সারা দেশ কী অপরূপ মনে হচ্ছে! গরমের সময় গমের ক্ষেত হলুদবর্ণ হয়ে আছে, মানারাত তারার রোজা রানে লম্বা লম্বা ঠ্যাং নিয়ে ঠুক্ঠুক্ করে হেঁটে বেড়াচ্ছে আর কথা বলছে মিশরি ভাষায়-_মাদ্র কাছ থেকে তারা এ-ভাষাই রপ্ত করেছে কিনা তাই।
সামনের মাঠ আর ক্ষেতের একদিক দিয়ে সবুজ বনানীর সারি চলে গেছে দিগন্ত ছুঁয়ে এ বনের মধ্যে এক গভীর স্থচ্ছ সরোবর ! সত্যিই, চারদিকে কী অপরূপ শোভা ! অনেক পুরনো একটা বাড়ি, সূর্যালোকে বড়ো চমৎকার দেখাচ্ছে, বাড়িটার চারদিক ঘিরে খাল চলে গেছে।
প্রাচীর থেকে খালের কিনারা পর্যন্ত এক ধরনের বুনো লতাপাতার গাছ, বার্ডক লতা ভর্তি হয়ে আছে; ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা এ লতা’পাতার জঙ্গলে খেলা করে, দোলনা বানিয়ে দোলে, তার মধ্যে লুকোচুরি খেলে অনায়াসে। এই জায়গাটা এমন বুনো আর চুপচাপ যে একে এ দিগন্তছোয়া বনভূমির গভীরে কোনো স্থান বলে ভ্রম হয়।আর ঠিক সেজন্যই একটা পাতিহাস ওখানটায় তার বাসস্থানের উপযুক্ত ভেবে বাসা তৈরি করেছে।
হাসটি তার ডিমের উপরে বসে ছিল। বেশ কিছুদিন ধরে সে এখানে আছে, ফলে আজকাল তার আর মোটেই ভালো লাগছে না এখানে থাকতে। কেননা, বন্ধুবান্ধব পাড়াপড়শিরা কেউই প্রায় আজকাল দেখাসাক্ষাৎ করতে আসে না-_এই খালের এরকম পিছল নির্জন স্থানে এসে তার সাথে ফিসফাস গুজগাজ করার চেয়ে বরং খালের পানিতে সাতরানো অনেক বেশি আনন্দকর বলে তারা মনে করে।
কিন্ত কী আর করা যাবে? হাস বেচারা দিনের পর দিন ডিমে তা দেওয়ার জন্যে বসে রইল। অবশেষে সেই সময় এসে গেল যখন ফাটল ধরল ডিমে তার, একটা-একটা করে নতুন মুখ ডিমের ভিতর থেকে উকি দিতে লাগল। “প্যাক প্যাক্__প্যাক প্যাক’ : তাদের গলা থেকে মিহি মিষ্টি আওয়াজ বেরুচ্ছে, সাধ্যমতো চলতে ফিরতে চেষ্টা করছে সবাই, সবুজ লতাপাতার ফাক দিয়ে কেউ কেউ বাইরে উকিব্ুকিও মারতে লাগল।
“ঈশ্, দুনিয়াটা কত্তো বড়ো!” ছোট্ট একটি বাচ্চা হাস অবাক হয়ে বলে উঠল।“ওমা, বলে কী দেখ! দুনিয়াটা বুঝি এটুকুই ভেবেছিস?” পাতিহাসগুলোর মা উত্তর দেয়, “এই পৃথিবীটা অনেক অ-নে-ক বড়ো। এই বাগানের ওদিকে যে-মাঠ, তা ছাড়িয়েও অনেক দূর–। অবশ্য আমি কখনো অদ্দূুর যাইনি।
তারপরেই হেকে উঠল, “বলি, বাছারা, তোরা সব ঠিকঠাক আছিস তো? এদিক-ওদিক আবার চলে যাস ন! যেন।” একথা বলে উঠে দীড়াল সে। “নাঃ, আমি তো এখনো আমার সব কণ্টিকে পাইনি। সবচেয়ে বড়ো ডিমটা আমার এখনো বাকি। কবে যে ফুটবে আল্লাই মালুম! আর ছাই ভালো লাগছে না, বিরক্ত ধরে গেল” আবার সে বসে পড়ে সেখানে ।
এক বুড়ি হাস বেড়াতে এসেছে। বান্ধবীকে একটু দেখে যাবে আর কী। সে জিজ্ঞেস করল, “কি দিদি, কেমন আছিস লো?” “আর বলো না বাপু, এই একটা ডিম নিয়ে বড়ো মুশকিলে পড়েছি। না এটা ভাঙে, না আমি একটু ঘুরেফিরে বেড়াতে পারি। কিন্তু তুমি আমার বাচ্চাগুলোকে দেখেছ তো দিদি? ৯৭,০১০ -১৬১। দেখিনি।”
“শোন, শোন, কী বলছিস তুই? তাহলে নির্ঘাৎ এটা একটা টার্কির ডিম। আমিও একবার ঠিক এমনিভাবেই ; বাচ্চাদের নিয়ে তোর মতোই সেবার যন্ত্রণার একশেষ হয়েছিল। তাছাড়া এই টাকিগুলো পানি দেখলেই এত ভয় পায় যে পানির ধারেকাছে খেষবে না। আমি কতো ডেকেছি, মারব-ধরব করেছি, কিন্তু যে কে সে-ই, কোনো কাজ হয়নি।আচ্ছা দেখি, ডিমটা দেখা তো।
হু, ছু, ঠিক যা ভেবেছি___, টার্কিরই ডিম। বাদ দে এইসব; তুই বরং এই বাচ্চাগুলোকেই সাতার শেখা গে।” “না গো, আর কয়েকটা দিন দেখি না, দিদি,” হাস জবাব দেয়, এদ্দিনই যখন তা দিলাম, আর দু-এক দিনে কীই-বা ক্ষতি হবে?” “জানি না, বাপু। এটা তোমার ব্যাপার, তুমি বোঝো গে-_” বুড়ি হাস উত্তর দিল, তারপর হেলেদুলে থুপথুপ করে চলে গেল নিজের কাজে।
বড়ো ডিমটা, যাক, শেষকালে ভাঙল] পি পি-_আওয়াজ বেরুল ডিমটার ভিতর থেকে, আর সে-_ছোট্ট পোনা হাস-_হুড়মুড় করে ডিম ভেঙে বেরিয়ে এল বাইরে। এহ্-হে, কী কদাকার ! কী বিরাট দেখতে ! মা তার এই শিশুটির দিকে তাকিয়ে রইল। “দেখতে বেশ বড়োসড়ো, আর শক্তসমর্থ মনে হচ্ছে,” মনে মনে বলতে থাকে সে, “আমার কোনো বাচ্চাই তো এরকম নয়।
তাহলে কি সত্যিই এটা একটা টার্কির ছানা? ঠিক আছে, শিগ্গিরই বুঝতে পারব। পানিতে তো নামতেই হবে সকলকে, বাছাকে আমার ঠেলেঠুলে নিয়ে যাবই; তারপর দেখব কী হয়।”পরদিন আবহাওয়া বড়ো সুন্দর ছিল। সবুজ লতাপাতায় সোনালি সূর্য ঝিকমিক করছে। হাসটি তার সব বাচ্চাকে নিয়ে খালের ধারে গেল। ঝপাৎ! ঝাপ দিয়ে পড়ল সে পানিতে।
“প্যাক-গ্যাক, গ্যাক-গ্যাক-_” সে ডাকতে থাকে তার বাচ্চাগুলোকে, আর একটার পর একটা পোনা হাস ঝাপ দিয়ে পড়তে লাগল পানির বুকে। ঝাপিয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে পানিতে ডুবে গেল, কিন্তু পরক্ষণেই পানির ভিতর থেকে মাথা তুলে ধরল আর কী সহজভাবেই-না স্সাতার কাটতে লাগল।
সব কটি পোনা হাসই সেখানে রয়েছে, এমনকি কুচ্ছিৎ মেটে রংয়ের পোনাটিও অন্যগুলোর সঙ্গে কী আনন্দে সাতার কাটছে।“নাহ, তাহলে এ তো টার্কি নয়।” তাদের মা হাফ ছেড়ে বাচল; “দেখ, দেখ, কী সুন্দর পা ফেলাচ্ছে, মাথাটি কেমন উচু করে ধরে রেখেছে পানির ওপরে । আমারই বাচ্চা তো, হবে না কেন! আর ভালো করে তাকিয়ে দেখলে মোটামুটি সুন্দরই তো দেখতে।
দেখাই গে তোদের। দেখিস, আমার কাছেপিঠে থাকিস সবসময়, বেতালে যেন কেউ মাড়িয়ে না দ্যায় আর খবরদার বিড়াল থেকে কিন্তু সাবধান।” তারা হাটতে হাটতে খামারবাড়ির হাসপট্রিতে এল। দুটো পাতিহাস পরিবার একটা বাইন মাছের মাথা নিয়ে ঝগড়া করছে। মাছটার আবার লেজ নেই, সেটা একটা বিড়াল নিয়ে পালিয়েছে।
“দেখেছিস? দুনিয়ার হালচাল দেখতে পাচ্ছিস কী রকম?” মা হাসটি হাসপরিবার দুটোর ঝগড়া দেখে বলে উঠল বাচ্চাগুলোকে। তারপর ঠোটটা পরিষ্কার করল ভালোভাবে; ঝলসানো বাইন মাছ তারও খুব প্রিয়। “বাছারা, তোরা শোন”-__মা ফের হাক দিয়ে ওঠে, “এখন পায়ের ব্যবহার শিখে নে দেখি।
পা দুটো লাগিয়ে জোড় পায়ে দাড়াও হ্যা, ঠিক আছে,_এইবার মাথা নুইয়ে সালাম করো বুড়ি দিদিমাকে। এই এলাকায় ইনিই সবচেয়ে অভিজাত, হিস্পনি রক্ত যে তার শরীরে বইছে তা চেহারা চাল-চলন আর ব্যবহার দেখলেই সকলে বোঝে। আর ভালো মতো নজর দিয়ে দেখে নে তোরা-_এর পায়ে একটা লাল ফেটি বাধা, এটা তার বিশেষ খান্দানির পরিচয় দ্যায়, একটা পাতিহাসের জন্যে এর চেয়ে সম্মানের আর কিছু নেই”।
অন্যান্য হাস যারা খামারে চরে বেড়াচ্ছিল তারা এবার তাকিয়ে দেখল এদের, চেচাতে লাগল, “আরে দেখ, দেখ, নতুন একদল পোনা হাস এসেছে।” তারপর ওর দিকে চোখ পড়তেই চেচিয়ে উঠল, “ঈশ্, কী জঘন্য ! এই পোনাটা কী বিচ্ছিরি রে দেখতে ! আমরা একে দলে নেব না।” আর এ-কথা শেষ হবার সাথে সাথে একজন উড়ে গেল ওর দিকে, গিয়েই ঘাড় কামড়ে ধরল বেচারা কুচ্ছিৎ প্যাকারুর।
“আহা-হা, ছেড়ে দাও, ছেড়ে দাও। ও তো কোনো ক্ষতি করেনি তোমাদের” মা বেচারা ধমকে ওঠে তাদের।“তা বটে! কিন্তু কী রকম বিরাট ঢ্যাপসা আর কুচ্ছিৎ ওটা দেখতে !”পায়ে লাল ফেট্টি বাধা বৃদ্ধা হাসটি বলে উঠল, “খুব সুন্দর বাচ্চা তো এগুলো। একটাই যা সামান্য একটু দেখতে খারাপ, ফলে সবাই একটু ট্যার্চা চোখে একে দেখবে বটে, তবে আমার মনে হয়- এদের মা ইচ্ছে করলেই একে মেজেঘষে খানিক সুন্দর করে তুলতে পারে।
” পাতিহাসগুলোর মা জবাব দিল, “ঠিকই বলেছ তুমি, বুড়ি মা। আমার এই পোনাটা দেখতে সুবিধের হয়নি, কিন্তু তা হলে কী হয়-_এ আমার বড়ো লক্ষী ছেলে, এত সুন্দর সাতার দিতে পারে যে কী বলব! সকলের চেয়ে এই তো ভালো সাতার দ্যায়। আমার ধারণা, আরেকটু বয়েস হলে দেখতে অন্যদের মতোই হবে, আর হয়তো তখন একটু ছোটোই দেখাবে একে ।
” এই বলে সে তার বাচ্চার ঘাড় আদর করে চুলকে দিতে লাগল, উচু হয়ে থাকা এলোমেলো পালকগুলো মোলায়েম করে আচড়ে দিল। তারপর বলল, “তা ছাড়া, এ তো মেয়ে নয়, খোকা। একটু শক্তসমর্থ হওয়াই দরকার। বেশ জোয়ানমর্দ হয়ে সারা জীবন সংগ্রাম করে যাবে, আমি তা-ই চাই।” “আচ্ছা, বাছারা, তোমরা এখন এস।
” বুড়ি দিদিমা ঠ্যসটি উপদেশ দেয় সকলকে । “তোমার বাচ্চাগুলো বড়োই সুন্দর হয়েছে দেখতে। ভালো কথা, যদি বাইন মাছের মাথা দেখতে পাও কেউ, নিয়ে এসো আমার কাছে, কেমন ?” অতএব এখন সকলে তারা ঘরে ফিরে চলল।আহা, বেচারা ছোট্ট পোনা হাস, বেচারি গ্যাকারু ! ডিম ফুটে সবচেয়ে শেষে বেরিয়েছে, দেখতে বেচারাকে সব হাস আর মুরগি মিলে যখন-তখন ঠোকরাচ্ছে, খোচাচ্ছে, সবসময় করে তুলছে।
আর একটা টার্কি মোরগ__তার পায়ে আবার নখের আঙটা। এতেই তার এত দেমাগ যে সে নিজেকে লাটবেলাট ভাবে: রাস্তা হাটে ফুলেফুলে, যেন ভরা পাল জাহাজ একটা ভেসে যাচ্ছে। সে রাগে লাল হয়ে ঠক্ঠক করতে করতে বেচারা পোনা প্যাকারুর পানে তেড়ে যায়। আর সে? বুঝতেই পারে না এ রকম অবস্থায় কী করা উচিত বা কী করতে হয়; তার বদখৎ চেহারার জন্যে সর্বদা সে মনমরা হয়ে পড়ে থাকে।
প্রথম দিনটা তো এভাবেই কাটল, আর তার পর থেকে যত দিন যেতে লাগল ব্যাপারটা খারাপের দিকেই গেল। নিজের আপন ভাইবোনগুলো পর্যন্ত তার সাথে যাচ্ছেতাই নিষ্ঠুর ব্যবহার করে, প্রায়ই গালমন্দ করে অভিশাপ দ্যায় : “হোদলকুৎকুৎ, তোকে বিল্লীতেও দেখতে পায় না?” আর প্যাকারুর মা, তারও মনে কি শাস্তি আছে? সে ভাবে, এমন বিশ্রী ছেলে তার না হলেই ভালো ছিল।
অন্যান্য হাসগুলে৷ যখন-তখন মন গেলেই সমানে মারধোর করছে, মুরগিগুলো ঠুকরে দিচ্ছে, আর যে-মেয়েটা হাস-মুরগিদের খেতে দ্যায় সে সারাক্ষণই লাখি-ঝাটার ওপরে রেখেছে তাকে।মারধোরের হাত থেকে বাচবার জন্যে একদিন সে লুকোতে গেল। একটা ঝোপঝাড় দেখে যেই সে ঢুকেছে অমনি কতকগুলো পাখি ভয় পেয়ে কিচিরমিচির করতে করতে উড়ে পালাল।
”“ঈশ্, আমি দেখতে এতই খারাপ যে এরা পর্যস্ত ভয় পেয়ে পালিয়ে গেল”-_ ভাবল সে। মন খারাপ হয়ে গেল তার, তখন সে ঝোপ থেকে বেরিয়ে সোজা এক দিকে-_ যে দিকে দু’চোখ যায়-_ হাটতে শুরু করে। মনের দুঃখে সে যাচ্ছে তো যাচ্ছেই, যাচ্ছে, যাচ্ছে, যাচ্ছে….। অবশেষে এসে থামল এক জায়গায়, দেখল, সামনেই একটা বিল। অনেক বুনো হাস সেখানে ।
সারা রাত সে পড়ে থাকল বিলের মধ্যে, শোকেদুঃখে তখন সে খুবই ক্লান্ত! সকালে বুনো হাসের দল যখন আকাশে উড়ল তখন দেখতে পেল যে, তাদের এক নতুন সঙ্গী এসেছে। “কে হে বাপু তুমি?” জিজ্জেস করে তারা। প্যাকারু খুবই বিনীতভাবে আলাপ করল তাদের সাথে।
অবশেষে বুনো হাসগুলো বলল, “তোমার চেহারাটা দেখতে খারাপ বটে ! তবে তাতে কী? তুমি আমাদের বংশে বিয়ে-া না করতে চাইলেই হল।” বলে কী! বিয়ে-থা? সে তো এ সব ঘুণাক্ষরেও কল্পনা করে না। তার কেবল ইচ্ছা : এই বিলের শাপলা-কলমিদাষের মধ্যে মুখ ডুবিয়ে শুয়ে থাককে, এই বিলের স্বচ্ছ তরল জল পান করবে।
পুরো দুটো দিন প্যাকারু রইল এই জলাশয়ে। তৃতীয় দিনে কোথা থেকে উড়ে এল দুই বুনো বালিহাস-_না, বালিহাস ঠিক বলা চলে না, বয়েস খুবই কম তাদের, বরং বলা চলে বালিহাসের পোনা। ডিম ফুটে বের হয়েছে তারা বেশি দিন হয়নি, আর তাইতেই ছেলে-ছোকরাদের চ্যাতডামি তাদের স্বভাবে তখনো রয়ে গেছে।
“হে-ই!” বুনো বালিহাসের পোনা দুটো তাকেই ডাকছে যেন। তারা বলছে, “ওহে, এদিক পানে একটু শুনে যাও তো বাপু। দেখতে তুমি বড়োই বদখৎ, আর সে জন্যেই তোমাকে খুঁউ-ব ভালো লাগছে আমাদের। তুমি আমাদের সঙ্গে আসবে নাকি? এখান থেকে সেখান অবিরাম ঘুরে বেড়াবে আমাদের সাথে? এ দিকে আরেকটা বিল আছে, এখান থেকে বেশি দূরে নয়।
সেখানে খুব চমৎকার কিছু বুনো পাতিহাস আছে, এত সুন্দর যে কী বলব! তারা কেবলই শিস্ দ্যায় স্স্-স্ স্স্্স্ করে। তুমি তো বাপু ইচ্ছে করলেই ওখান থেকে টুকটুকে একটা বৌ বিয়ে করে আনতে পার; তুমি যে-রকম বিদঘুটে দেখতে, তাতে আবার তোমার ভাগ্যও খুলে যেতে পারে ”
গুড়ুম ! খ্যা, এ কী হল? বন্দুকের শব্দ ! আর, আহা রে, বাচ্চা বালিহাস দুটো ছটফট করতে করতে মরে গেল কলমিদামের মধ্যে! আবার এ-_গুড়ুম ! বুনো হাসের ঝাক উড়ল শ্যাওলা, কচুরিপানা আর দামের ভিতর থেকে। চারদিকে দারুণ একটা হৈ চৈ বেধে গেল, বন্দুকের আওয়াজ হচ্ছে ক্রমাগত
শিকার করতে এসেছে কারা। বেশ বড়োসড়ো শিকারি দল। ঝোপে-ঝাড়ে বিভিন্নজন লুকিয়ে আছে। কেউ কেউ আবার গাছের উপরে উঠেছে, সে-সব গাছের শাখাপ্রশাখা আবার বিলের উপর ঝুলে আছে। শিকারি কুকুরগুলো কাদা, পানি সমানে ছিটোচ্ছে; পানিতে ভুবে-থাকা আগাছা, শ্যাওলা, দাম সরিয়ে সব দিক খুঁজছে।
ওহ, কী ভয়টাই না পেয়েছে বেচারি পোনা গ্যাকারু ! ছোট্ট মাথাটা কোথায় যে রাখবে সে ভেবেই পাচ্ছে না। শেষকালে মাথাটা ঘুরিয়ে নিয়ে ডানার তলায় গুজে দিল, আর ঠিক তখনই এক বাঘা কুকুর-__জিভ এ্যাত্তোখানি মুখ থেকে ঝুলছে, গোল গোল চোখ যেন আগুনের ভাটা-_ধোৎ করে তার পাশ দিয়ে ছুটে বেরিয়ে গেল।
বিরাট চোয়াল, হা করে আছে-_যেন এক্ষুনি গিলে খাবে; কুকুরটা নাক কুচকে প্যাকারুর গা শুঁকল, ফর্সা তীক্ষ দাত খিচিয়ে উঠল, কিন্তু তারপর কী ভেবে ছপাৎ ছপাৎ করে জল ছিটিয়ে চলে গেল, কিচ্ছুটি করল না, গায়ে একটু আচড়ও দিল না তার, একেবারে ভালোমানুষটির মতো চলে গেল।“উঠ, বাব্বাঃ, বাচলাম। করুণাময়ের অশেষ কৃপা।
” সে মনে মনে ধন্যবাদ জানায় বিধাতাকে, “আমি দেখতে এতই জখন্য যে কুকুরটা আমাকে কামড়াল না পর্যস্ত।”এরপর প্যাকারু ঠিক এঁ জায়গাতেই হয়ে শাপলার দামে মুখ খুঁজে পড়ে রইল। ওদিকে তখনো শিকারিদের হৈ-হল্লা পূর্বের মতোই উদ্দাম। বেলা গড়িয়ে বিকেল হয়ে এলে ওদের হট্টগোল হৈ চৈ কমল, কিন্তু তখনো বেচারা ভয়ে টু শব্দ করল ন!
একটুও আরো ঘণ্টা কয়েক অপেক্ষা করার পর সে ঘাড় তুলে উকিঝুঁকি মেরে দেখল চারদিক, আর তারপরে সেখান থেকে যত তাড়াতাড়ি পারে দৌড়। দৌড়, দৌড়, দৌড়। মাঠ পেরিয়ে, জমি পেরিয়ে, খানাখন্দ পার হয়ে সে দৌডুচ্ছে; বাতাসের বেগ খুব__দমকা হাওয়া বইছে শৌ শৌ, যেতে কষ্ট হচ্ছে তার, তবু সে দৌডুচ্ছে।সন্ধে হয়ে এল প্রায়। তখনো ছুটছে গ্যাকারু।
দম নিতে যেই একটু থেমেছে, সামনে দ্যাখে একটা ঝুঁড়েঘর। একেবারে ভাঙাচোরা, শরীরে তার কিচ্ছু নেই, কোন্ দিকে হেলে ভেঙে পড়বে ঠিক করতে না পেরেই যেন দীড়িয়ে আছে এখনো। সে দেখল, একটা কবজা ভেঙে যাওয়ায় দরজার পাল্লাটা হুমড়ি খেয়ে পড়ছে দেয়ালে; যে অল্প একটু ফাক ছিল ঢুকতে পারে প্যাকারু। বাইরে হাওয়ার গর্জন বাড়ছে ক্রমশ। কী করবে এখন সে? ভয়ে ভয়ে হামাগুড়ি দিয়ে ভিতরে ঢুকে পড়ল পোনা প্যাকারু।
Red more
