জি, মনে হচ্ছে।
এই বুড়াের প্রতি কিছুক্ষণ আগেও বাজে ধারণা পােষণ করছিলে এই ভেবে খারাপ লাগছে না?
লাগছে।
তুমি কি আমার সঙ্গে জয়েন করবে? ট্রেনের ঝাকুনির সঙ্গে প্রথম শ্রেণীর ব্লন্ডেড হুইস্কি ভালাে লাগার কথা। তােমাদের ওমর খৈয়ম কি বলেছেন—
এই খানে এই তরুর তলে তােমায় আমায় কৌতূহলে যে ক’টিদিন কাটিয়ে যাব প্রিয়ে,
সঙ্গে রবে সূরার পাত্র অল্প কিছু আহার মাত্র আরেক খানি ছন্দ মধুর
কাব্য হাতে নিয়ে। আশহাব বলল, তােমাদের ওমর খৈয়ম বলছেন কেন? ওমর খৈয়মতাে আপনারও।
বৃদ্ধ বললেন, আমার না। আমি অংকের মানুষ। কবিতার সঙ্গে অংকের বিরােধ আছে। বৃদ্ধ আরেকটা গ্লাস বের করলেন। গ্লাসে হুইস্কি ঢাললেন, বরফ দিলেন। বুঝা যাচ্ছে ব্যবস্থাটা আশহাবের জন্যে। আশহাবের বলতে ইচ্ছা করছে—স্যার, আমি খাব না। আমার সঙ্গে আমার মা আছেন। মুখ থেকে গন্ধ পেলে সর্বনাশ হয়ে যাবে। আশহাব বলতে পারল না। তার মধ্যে প্রবল ঘাের তৈরি হয়েছে পৃথিবীর দশজন সেরা অংকবিদের একজন তার সামনে বসা, কি আশ্চর্য। সব বিদেশি নামের ভিড়ে দুটো দেশি নাম রামানুজন, রশীদ। বাংলাদেশের অনেকেই রামানুজনের নাম জানে রশীদ উদ্দিনের নাম কেউ কি জানে?
বৃদ্ধ গ্লাস বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, চিয়ার্স। আশহাব গ্লাস হাতে নিয়ে বলল, চিয়ার্স। সে ঠিক করেছে গ্লাসে চুমুক দেবে না। দ্রতা রক্ষার জন্যে গ্লাস হাতে নিয়ে বসে থাকবে। মাঝে মাঝে গ্লাসে ঠোট লাগাবে। চুমুক দেয়ার ভান করবে।
সাজেদার বগীর দরজা সামান্য ভােলা। করিডাের থেকে দেখা যাচ্ছে তিনি হেলান দিয়ে আছেন। তাঁর চোখ ভেজা। মাঝে মাঝে তিনি গায়ের পাতলা
কিছুক্ষণ- হুমায়ূন আহমেদ
চাদর দিয়ে চোখ মুছছেন। চোখ মুছার কারণে ঠোটের পানের রসও মুখের নানান জায়গায় লাগছে। তাঁকে অদ্ভুত দেখাচ্ছে।
চিত্রা করিডাের থেকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকল। তার হাতে ছােট্ট ঠোঙায় জর্দা। ট্রেন কিছুক্ষণের জন্যে কি একটা স্টেশনে থেমেছিল। পান-সিগারেট ওয়ালার কাছ থেকে সে পাঁচ টাকার জর্দা কিনেছে। চিত্রা বগীতে ঢুকবে কি ঢুকবে না বুঝতে পারছিল না। মােটামুটি অপরিচিতা এক মহিলা চোখ ভাসিয়ে কাদছেন। এই সময় কি তাঁকে বিরক্ত করা উচিত? ব্যক্তিগত দুঃখ যাপনের সময় উপস্থিত হওয়া যায় না ।
চিত্রাকে বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে হল না। সাজেদা হাত ইশারায় তাকে ডাকলেন। চিত্রা বগীতে ঢােকামাত্র তিনি বললেন, আমার ছেলেটিকে দেখেছ?
চিত্রা বলল, জি না। আমি আপনার জন্যে জর্দা এনেছি।। সাজেদা বললেন, ফেলে দাও। আমি ঠিক করেছি জীবনে জর্দা খাব না। চিত্রা বলল, আমি কি আপনার ছেলেকে খুঁজে বের করব?
খুঁজে বের করতে হবে না। তুমি বােস। দরজা বন্ধ করে বােস। তােমাকে আমি কিছু কথা বলব।
চিত্রা দরজা বন্ধ করে পাশে বসল। সাজেদা বললেন, আমার ছেলের চেহারা দেখে কি কেউ বলবে সে হাড় বজ্জাত? কেউ বলবে না । শান্ত শিষ্ট চেহারা! ভদ্র ব্যবহার। হাসি ছাড়া মুখে কথা নাই। তােমার সঙ্গে নিশ্চয়ই হেসে হেসে অনেক কথা বলেছে। বলে নাই?
কিছুক্ষণ- হুমায়ূন আহমেদ
জি, বলেছেন। ম্যাজিক দেখায়েছে, তাই না? চিত্রা বিস্মিত হয়ে বলল, না তাে।
সাজেদা বললেন, গুণধর পুত্র। তার নানান গুন। তিনি একজন শখের ম্যাজিশিয়ান—টাকার ভিতর দিয়ে পেনসিল ঢুকাবে টাকা ছিড়বে না। হাতে পয়সা নিয়ে অদৃশ্য করে ফেলবে তারপর কারাে নাক থেকে বের করবে। তাসের তিনটা সাহেব হয়ে যাবে তিনটা বিবি। ম্যাজিকের সব জিনিস সব সময় তার পকেটে থাকে। তােমাকে এখনাে দেখায় নি?
দেখাবে। কিছুক্ষণের মধ্যেই দেখাবে। পয়সা বের করার কথা বলে তােমার কানে হাত দেবে। নাকে হাত দেবে। মেয়েছেলের গায়ে হাত দেয়ায় আনন্দ আছে না। মহানন্দ।
আপনি মনে হয় উনার উপর খুব রেগে আছেন ।
সাজেদা কড়া গলায় বললেন, রেগে থাকব কেন? আমি তার উপর দিলখােশ। সে এখানে ঢুকলেই তাকে আমি কোলে বসিয়ে গালে চুমা দিব আর ও আমার বাবা ও আমার সােনা’ বলে মাথায় হাত বুলাব। সে একবার কামরায় ঢুকে দেখুক। কতবড় সাহস! আমার সঙ্গে গলা উচিয়ে কথা বলে । বুক ফুলিয়ে বলে, আমি কয়েকবার মদ খেয়েছি। কি বিরাট কাজ করে ফেলেছ। তােমার মা হিসেবে আমার কত গর্ব হচ্ছে। আমার সােনা মানিক মদ খায়, কি আনন্দ! এত আনন্দ আমি কোথায় রাখি। আমার সােনা মানিককে মদ খাওয়ার জন্যে সােনার মেডেল দেব। মেডেলে লেখা থাকবে ‘মদারু শ্রেষ্ঠ।
কিছুক্ষণ- হুমায়ূন আহমেদ
কথাবার্তায় সাময়িক বিরতি পড়ল। সাজেদা পান সাজতে বসলেন। চিত্রার হাত থেকে জর্দার প্যাকেট নিয়ে এক গাদা জর্দা পানে ঢাললেন। প্রসঙ্গ পাল্টাবার জন্যে চিত্রা বলল, রাতে আপনি কখন খাবেন? বুফে কারে খেতে হলে আগে অর্ডার দিতে হবে। ওরা তাই বলল ।।
সাজেদা বললেন, খাবার আমি সঙ্গে নিয়ে এসেছি। হট পটে গরম খাবার আছে। তুমিও আমার সঙ্গে খাবে। আশহাব বাদ। মদারু ছেলের সাথে বসে আমি খাব না। মা, তুমি একটা কাজ কর—আমার মদারু পুত্রকে ডেকে আন। তুমি ওর সঙ্গে কামরায় ঢুকবে না। আমি এমন কিছু ঘটনা ঘটাব যা তােমার দেখা ঠিক হবে না।
কথায় বলে সাপের পাঁচ পা দেখা—আমি মদারুটাকে সাপের পঞ্চাশ পা দেখাব। চিত্রা বগী থেকে বের হল। করিডােরে কাউকে দেখা যাচ্ছে না। সে রওনা হল বুফে কারের দিকে। বুফে কারে রাতের খাবারের অর্ডার দিয়েছিল। অর্ডার ক্যানসেল করতে হবে। এই মহিলা তাকে না খাইয়ে ছাড়বেন না এটা বুঝা যাচ্ছে। শুধু যে খাওয়াবেন তা-না, নানান অত্যাচারও করবেন। ভালবাসা দেখাতে গিয়ে অত্যাচার।
Read more