কানাইয়ের কথা – সত্যজিৎ রায়

কানাইয়ের কথা

নসু কবরেজ প্রায় পাঁচ মিনিট ধরে বলরামের নাড়ি ধরে বসে রইলেন। শিয়রের কাছে দাঁড়িয়ে বলরামের সতেরো বছরের ছেলে কানাই কবরেজের দিকে একদৃষ্টে চেয়ে আছে। আজ দশদিন হল তার বাপের অসুখ। কোনও কিছু খাবারে তার রুচি নেই; একটানা দশদিন না খেয়ে সে শুকিয়ে গেছে, তার চোখ কোটরে বসে গেছে, তার সর্বাঙ্গ ফ্যাকাশে হয়ে গেছে।

তিন ক্রোশ পায়ে হেঁটে কানাই নসু কবরেজের কাছে গিয়ে তাঁর হাতে পায়ে ধরে তাঁকে নিয়ে এসেছে তার বাপের চিকিৎসার জন্য। এ রোগের নাম কী, তা কানাই জানে না। কবরেজ জানেন কি? তাঁর চোখের ভ্রুকুটি দেখে কেমন যেন সন্দেহ হয়।মোট কথা, এ যাত্রা তার বাপ না বাঁচলে তার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়বে। আপন লোক বলতে তার আর কেউ নেই।

নন্দীগ্রামে দু বিঘে জমি আর একজোড়া হাল বলদ নিয়ে থাকে বাপব্যাটায়। খেতে যা ফসল হয় তাতে মোটামুটি দুবেলা দু মুঠো খেয়ে চলে যায় দুজনের। কানাইয়ের মা বসন্ত রোগে মারা গেছেন বছর পাঁচেক আগে, আর এখন বাপের এই বিদঘুঁটে ব্যায়াম।চাঁদনি, নাড়ি ছেড়ে মাথা নেড়ে বললেন কবরেজমশাই। নসু কবরেজের খ্যাতি অনেকদূর পর্যন্ত ছড়িয়েছে।

তাঁর নাড়িজ্ঞান নাকি যেমন-তেমন নয়। তিনি জবাব দিয়ে গেলে রোগীকে বাঁচানো শিবের অসাধ্যি, আর তিনি ওষুধ বাতলে গেলে রোগী চাঙ্গা হয়ে উঠবেই। কিন্তু চাঁদনি আবার কী? আজ্ঞে? ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল কানাই।চাঁদনি পাতার রস খাওয়াতে হবে, তা হলেই রোগ সারবে। সংস্কৃত নাম চন্দ্রায়ণী। আর রোগের নাম হল শুনাই।

চাঁদনি একটা গাছের নাম বুঝি? ঢোক গিলে জিজ্ঞেস করল কানাই।নসু কবরেজ ওপর-নীচে মাথা নাড়লেন দুবার। কিন্তু তাঁর চোখ থেকে ভ্রুকুটি গেল না।কিন্তু চাঁদনি তো যেখানে-সেখানে পাবে না বাপু, শেষটায় বললেন তিনি।তবে? বাদড়ার জঙ্গলে যেতে হবে।একটা পোডড়া মন্দির আছে মহাকালের।

তার উত্তরদিকে পঁচিশ পা গেলেই দেখবে চাঁদনি গাছ। কিন্তু সে তো প্রায় পাঁচ ক্রোশ পথ; পারবে যেতে? নিশ্চয়ই পারব, বলল কানাই। হাঁটতে আমার কোনও কষ্ট হয় না।কথাটা বলেই কানাইয়ের আরেকটা প্রশ্ন মাথায় এল।কিন্তু গাছ চিনব কী করে কবরেজমশাই? ছোট ছোট ছুঁচলো বেগনে পাতা, হলদে ফুল আর মন-মাতানো গন্ধ।

বিশ হাত দূর থেকে সে গন্ধ পাওয়া যায়। স্বর্গের পারিজাতকে হার মানায় সে গন্ধ। তিন-চার হাতের বেশি উঁচু নয় গাছ। একটি পাতা বেটে রস খাওয়ালেই আর দেখতে হবে না। ব্যারাম বাপ বাপ বলে পালাবে, আর শরীর দুদিনেই তাজা হয়ে যাবে। তবে সময় আছে আর মাত্র দশদিন। দশদিনের মধ্যে না খাওয়ালে… নসু কবরেজ আর কথাটা শেষ করলেন না।

আমি কাল সক্কাল-সক্কাল বেরিয়ে পড়ব, কবরেজমশাই, বলল কানাই। গণেশখুড়োকে বলব আমি যখন থাকব না তখন যেন বাবাকে এসে দেখে যায়। খাওয়ানো তো যাবে না বোধ হয় কিছুই? নসু কবরেজ মাথা নাড়লেন। সে চেষ্টা বৃথা। এ ব্যারামের লক্ষণই এই। পেটে কিছুই সহ্য হয় না, আর দিনে দিনে শরীর শুকিয়ে যেতে থাকে। তবে চাঁদনির রস এর অব্যর্থ ওষুধ।

আর, ইয়ে, ব্যারাম সারবার পর বাকি কথা হবে… পড়শি গণেশ সামন্তকে বাপের দিকে একটু নজর রাখার কথা বলে পরদিন ভোর থাকতে গুড়-চিড়ে গামছায় বেঁধে নিয়ে কানাই বেরিয়ে পড়ল বাদড়ার জঙ্গলের উদ্দেশে। পৌঁছতে পৌঁছতে সেই বিকেল হয়ে যাবে, কিন্তু কানাই পরোয়া করে না। বাপকে সে দেবতার মতো ভক্তি করে, আর বাপও ছেলেকে ভালবাসে প্রাণের চেয়েও বেশি।

দিব্যি সুস্থ মানুষটার হঠাৎ যে কী হল!–দেখতে দেখতে শুকিয়ে আধখানা হয়ে গেল।পথ জানা নেই, তাই একে তাকে জিজ্ঞেস করে করে চলতে হচ্ছে। বনের নাম শুনে সকলেই জিজ্ঞেস করে, কেন, সেখানে আবার কী? শুনে কানাই বুঝতে পারে বনটা খুব নিরাপদ নয়, কিন্তু তা হলে কী হবে? বাপের জন্য চাঁদনি পাতা জোগাড় করতে সে প্রাণ দিতে প্রস্তুত।

সূর্যি যখন লম্বা ছায়া ফেলতে শুরু করছে তখন একটা ধানখেতের ওপারে কানাই দেখল একটা গভীর বন দেখা যাচ্ছে। খেত থেকে এক কৃষক কাঁধে লাঙল নিয়ে বাড়ি ফিরছিল। তাকে জিজ্ঞেস করে কানাই জানল ওটাই বাদড়ার বন। কানাই পা চালিয়ে এগিয়ে চলল।শাল সেগুন শিমুলের সঙ্গে আর কত কী গাছ মেশানো ঘন বনে সুর্যের আলো ঢোকে না বললেই চলে।

এই বিশাল বনে তিন-চার হাত উঁচু গাছ খুঁজে পাওয়া কি চাট্টিখানি কথা? তবে কাছে মন্দির আছে, সেই একটা সুবিধে! বিশ-পঁচিশ হাত ভিতরে ঢুকতেই একটা হরিণের পাল দেখতে পেল কানাই। তাকে দেখেই হরিণগুলো ছুটে পালালো। হরিণ তো ভাল, কিন্তু জাঁদরেল কোনও জানোয়ার যদি সামনে পড়ে? যাই হোক, সে ভেবে কোনও লাভ নেই।

তার লক্ষ্য হবে এখন একটাই; প্রথমে মহাকালের মন্দির, তারপর চাঁদনি গাছ খুঁজে বার করা।মন্দির দেখতে পাবার আগে কিন্তু গন্ধটা পেল কানাই। তত জোরালো নয়; মিহি একটা গন্ধ, কিন্তু তাতেই প্রাণ জুড়িয়ে যায়।এবার একটা মহুয়া গাছ পেরিয়ে পোডড়া মন্দিরটা চোখে পড়ল। দিন ফুরিয়ে এসেছে, তবে মন্দিরের চারপাশটায় গাছ একটু পাতলা বলে পড়ন্ত রোদ এখানে-ওখানে ছিটিয়ে পড়েছে।

তুই কে রে ব্যাটা? প্রশ্নটা শুনে কানাই চমকে তিন হাত লাফিয়ে উঠেছিল। এখানে অন্য মানুষ থাকতে পারে এটা তার মাথাতেই আসেনি। এবার মুখ ঘুরিয়ে দেখল একটা গোলপাতার ছাউনির সামনে তিন হাত লম্বা সাদা দাড়িওয়ালা একটা লোক ভুরু কুঁচকে চেয়ে আছে তার দিকে।তুই যা খুঁজছিস তা এখানে পাবি না, এবার বলল বুড়ো কয়েক পা এগিয়ে এসে। সে কি মনের কথা বুঝতে পারে নাকি?

কী খুঁজছি তা তুমি জানো? জিজ্ঞেস করল কানাই।দাঁড়া দাঁড়া, একটু মনে করে দেখি। তোকে দেখেই বুঝতে পেরেছিলাম, কিন্তু এখন আবার মন থেকে হঠাৎ ফসূকে গেল। একশো ছাপ্পান্ন বছর বয়সে স্মরণশক্তি কি আর জোয়ান বয়সের মতো কাজ করে? বুড়ো মাথা হেঁট করে ডান হাত দিয়ে গাল চুলকে হঠাৎ আবার মাথা সিধে করে বলল, মনে পড়েছে।

চাঁদনি। তোর বাপের অসুখ, তার জন্য চাঁদনি পাতা নিতে এসেছিস তুই।ওই মন্দিরের উত্তর দিকটায় ছিল আজ দুপুর অবধি। কিন্তু সে তোর আর নেই! গিয়ে দেখ–শেকড় অবধি তুলে নিয়ে গেছে।কানাইয়ের বুক ধড়ফড় শুরু হয়ে গেছে। এতটা পরিশ্রম মাঠে মারা যাবে? সে মন্দির লক্ষ্য করে এগিয়ে গেল। উত্তর দিক। উত্তর দিক কোষ্টা? হ্যাঁ, এইটে। ওই যে গর্ত।

ওইখানে ছিল গাছ–শেকড় অবধি তুলে নিয়ে গেছে।কিন্তু কে? কানাইয়ের চোখে জল। সে বুড়োর কাছে ফিরে এল।কে নিল সে গাছ? কে নিল? রূপসার মন্ত্রী সেপাই-সান্ত্রী নিয়ে এসে গাছ তুলে নিয়ে গেছে। রূপসার প্রজাদের ব্যারাম হয়েছে–শুখনাই ব্যারাম–বিশদিনে না খেয়ে হাত পা শুকিয়ে মরে যায় তাতে। একমাত্র ওষুধ হল চাঁদনি পাতার রস।

কানাইয়ের আর কথা বলতে ইচ্ছা করছিল না। সে চোখে অন্ধকার দেখছিল। কিন্তু বুড়ো একটা অদ্ভুত কথা বলল।চাঁদনি এখানে নেই বটে, কিন্তু আমি যে দেখছি তোর বাপ ভাল হয়ে উঠবে।কানাই চমকে উঠল।তাই দেখছেন? সত্যি তাই দেখেছেন? কিন্তু ওষুধ না পেলে কী করে ভাল হবে? এ গাছ আর কোথায় আছে সে আপনি জানেন? বুড়ো মাথা নাড়ল।

আর কোথাও নেই। এই একটিমাত্র জায়গায় ছিল, তাও এখন চলে গেছে রূপসার রাজ্যে।সে কতদুর এখান থেকে? দাঁড়া, একটু ভেবে দেখি? বুড়ো বোধহয় আবার ভুলে গেছে, তাই মনে করার চেষ্টায় মাথা হেঁট করে টাক চুলকোতে লাগল।হ্যাঁ, মনে পড়েছে। ত্রিশ ক্রোশ পথ। বিশাল রাজ্য।এবার কানাইয়েরও মনে পড়েছে।

বলল, রূপসা মানে যেখানের তাঁতের কাপড়ের খুব নামডাক? ঠিক বলেছিস। রূপসার শাড়ি ধুতি চাদর দেশ-বিদেশে যায়। এমন বাহারের কাপড় আর কোথাও বোনা হয় না।আপনি এত জানলেন কী করে? আপনি কে? আমি ত্রিকালজ্ঞ। আমার নাম একটা আছে। তবে এখন মনে পড়ছে না। ভাল কথা, তোকে তো একবার রূপসা যেতে হচ্ছে।

চাঁদনির খোঁজ তোকে তো করতেই হবে।কিন্তু কবরেজ বলেছে দশদিনের মধ্যে বাপকে ওষুধ খাওয়াতে না পারলে বাপ আর বাঁচবে না। তার মধ্যে একদিন তো চলেই গেল।তাতে কী হল। যা করতে হবে ঝটপট করে ফেল।কী করে করব? ত্রিশ ক্রোশ পথ। সেখানে যাওয়া আছে, গাছ খুঁজে বার করা আছে, ফেরা। আছে…। দাঁড়া, মনে পড়েছে।

বুড়ো এবার তার কুটিরের মধ্যে ঢুকে একটা থলি বার করে আনল। তারপর তার থেকে তিনটে গোল গোল জিনিস বার করল–একটা লাল, একটা নীল, একটা হলদে।এই দ্যাখ, লালটা হাতে তুলে বলল বুড়ো। এটা একরকম ফল। এটা খেলে তুই হরিণের চেয়ে তিনগুণ জোরে ছুটতে পারবি। এক ক্রোশ পথ তোর যেতে লাগবে তিন মিনিট। তার মানে দেড় ঘণ্টায় তুই পৌঁছে যাবি রূপসা।

এই তিনটেই ফল, আর তিনটেই তোকে দিলাম।কিন্তু হলদে আর নীল ফল খেলে কী হয়? এই তো মুশকিলে ফেললি, বলে বুড়ো আবার মাথা হেঁট করে কিছুক্ষণ ভাবল। তারপর এপাশ-ওপাশ মাথা নাড়িয়ে বলল, উঁহু, মনে পড়ছে না। তবে কিছু একটা হয়, আর সেটা তোর উপকারেই লাগবে। যদি কখনও মনে পড়ে তবে তোকে জানাব।

কী করে জানাবে? আমি তো চলে যাব।উপায় আছে।বুড়ো আবার থলির ভিতর হাত ঢুকিয়ে এবার একটা ঝিনুক বার করল, সেটা প্রায় হাতের তেলোর সমান বড়। সত্যি বলতে কি, কানাই এতবড় ঝিনুক কখনও দেখেনি। ঝিনুকটা কানাইকে দিয়ে বুড়ো বলল, এটা সঙ্গে রাখবি। আমার কিছু বলার দরকার হলে আমি তোকে নাম ধরে ডাকব। তোর নাম কানাই তো? হ্যাঁ।

সেই ডাক তুই এই ঝিনুকের মধ্যে শুনতে পাবি। ওটা তোর ট্যাঁকে থাকলেও শুনতে পাবি। তারপর ঝিনুকটাকে কানের উপর চেপে ধরলেই তুই পষ্ট আমার কথা শুনতে পাবি। আমার কথা যখন শেষ হবে তখন ঝিনুকে শোনা যাবে সমুদ্রের গর্জন। তখন আবার ঝিনুকটা ট্যাঁকে খুঁজে রাখবি।

কানাই ঝিনুকটা নিয়ে তার ট্যাঁকেই রাখল। বুড়ো এবার চারিদিকে চোখ বুলিয়ে বলল, আজ তো সন্ধে হয়ে গেল। তুই এখন রূপসা গিয়ে কিছু করতে পারবি না। আমি বলি আজ রাতটা আমার কুটিরেই থাক, কাল ভোরে রওনা হবি। তা হলে ওখানে সারা দিনটা পাবি, অনেক কাজ হবে। আমার ঘরে ফলমূল আছে, তাই খাবি এখন।

কানাই রাজি হয়ে গেল। তার ইচ্ছে করছিল তখনই লাল ফলটা খেয়ে রওনা দেয়; বুড়োর কথা ঠিক কিনা সেটা পরখ করে দেখতে ইচ্ছা করছিল, কিন্তু সেটাকে সে দমন করল। সকালে রওনা দেওয়াই সবদিক দিয়ে ভাল হবে।ভাল কথা, বলল বুড়ো, মনে পড়েছে। আমায় লোকে জগাইবাবা বলে ডাকে। তুইও বলিস।

পরদিন সকালে লাল ফলটা খেয়ে জগাইবাবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে রাস্তায় পা দিতেই কানাই বুঝল তার গায়ের রক্ত যেন টগবগ করে ফুটছে। তারপর হাঁটতে গিয়ে দেখল হাঁটলে চলবে না–দৌড়তে হবে। সে দৌড় যে কী বেদম দৌড় সে আর কী বলব! রাস্তার দুপাশে গাছপালা।

ঘরবাড়ি মানুষজন গোরু ছাগল সব তীরবেগে বেরিয়ে যাচ্ছে উলটোদিকে, পায়ের তলা দিয়ে মাটি সরে যাচ্ছে শন শন করে, দুকানের পাশে বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দে কানে প্রায় তালা লাগে, দেখতে দেখতে দুদিকের দৃশ্য বদলে যাচ্ছে গ্রাম থেকে শহর, শহর থেকে মাঠ, মাঠ থেকে বন, বন থেকে আবার গ্রামে। পথে দুটো নদী পড়ল, মুহূর্তের মধ্যে সে নদী কানাইয়ের পায়ের তলা দিয়ে বেরিয়ে গেল, পায়ের গোঁড়ালিটুকুও ভিজবার সময় পেল না।

সূর্য মাথায় ওঠার আগেই কানাই বুঝতে পারল সামনে একটা বড় শহর দেখা যাচ্ছে। সে তখনই দৌড়নো বন্ধ করে হাঁটতে শুরু করল। বাকি পথটুকু এমনিভাবেই হেঁটে যাবে, নইলে অন্য পথচারীরা কী ভাববে? তাকে নিয়ে একটা হইচই পড়ে এটা কানাই মোটেই চায় না।শহরে ঢোকবার মুখে একটা তোরণ, তার দুদিকে দুজন সশস্ত্র সেপাই।

এটা আগে থেকে জানা ছিল না, তাই কানাইকে একটু মুশকিলেই পড়তে হয়েছিল। সেপাইরা কানাইকে দেখেই তার পথরোধ করতে গিয়েছিল, তাই নিরুপায় হয়ে কানাইকে সামান্য একটু দৌড় দিতে হয়েছিল। ফলে কানাই এমন একটা জায়গায় পৌঁছে গেল, যেখান থেকে তোরণটা এত দূরে যে, সেটাকে প্রায় দেখাই যায় না।আর কোনও ভাবনা নেই। কানাই এখন একটা বাজারের মধ্যে দিয়ে চলেছে।

দুদিকে দোকানপাট, তাতে নানারকম জিনিসের মধ্যে কাপড়ই বেশি, আর সেই কাপড়ের বাহার দেখেই কানাই তো থ! দেশ-বিদেশের লোকেরা সে কাপড় দেখছে, দর করছে, কিনছে। কিন্তু একটা। জিনিস দেখে কানাইয়ের ভারী অদ্ভুত লাগল। যারা সে কাপড় বেচছে তাদের কারুর মুখে হাসি নেই। আর, আরেকটা অদ্ভুত ব্যাপার হল, হাটের এখানে-সেখানে হাতে বল্লমওয়ালা সেপাইরা ঘোরাফেরা করছে।কানাইয়ের ভারী কৌতূহল হল।

সে একটা কাপড়ের দোকানে গিয়ে দোকানদারকে জিজ্ঞেস করল, এই শহরের নাম কি রূপসা? লোকটা মুখে কিছু না বলে কেবল মাথা লোকটা এপাশ-ওপাশ দেখে নিয়ে বলল, তুমি বুঝি ভিন দেশের লোক? কানাই বলল, হ্যাঁ; আমি সবে এখানে এলাম।তাই তুমি জানো না, বলল দোকানদার। এখানে মড়ক লেগেছে।মড়ক? শুখনাইয়ের মড়ক। এখন তাঁতিপাড়ায় লেগেছে, কিন্তু ছড়িয়ে পড়তে আর কতদিন? তাঁতির! সব না খেতে পেয়ে শুকিয়ে মরে যাচ্ছে।

কিন্তু– কানাই ওষুধের কথাটা বলতে গিয়ে বলল না। আশ্চর্য ব্যাপার!–-মন্ত্রী গিয়ে চাঁদনি গাছ নিয়ে এসেছে, তাও তাঁতিদের কেন অসুখ সারছে না? এই গাছের পাতায় কি তা হলে কাজ দেয় না? একটা আস্ত গাছে কত পাতা হয়? চার-পাঁচশো তো বটেই। তার একটা খেলেই একটা লোকের। অসুখ সারার কথা। কিন্তু সে গাছ তা হলে গেল কোথায়? কানাই উঠে পড়ল।

তার মনে পড়ে গেছে যে এখানে আসার একমাত্র উদ্দেশ্য হল চাঁদনির পাতা জোগাড় করা। কিন্তু সেই গাছ তার নাগালে আসবে কী করে? মস্ক্রিমশাই সে গাছ কোথায় রেখেছেন সেটা সে জানবে কী করে? কানাই হাঁটতে আরম্ভ করল। বাজার ছাড়িয়ে সে দেখল একটা পাড়ার মধ্যে এসে পড়েছে। এখানে চারিদিক থেকে কান্নার আওয়াজ আসছে।

এটাই কি তাঁতিপাড়া? রাস্তার ধারে একটা বুড়ো বসে আছে দেখে কানাই তার দিকে এগিয়ে গেল।হ্যাঁ গো, এটা কি তাঁতিপাড়া? কানাই জিজ্ঞেস করল।বুড়ো মাথা নেড়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, এটাই তাঁতিপাড়া। তবে তাঁতি আর এখানে বেশিদিন নেই। চারটে করে তাঁতি রোজ মরছে ব্যারামে। শশী গেল, নীলমণি গেল, লক্ষ্মণ গেল, বেচারাম গেল–আর কি! এ রোগের তো কোনও চিকিৎসা নেই।

আমায় এখনও ধরেনি রোগে, তবে ধরতে আর কত দিন? চিকিৎসা নেই বলছ কেন? একটা গাছের পাতার রস খেলেই তো এ ব্যারাম সারে। সে গাছ তো তোমাদের মস্ক্রিমশাই বাদড়ার জঙ্গলে গিয়ে নিয়ে এসেছেন।তাঁতিদের তাতে লাভটা কী? সে গাছ তো মন্ত্রিমশাই আমাদের দেবেন না।কেন, দেবে না কেন?

 

Read more

 

কানাইয়ের কথা (২য় পর্ব) – সত্যজিৎ রায়

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *