর বয়সে লিখেন, পুতুলনাচের ইতিকথা।
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে আমার পরিচয় পুতুলনাচের ইতিকথা দিয়ে। পরিচয়ের ঘটনা বলা যেতে পারে। আমার আবার পোস্টিং তখন বগুড়ায়। আমি বগুড়া জিলা স্কুলে ক্লাস টেনে পড়ি। সেখানকার পাবলিক লাইব্রেরির নাম উডবার্ন পাবলিক লাইব্রেরি। লাইব্রেরির অবৈতনিক সিক্রেটারি একজন উকিল। অল্পবয়েসীরা লাইব্রেরি থেকে কী বই নিচ্ছে না নিচ্ছে সেই দিকে তাঁর তীক্ষ্ণ নজর। আমার হাত থেকে পুতুলনাচের ইতিকথা তিনি কেড়ে নিয়ে বললেন, এই বয়সে মানিক না পড়াই ভালো। বইটা কঠিন। অশ্লীলতাও আছে।
আমি বললাম, বইটা আমি আমার পড়ার জন্যে নিচ্ছি না। বইটা বাবা পড়তে চেয়েছেন। তাঁর জন্যে নিচ্ছি। আমার জন্যে নিয়েছি সুন্দরবনে আর্জান সরদার।বই নিয়ে বাসায় ফিরলাম। সঙ্গে সঙ্গেই পড়তে শুরু করলাম। উপন্যাসের শুরুটা কী অদ্ভুত।খালের ধারে প্রকাণ্ড বটগাছের গুঁড়িতে ঠেস দিয়া হারু ঘোষ দাঁড়াইয়া ছিল। আকাশের দেবতা সেইখানে তাহার দিকে চাহিয়া কটাক্ষ করিলেন।এই শুরুটা পড়ে আমি কিন্তু বুঝতে পারি নি যে হারু ঘোষের ওপর বজ্রপাত হয়েছে। সে পুড়ে কয়লা হয়ে গেছে। উপন্যাসের কী আশ্চর্য শুরু এবং কী আশ্চর্য লেখা।
পুতুলনাচের ইতিকথা নিয়ে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় মোটামুটি কঠিন সমালোচনার মধ্যে পড়েন। কমিউনিস্টরা বললেন, মানিক বাবু মানুষকে পুতুল হিসেবে দেখছেন। নিয়তির হাতের পুতুল। তা হতে পারে না। মানুষই তার নিয়তির স্রষ্টা। একজন লেখক সেই সত্যই লিখবেন। নিয়তির হাতে সব ছেড়ে দেবেন না।
যে যা বলে বলুক, আমার ধারণা বিশ্বসাহিত্যের শ্রেষ্ঠ রচনাগুলির মধ্যে এটি একটি। উপন্যাসটি আমাকে কতটুক আচ্ছন্ন করেছে তার প্রমাণ দেই। আমার উপন্যাস শ্রাবণ মেঘের দিনের প্রধান চরিত্র কুসুম। এই কুসুম এসেছে পুতুলনাচের ইতিকথা থেকে। শশী ডাক্তারের প্রণয়িনী। স্ত্রী শাওনকে আমি ডাকি কুসুম নামে। মনস্তাত্ত্বিকভাবে আমি তখন নিজেকে শশী ডাক্তার যে ভাবি না তা কে বলবে!
আমার মেজো মেয়ের নাম শীলা। এই নামটিও নিয়েছি মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছোটগল্প শৈলজ শিলা থেকে। গল্পের শেষে তিনি বলছেন—শৈলে যাহার জন্ম, শিলা যাহার নাম সে শিলার মতো শক্ত হইবে জানি কিন্তু রসে ডুবাইয়া রাখিলেও শিলা কেন গলিবে না ভাবিয়া মাথা গরম হইয়া উঠে।তাঁর কোন লেখা কেমন, কোন গ্রন্থে জাদুবাস্তবতা আছে, কোনটিতে নেই, এইসব তাত্ত্বিক আলোচনায় যাব না। সাহিত্যের সিরিয়াস অধ্যাপকদের হাতে এই দায়িত্ব থাকুক। আমি ব্যক্তি মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বিষয়ে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখতে চাচ্ছি।
নিঃসঙ্গ মানুষটার কোনো বন্ধু ছিল না। এতগুলি বই লিখেছেন, কাউকে কোনো বই উৎসর্গ করেন নি।এই পর্যন্ত লিখে আমি থমকে গেলাম। অন্যদের মতো আমিও কি মানুষটাকে গ্ল্যামারাইজড করার চেষ্টা করছি না? মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কোনো বন্ধু নেই। একজন কাউকে পান নি বই উৎসর্গ করার জন্যে, এটা তো তার ব্যর্থতা। কোনো অর্জন না।
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় পড়াশোনা বাদ দিয়ে সাহিত্যে নিজেকে সম্পূর্ণ নিবেদন করেন।–এই বাক্যটাতেও তাঁকে বড় করার প্রচ্ছন্ন চেষ্টা থাকে। মূল ঘটনা সেরকম না। তিনি দুবার B.Sc. পরীক্ষা দিয়ে ফেল করার পরই তাঁর ডাক্তার ভাই পড়াশোনার খরচ দেয়া বন্ধ করেন। বাধ্য হয়েই তাঁকে পড়াশোনায় ইতি টানতে হয়।
তাঁর কঠিন মৃগী রোগের চিকিৎসায় সেই সময়কার সবচেয়ে বড় চিকিৎসক এগিয়ে এসেছিলেন–ডাক্তার বিধান চন্দ্র রায়। তিনি তখন শুরু করেন মদ্যপান। এই সময় অতুল চন্দ্র সেনগুপ্তকে এক চিঠিতে লেখেন–
ডাক্তারের সব উপদেশ মেনে চলা বা সব অষুধ নিয়মিত খাওয়া সম্ভব হয় নি। কারণ অর্থাভাব এবং অতিরিক্ত খাটুনি। আজ এখন অষুধ খেয়ে ঘুমোলে কাল হাঁড়ি চড়বে না। খানিকটা এলকোহল গিললে কিছুক্ষণের জন্যে তাজা হয়ে হাতের কাজটা শেষ করতে পারব। এ অবস্থায় এলকোহলের আশ্রয় নেয়া ছাড়া গতি কি?
খোঁড়া যুক্তি। যারা মদ্যপান করেন তারা জানেন এই জিনিস কাউকে তাজা করে না। আচ্ছন্ন করে। বোধশক্তি নামিয়ে দেয়।আমার খুবই কষ্ট লাগে যখন দেখি এতবড় একজন যুক্তিবাদী লেখক নিজের জীবনকে পরিচালিত করেছেন ভুল যুক্তিতে।তাঁর শেষ সময়ের চিত্র শরৎচন্দ্রের চরিত্রের চিত্রের মতো। তাঁর নিজের লেখা চরিত্রের মতো না।
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় তখন আশ্রয় নিয়েছেন বস্তিতে। তাঁকে জাপ্টে ধরেছে চরম দারিদ্র, মদ্যপানে চরম আসক্তি এবং চরম হতাশা। তাঁকে দেখতে গেলেন কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়। অবস্থা দেখে তিনি গভীর বেদনায় মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্ত্রীকে বললেন, এমন অবস্থা! আগে টেলিফোন করেন নি কেন? মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্ত্রী অস্ফুট গলায় বললেন, তাতে যে পাঁচ আনা পয়সা লাগে ভাই।১৯৫৬ সনের ডিসেম্বর মাসে বাংলা কথাসাহিত্যের উজ্জ্বলতম নক্ষত্র মারা। যান। তাঁর বয়স তখন মাত্র ৪৮।
যদ্যপি আমার গুরু শুড়ি বাড়ি যায়
তদ্যপি আমার গুরু নিত্যানন্দ রায়।
এই লেখাটির জন্যে প্রতীক ও অবসর প্রকাশনার আলমগীর রহমান নানান বইপত্র দিয়ে সাহায্য করেছেন। তাঁকে আন্তরিক ধন্যবাদ।