কিছুক্ষণ- হুমায়ূন আহমেদ -(পর্ব-১৬)

আপনি যদি কিছু মনে না করেন—আমি রাতে আপনার মা’র সঙ্গে থাকব না। 

আশহাব বলল, মা’র সমস্যা একটাই কথা বলা। এ ছাড়া তার আর কোনাে সমস্যা নেই। 

বুঝতে পারছি, আমার ভাল লাগছে না। আপনি আপনার মা’র কাছে যান। তিনি অপেক্ষা করছেন। আপনারা মাতা-পুত্র খাওয়া দাওয়া করুন। এর মধ্যে আমাকে ডাকবেন না প্লিজ।

কিছুক্ষণআমি বুফে কারে খাব। অর্ডার দিয়ে রেখেছি। আপনারা মাতা-পুত্রের মিলন দৃশ্য দেখার আগ্রহ যেমন আমার নেই, বিচ্ছেদ দেখার আগ্রহও আমার নেই। 

মা আপনাকে ছাড়া খাবে না। 

ব্যবস্থা করুন যেন খায় । প্লিজ। 

আশহাবকে করিডােরে দাঁড় করিয়ে চিত্রা এগিয়ে গেল। তার সত্যিই অসহ্য লাগছে। মােবাইল টেলিফোনে পিং পিং শব্দ হচ্ছে। নিশ্চয়ই লিলি । 

a fogt! Hello! Hello! ফান হচ্ছে? খুব ফান হচ্ছে। ফানে ডুবে আছি। নাক পর্যন্ত ফান। বাবারে একটু ধৈর্য্য ধর। ময়মনসিংহ জংশনে গাড়ি থামবে তুই চলে যাবি স্যালুনে। রাণীর মত থাকবি। 

একবারতাে বলেছিস। বার বার একই কথা শুনতে ভাল লাগে না। এতাে রেগে আছিস কি জন্যে? এক মহিলা আমাকে বৌমা ডাকছেন। 

সে কি! কেন? তাের চেহারা কি মহিলার অতি আদরের বৌমার মতাে যে সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে মারা গেছে। বাংলা সিনেমা? 

চুপ কর তাে। উনি মেন্টাল পেশেন্ট! 

ওহ মাই গড। রাতে ঐ মহিলার রুম আমার শেয়ার করার কথা। 

কিছুক্ষণ- হুমায়ূন আহমেদ

ভুলেও ঐ কর্ম করবি না। শত হস্ত দূরেত থাকিথং। অর্থাৎ শত হস্ত দূরে থাকবি। নয়ত দেখা যাবে রাতে সে তােকে গলা টিপে মেরে ফেলার চেষ্টা করছে। 

উপদেশের জন্যে ধন্যবাদ। ম্যাথমেটিশিয়ানের সঙ্গে কথা হয়েছে? এখনাে না। 

বুড়ােরা তরুণী মেয়েদের সঙ্গে গল্প করতে খুব পছন্দ করে। মজার মজার গল্প বলে এরা তরুণীদের ভুলাতে চায়। তুই এককাজ কর। বুড়াের সঙ্গে গল্প করতে করতে চলে যা। তাের জায়গায় আমি থাকলে বুড়াের সঙ্গে এমনই গল্প জমাতাম যে বুড়াে ভাবতাে—কিয়া মজা। খাব ব্যাঙ ভাজা। মেয়ে তাে আমার প্রেমে ডুব সাঁতার দিচ্ছে। 

লিলি আমার ধারণা তুই ভাবছিস যে খুব মজার কথা বলছিস। তাের কথাবার্তায় হিউমার ঝড়ে পড়ছে। ব্যাপারটা সে রকম না। তুই একই ভঙ্গিতে সবার সঙ্গে কথা বলিস। তাের কথাবার্তায় সামান্যতম ভেরিয়েসন নেই। 

তাের কথায় ভয়ংকর দুঃখ পেলাম। দুঃখে মরে যেতে ইচ্ছা করছে। এই দেখ মরে যাচ্ছি ওয়ান টু থ্রী। বলেই লিলি মােবাইল অফ করল। চিত্রা বলল, থ্যাংক গড় । 

মন্ত্রী সাহেবের সেলুন কারে আরাে একজন বলল, থ্যাংক গড। সেই একজন মন্ত্রী সাহেবের আদরের শ্যালিকা যমুনা। তার থ্যাংক গড বলার কারণ গান বাজনা শুরু হতে যাচ্ছে। ব্যান্ডের লম্বা চুলের ছেলে মাথা ঝাঁকিয়ে নিজেকে তৈরি করছে। সে অস্বাভাবিক চিকন গলায় বলল, শুরু করব Fusion Tagore দিয়ে। 

কিছুক্ষণ- হুমায়ূন আহমেদ

ব্যান্ডের সুরে রবীন্দ্র সংগীত নামে নতুন এক জিনিস শুরু হয়েছে। এর মধ্যে কিছু ইংরেজি এবং হিন্দি কথাবার্তাও আছে। মহা Fusion যাকে বলে। অল্প সময়ে তরুণ তরুণীদের হৃদয় এই সঙ্গীত হরণ করে নিয়েছে। ব্যান্ডের পরিচালক যমুনার দিকে তাকিয়ে বলল, আপা এই গানটায় সবাইকে অংশ নিতে হবে। 

যমুনা বলল, কি ভাবে অংশ নিব? আমি তাে গান জানি না। গান জানতে হবে না গানের মাঝখানে যতবার আমি হাততালি দেব ততবার আপনারা সবাই বলবেন—‘ঠেকাই মাথা। হাতের ইশারা না করা পর্যন্ত ঠেকাই মাথা বলতেই থাকবেন। সুর নিয়ে চিন্তা করবেন না। যে ভাবে বলতে চান—বলবেন। 

যমুনা আনন্দিত চোখে স্বামীর দিকে তাকিয়ে বলল, কি মজা। এই মজা 

যমুনার স্বামী বলল, মজা বলেইতাে মনে হচ্ছে। যমুনা তার বােনের দিকে তাকিয়ে বলল, দুলাভাই জয়েন করবে না? সুরমা বললেন, ওর শরীরটা খারাপ। ঐ যে এসিডিটি প্রবলেম। যমুনা বলল, কয়েকবার ঠেকাই মাথা করলে এসিডিটি ঠিক হয়ে যেত। সুরমা বললেন, তােরা শুরু কর আমি ওকে নিয়ে আসব। সংগীত শুরু হয়েছে— 

ও আমার দেশের মাটি তােমার পরে ঠেকাই মাথা। 

ঠেকাই মাথা, ঠেকাই মাথা, ঠেকাই মাথা, ঠেকাই মাথা। 

তােমাতে বিশ্বমায়ের আঁচল পাতা ঠেকাই মাথা, ঠেকাই মাথা, ঠেকাই মাথা, ঠেকাই মাথা। 

My head down on your feet Mother, mother, mother, mother. ঠেকাই মাথা, ঠেকাই মাথা, ঠেকাই মাথা, ঠেকাই মাথা। 

কিছুক্ষণ- হুমায়ূন আহমেদ

সংগীত জমে গেছে। ঠেকাই মাথা সুপার হিট হয়েছে। যমুনা আনন্দে স্বামীর গায়ে বার বার গড়িয়ে পড়ছে। আনন্দের তুঙ্গ মুহূর্তে সেলুন কারের বাতি নিভে গেল। বগী ডুবে গেল অন্ধকারে। সুরমা পা টিপে টিপে স্বামীর কাছে গিয়ে বললাে, এই বাতি নিভে গেছে তাে। 

খায়ের সাহেব বললেন, দেখতে পাচ্ছি। আমি অন্ধ না । 

সুরমা বললেন, ট্রেনের লােকজন কেউ তাে আসছে না। মােমবাতি, চার্জার কিছু দেবে না? 

দিলে আমি কি করব? আমার হাতে কি ক্ষমতা আছে? সুরমা বললেন, এরা কি জেনে গেছে? জানতেও পারে। 

 

Read more

কিছুক্ষণ- হুমায়ূন আহমেদ -(পর্ব-১৭)

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *