কাঠপেন্সিল পর্ব:০৮ হুমায়ূন আহমেদ

কাঠপেন্সিল

কিছুদিন আগে একটা ছবি বানিয়ে শেষ করেছি। নিজেরই যৌবনকালের রচনা আমার আছে জল উপন্যাসের চিত্ররূপ। প্রযোজক চ্যানেল আই। ছবিতে শর্ত জুড়ে দেওয়া, লাক্স সুন্দরী প্রতিযোগিতায় যে মেয়েটি প্রথম হয়েছে সে-ই হবে নায়িকা। অভিনয় জানুক বা না-জানুক। কঠিন শর্ত। শর্ত মানার অর্থ হচ্ছে ঢেঁকির চেয়েও বেশি কিছু গেলা, রাইস মিল গেলা। আমি রাইস মিল গিলে ফেললাম। কারণ অর্থনৈতিক না, কারণ হৃদয়নৈতিক। লেখালেখি করতে গিয়ে যখন ক্লান্ত হয়ে পড়ি, তখন অন্যকিছু করতে ইচ্ছে করে।

ছবি বানানোর সময় আমার মধ্যে প্রবল ঘোর কাজ করে। এমনিতেই আমি ঘোরলাগা মানুষ। বাড়তি ঘোরে কঠিন নেশার অনুভূতি হয়। বড় ভালো লাগে।ছবি বানাতে প্রথম যে জিনিসটি লাগে তার নাম অর্থ। অর্থের পরেই লাগে একটা নিখুঁত চিত্রনাট্য। চিত্রনাট্য নিয়ে মোটেই মাথা ঘামালাম না। ভাবটা এরকম, আমারই তো ছাগল। ইচ্ছেমতো কেটেকুটে নিব। ছবির শুটিং শুরু হবে ফেব্রুয়ারির ২০ তারিখ থেকে। চিত্রনাট্য বাদ দিয়ে আমি করছি লেখালেখি। মধ্যাহ্ন উপন্যাসের দ্বিতীয় খণ্ড। আমার চিন্তা-চেতনায় মধ্যাহ্ন, আমার আছে জল না।

লেখালেখি শেষে চিত্রনাট্য নিয়ে বসলাম এবং প্রথম যে বাক্যটি উচ্চারণ করলাম তা হচ্ছে, খাইছে আমারে। পড়লাম গভীর জলে। নানানভাবে চেষ্টা করেও চিত্রনাট্য দাঁড় করাতে পারছি না। এদিকে দুয়ারে প্রস্তুত গাড়ি। গান লেখা হয়ে গেছে। গানে সুর দেওয়া হয়েছে। পাত্রপাত্রীরা তৈরি। ক্যামেরা, ক্রেন, ট্রলি, বৃষ্টি, জেনারেটর রেডি। রেডি না চিত্রনাট্য। আমি সারাদিন লিখি, সন্ধ্যাবেলায় যা লিখি ছিঁড়ে কুচিকুচি করি। পুত্র নিষাদ ছেড়া কাগজে হামাগুড়ি দিয়ে বড়ই আনন্দ পায়। আমি ভাবি, নিষাদের বয়সে ফিরে যেতে পারলে কত সুখেই না থাকতাম।

করুণাময় একসময় করুণা করলেন। একদিন অবাক হয়ে দেখি, চমৎকার একটি চিত্রনাট্য দাড় করে ফেলেছি। শাওনকে পড়তে দিলাম। সে পড়ে গম্ভীর হয়ে গেল। আমি বললাম, কোনো সমস্যা? সে বলল, হ্যাঁ, সমস্যা।কী সমস্যা? সে বলল, যে-কোনো অগা মগা বগা ডিরেক্টরকে এই চিত্রনাট্য দিলে সে সুন্দর ছবি বানিয়ে দিবে। ভালো ডিরেক্টর লাগবে না।

তার প্রশংসাবাক্য বড় ভালো লাগল। স্ত্রীর প্রশংসা পাওয়া যে কত জটিল বিষয় তা স্বামী মাত্রই জানেন।মহাবিপদ সংকেত (দশ নম্বর) চিত্রনাট্য তৈরি হবার পর মহাবিপদ সংকেতের ঘণ্টা বাজতে শুরু করল। ঘণ্টা আগেই বাজছিল। আমি নির্বোধ প্রকৃতির বলে বুঝতে পারি নি। একে একে শিল্পীরা ঝরে পড়তে শুরু করলেন।

প্রথমে সরে দাঁড়াল মাহফুজ। তাকে শুরুতে জামিল নামের একটি চরিত্রে নিয়েছিলাম। আলাভোলা টাইপ চরিত্র। পরে মনে হলো মাহফুজের চেয়ে জাহিদকে এই চরিত্রে ভালো মানাবে। মাহফুজকে মানাবে সাব্বির চরিত্রে। আমেরিকা প্রবাসী এক ফটোগ্রাফার। স্মার্ট, সুদর্শন। মাহফুজ বলল, না। সে জামিল ছাড়া অন্য চরিত্রে কাজ করবে না। তাকে অনেক বোঝালাম। সে বুঝল না।

মাহফুজ তার নানান কর্মকান্দ্রে অনেকবার আমাকে অনেক আনন্দ দিয়েছে, ঐদিনের কঠিন না সব আনন্দ ছাপিয়ে প্রবল বেদনায় আমাকে ঢেকে দিল। বারবার মনে হলো, আমি সবসময় আমার স্নেহ অপাত্রে দান করেছি। যেখানে আমার নিজের পুত্রকন্যাই আমার স্নেহ বুঝতে পারে নি, সেখানে দূরের মাহফুজ কী করে বুঝবে?

মাহফুজের পরেই ছিটকে সরে গেল রিয়াজ। তার করার কথা সাব্বির। রিয়াজকে যে মাহফুজের চেয়ে আমি কোনো অংশে কম স্নেহ করেছি তা না। ছেলেটির চেহারা যেমন সুন্দর আচার-ব্যবহারও সুন্দর। অতি মিশুক অতি আড্ডাবাজ মানুষ। ছবির জগতের মানুষদের কিছু অদ্ভুত হিসাব-নিকাশ থাকে। আমার ধারণা রিয়াজ অদ্ভুত হিসাবটা করল। সে ভাবল যেহেতু মাহফুজ সাব্বির চরিত্রটা করছে না কাজেই সেখানে নিশ্চয়ই কিন্তু আছে। রিয়াজ টেলিফোনে জানাল, যে-সময়ে আমার আছে জল-এর শুটিং হবার কথা সে-সময়ে তার অন্য একটা ছবির জন্য সময় দেওয়া। তার মনে ছিল না… ইত্যাদি।

বাকি থাকল চ্যালেঞ্জার। সেই বাকি থাকে কেন? একদিন জানলাম টাকাপয়সা বিষয়ক কিছু সমস্যা তার হচ্ছে। ইদানীং নাটক এবং টেলিফিল্ম করে যে টাকা সে পায় চ্যানেল আই তাকে তারচেয়ে অনেক কম টাকা দিচ্ছে। সে দশদিন কাজ করে এর থেকে বেশি টাকা পায়। সেখানে একমাস! চ্যালেঞ্জারকে আমি অনেকদিন ধরে চিনি। টাকাপয়সা তার কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ এরকম আমার কখনোই মনে হয় নি।

অবশ্যই টাকাপয়সা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। তারপরেও জীবন মাপার ব্যারোমিটার কখনোই অর্থ হতে পারে না। চ্যালেঞ্জারকে আমি নিজেই ছবি থেকে বাদ দিলাম। শাওন প্রবল আপত্তি করল। তার একটাই যুক্তি, চিত্রনাট্যে তুমি আইজি সাহেবের চরিত্র চ্যালেঞ্জারকে মাথায় রেখে তৈরি করেছ।

চ্যালেঞ্জারকে বাদ দিয়ে অন্য যাকেই তুমি নিবে তার মধ্যে চ্যালেঞ্জারকে দেখতে চাইবে। যখন দেখবে না, তখন নিজেরই খারাপ লাগবে। তুমি চ্যালেঞ্জারকে বাদ দিও না।আমি হাসতে হাসতে বললাম, তোমার যুক্তি মানলাম, কিন্তু তালগাছটি আমার। আমি চ্যালেঞ্জারকে বাদ দিলাম।কে করবে আইজি চরিত্র?

কাউকে না পাওয়া গেলে আমি নিজেই করব।পাগল হতে তোমার বেশি বাকি নেই।আমি বললাম, নিশ্চিন্ত থাকে। ছবি শেষ হবার আগেই পুরোপুরি পাগল হয়ে যাব।আমার সমুদ্রশয্যা দেখে শাওন খুবই চিন্তিত হয়ে পড়ল। একে টেলিফোন তাকে টেলিফোন– শিল্পী যোগাড় করা যায় কি না।

একরাতে হতাশ হয়ে চ্যানেল আই-এর হাসানকে টেলিফোন করে বললাম, চিত্রনাট্যটা তৈরি আছে। তুমি তৌকীর আহমেদকে চিত্রনাট্যটা দিয়ে ছবি করতে বলো। সে আগেও আমার চিত্রনাট্যে দারুচিনি দ্বীপ বানিয়েছে। ভালো বানিয়েছে। এবারেরটা আরো ভালো হবে। তৌকীর পরিচালনা করলে আইজি সমস্যার সমাধান হবে। আবুল হায়াত সাহেব আনন্দের সঙ্গেই আইজি করবেন।হাসান বিড়বিড় করে বলল, বিশ তারিখ থেকে শুটিং শুরু, আজ সতের তারিখ, এখন আপনি এইসব কী বলছেন?

সমস্যা সমাধানে এগিয়ে এলেন আসাদুজ্জামান নূর। শাওনকে তিনি মা ডাকেন। শাওন যখন করুণ গলায় বলল, নূর চাচা, হুমায়ুন আহমেদ মহাবিপদে পড়েছে। তার শরীর কত খারাপ সেটা তো আপনি জানেন। তাকে দেখলে মনে হয় যে-কোনো সময় হার্ট অ্যাটাক হবে। আইজি চরিত্রটি আপনি করে দিন, কিংবা আলী যাকের চাচাকে রাজি করান।

নূর বললেন, মা, তুমি হুমায়ূনকে দুশ্চিন্তা করতে নিষেধ করো। আমি বিশ তারিখের আগেই আলী যাকেরকে রাজি করাব। সে রাজি না হলে আমি তো আছিই। তুমি হুমায়ূনকে নিশ্চিন্ত মনে ঘুমাতে বলো।শাওন বলল, নুর চাচা থ্যাংক ইউ।

বলতে বলতে সে চোখ মুছল। গভীর আবেগে এবং আনন্দে তার চোখে পানি এসে গেছে। সে আমাকে ধরা গলায় বলল, এখন তোমার অশান্তি দূর হয়েছে তো? চলো কোনো ভালো রেস্টুরেন্টে গিয়ে দুজনে ডিনার করি। তুমি তো খাওয়াদাওয়াই ছেড়ে দিয়েছ।আমরা বিশাল সাইজের লবস্টার দিয়ে ডিনার সারলাম। রাতে খুব আরামের ঘুম হলো।

উনিশ তারিখ আসাদুজ্জামান নুর জানালেন, তিনি বা আলী যাকের দুজনের কেউই অভিনয় করতে পারবেন না।আমি শাওনের আহত এবং দুঃখিত মুখের দিকে তাকাতেই পারছিলাম না। সে করুণ গলায় বলল, চ্যালেঞ্জারকে বলি? আমাদের এত বড় বিপদে তিনি পাশে দাঁড়াবেন না এটা হতেই পারে না।আমি বললাম, না।ছবির কী হবে?

ছবি হবে। আগামীকাল থেকেই শুটিং। Countdown শুরু হয়েছে। মাঝখানে থামা যাবে না।আইজি চরিত্র কে করবেন? জানি না।আইজি চরিত্রে অভিনয় করার জন্যে এগিয়ে এলেন পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়। যে করুণা এই মানুষটি আমার প্রতি দেখিয়েছিলেন সেই করুণা যেন বহুগুণে এই মানুষটির প্রতি বর্ষিত হয়, তাঁর প্রতি এই আমার শুভ কামনা। গুরু নানক বলেছেন—

দুগুনা দত্তার

চৌগুনা জুজার

যে দুগুণ দেয় সে চারগুণ ফেরত পায়। গুরু নানকের এই বাক্যটি আমি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি।ফটোগ্রাফার সাব্বির ফটোগ্রাফার সাব্বির চরিত্রে অভিনয় করতে এগিয়ে এলেন চিত্র জগতের আরেক নায়ক ফেরদৌস। তার সঙ্গে আমি চন্দ্রকথা ছবিতে কাজ করেছি। চিত্রনায়কদের নায়কসুলভ সমস্যা থেকে সে বহুলাংশে মুক্ত। বিয়ের পর তার স্বভাবে এবং আচরণে অন্য ধরনের স্থিরতা এসেছে। আমার আছে জল ছবিতে সাতদিনের নোটিশে তাকে যে রাজি করিয়েছে তার নাম হাসান। হাসান এই দায়িতু পালন করে মহানন্দে ইউরোপ বেড়াতে চলে গেল। আমি এবং শাওন খুবই আনন্দ পেলাম। আমরা সাব্বির নামের কঠিন একটি চরিত্রে একজন Dependable আর্টিস্ট পেলাম।

ফেরদৌসকে অনেক শিডিউল (এ দেশে এবং পশ্চিমবঙ্গের) উলটপালট করতে হলো। তার মধ্যে যতটুকু ফাঁক পাচ্ছিল সে সিলেট থেকে বিমানে চলে যাচ্ছিল, অন্য সিডিউলে কাজ করে আবার ফিরে আসছিল।ফেরদৌসের একটা ছোট্ট গল্প বলার লোভ সামলাতে পারছি না। পাঠকরা জানেন কি না জানি না, ছবির সব নায়ক এবং নায়িকাদের আলাদা চেয়ার এবং বিশাল রঙিন ছাতা থাকে। নায়ক-নায়িকাদের সহকারীরা চেয়ার এবং ছাতা বহন করে।

আমি একদিন ভুল করে ফেরদৌসের চেয়ারে বসে পড়েছি। খুবই আরামদায়ক চেয়ার। ফেরদৌস ব্যাপারটা লক্ষ করল এবং সঙ্গে সঙ্গেই তার স্ত্রীকে টেলিফোন করল।স্যার আমার চেয়ারটায় বসে খুব আরাম পেয়েছেন বলে আমার মনে হয়েছে। তুমি তো এখন লন্ডনে। তুমি অবশ্যই লন্ডনের যে দোকান থেকে আমার এই চেয়ারটা কিনেছ, অবিকল সেরকম একটা চেয়ার কিনে সিলেটে পাঠাবার ব্যবস্থা করবে।

আমি ফেরদৌসের টেলিফোনের বিষয়ে জানি না। একদিন বিস্মিত হয়ে দেখি, একই রকম দুটা চেয়ার পাশাপাশি। ফেরদৌস বিনীত গলায় বলল, স্যার, এটা আপনার জন্যে। গহীন জঙ্গলে পাওয়া এই উপহার কিছুক্ষণের জন্যে আমাকে অভিভূত করে রাখল। মনে হলো সে আমার অভিনেতা না, আমারই ছেলে। বাবার বসার কষ্ট দেখে দূরদেশ থেকে একটা চেয়ার আনিয়েছে।

জাহিদ হাসান টিভির নায়করা যে চলচ্চিত্রের নায়কদের মতোই বিপদজনক সঙ্গী এই ধারণা জাহিদকে দেখে জন্মেছে। যেখানেই জাহিদ সেখানেই শত শত ভক্ত। কেউ জাহিদ ভাইয়ের কাঁধে হাত রেখে ছবি তুলবে। কেউ অটোগ্রাফ নেবে। রিকশাওয়ালা রিকশা নিয়ে যাচ্ছে, হঠাৎ জাহিদকে দেখে অতি পরিচিত ভঙ্গিতে বলবে, আরে জাহিদ ভাই। ভালো আছেন? মৌ আপু ভালো?

আমি জাহিদের মতো রসবোধসম্পন্ন মানুষ দ্বিতীয়টি দেখেছি বলে মনে পড়ে না। তাৎক্ষণিক Humour-এ তার জুড়ি নেই। তার রসিকতায় মুগ্ধ হয়ে কতবার যে হো হো করে হেসেছি।পাঠকরা কি জানেন, সে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে এবং ছাইপাশ খায় না? ছাইপাশ খাওয়া অভিনেতারা অভিনয়ের অঙ্গ মনে করেন, সেখানে একজন তা খায় না দেখে অবাক হয়েছি।

আমার আছে জল ছবিতে সে খুব ভালো অভিনয় করেছে। একটি অতি জটিল মনস্তাত্ত্বিক চরিত্র চমৎকার ফুটিয়েছে। তার অভিনীত একটি দৃশ্য মনিটরে (আমাদের এই ক্যামেরায় মনিটর আছে) দেখে আমার চোখে পানি এসেছে। আমি মনে মনে বলেছি, জিতে রহ ব্যাটা।

জাহিদের স্ত্রী মৌ এই ছবিতে কাজ না করেও সরব উপস্থিত ছিল। হলদিরামের সনপাপড়ি আমি আগ্রহ করে খাই জানতে পেরে সে শুটিং-এর পুরো সময় সনপাপড়ির সাপ্লাইয়ের দিকে নজর রাখল। আমি মনের সাধ মিটিয়ে সনপাপড়ি খেলাম।ছবি শেষ। সনপাপড়িও শেষ। জাহিদের সঙ্গে কথা ছিল ঢাকায় পৌঁছে সে সনপাপড়ির দোকানের ঠিকানা দেবে। ঢাকায় পৌঁছেই সে মোবাইল বন্ধ করে রেখেছে। মনে হচ্ছে সনপাপড়ির জন্যে আরেকটা ছবি পর্যন্ত আমাকে অপেক্ষা করতে হবে।

প্রথম রাতে বনবিড়াল বধ সব স্বামীই বিয়ের রাতে বিড়াল মারতে চান। বিড়াল নিয়ে আসেন। বিছানার পাশে বেঁধে রাখেন। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সেইসব বিড়াল স্ত্রীরা মেরে ফেলেন। বিড়ালবধি স্ত্রীদের হাতে স্বামীদের বাকি জীবন ভেড়া হয়ে থাকতে হয়।ছবির শুটিং এক ধরনের বিবাহ প্রক্রিয়া। কাজেই এই বিবাহ প্রক্রিয়ায় বিড়ালবধ জরুরি।

আমি ঠিক করে রেখেছিলাম, কোনো একটা কারণ বের করে শুটিং-এর প্রথম দিন খুব হৈচৈ করে এক পর্যায়ে বলব, কাজই করব না। প্যাক আপ। সবাই বুঝবে, বাপরে, এত কঠিন পরিচালক! আমাকে কারণ খুঁজতে হলো না। শুটিং-এর প্রথম দিন কারণ আপনাআপনি হাতে ধরা দিল।টিলাগাঁও রেলস্টেশনে শুটিং। আইজি সাহেব দলবল নিয়ে ট্রেন থেকে নামবেন। ক্যামেরা ওপেন হবে সাড়ে নটায়। আমি নটায় উপস্থিত হলাম। ক্যামেরাম্যান মাহফুজুর রহমান তার আগেই এসেছেন।

তিনি চিন্তিত ভঙ্গিতে চা খাচ্ছেন। তার চিন্তার কারণ শত শত মানুষ। এদের সরিয়ে শুট কীভাবে নেয়া হবে? চ্যানেল আই যে দুজনকে (প্রোডাকশন কন্ট্রোলার) সবকিছু দেখাশুনার দায়িত্ব দিয়ে পাঠিয়েছে তারা অনুপস্থিত। জানা গেল দুজনই ঘুমাচ্ছে। ঘুম ভাঙলে আসবে। ক্যামেরা চলে এসেছে, লাইটের লোকজন আসে নি। গাড়ি নেই। যে মাইক্রোবাস ক্যামেরা নিয়ে এসেছে সেটা নড়বে না। কারণ তাদের ওপর নাকি কঠিন নির্দেশ–ক্যামেরা ছাড়া এই মাইক্রোবাস আর কোনো কিছুই বহন করতে পারবে না।

ক্যামেরাম্যান মাহফুজুর রহমান বললেন, চা খান। রাগ কন্ট্রোলে রাখুন। আল্লাহপাক যা ঠিক করে রেখেছেন তারচেয়ে বেশি কিছু হবে না, কমও হবে না।চায়ে চুমুক দিয়ে আমার রাগ আরো বেড়ে গেল। জাহিদের শ্বশুরবাড়ির চায়ের মতো চা। মুখে দেওয়া যায় না (জাহিদের শ্বশুরবাড়ির চা আমি কখনো খাই নি। জাহিদ আমাকে বলেছে বাংলাদেশের সবচেয়ে খারাপ চা হয় তার শ্বশুরবাড়িতে)।

আমার চা পানে বিঘ্ন ঘটল। মধ্যবয়স্ক টাকমাথার এক ভদ্রলোক উত্তেজিত ভঙ্গিতে এগিয়ে এলেন, সিলেটি ভাষায় বললেন, আপনারা সিলেটের ঐতিহ্য নষ্ট করছেন। জীবন থাকতে আমি সিলেটের ঐতিহ্য নষ্ট করতে দিব না।ভদ্রলোককে সমর্থন দেবার জন্যে সমবেত জনতার এক অংশ বলল, অয় অয়। (অয় শব্দটির বাংলা মানে হ্যাঁ।আমি বললাম, ঐতিহ্য কীভাবে নষ্ট করেছি? সিলেটে কি ছবির শুটিং হয় না? হয়। কিন্তু ঐতিহ্য রক্ষা করার পর হয়।সমবেত জনতা বলল, অয় অয়।আমি বললাম, কী ঐতিহ্য নষ্ট করেছি?

স্টেশনের নাম টিলাগাঁও। আপনার সেই স্টেশনকে বানিয়েছেন সোহাগী। স্টেশনের ঐতিহ্য ভূলুণ্ঠিত হয়েছে।সমবেত জনতা গর্জে উঠল, অয় অয়।আমি তাকিয়ে দেখি, ঢাকা থেকে তৈরি করে আনা সোহাগী নামফলক বিভিন্ন দিকে বসে গেছে।ভদ্রলোক বললেন, শুটিং যদি করতেই হয় টিলাগাঁও নামে করতে হবে।আমি বললাম, লেখক তার বইয়ে স্টেশনের নাম দিয়েছেন সোহাগী। লেখকের অনুমতি ছাড়া অন্য নাম দেয়া যাবে না। সোহাগী নামই ব্যবহার করতে হবে।

লেখকের কাছ থেকে অনুমতি নেন। তাকে মোবাইল করেন।আমিই লেখক। আমি অনুমতি দিলাম না।আমার এই কথায় দর্শকদের এক অংশ হেসে ফেলল। ভদ্রলোক ছুটে বের হয়ে গেলেন।আমি ভাবছি, না জানি নতুন কী যন্ত্রণা অপেক্ষা করছে। মাহফুজুর রহমান ফিসফিস করে বললেন, সব সাইকোলজি প্রেডিক্ট করা মুশকিল। কী হয় না হয় কে জানে। সোহাগী নামফলক তুলে দিন। আমি বললাম, না।

ভদ্রলোক ফিরে এসেছেন। সঙ্গে আট ন বছরের দুটি শিশু। তারা আমার দুপাশে দাঁড়িয়ে ছবি তুলবে। আমি বললাম, এখানে চারদিন শুটিং করব। ছবি তোলার অনেক সময় পাবেন। আপাতত পাবলিক কন্ট্রোল করুন। ছবির কাজ যেন ঠিকমতো করতে পারি সেই ব্যবস্থা করেন। ভদ্রলোক বললেন, অয় অয়। এবং অতি ব্যস্ততার সঙ্গে জনগণকে সামলাতে লাগলেন। স্টেশনের ঐতিহ্যবিষয়ক জটিলতার এইখানেই সমাপ্তি।

দুপুর একটার দিকে চ্যানেল আই-এর প্রোডাকশন কন্ট্রোলার এবং তার সহকারী এসে উপস্থিত হলো। প্রোডাকশন কন্ট্রোলারের নাম কামাল, অন্যজনের নাম ভুলে গেছি। অন্যজনের মাথায় টাক। তার চেহারা এবং আচার-আচরণ ধূর্ত প্রকৃতির।আমি বললাম, তোমরা এত দেরিতে এসেছ? স্যার, রাতে ঘুম হয় নাই। ঘুমাচ্ছিলাম।ছবির মতো বড় ব্যাপারের সঙ্গে আগে যুক্ত ছিলে?

কামাল বলল, জি-না স্যার। এটাই আমার প্রথম চাকরি।আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে আছি। চ্যানেল আই-এর হাসান বলেছিল, স্যার, নিখুঁত ব্যবস্থা থাকবে। সব এক্সপার্ট লোকজন দেওয়া হবে। ক্যামেরা ঠিক হবার পর আপনাকে ডাকা হবে। আপনি শুধু বলবেন, ক্যামেরা। ক্যামেরা চালু হবে। আপনাকে সম্পূর্ণভাবে ঝামেলামুক্ত রাখার দায়িত্ব আমার।

আমি কামালকে বললাম, ছবির অতি জটিল এই কাজ করার কোনো অভিজ্ঞতা তোমাদের নেই। তোমাদেরকে দিয়ে আমার চলবে না। চ্যানেল আই এর একটি মাইক্রোবাস আমি দেখতে পাচ্ছি। এই মুহূর্তেই তোমরা এই মাইক্রোবাসে করে ঢাকায় চলে যাবে। বাকি কাজ আমি আমার লোকজন দিয়ে করাব।

দুজনই মনে হয় হাঁপ ছেড়ে বাঁচল। একসঙ্গে বলল, জি আচ্ছা স্যার। ঢাকায় চলে যাচ্ছি।বলেই লম্বা লম্বা পা ফেলে উধাও। আমি ভেবেই নিয়েছিলাম তারা চলে গেছে। কিন্তু সন্ধ্যার দিকে তাদেরকে আড়ালে আবডালে উঁকি দিতে দেখা গেল। তাদের ডেকে আবার যে ধমকাব সে ইচ্ছা করছে না। কারণ প্রথমদিনেই তিনটা সিকোয়েন্স করেছি। প্রতিটি সিকোয়েন্স চমৎকার হয়েছে। আমার মন প্রফুল্ল। কী আর হবে রাগারাগি করে!

প্রথম শট ছবির প্রথম শট সব পরিচালকের কাছেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ছবির কিছু কুসংস্কারের একটি হলো, প্রথম শট এক টেকে Ok হতে হয়। Ok হবার পর বিপুল করতালি, তারপরই যাত্রা শুরু। আমি অতিরিক্ত আবেগপ্রবণ বলেই প্রথম শটের পর যখন হাততালি হতে থাকে, তখন আমার চোখে পানি আসে। আমি ব্যস্ত খাকি চোখের পানি আড়াল করার চেষ্টায়।

আমার যেসব ছবিতে শাওন থাকে, তার প্রতিটির প্রথম শট তাকে নিয়ে করেছি। ব্যক্তিগত ভালোবাসা তার একটি কারণ। একই সঙ্গে প্রথম শট সে এক টেকে Ok করবেই এই বিশ্বাস। এই প্রথম আমার আছে জল ছবিতে শাওনকে বাদ দিয়ে প্রথম শটের জন্যে বেছে নিলাম সাড়ে তিন বছর বয়সী শিশুশিল্পী ওয়াফাকে। প্রথম শটে শাওনকে বাদ দিয়েছি বলেই কেউ আবার ভেবে বসবেন না যে আমাদের ঝামেলা শুরু হয়েছে। অনেকদিন মানবজমিন পত্রিকায় আমার কোনো নিউজ যাচ্ছে না। এবার হয়তো যাবে, শাওনের সংসারে আগুন। অসহায় শিশু নিষাদের কাস্টডি কে পাবে?

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *