কাঠপেন্সিল শেষ : পর্ব হুমায়ূন আহমেদ

কাঠপেন্সিল

শাওনকে প্রথম শটে না নেয়ার কারণ তার সঙ্গে শিল্পীর মেকাপ শেষ হয়। নি। অনেক সময় লাগবে। এতক্ষণ অপেক্ষা করার অর্থ হয় না। কাজেই শিশুশিল্পী শুয়াফা। শটটা এরকম–সোহাগী স্টেশনে সবাই নেমেছে। অপেক্ষা করছে কখন জিপ আসবে। তারা রওনা হবে ডাকবাংলোর দিকে। এই অবস্থায় সবার দৃষ্টি এড়িয়ে নিশাতের কন্যা টুনটুনি (ওয়াফা) নেমে পড়েছে রেললাইনে। হাতে দুধের বোতল। মাঝে মাঝে বোতলে টান দিচ্ছে। মনের আনন্দে রেল লাইন ধরে হাঁটাহাঁটি করছে।

শিশুশিল্পীদের নিয়ে কাজ করতে আমি অনেক স্বচ্ছন্দ বোধ করি। এরা মিমিক করায় ওস্তাদ। অনেকটাই রোবটের মতো। যা বলে দেয়া হবে তাই করবে। এক চুল এদিক-ওদিক হবে না। আমি বললাম, ওয়াফা, অ্যাকশন বলার সঙ্গে সঙ্গে তুমি বোতল হাতে রেললাইন ধরে হাঁটতে থাকবে। রেললাইনের তিনটা স্লিপার পার হবার পর থামবে। এইগুলিকে বলে স্লিপার। এক দুই তিন, এই জায়গায় থামবে। বোতলটা মুখে দিয়ে কিছুক্ষণ দুধ খাবে। তারপর উল্টোদিকে ফিরে হাঁটা ধরবে। আমি Stop না বলা পর্যন্ত হাঁটতেই থাকবে। পারবে?

পারব।ভুল হবে না? না।একবার করে দেখাও।সে করে দেখাল। নিখুঁতভাবে করল। তবে একবার ক্যামেরার দিকে তাকাল। ছবির ভাষায় বলা হয় False look. তাকে ভালোমতো বুঝিয়ে দেয়া হলো যেন ক্যামেরার দিকে না তাকায়।ক্যামেরা চালু করে অ্যাকশান বললাম। ওয়াফা কোনোরকম ভুল ছাড়া শট Ok করল। তুমুল করতালি চলছে। আমি Stop বলতে ভুলে গেছি। ওয়াফা হেঁটেই যাচ্ছে। এত হৈচৈ হচ্ছে সে একবারও ফিরে তাকাচ্ছে না।

শিশুশিল্পীদের দিয়ে অভিনয় করানোর কিছু সমস্যাও আছে। একটা উল্লেখ করি। ওয়াফার একটা শট এরকম–গরুর গাড়ি করে তারা যাচ্ছে। সে আছে মায়ের সঙ্গে। হঠাৎ দেখল একদল অতিথি পাখি উড়ে যাচ্ছে। দেখেই সে বলল, মা, দেখো দেখো, Birds! আমি বুঝিয়ে দিলাম, অ্যাকশান বলা মাত্রই তুমি বলবে, মা, দেখো দেখো, Birds! আচ্ছা।

অ্যাকশান বললাম, সে নিখুঁতভাবে বলল। শট শেষ হয়ে গেল। এরপর শুরু হলো বিপদ। অন্য সিকোয়েন্স হচ্ছে। যতবারই বলছি অ্যাকশান; ওয়াফা বলছে, মা, দেখো দেখো, Birds! আমি ভালোমতো বুঝলাম। বললাম, এখন থেকে অ্যাকশান বললে, তুমি শুধু মার দিকে তাকিয়ে থাকবে। মা কথা বলবে, তুমি শুনবে।

আচ্ছা।আমি বললাম, অ্যাকশান! ওয়াফা যথারীতি বলল, মা, দেখো দেখো, Birds! লাক্স সুন্দরী কথা লাক্স সুন্দরীর নাম মীম। আমি ধরেই নিয়েছিলাম মেয়েটি মুসলমান। আলিফ লাম মীমের মীম থেকে তার নাম। মেয়ের মা বললেন, (গলা নামিয়ে) স্যার, আপনার মতো অনেকেই মনে করে আমরা মুসলমান। আসলে আমরা হিন্দু। মীমের আসল নাম বিদ্যা সিনহা সাহা। চ্যানেল আই এবং আমরা অনেক কায়দা করে তার আসল নাম গোপন রেখেছি। হিন্দু জানলে তো কেউ তারে ভোট দেবে না। তাই নাকি? হ্যাঁ স্যার।তুমি কি সবাইকে এইসব কথা এখন বলে বেড়াচ্ছ? সবাইকে বলি না স্যার। যারা আপন তাদের বলি।

আমি মীমের মায়ের সরলতায় মুগ্ধ হলাম। মীম তার মার মতো সরল না, তবে জটিলও না। শিশুশিল্পীদের কাছ থেকে অভিনয় আদায়ের যে টেকনিক, আমি তার ক্ষেত্রেও সেই টেকনিক ব্যবহার করলাম। যা করতে বলা হবে অবিকল তাই করতে হবে। ডানে তাকাতে বললে ডানে তাকাবে। বামে তাকাতে বললে বামে। প্রতিটি step বলে দেওয়া।

কয়েকবার রিহার্সেল করা হলো। সে ঠিকমতো পারল। যখন ক্যামেরা চালু করা হলো তখন আর পারল না। আমি বললাম, আবার যদি ভুল কর আছাড় দিয়ে ট্রেন লাইনে ফেলে দেব। শুরু হলো কান্নাকাটি। আমি বললাম, চোখ মুছে শট দেবার জন্যে তৈরি হও।

মীমের কো-আর্টিস্ট জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায় এই পর্যায়ে এগিয়ে এলেন। তিনি আমাকে বললেন, হুমায়ুন! মেয়েটা কান্নাকাটি করছে। তাকে আধঘণ্টা সময় দিন। সে নিজেকে Compose করুক।আমি বললাম, না। আজ তাকে সময় দেওয়া হলে প্রতি শটেই সময় দিতে হবে। আজ যদি সে বের হয়ে আসে পরে আর সমস্যা হবে না।

আমি শট নিলাম। মীম উতরে গেল। তাকে নিয়েই আমার সব টেনশন। অভিনয়ের কোনো অভিজ্ঞতা ছাড়াই ছবির এত বড় এবং এত জটিল চরিত্রে কাজ করা কঠিন বিষয়। দিনের শেষে আমি বলব, ছবি দেখে কেউ বলতে পারবে না এটা মেয়েটার প্রথম কাজ।মেয়েটার বেশ কিছু প্লাসপয়েন্ট আছে—

১. সে ক্যামেরা ফ্রি।

২. সে ধৰ্মক ফ্রি। (ধমক খেয়ে কাজ করতে পারে)

৩. সে ভালো অনুকরণ করতে পারে।

তবে, তাকে প্রতিটি অংশ ধরিয়ে না দিলে সে কাজ করতে পারবে বলে আমার মনে হয় না। আমার আছে জল ছবিতে অভিনয় করার অভিজ্ঞতাটা সে কাজে লাগাতে পারে কি না তাও দেখার বিষয় আছে। যদি কাজে লাগাতে পারে তাহলে তার ভবিষ্যৎ ভালো।

তাকে ক্ষতি করেছে লাক্স সুন্দরী গ্রুমিং সেশন নামক কর্মকাণ্ড। তার মাথায় ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে–জীবনের সার কথা একটাই, নিজেকে সুন্দর দেখানো। সাজগোজেই সব।মেকাপম্যান মেকাপ দিয়েছে সে চলে গেছে নিজের ঘরে। বাড়তি কিছু মেকাপ দেওয়া। আরো সুন্দর হবার চেষ্টা।

তাকে অনেক বুঝানোর চেষ্টা করেছি। একদিন ডেকে বললাম, মীম! আমেরিকায় সবচে বেশি সাজগোজ করে বুড়িরী। ঠোঁটে রং, গালে রঙ, চুলে রঙ। তারপরেই আসে মধ্যবয়স্করা। তোমার মতো বয়েসী মেয়েরা কোনো সাজসজ্জাই করে না। তারা জানে বয়সের সৌন্দর্যেই তারা সুন্দর। তুমি যতই সাজবে ততই তোমাকে কৃত্রিম লাগবে। আমার আছে জল ছবির নায়িকা দিলশাদের মধ্যে কোনো কৃত্রিমত্তা নেই। সে জীবনের জটিলতা নিয়েই ব্যতিব্যস্ত। সে কিন্তু সাজতো না। বুঝেছ?

বুঝেছি স্যার।এরপর থেকে মেকাপম্যান যতটুকু মেকাপ দেবে তার বেশি কিছু করবে না। ঠিক আছে? জি স্যার, ঠিক আছে।বলেই সে ঘরে ঢুকে গেল। সারা মুখে আরো বাড়তি কিছু রঙচঙ দিতে, চোখ আঁকতে।মিউটিনি অন দ্য বাউন্টি শুটিং চলছে। সঙ্গে সঙ্গে বিদ্রোহের বীজ দানা বাঁধছে। দুটি দল তৈরি হয়েছে। একদিকে চ্যানেল আই অন্যদিকে গোটা শুটিং দল। শুটিং দলের নেতৃত্ব দিচ্ছে এফডিসির কামরুল। তার সঙ্গে পরোক্ষভাবে অনেকেই আছে। পরোক্ষ দলের একজন নুহাশ চলচ্চিত্রের জুয়েল রানা।

চ্যানেল আই নেতৃত্ববিহীন। চ্যানেল আই-এর প্রতি কামাল ভেজিটেবল টাইপ চরিত্র। সে কর্মকাণ্ড গোছানো নিয়েই ব্যতিব্যস্ত। তার সহকারীর (নাম মনে পড়েছে, হীরন) সব কর্মকাণ্ডই অস্পষ্ট। স্টিল চিত্রগ্রাহক নাসির চ্যানেল আই-এর। সে গুপ্তচর গোছের। তার কাজ চ্যানেল আই-এর ঢাকা অফিসকে মোবাইলে খবর সরবরাহ করা (ভুল খবর)।

এক ভোরে কামরুল উপস্থিত। দারুণ উত্তেজিত ভঙ্গিতে জানাল, সে পরিষ্কার বুঝতে পারছে কাজ শেষ হলে চ্যানেল আই কাউকে টাকাপয়সা দেবে না।আমি বললাম, চ্যানেল আই কোনো ছোটখাটো প্রতিষ্ঠান না। বিশাল প্রতিষ্ঠান। কমিটমেন্টের টাকা তারা দেবে না এটা কখনো হবে না।কামরুল নানান উদাহরণ দিতে লাগল। এক পর্যায়ে আমি বললাম, চ্যানেল আই টাকা না দিলে আমি নিজের পকেট থেকে দেব। এখন কি ঠিক আছে?

জি স্যার, ঠিক আছে।আমি আর কোনো সমস্যার কথা শুনতে চাই না।স্যার আর শুনবেন না।এর মধ্যে ইউরোপ থেকে হাসান ঢাকা ফিরেছে। আমি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছি। হাসান চলে এসেছে, আর সমস্যা হবে না। দূরে বসেও সব ঠিকঠাক করার জাদুকরী ক্ষমতা এই ছেলের আছে।হাসান দেশে ফেরায় সমস্যা কমল না, আরো বাড়ল। সে একদিন টেলিফোন করে (যথেষ্ট বিনয় এবং ভদ্রতার সঙ্গেই) বলল, ভাবি, শুটিং-এ এই অল্প কিছু দিনেই প্রচুর টাকা খরচ হয়ে গেছে। সাগর ভাই চিন্তিত। আপনি কি ব্যাপারটা দেখবেন?

শাওনের কাছ থেকে খবরটা পেয়ে খুব মন খারাপ হলো। ছবির খরচের পুরোটাই হচ্ছে চ্যানেল আই-এর হাতে। সেখানে খবরদারির কিছু নেই। তাহলে হাসানের কথার অর্থ কি এই যে, আমার কারণে অতিরিক্ত খরচের ব্যাপারটা ঘটছে।দারুচিনি দ্বীপে শুটিং-এর জন্যে হেলিকপ্টারের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। আমি হেলিকপ্টার ব্যবহার করি নি, চারটা গরুর গাড়ি গাজীপুর থেকে সিলেট নিয়ে গিয়েছি। কারণ সিলেটে গরুর গাড়ি নেই।

হোটেল শেরাটনে ছবির মহরত অনুষ্ঠানের কথা মনে পড়ল। সেই অনুষ্ঠানে ইউনিলিভারের কর্মকর্তা স্পষ্ট করে বলেছিলেন, ভালো ছবির নির্মাণে সব রকম আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে। এটা কি কথার কথা? সাধারণ একটি বিজ্ঞাপন তৈরির বাজেটে কি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র হয়?

চ্যানেল আই প্রতিবছর বেশ কিছু ছবি বানাচ্ছে। ছবির বাজেট হাস্যকর। পরিচালকরা চুক্তিভিত্তিক। মহানন্দে সেই বাজেটেই ছবি বানিয়ে দিচ্ছেন। এর থেকেই হয়তোবা চ্যানেল আই-এর ধারণা হয়েছে–এই বাজেটেই ছবি হয়।

অনেক আগে বানানো শ্রাবণ মেঘের দিন ছবিতে আমি খরচ করেছিলাম প্রায় এক কোটি টাকা (সে ছবিতে অবশ্যি আরো কিছু সমস্যা ছিল)।চন্দ্রকথা ছবিতে ৭৬ থেকে ৮০ লক্ষ টাকার মতো খরচ হয়েছে। অনেক টাকা চলে গেছে সেট বানানোতে।সব কিছুর দাম হুহু করে বাড়ছে, সেখানে কী করে চ্যানেল আই-এর বাজেটে ছবি হবে?

আমি কোনো পরামর্শদাতা না। তারপরেও গায়ে পড়ে ছোট্ট পরামর্শ দিচ্ছি। একজন লাক্স সুন্দরীর পুরস্কার ছবির নায়িকা হওয়া। ব্যাপারটা হাস্যকর। নায়িকা হওয়া অর্জনের বিষয়, পুরস্কারের বিষয় না। তিন থেকে চার বছর পর্যন্ত নির্বাচিত লাক্স সুন্দরী নাটক করবে, টেলিফিল্ম করবে। এদের ভেতর থেকে অভিনয়ে নিপুণ একজনকে নিয়ে প্রতি চার বছর পর ভালো বাজেটে একটা ছবি হবে।

বুঝতে পারছি আমি কোনো কাজের সাজেশন দিচ্ছি না। বর্তমান পৃথিবীর চালিকাশক্তি অর্থ। আমার আছে জল-এর বাইরে পড়ে না। ছবির অর্থের ব্যাপারটা ফয়সালা করবেন ইউনিলিভার, এশিয়াটিক এবং চ্যানেল আই। তারা অর্থনৈতিকভাবে সুবিধাজনক বিষয়টি বেছে নেবেন। ছবি কী হবে না হবে তা অনেক পরের ব্যাপার।তবে আমার শিক্ষা সফর সম্পন্ন।

বহুব্রীহি নামের একটা কমেডি ধাঁচের নাটক একবার বানিয়েছিলাম। সেই নাটকে একজন বোকা ডাক্তার ছিলেন। নাটক দেখে ডাক্তাররা এবং মেডিকেল কলেজের ছাত্র-ছাত্রীরা দারুণ ক্ষেপল। হয়তো তাদের ধারণা বাংলাদেশে কোনো বোকা ডাক্তার নেই। ডাক্তারদের এসোসিয়েশন (বিএমএ বা এই ধরনের কিছু) থেকে সিদ্ধান্ত হলো (!) যে, হুমায়ুন আহমেদ এবং তার পরিবারের কাউকে ডাক্তাররা চিকিৎসা সেবা দেবেন না! এই সময় আমার ছোট মেয়ে বিপাশার প্রচণ্ড দাঁতে ব্যথা। সে কাদঁতে কাঁদতে বলল, বাবা ডাক্তাররা তো আমার ব্যথা কমাবে না। এখন আমি কী করব?

আমি মেয়েকে কোলে নিয়ে গেলাম ডাক্তার রতনের কাছে (রতন ডেন্টাল ক্লিনিকের ডাক্তার রতন। তখন তিনি বোধহয় বিকল্প ডেন্টাল ক্লিনিকে ছিলেন, ঠিক মনে পড়ছে না) ডাক্তার রতনকে বললাম, আমার মেয়েটার প্রচণ্ড দাঁতে ব্যথা। আপনি কি তার চিকিৎসা করবেন না-কি তাকে নিয়ে দেশের বাইরে যেতে হবে?

ডাক্তার রতন বললেন, মা আসো আমার কোলে আসো। আগে কোলে নিয়ে আদর করি তারপর চিকিৎসা।তখনকার সেই অদ্ভুত সময়ে চারদিকে আমার কুশপুত্তলিকা দাহ করা হতে লাগল এবং আমার লেখা বইয়ে অগ্নিসংযোগ হতে লাগল। আমি খুবই মজা পেলাম।বহুব্রীহির আগে এইসব দিনরাত্রি নাটকে টুনিকে মেরে ফেলার জন্যে আমার জেলা ময়মনসিংহ শহরেও কুশপুত্তলিকা দাহ করা হয়েছিল।কুশপুত্তলিকা দাহের ব্যাপারটা সে কারণে আমার মাথার ভেতর ঢুকে আছে।

যখন খবর পেলাম চ্যানেল আই-এর হাসান আসছে সিলেটে আমার সঙ্গে দেখা করতে, তখন ভাবলাম মজা করা যাক–চ্যানেল আই-এর বিরুদ্ধে আমরা স্লোগান দেব এবং হাসানের একটা কুশপুত্তলিকা দাহ করা হবে।সবাই এই আইডিয়ায় যথেষ্টই মজা পেল। জাহিদ বলল, শহীদ মিনারের সামনে একবার তার কুশপুত্তলিকা দাহ করা হয়েছিল। কারণ সে একটা সিগারেট কোম্পানির বিজ্ঞাপনের মডেল হয়েছিল।

লাউয়াছড়ার গহীন অরণ্যে শুটিং হচ্ছে। হাসান শুটিং দেখতে গেল। শুটিং এর শেষে আমরা যথেষ্ট আনন্দ এবং হাততালির মধ্যে তার কুশপুত্তলিকা দাহ করলাম। হাসান হাসছে এবং হাততালি দিচ্ছে। হাসানের এই আনন্দ যে অভিনয় তখন বুঝতে পারি নি। আমাকে পরে জানানো হয়েছে, তার অধস্তন কর্মচারীদের সামনে তাকে অপমান করা হয়েছে। সে দারুণ আহত।

সমস্যা তার না, সমস্যা আমার। জীবনের হাস্যকর দিকটাই সবসময় আমার চোখে পড়ে। আমি রসিকতা করার চেষ্টা করি। এই রসিকতায় অন্যরা কষ্ট পাবে। এটা চট করে মাথায় আসে না। যখন বুঝতে পারি তখন আর শোধরানোর পথ থাকে না। আমার মনে থাকে না যে রসিকতা বন্ধুদের সঙ্গে করা যায়, কর্তাব্যক্তিদের সঙ্গে করা যায় না।

হাসানকে তরুণ বন্ধুই ভেবেছি, তাকে চ্যানেল আই-এর কর্তাব্যক্তি কখনো ভাবি নি। হাসানের কাছে Sorry বলা ছাড়া আর কী বলব? তবে হাসানের মনতুষ্টির জন্যে আমি নিজেই নিজের কুশপুত্তলিকা দাহের ব্যবস্থা করেছি। অনুষ্ঠানটি হবে নুহাশ পল্লীতে। আমার স্টাফদের সামনে। অনুষ্ঠানে আমি ইউনিলিভার, এশিয়াটিক ও চ্যানেল আই-এর কর্তাব্যক্তিদের (!) এবং আমার আছে জল-এর সকল কুশিলবদের নিমন্ত্রণ করলাম।আমার ধারণা অনুষ্ঠানটি যথেষ্ট আনন্দের হবে।

মজাদার ঘটনা

ছবির বিষয়ে যখনই কোনো সাংবাদিক রিপোর্ট করতে যান তখন তিনি গম্ভীর মুখে প্রশ্ন করেন, ছবিতে মজাদার কী ঘটনা ঘটেছে? আমাকে এ রকম কোনো প্রশ্ন এখনো কেউ করে নি। আগ বাড়িয়ে নিজেই বলছি।

প্রাচীন এক বটগাছের নিচে শুটিং হচ্ছে। মা (মুনমুন) এবং মেয়ে (শাওন) বটগাছের নিচে বসে কথা বলছে। মাস্টার শট নেয়া হয়ে গেছে। হঠাৎ ক্যামেরাম্যান মাহফুজ আমাকে ইশারায় একটা জিনিস দেখালেন। আমি হতভম্ব হয়ে দেখি দুই অভিনেত্রীর মাথার চার-পাঁচ ফুট ওপরে বটগাছের এক গর্ত থেকে একটি সাপ উঁকি-ঝুঁকি দিচ্ছে।

তার ভাবভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে যে-কোনো সময় সে গাছ বেয়ে নিচে নেমে আসবে এবং দুই অভিনেত্রীর সঙ্গে যুক্ত হবে।আমি ইশারায় মাহফুজকে বললাম, শুটিং বন্ধ করার দরকার নেই। শুটিং চলুক। সাপ যদি সত্যি নেমে আসে তখন দেখা যাবে। এই একটি দৃশ্যে আমি দুই অভিনেত্রী কী অভিনয় করছে তা দেখি নি, সারাক্ষণ তাকিয়ে ছিলাম সাপের দিকে।

এই ছবিতে অনেকগুলি গান আছে। গানের কোরিওগ্রাফিতে সাহায্য করার জন্যে যে ছেলেটি আছে তার নাম রহিম। কেউ তাকে নাম জিজ্ঞেস করলে সে অবশ্যি রহিম বলে না, বলে রয়। রহিম নামে মনে হয় তার মর্যাদা ঠিকমতো প্রকাশ পায় না। যাই হোক, একদিন দেখি সে ব্যস্ত হয়ে নিষাদকে নাচ দেখাচ্ছে। নিষাদের সামনে মুদ্রা করছে, কোমর দোলাচ্ছে। আমি বললাম, রয় শোন। আমার ছেলে বড় হয়ে গোঁফ কামিয়ে পুরুষ নৃত্যশিল্পী হবে এটা আমার ইচ্ছা না। তুমি এই কাজটা করবে না।রয় বলল, জি আচ্ছা স্যার।

সে মুখে বলল, জি আচ্ছা কিন্তু তার কর্মকাণ্ড চালিয়ে যেতে লাগল। নিষাদ মনে হয় ব্যাপারটায় মজা পেল। রয়কে দেখলেই সে হাত নাড়ায় এবং কোমর দোলানোর চেষ্টা করে।শুটিং অনেক দিন হলো শেষ হয়েছে, রয়ের ভূত নিষাদের ঘাড় থেকে নামে নি। কোথাও গান হলেই সে হাত নাড়ে এবং কোমর দোলানোর চেষ্টা করতে গিয়ে আছাড় খায়।

আমরা তিনটা জেনারেটার নিয়ে গিয়েছিলাম। জেনারেটারের একজন এসে বলল, তিনটা জেনারেটারের একটাতে ভূতের আছড় হয়েছে। এখন কী করা?আমি চোখ কপালে তুলে বললাম, জেনারেটরে ভূতের আছড় মানে? সে বলল, যে-ই জেনারেটারের আশেপাশে যাচ্ছে সে-ই আহত হচ্ছে। ছয় থেকে সাতজন বিনা কারণে আহত।আর কিছু?

ক্যামেরা যখন বন্ধ থাকে তখন ভোল্টেজ ঠিক থাকে কিন্তু ক্যামেরা চালু করলেই ভোল্টেজ আপ ডাউন হয়।ভূত তাড়ানোর কী ব্যবস্থা করতে হবে সেটা বলো।মুনসি মওলানা এনে ফুঁ দেওয়াতে হবে।মুনসি মাওলানা খবর দিয়ে আনো।

হযরত শাহজালাল (রাঃ) সাহেবের মাজার জিয়ারত আমরা যেখানে শুটিং করছি সেখান থেকে হযরত শাহজালাল (রাঃ) সাহেবের দরগা এক-দেড় ঘণ্টার পথ। একদিন শুটিং বন্ধ রেখে দলবেঁধে রওনা হলাম মাজার জিয়ারতে। নিষাদকে পায়জামা-পাঞ্জাবি এবং টুপি পরানো হলো। তাকেও যথেষ্ট উৎসাহী মনে হলো।নিষাদকে কোলে নিয়ে মাজার শরীফের দিকে যাচ্ছি, আমাকে জানানো হলো–শিশুদের প্রবেশ নিষেধ।আমি বিস্মিত হয়ে বললাম, কেন?

মেয়েশিশু তো কোনোক্রমেই ঢুকতে পারবে না। পুরুষশিশুরাও নিজে নিজে হাঁটতে না পারা পর্যন্ত ঢুকতে পারবে না।নিষাদ হাঁটার পরীক্ষা দিল। তিন-চার কদম নিজে হেঁটে থপ করে পড়ে গেল।নিতান্ত অনিচ্ছায় নিষাদকে ভেতরে ঢোকার অনুমতি দেয়া হলো। আমি ভাবছি, হযরত শাহজালাল (রাঃ) কি শিশুদের বিষয়ে এই নিষেধাজ্ঞা নিজে দিয়ে গেছেন? না-কি দরগার লোকজন এইসব অদ্ভুত নিয়ম বানিয়েছেন? আমাদের নবীজি যখন নামাজ পড়তেন তখন তাঁর গলা ধরে ঝুলত তাঁর নাতিরা।

হযরত শাহজালাল (রাঃ) সাহেবের মতো মহামানব মেয়েশিশু এবং পুরুষশিশুর মধ্যে ভেদাভেদ করবেন? তাদের কাছে আসতে দেবেন না? দরগার সেবায়েতরা একটি তথ্য ভুলে গেলেও হযরত শাহজালাল (রঃ) অবশ্যই কখনো ভুলেন না যে, তাঁরও জন্ম হয়েছিল এক মায়েরই গর্ভে। মেয়েরা কেন অচ্ছুৎ হবে?

পাদটিকা

ছবি শেষ। আমি সাড়ে তিন বছর বয়েসী অভিনেতা ওয়াফাকে বললাম, ওয়াফা! সবচে ভালো অভিনয় কে করেছে?ওয়াফা বলল, আমি।আমার আরেক শিশুশিল্পী মালিহাকে (বয়স চার) জিজ্ঞাসা করলাম, ভেবে চিন্তে বলো। এই ছবিতে সবচে ভালো অভিনয় কে করেছে? মালিহা অনেকক্ষণ চিন্তা করে বলল, স্যার আপনি।

একজনকে বিশেষ ধন্যবাদ সেই একজন শাওন। বিশেষ ধন্যবাদের কারণ ব্যাখ্যা করি। আমার আছে জল ছবির কোরিওগ্রাফারের নাম রতন। রতন ছবি শুরু হবার সাতদিন আগে জানাল সে কাজ করবে না। আমি শাওনকে সেই দায়িত্ব দিলাম।

সে বলল, আমি যখন অভিনয় করি তখন অন্যকিছু নিয়ে চিন্তা করতে পারি না।আমি বললাম, পারতে হবে।কোরিওগ্রাফির কাজটি সে করেছে। দর্শক দেখবেন কত ভালো করেছে।একই সঙ্গে মীমকে অভিনয় করার প্রতিটি বিষয় ধৈর্য ধরে দেখিয়েও দিয়েছে। তার একটাই কথা, মীম খারাপ করলে সে একাই সবাইকে টেনে নিচে নামিয়ে আনবে।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *