কিছুক্ষণ- হুমায়ূন আহমেদ -(পর্ব-১২)

মন্ত্রী মহােদয়ের বুক জ্বালা করার কারণ এসিডিটি না। তিনি এই মাত্র জেনেছেন তার মন্ত্রীত্ব নেই। আসল জায়গা থেকে খবর এখনাে আসেনি। যে জায়গা থেকে এসেছে সেটাও নির্ভরযােগ্য। তিনি ইচ্ছা করলেই আরাে কয়েকটা টেলিফোন করে মূল সত্যটা জানতে পারেন। এই মুহূর্তে ইচ্ছা করছে না। 

কিছুক্ষণমন্ত্রী মহােদয়ের স্ত্রী সুরমা হাতে টমেটো জুস নিয়ে এগিয়ে এলেন। আহ্লাদি গলায় বললেন, এই, গান কখন শুরু হবে? যমুনা আর তার বর গান শুনতে চাচ্ছে। 

যমুনা সুরমার ছােট বােন। গত সপ্তাহে সেনাকুঞ্জে তার বিয়ে হয়েছে। বিয়ের পর তার মন্ত্রী দুলাভাই তাদের দেশের বাড়িতে বেড়াতে নিয়ে যাচ্ছেন। আনন্দ ফুর্তি করতে করতে যাওয়া হবে ভেবেই ট্রেনে যাওয়া হচ্ছে। সেলুন 

কারে নানান আনন্দ ফুর্তির ব্যবস্থা। একটা ব্যান্ড দল যাচ্ছে। ব্যান্ডের নাম Hungry। ভিডিও ম্যান যাচ্ছে। তার দায়িত্ব ভিডিও করা। কোনাে আনন্দ যেন বাদ না পড়ে। ঢাকা ক্লাব থেকে একজন বারটেনডার নেয়া হয়েছে যে ককটেল বানানােয় ওস্তাদ। সম্প্রতি সুরমার ককটেল আসক্তি হয়েছে। তিনি বিশেষ বিশেষ পার্টিতে ককটেলের ব্যবস্থা রাখেন। সিঙ্গাপুর থেকে ককটেল বানানাের উপর একটা বইও কিনেছেন। তাঁর ইচ্ছা আজ বই দেখে কয়েকটা 

আইটেম বানাবেন। 

সুরমা বললেন, এই, কথা বলছ না কেন? গান কি শুরু হবে? মন্ত্রী শুকনাে গলায় বললেন, হুঁ। তােমার শরীর খারাপ না-কি? এসিডিটি হচ্ছে। 

সুরমা উদ্বিগ্ন গলায় বললেন, এন্টাসিড খেয়ে এক গ্লাস ঠাণ্ডা দুধ খাও। দুধ নিয়ে এসেছি। দেব? 

দাও। একটু আগে টেলিফোন কে করেছে? অফিস থেকে। 

কিছুক্ষণ- হুমায়ূন আহমেদ

সুরমা বিরক্ত গলায় বললেন, তারা কি একটা সেকেন্ডের জন্যে তােমায় বিশ্রাম দেবে না! দিন রাত কাজ করতে হবে? মােবাইলটা অফ করে রাখতাে। মন্ত্রী তাে আরাে আছে। একমাত্র তােমাকেই দেখলাম জীবনটা দিয়ে দিচ্ছ। নেত্রীর এত কাছের যে সালাম সাহেব সন্ধ্যার পরেইতাে সে বােতল নিয়ে বসে। তখন তার টিকির দেখা পাওয়া যায় না। 

মন্ত্রী বললেন, থামতাে। 

সুরমা বললেন, থামব কেন? সত্যি কথা বলতে আমি ভয় পাই না। আমি সালাম সাহেবের মুখের উপর এই কথা বলতে পারব। তার স্ত্রী গত এক মাসে তিনবার বিদেশ গিয়েছে। বেইজিং থেকে একটা খাট কিনে এনেছে একুশ হাজার ডলার দামে। টাকা কোত্থেকে আসে আমি জানি না? আমি চামচে দুধ খাওয়া মেয়ে না। | সুরমা টমেটো জুসের গ্লাস নিয়ে খাস কামরার দিকে রওনা হয়েছেন। যমুনা তার স্বামী ফয়সলকে নিয়ে সেই কামরাতেই আছে। দুজন হাত ধরাধরি করে বসা ছিল। সুরমাকে দেখে হাত ছেড়ে দিল। সুরমা বললেন, ফয়সল 

তুমি আমাকে দেখে লজ্জা পাচ্ছ কেন বল তাে? স্ত্রীর হাত ধরে বসে থাকবে না তাে কার হাত ধরে বসবে। আমার মধ্যে কোনােরকম ‘প্রিজুডিস’ নেই। (সুরমার পড়াশােনা ক্লাস সিক্স পর্যন্ত। তার দ্রুত উন্নতি হয়েছে। কথাবার্তায় তিনি এত চমৎকার করে ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করেন যে তাঁর শিক্ষা দিক্ষা নিয়ে বিভ্রান্ত হতে হয়। প্রিজুডিস শব্দটা গত সপ্তাহে শিখেছেন—এর অর্থ মন খােলা। যে কোনাে কিছুতেই কিছু মনে করে না।) সুযােগ পেলেই সুরমা প্রিজুডিস শব্দটা ব্যবহার করেন। যাতে সড়গড় হয়ে যায়। 

কিছুক্ষণ- হুমায়ূন আহমেদ

সুরমা বসতে বসতে বললেন, ফয়সল এক গ্লাস টমেটো জুস খাবে? খেয়ে দেখতে পার। সামান্য ভদকা দেয়া হয়েছে টমেটোর গন্ধ দূর করার জন্যে। এরা ব্লাডি মেরী না-কি-কি যেন বলে। 

ফয়সল বলল, খেয়ে দেখতে পারি। 

যমুনা বলল, বড়পা, ও খেলে আমাকেও একটু দিতে হবে। আমি কোনদিন ভদকা খাইনি আজ খেয়ে রাশিয়ান হয়ে যাব। আমার নাম হবে যমুনাভস্কি।। 

সুরমা বললেন, তুই ভদকা খাবি মানে পাগল নাকি? 

এইসব বললে হবে না, আমিও এক চুমুক খাব। এক চুমুক খেলে কি হয়? আমি যমুনাভস্কি হব।। 

সুরমা বললেন, ঠিক আছে তােকে দেব এক গ্লাস। ঘ্যান ঘ্যান বন্ধ করে তাের দুলাভাইকে এক গ্লাস দুধ দিয়ে আয়। ওর এসিডিটি হচ্ছে। কোনাে বিশ্রাম নাই কিছু নাই শুধু কাজ আর কাজ—এসিডিটিততা হবেই। একটু 

বেড়াতে যাচ্ছে এরমধ্যেও টেলিফোনের পর টেলিফোন ।। 

যমুনা বলল, আপা দুলাভাইকে বল মােবাইল সেটটা জানালা দিয়ে ফেলে দিতে। ময়মনসিংহ পৌছে আরেকটা কিনে নেবে। 

কিছুক্ষণ- হুমায়ূন আহমেদ

সুরমা বললেন, তুই যে কি পাগলের মতাে কথা বলিস। দিনের মধ্যে দশবার প্রধানমন্ত্রী টেলিফোন করেন। সেট ফেলে দিলে উনার কল কে রিসিভ করবে? প্রধানমন্ত্রীর সবচে কাছের মানুষ বলতে এখন সে। 

মন্ত্রী মহােদয়ের কাছে টেলিফোন এসেছে। টেলিফোন করেছে তার বড় ছেলে ইমতিয়াজ। ইমতিয়াজের গলার স্বর চাপা। ভীত ভাবও আছে।  

বাবা! 

ভাল আছ বাবা? 

আমার বিষয়ে কেউ কি তােমাকে টেলিফোন করেছে? 

তুই কি নতুন কোনাে ঝামেলা পাকিয়েছিস? উহু। বাবা তােমরা কি মজা করছ? গানের দলটা কেমন?

 

Read more

কিছুক্ষণ- হুমায়ূন আহমেদ -(পর্ব-১৩)

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *