মাওলানা বললেন, ঐ ডাক্তার ছেলে গলাপর্যন্ত মদ খেয়েছে। তার মুখ দিয়ে ভক ভক করে মদের গন্ধ, আসছে। ঐ গন্ধ আমি চিনি। কিছু মনে করবেন না জনাব আপনিও মদ খেয়েছেন।

রশীদ উদ্দিন হতাশ গলায় বললেন, কথা সত্য। মদ খাওয়ায় ডাক্তারের শরীর এবং মন হয়ত অশুচি হয়েছে। তার বিদ্যা কিন্তু হয় নি।
রশীদ উদ্দিনের কথা শেষ হবার আগেই চিত্রা কামরা থেকে বের হল। উত্তেজিত গলায় বলল, ডাক্তার কোথায়? বাচ্চা বের হচ্ছে। মাথা বের হচ্ছে।
চিত্রা ছুটে চলে গেল। এবং প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই হতভম্ব মাওলানার সামনেই ডাক্তারের হাত ধরে টানতে টানতে কেবিনে ঢুকে গেল।
মাওলানা বললেন, কাজটা কি ঠিক হয়েছে?
রশীদ সাহেব বললেন, যদি আমার মতামত জানতে চান তাহলে বলব কাজ উত্তম হয়েছে। এখন আপনি নিশ্চিন্ত মনে আল্লাহপাককে ডাকতে পারেন।
চিত্রা ভয়ে কাঁদছে। তার কাছে মনে হচ্ছে সে এক্ষুনি অজ্ঞান হয়ে পড়ে যাবে। আশহাব বলল, আপনি ঘাবড়াবেন না। মহিলার হাত ধরুন। ডেলিভারি নরম্যাল হবে। আমার ফুটন্ত পানি দরকার। ব্লেড দরকার, সূতা দরকার।
ব্লেড দিয়ে কি করবেন? বাচ্চার নাড়ি কাটতে হবে না।
আফিয়া হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন, আপনি কি ডাক্তার?
আশহাব বলল, আমি ডাক্তার, এবং খুব ভাল ডাক্তার। গাইনি আমার বিষয় না, তারপরেও কোনাে সমস্যা নেই। আপনাকে যা করতে বলব করবেন আমাকে সাহায্য করবেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই বড় চাপ আসবে তার
জন্যে প্রস্তুত হােন। যখন নিঃশ্বাস চেপে রাখতে বলব তখন নিঃশ্বাস চাপবেন।
আফিয়া গােংগাতে গােংগাতে বলল, আমি পারব না। আমি পারব না।
রশীদ সাহেব মাওলানাকে বললেন, আপনি কি একটা ম্যাজিক দেখবেন?
কিছুক্ষণ- হুমায়ূন আহমেদ
হতভম্ব মাওলানা বললেন, ম্যাজিক? পয়সা অদৃশ্য করার খেলা দেখাব। মজা পাবেন। আপনার কি মাথা টাথা খারাপ এখন ম্যাজিক দেখাবেন?
মূল ম্যাজিক আল্লাহপাক কিছুক্ষণের মধ্যে দেখাবেন এখন আমারটা ‘দেখুন। আমার ডান হাতে কি? পাঁচ টাকার একটা কয়েন না। কয়েনটা এখন নিলাম বাম হাতে। এখন দেখুন বাম হাত শূন্য। ডান হাতও শূন্য। বলুন
কয়েনটা কোথায়?
জাহান্নামে। খারাপ বলেন নি। From here to eternity.
চিত্রা দরজা খুলে বলল, ফুটন্ত পানি লাগবে, ব্লেড লাগবে, সূতা লাগবে । কিছুক্ষণের মধ্যেই ডেলিভারি হবে। | মাওলানা তাকিয়ে আছে। মনে হচ্ছে সে চিত্রার কথা বুঝতে পারছে না। চিত্রা তাঁকে কঠিন ধমক দিল, হাদার মতাে দাঁড়িয়ে আছেন কেন? ব্যবস্থা করুন।
সেলুন কারে বাতি জ্বলা নেভার খেলা চলছে। এই বাতি জ্বলছে এই নেই। সেলুন কারের যাত্রীরা আতংকে অস্থির। সবচেয়ে ভয় পেয়েছে যমুনা এবং তার স্বামী। যতবার বাতি নিভছে ততবার সে আতংকে অস্থির হয়ে স্বামীকে জড়িয়ে ধরছে। ভয় সংক্রামক। যমুনার আতংক ছড়িয়ে পড়েছে সবার মধ্যে। বদরুলের কর্মকাণ্ডও সবাইকে ঘাবড়ে দিচ্ছে। তার মেন্টাল ব্রেক ডাউনের মত হয়েছে। সে যেসব কথাবার্তা বলছে তার কোনাে অর্থই বুঝা যাচ্ছে না তবে মাঝে মাঝে যখন বলছে— “মেরে ফেলবে। সবাইকে মেরে ফেলবে” তখন সবাই আঁৎকে উঠছে। মেরে ফেলবে বাক্যের অর্থ না বুঝার কিছু না। খায়ের সাহেবের মন্ত্রীত্ব নেই এই খবর এখন সবাই জানে। মূল আতংক এখানেই।
কিছুক্ষণ- হুমায়ূন আহমেদ
খায়ের সাহেব পূর্ত প্রতিমন্ত্রী হেলাল উদ্দিনকে টেলিফোন করছেন। আশ্চর্যের ব্যাপার হেলাল টেলিফোন ধরেছেন এবং ধরেই বলেছেন, আপনার ব্যাপারটা শুনেছি। ভেরি স্যাড। দলের মধ্যে কান ভাঙানির লােক হয়েছে বেশি এরাই কাজটা করেছে। আপনি একজন সিনসিয়ার ওয়ার্কার। দলের জন্যে আপনার সেক্রিফাইস আছে। আমার দৃঢ় বিশ্বাস সবাই একদিন ভুল বুঝতে পারবে।
আবুল খায়ের সাহেব বললেন, আমি এখন এক বিপদে আছি। তুমি কাউকে বলে কিছু করতে পারবে?
হেলাল উদ্দিন বললেন, কি বিপদ?
আবুল খায়ের বিপদটা মােটামুটি গুছিয়েই বললেন। বাতি জ্বালানাে নিভাননা অংশও বাদ দিলেন না। | হেলাল উদ্দিন বললেন, কি সর্বনাশ। এদের এটিচুডততা মােটেই ভাল মনে হচ্ছে না।
আবুল খায়ের বললেন, আমারাে ভাল মনে হচ্ছে না। হেলাল উদ্দিন বললেন, আপনাদেরটা কি সব শেষের কামরা? হঁ্যা। বলেন কি। আরাে বিপদ। আরাে বিপদ কেন?
হেলাল উদ্দিন বললেন, বদগুলা বগিটা খুলে দিতে পারে। মূল ট্রেন থেকে আলাদা করে দিতে পারে। পরে যখন ইনভেসটিগেসন হবে তখন বলবে একসিডেন্ট। আপনা আপনি খুলে গেছে।
তুমি তাে আরাে ভয় ধরিয়ে দিলে। খায়ের ভাই এটাই বাস্তবতা। এখন করব কি বল।।
ঐ পার্টির কাউকে টাকা পয়সা দিয়ে হাত করতে হবে। বিপদ থেকে উদ্ধারের একটাই পথ।
Read more