কিছুক্ষণ- হুমায়ূন আহমেদ -(পর্ব-৮)

আশহাব কামরা থেকে বের হল। মা’র একটানা কথা শুনতে অসহ্য লাগছে। মা কথা বলতেই থাকবেন, বলতেই থাকবেন। এক সময় কাঁদতে শুরু করবেন। আশহাব করিডােরে এসেই সিগারেট ধরাল। সিগারেটে টান দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে মনে হল মা’র সঙ্গে এতটা বাড়াবাড়ি না করলেও চলত। সমস্যার সমাধান অবশ্যি দ্রুত করা যাবে। মার সামনে বসে বললেই হবে, মা! মুখে ভাত তুলে দাও। এই কাজটা সে কি এক্ষুনি করবে? না-কি কিছু সময় নেবে? খুক খুক কাশির শব্দে আশহাব তাকালাে।কিছুক্ষণ 

বুড়াে ভদ্রলােক কাশছেন। দরজার পাশে প্লাস্টিকের চেয়ারে রশীদ সাহেব বসে আছেন। হাতে কাগজ কলম। হিসাব নিকাশ হচ্ছে। এই বুড়াের সঙ্গে রাত কাটাতে হবে। আগেই পরিচয় করে নেয়া ভালাে হবে। যদি তেমন অসহনীয় হয় তাহলে বুফে কারে বসে থাকাটাও খারাপ না। আশহাব এগিয়ে গেল। বুড়াের সঙ্গে রাত কাটাবার একটা সুবিধা আছে। বুড়াে সিগারেট খায়। এত দূর থেকেও তার গা থেকে নিকোটিনের কড়া গন্ধ আসছে। 

রশীদ সাহেব খাতায় কিছু হিসাব নিকাশ করছেন। এই মুহূর্তে তার হাতে সিগারেটের বদলে কলম। সিগারেট বিপদজনকভাবে ঠোটে ঝুলে আছে। যে কোনাে মুহূর্তে ঠোট থেকে খসে পড়তে পারে। বৃদ্ধের নজর হাতের কাগজে। বসির নামের এটেনডেন্ট তাঁকে ট্রেনযাত্রীর পুরাে সংখ্যা দিয়েছে। 

ফুল টিকেট যাত্রী ৬২২ জন। 

হাফ টিকেট যাত্রী ১৮ জন। ইনজিনের সঙ্গে ড্রাইভারসহ ৪ জন। 

গার্ডরুমে ২ জন। 

কিছুক্ষণ- হুমায়ূন আহমেদ -(পর্ব-৮)

জেনারেটর রুমে ৩ জন। রশীদ সাহেব গভীর মনযােগে তাকিয়ে আছেন। যাত্রী সংখ্যার গুণ ভাগ চলছে। আশহাব এসে দাঁড়ানাে মাত্র রশীদ সাহেব বললেন, আপনিই তাে 

ডাক্তার! আমার সঙ্গে যার থাকার কথা? 

আশহাব বলল, জি। কটা বাজে দেখুন তাে। নয়টা দশ। 

সর্বনাশ। নেশার সময় হয়ে গেছে। আসুনতাে কামরায় যাই। আপনার সঙ্গে আলাপ পরিচয় হােক। ঐ মেয়েটাকেও দরকার। আমার ঘর থেকে জিনিসপত্র নিয়ে যাবে। ঐ মেয়ে তাে থাকবে আপনার মায়ের সঙ্গে? 

জি। 

তাহলে এক কাজ করুন আপনিই তার স্যুটকেস আপনার মা’র ঘরে রেখে আসুন। আমি চাই না মেয়েটা আমার কামরায় আবার আসুক। আমি মদ্যপান করব এই দৃশ্য দেখে মেয়েটার ভালাে নাও লাগতে পারে । 

আপনি মদ্যপান করবেন? 

হ্যা। আপনার কি কোনাে অসুবিধা আছে? 

আশহাব কি বলবে ভেবে পেল না। মদ্যপান অনেকেই করে তবে সরাসরি ঘােষণা দিয়ে কেউ কি করে? এই বুড়াে এমনভাবে বলছে যেন বিষয়টা মাইকে সবাইকে জানানাে খুবই জরুরী। হ্যালাে ট্রেনযাত্রী! মাইক্রোফোন টেস্টিং। ওয়ান টু থ্রি। আমি এখন মদ্যপান করব। 

কিছুক্ষণ- হুমায়ূন আহমেদ -(পর্ব-৮)

আশহাব বুড়াের পাশে বসেছে। টু সিটার বগিতে মুখােমুখি বসার সুবিধা নেই। দুটো সিটের একটা উপরে, একটা নিচে। আশহাবের মনে হল মুখােমুখি বসতে পারলে ভালাে হত। বুড়াের কাণ্ডকারখানা ভালােমতাে দেখা যেতাে। বুড়াে মদ খাওয়ার বিষয়টা যথেষ্ট আয়ােজন করে শুরু করেছে। ঝকঝকে গ্লাস। গ্লাসে পেঁচানাে ন্যাপকিন, বরফের বাক্স, বরফ তােলার চামচ। এর মধ্যে বসির বরফ দিয়ে গেছে। বুড়াে গ্লাস হাতে নিয়ে আশহাবের দিকে তাকিয়ে বলল, চিয়ার্স। 

আশহাব যন্ত্রের মতাে বলল, চিয়ার্স। বুড়াে বলল(মদ্যপানের সময় শরীরের পাঁচটি ইন্দ্রিয়ের মধ্যে চারটি ইন্দ্রিয় অংশ গ্রহণ করে। চোখ দেখে, জিহ্বা স্বাদ নেয় এবং স্পর্শ নেয়, নাক ঘ্রাণ নেয় শুধু একটা ইন্দ্রিয় অংশ নিতে পারে না। সেই ইন্দ্রিয়ের নাম কান, সাধু বাংলায় কর্ণ। কান যেন অংশ নিতে পারে শুধুমাত্র এই জন্যে অর্থাৎ কানকে শুনাবার জন্যে আমরা বলি Chears. 

ও আচ্ছা। 

বুড়াে বলল, মদ্যপানের সময় আমি প্রচুর কথা বলি। সেন্ট্রাল নার্ভাস সিস্টেমে খানিকটা জড়তা আসে। মােটর একসানের উপর কন্ট্রোল কমে যায় বলেই—ক্রমাগত কথা বলা। আপনার পরিচয় আমি পেয়েছি, ইয়াং ডক্টর । আমার পরিচয় দেয়া হয়নি—আমি একজন দৈত্য! নাইস টু মিট ইউ। 

কিছুক্ষণ- হুমায়ূন আহমেদ -(পর্ব-৮)

বুড়াে হাত বাড়িয়েছে।

আশহাবকে হাত বাড়িয়ে হ্যান্ডশেক করতে হল।

সে খানিকটা শংকিত বােধ করছে।

বুড়াে দুটো চুমুক দিয়েই নিজেকে দৈত্য বলছে।

গ্লাস শেষ করার পর কি বলবে কে জানে। 

আশহাব বলল, আপনি দৈত্য? বুড়াে বলল, হ্যা দৈত্য। A giant. হা হা হা। Old giant. বৃদ্ধ দৈত্য! 

আশহাব চুপ করে আছে। যে নিজেকে দৈত্য পরিচয় দিচ্ছে তার সঙ্গে আলাপ আলােচনা অর্থহীন। | আমি হচ্ছি ৮ নম্বর দৈত্য। Giant number eight. আমার কথা শুনে চমকাচ্ছ, না? এখন থেকে তুমি করে কথা শুরু করলাম। পেটে সামান্য পড়লেই নিজেকে অতি বৃদ্ধ একজন বলে মনে হয়। সবাইকে মনে হয় হাঁটুর বয়েসী, তােমাকে তুমি করে বলায় আহত বােধ করছ না তাে? 

আশহাব জবাব দিল না। সে আহত বােধ করলেও বৃদ্ধের কিছু যাবে আসবে বলে মনে হয় না। বৃদ্ধ হাতের গ্লাস খুব সাবধানে সিটের পাশের টেবিলে রেখে তার চামড়ার হ্যান্ড ব্যাগ খুলে একটা কমলা রঙের মােটা হার্ড কভার বই বের করে আশহাবের দিকে বাড়িয়ে দিতে দিতে বলল—বইটার পাতা উল্টালেই বুঝবে কেন নিজেকে দৈত্য বলছি। 

কিছুক্ষণ- হুমায়ূন আহমেদ -(পর্ব-৮)

বইটার প্রথম পৃষ্ঠা দেখেই আশহাব চমকে উঠল। আমেরিকার ম্যাকমিলন কোম্পানির প্রকাশিত বই। নাম—Ten Giant of Math World. দশ জন Giant-এর ছবিও প্রথম পাতায় দেয়া। দশজনের একজন এই বুড়াে। আশহাব চোখ বড় করে তাকিয়ে আছে। বুড়াে বলল, এখন আমার বিষয়ে তােমার Perspective বদলে গেছে, না? আমাকে নিশ্চয়ই অন্যরকম ভাবে দেখছ? 

জি। 

মনে হচ্ছে না এই জ্ঞানী বুড়াে পাবলিক প্লেসে মদ্যপান করলেও করতে পারে। এইটুকু ছাড় বুড়ােটাকে দেয়া যেতে পারে। 

 

Read more

কিছুক্ষণ- হুমায়ূন আহমেদ -(পর্ব-৯)

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *