বুড়ো মানুষদের শক্ত খাবার খাওয়ার প্রয়োজন নেই, এই জন্যে দাঁতও পড়ে যায়।মহসিন সাহেব মীরপুর রোড ধরলেন। তিনি চিড়িয়াখানার দিকে যাচ্ছেন। চিড়িয়াখানা ব্যাপারটা তার কাছে খুব অপছন্দের। আজ যাচ্ছেন ছোটমেয়ের জন্যে। একমাত্র চিড়িয়াখানায় গেলেই আলোর মুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।
মহসিন সাহেব গাড়ির গতি আরো বাড়িয়ে দিলেন। তিনি লক্ষ করেছেন দ্রুতগতি তাঁকে চিন্তায় সাহায্য করে। যদিও এই মুহূর্তে তেমন কোনো চিন্তা তার মাথায় নেই। অস্পষ্টভাবে নিশানাথ বাবুর কথা তাঁর মনে আসছে। দীপও আজ সকালে চুল পড়ার কথা বলেছিল। লোকটির দিন বোধ হয় শেষ হয়ে আসছে। হঠাৎ ভালো-মন্দ কিছু হয়ে গেলে সমস্যা হবে। ডেড বডি কী করা হবে?
হিন্দুদের দেহ সত্বারের অনেক সমস্যা আছে বলে শুনেছেন। নিশানাথ বাবুর আত্মীয়স্বজন ঢাকায় কেউ আছেন। কিনা জিজ্ঞেস করা হয় নি। জানা থাকা দরকার।এক জন ডাক্তার নিশানাথ বাবুকে দেখছেন।ডাক্তারের কোনো প্রয়োজন ছিল না। তাঁর শরীর এখন ভালই লাগছে, তবু দীপা ডাক্তার আনিয়েছেন। এখন দাঁড়িয়ে আছেন ডাক্তারের পাশে।ডাক্তার সাহেব বললেন, আপনার অসুবিধা কী?
নিশানাথ বাবু বললেন, তেমন কোনো অসুবিধা নেই।ডাক্তার সাহেব বিস্মিত হয়ে দীপার দিকে তাকালেন। দীপা বললেন, দেখুন না হঠাৎ করে ওঁর মাথার সব চুল পড়ে গেল! এটা এমন কিছু না। অন্য কোনো অসুবিধা না থাকলেই হল। আছে অন্য কোনো সমস্যা? জ্বি না, মাঝে মাঝে খুব মাথার যন্ত্রণা হয়।এখনো হচ্ছে?
জ্বি না।দীপা বললেন, ওঁর সাইনাসের সমস্যা আছে।বেশি করে লেবুর সরবত খাবেন। ভিটামিন সি এইসব ক্ষেত্রে খুব উপকারী। ভিটামিন সি-কে এখন বলা হচ্ছে দিরা ভিটামিন।ডাক্তার সাহেব বোধহয় বাড়ি যাবার তাড়া আছে, দ্রুত কাজ সারতে চাইছেন। দীপা বললেন, আপনি দয়া করে ওঁর প্ৰেশারটা একটু দেখুন।ডাক্তার সাহেবের ব্যাগ খুলে অপ্রসন্ন মুখে প্রেশারের যন্ত্রপাতি বের করলেন। পেশার মাপার আর কোনো ইচ্ছা ছিল না। এই ডাক্তার এ বাড়িতে প্রথম এসেছেন।
এঁদের ডাক্তার হচ্ছে দীপার ছোট বোন তৃণা। আজ তৃণাকে পাওয়া যায় নি। তার বোধহয় আবার হাসপাতালে নাইট ডিউটি পড়েছে।আপনার প্ৰেশার নৰ্মাল। আপনার বয়সের তুলনায় খুবই নর্ম্যাল।দীপা বললেন, চাচা, আপনার অন্য কোনো সমস্যা থাকলে বলুন।নিশানাথ বাবু বললেন, আমার আর তো কোনো সমস্যা নেই, মা।স্বপ্নের কথা বলুন।ডাক্তার সাহেব বললেন, কিসের স্বপ্ন?
দীপা বললেন, চাচা কি একটা স্বপ্ন যেন বারবার দেখছেন। বলুন না, চাচা। ডাক্তারদের কাছে কিছু গোপন করতে নেই।নিশানাথ বাবু বিব্রত গলায় বললেন, একটা মেয়ে–তার নাম নাসিমা। কামিজ পরা। মেয়েটার মন খুব খারাপ।ডাক্তার সাহেব বিস্মিত হয়ে বললেন, আপনি কি বলছেন কিছুই তো বুঝতে পারছি না।স্বপ্নের কথা বলছি। মানে গুছিয়ে বলতে পারছি না। এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। মানে–
নিশানাথ বাবু থেমে গেলেন এবং অবাক হয়ে ডাক্তারের দিকে তাকালেন, কারণ কথা বলতে বলতে হঠাৎ তার মনে হল এই ডাক্তারের নাম মাসুদুর রহমান। ডাক্তার সাহেবের স্ত্রীর নাম ইয়াসমিন। তাঁদের তিন ছেলে। বড় ছেলে সিড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে পিছলে পড়ে হাতের একটা হাড় ভেঙে ফেলেছে। হাড়টা ঠিকমতো সেট হয় নি বলে ডাক্তার সাহেব খুব চিন্তিত।
নিশানাথ বাবু ভেবে পেলেন না–এইসব কথা তাঁর মনে আসছে কেন? তিনি কি পাগল হয়ে যাচ্ছেন নাকি? বোঝাই যাচ্ছে এসব তাঁর কল্পনা। ডাক্তার সাহেবের নাম নিশ্চয়ই মাসুদুর রহমান নয়। তাঁর স্ত্রীর নামও নিশ্চয়ই ইয়াসমিন নয়। অথচ তার কাছে মনে হচ্ছে এটাই সত্যি। এরকম মনে হবার কী মানে থাকতে পারে?
ডাক্তার সাহবে বললেন, স্বপ্নের ব্যাপারটা তো শেষ করলেন না।নিশানাথ বাবু বললেন, ঐসব কিছু না, বাদ দিন। মাথা গরম হয়েছিল, তাই আজে-বাজে স্বপ্ন দেখেছি। এখন আর দেখি না।আমি আপনাকে ট্রাংকুলাইজার দিচ্ছি। শোবার সময় একটা করে খাবেন।জ্বি আচ্ছা।কয়েক দিন বিশ্রাম নিন। ভালোমতো খাওয়াদাওয়া করুন, সব ঠিক হয়ে যাবে। মাথার চুল নিয়ে মোটেও ভাববেন না। নানান কারণে মাথার চুল পড়ে যেতে পারে। এটা কিছুই না।
ডাক্তার সাহেব ব্লাডশোরের যন্ত্রপাতি ব্যাগে ভরছেন। নিশানাথ বাবু আচমকা বললেন, ডাক্তার সাহেব, আপনার নাম কি মাসুদুর রহমান? ডাক্তার সাহেব হাসিমুখে বললেন, জি। আপনি কি আমাকে চেনেন? জ্বি, চিনি। আপনার ছেলের হাত জোড়া লেগেছে? লেগেছে। তবে একটু সমস্যা আছে বলে মনে হয়। আপনি কি আমার ছেলেকেও চেনেন নাকি?
নিশানাথ বাবু হা-সূচক মাথা নাড়লেন।ডাক্তার সাহেব বললেন, ওকে অবশ্যি এ পাড়ার সবাই চেনে। বড়ো যন্ত্ৰণা করে। আপনার সঙ্গে কখনো কোনো বেয়াদবি করে নি তো? জ্বি না।কেউ যখন বলে আপনার ছেলেকে চিনি, তখনি একটু ব্ৰিত বোধ করি। ঐ দিন বাসার ছাদ থেকে কার মাথায় যেন পানি ঢেলে দিয়েছে। এগারো বছর বয়েস-এর মধ্যেই কি রকম দুষ্ট বুদ্ধি! আচ্ছা যাই।
ডাক্তার সাহেব চলে যাবার পর নিশানাথ বাবু প্রায় এক ঘণ্টা মূর্তির মতো বসে রইলেন। ব্যাপারটা কী হল তিনি কিছুই বুঝতে পারলেন না। এই এক ঘণ্টায় আরেকটি বিচিত্র ব্যাপার ঘটল। নিশানাথ বাবুর সামনের পার্টির দুটি দাঁত পড়ে গেল। তাঁর দাঁতে কোনো সমস্যা নেই অথচ পাকা ফল যেভাবে পড়ে, ঠিক সেইভাবে দাঁত পড়ে গেল! এর মানে কী? কী হচ্ছে এসব? তাঁর ভয় করতে লাগল। তিনি এক মনে গায়ত্রী মন্ত্ৰ জপ করতে লাগলেন।
জীব ও জড়ে যে ঈশ্বর, জল ও অগ্নিতে যে ঈশ্বর, যে ঈশ্বর আকাশে ও পাতালে সেই ঈশ্বরের কাছে সমর্পণ।তুষার এবং রাত্রি দুজনই তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। তুষারের মুখ ভাবলেশহীন, তবে রাত্রি একটু পরপর কেঁপে উঠছে। হাসি থামানর চেষ্টা করছে। সে বুঝতে পারছে কাজটা খুব অন্যায় হচ্ছে, তবু নিজেকে সামলাতে পারছে না। স্যারকে কী অদ্ভুত যে দেখাচ্ছে।
মাথায় একটু চুলও নেই। আবার সামনের পার্টির দুটো দাঁত নেই। তাও সহ্য করা যেত, কিন্তু এখন তাদের পড়াবার সময় খুখুট করে তিনটে দাঁত পড়ে গেল। এক মুহূর্তের জন্যে চেহারাটা হয়ে গেল অন্য রকম।নিশানাথ বাবু বললেন, হাসিস না।রাত্রি বলল, হাসি এলে কী করব? তবে আপনাকে দেখে আসছি না, স্যার। অন্য একটা ব্যাপারে হাসছি।কী ব্যাপার?
আছে একটা ব্যাপার। আমাদের স্কুলের একটা কাণ্ড।রাত্রি খুকধুক করে আসছে। হাসি চাপার চেষ্টা করছে, পারছে না। তুষার বলল, ও কিন্তু আপনাকে দেখেই হাসছে, স্যার।উহুঁ। আমি স্যারকে দেখে আসছি না। স্কুলের একটা ঘটনা মনে পড়েছে এই জন্যে হাসছি–হি হি হি হি।রাত্রি যে মিথ্যা কথা বলছে নিশানাথ বাবু তা বুঝতে পারছেন। আগেও বুঝতে পারতেন। মিথ্যা কথা বললে রাত্রির গলা অন্য রকম হয়ে যায়। আজও তার গলা অন্য রকম হয়ে গেছে। তবে নিশানাথ বাবু গলার স্বরের।
পরিবর্তন থেকে নয়, সম্পূর্ণ ভিন্ন এক পদ্ধতিতে জানতে পারছেন রাত্রি মিথ্যা বলছে। এই পদ্ধতি তিনি ব্যাখ্যা করতে পারবেন না, কারণ পদ্ধতিটি যে কী, তিনি নিজেও জানেন না। যেমন আজকের কথাই ধরা যাক। ছেলেমেয়ে দুটি বসে আছে তাঁর সামনে। নিশানাথ বাবু কোনো এক জটিল প্রক্রিয়ায় ইচ্ছামতো এদের দুজনের মাথার ভেতর ঢুকে যেতে পারছেন। মাথার ভেতরটা অনেকটা কুয়োর মতো। গহীন কুয়ো। এত গহীন যে ভয় হয় এর বোধহয় কোনো শেষ নেই।
নিশানাথ বাবু জানেন না অন্যের মাথার ভেতর চলে যাওয়ার প্রক্রিয়াটি কী। তিনি শুধু জানেন যে তিনি তা পারেন। সেই গহীন কূপের ভিতরে তিনি যখন নামেন তখন তাঁর রোমাঞ্চ বোধ হয়। কুয়োর দেয়ালগুলিতে থরে থরে কত কিছুই না সাজানো মানুষের স্মৃতি, জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা। কুয়োর গহীন থেকে উঠে আসে মানুষের চিন্তা, কল্পনা ও ভাবনা। একই সঙ্গে এক জন মানুষ কত কিছু নিয়েই না ভাবতে পারে।
মানুষের মাথার ভেতরে ঢুকতে পারার এই অদ্ভুত ক্ষমতার ব্যাপারটি নিশানাথ দু দিন আগে বুঝতে পেরেছেন। এই দুদিনে অনেকের মাথার ভেতর তিনি উঁকি দিয়েছেন। এ বাড়ির মালী, দারোয়ান, ড্রাইভার, রাস্তার ও-পাশে ভাই ভাই লণ্ড্রীর ছেলেটা, ডেল্টা ফার্মেসির রোগা লোক।
তিনি লক্ষ করেছেন একেক মানুষের জন্যে এই কুয়ো একেক রকম। কারও কারও কুয়ো আলোকিত। সেই সব ক্যােয় প্রবেশ করাও যেন এক গভীর আনন্দের ব্যাপার। এই যে শিশু দুটি তার সামনে বসে আছে তাদের মাথার ভেতরের কুয়ো দুটি আলোয় ঝলমল করছে। সেখানে কিছুক্ষণ থাকাও গভীর আনন্দের ব্যাপার।আবার সম্পূর্ণ বিপরীত ধরনের কুয়োও আছে। সেখানে গাঢ় অন্ধকার। সেইসব কুয়োয় আলোর লেশমাত্র নেই।
কুয়োয় ঢুকলে নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে। আতঙ্কে অস্থির হতে হয়। আবার কারো কারো কূয়োয় অল্প কিছু অংশ শুধু আলোকিত, বাকিটা গাঢ় অন্ধকারে ঢাকা। এ সবের কী মানে? পুরোটাই তাঁর কল্পনা নয় তো?রাত্রি বলল, স্যার, আপনার দাঁত পড়ে যাচ্ছে কেন? নিশানাথ বাবু বললেন, বুঝতে পারছি না। বয়স হয়েছে, সেই জন্যেই বোধ হয় পড়ে যাচ্ছে।তুষার বলল, স্যার আপনি কি জানেন বয়স হলে কেন দাঁত পড়ে যায়? না, জানি না।
আমি জানি। বুড়ো লোকদের শক্ত খাবার দরকার নেই, সেই জন্যে দাঁত পড়ে যায়।কে বলল? আরু বলেছে।ও আচ্ছা।আরু সব কিছু জানে। নিশানাথ বাবু বললেন, ট্রানস্লেশন নিয়ে বস, তুষার। ট্রানস্লেশনে তুমি বড়োই কাঁচা।রাত্রি বলল, ট্রানস্লেশনে আমি খুব পাকা, তাই না স্যার? নিশানাথ বাবু কিছু বললেন না। তুষার তার ট্রানস্লেশন নিয়ে বসল। তার মুখ অপ্রসন্ন। ইংরেজি তার অসত্য লাগে। তার চেয়েও অসহ্য লাগে ট্রানস্লেশন। সে খাতা খুলল। বাড়ির কাজ করতে হবে–
যখন রুগী মারা যাচ্ছে তখন ডাক্তার এলেন।
বাড়ি থেকে যখ বের হলাম তখন বৃষ্টি নামল।
যখন ঘন্টা পড়ল তখন স্কুলে গেলাম।
তুষার পেন্সিল কামড়াচ্ছে।
নিশানাথ বাবু বললেন, পারছ না?
পারছি।
রাত্রি বলল, ও মুখে বলছে পারছি, আসলে কিন্তু ও পারছে না।
তুষার রাগী চোখে তাকাল। রাগ সামলে খাতার উপর ঝুঁকে পড়ল। আসলেই সে পারছে না। তার খুব কষ্ট হচ্ছে। নিশানাথ বাবু হঠাৎ লক্ষ করলেন তিনি তুষারের মাথার ভেতরে চলে এসেছেন। সেই গহীন কুয়োর মাঝামাঝি একটা জায়গায়। তুষারের কষ্টটা তিনি বুঝতে পারছেন। সে বাক্যগুলির ইংরেজি প্রতিশব্দ জানে, কিন্তু সাজাতে পারছে না।
কোন শব্দটির পর কোন শব্দটি বসবে তা তার জানা নেই। আচ্ছা, তুষারের মাথার ভেতরে বসে কি তা ঠিক করে দেওয়া যায় না? এখান থেকে তাকে শেখানো কি সবচেয়ে সহজ নয়? চেষ্টা করে দেখবেন নাকি? এতে তুষারের কোনো ক্ষতি হবে না তো? নিশানাথ বাবু চেষ্টা করলেন। মুহূর্তের মধ্যে তুষার তা ধরে ফেলল। তুষারের মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। সে খাতার উপর ঝুঁকে পড়ে একের পর এক ট্রানস্লেশন করে যাচ্ছে।রাত্রি বলল, স্যার, ও কি পারছে?
হ্যাঁ পারছে।নিশানাথ বাবুর খুশি হওয়া উচিত, কিন্তু তিনি খুশি হতে পারছেন না। এই জটিলতার কিছুই তিনি বুঝতে পারছেন না। কোনো এক জনের সঙ্গে আলাপ করলে কেমন হয়? কার সঙ্গে আলাপ করবেন? যাকেই তিনি বলবেন সে-ই তাঁকে নিয়ে হাসাহাসি করবে। দীপা, দীপাকে কি বলা যায় না? সে কি হাসাহাসি করবে?
তুষার বলল, স্যার আমাকে আরো ট্রানস্লেশন দিন। আমার ট্রানস্লেশন করতে ভালো লাগছে।নিশানাথ বাবু বললেন, যখন অন্ধকার হয় তখন পাখিরা আকাশে ওড়ে।তুষার খাতায় ইংরেজিটা লিখছে। খাতা না দেখেও নিশানাথ বাবু বুঝতে পারলেন তুষার নির্ভুলভাবে ট্রানস্লেশন করবে। কারণ ইংরেজিটা সে ভাবছে, তিনি তাঁর ভাবনা বুঝতে পারছেন। এর মানে কী? হে ঈশ্বর, এর মানে কী? এর মানে কী? এর মানে কী? আলো কি ঘুমুচ্ছে?
দীপা বুঝতে পারছেন না। আলোর চোখ বন্ধ। একটা হাত মার গায়ে ফেলে রেখেছে। নিঃশ্বাস ভারী। লক্ষণ দেখে মনে হচ্ছে সে ঘুমিয়ে পড়েছে, তবু দীপা নিশ্চিত হতে পারছেন না। তিনি ঘড়ির দিকে তাকালেন। এগারোটা দশ বাজে। প্ৰায় আধা ঘণ্টার মতো হলো তিনি আলোকে নিয়ে শুয়েছেন। আলো-র মাথায় বিলি কেটে দিয়েছেন। পিঠে হাত বুলিয়ে দিয়েছেন। এতক্ষণ তার ঘুম এসে যাওয়ার কথা।
তিনি খুব সাবধানে আলোর হাত ঘুরিয়ে বিছানায় উঠে বসলেন। মেয়ের দিকে তাকিয়ে ছোট্ট একটা নিঃশ্বাস চাপলেন। এই মেয়ে তাঁকে বড়ো বিপদে ফেলেছে। অন্য এক ধরনের বিপদ, যে বিপদের কথা বাইরের কাউকে বলা যাবে না। বিপদের ধরনটা বিচিত্র। সন্ধ্যা মেলবার পর থেকে আলো তার বাবাকে সহ্য করতে পারে না। দীপাকে মেয়ে নিয়ে আলাদা ঘরে ঘুমুতে হয়।
সেই ঘরে মহসিন সাহেবের উকি দিলে সে অন্য রকম হয়ে যায়। কঠিন চোখে বাবার দিকে তাকায়। শক্ত করে মাকে চেপে ধরে। জাস্তব এক ধরনের শব্দ করতে থাকে। মহসিন সাহেব দুঃখিত ও ব্যথিত হন। মন খারাপ করে বলেন, ও আমাকে দেখে এরকম করে কেন দীপা? দীপা কাটান দিতে চেষ্টা করেন। কোমল গলায় বলেন, সব সময় তো করে না।তা ঠিক। সব সময় করে না। শুধু রাতেই এমন করে। কারণটা কী?
রাতে বোধ হয় সে বেশি ইনসিকিওর ফিল করে।আমার তা মনে হয় না। আমার কী মনে হয়, জান? আমার মনে হয়, সে কোনো এক রাতে আমাদের কিছু অন্তরঙ্গ ব্যাপার দেখে ফেলেছে। হয়তো ঐ ব্যাপারটা মনে গেঁথে আছে এসব নিয়ে তুমি মন খারাপকরো না। একটু বুদ্ধি হলেই ওরকম আর করবে না।বুদ্ধি হচ্ছে কোথায়? যত বয়স হচ্ছে ও তো দেখছি ততই–
মহসিন কথা শেষ করেন না। মুখ অন্ধকার করে ফেলেন। দীপা কি করবেন বুঝতে পারেন না। বেচারা একা একা রাত কাটায়, এটা তাঁর ভালো লাগে না। পুরুষ মানুষ শরীরের ভালোবাসার জন্যে কাতর হয়ে থাকে। সেই দাবি মেটানো দীপার পক্ষে বেশির ভাগ সময়ই সম্ভব হয় না।মাঝে মাঝে রাত এগারোটার দিকে মহসিন এই ঘরের দরজার পাশে এসে দাঁড়ান। কঠিন গলায় বলেন, দীপা ঘুমোচ্ছ?
দীপা বলেন, না, আসছি। ও বোধ হয় এখনো ভালোমতো ঘুমোয় নি।দীপা খুব সাবধানে আলোর হাত ছাড়িয়ে উঠতে চান। আলো সঙ্গে সঙ্গে জেগে উঠে ক্রুদ্ধ গর্জন করে ওঠে এবং দু হাতে মাকে জড়িয়ে ধরে। মহসিন ক্লান্ত গলায় বললেন, ওকে ঘুম পাড়াও। আমি শুয়ে পড়ছি।তিনি কিন্তু শুয়ে পড়েন না। ঘরে বাতি জ্বলে। চুরুটের গন্ধ অনেক রাত পর্যন্ত ভেসে আসে। দীপার বড়ো মন খারাপ লাগে। অথচ কিছুই করার। নেই। যত বার তিনি উঠতে যান আলো ততবারই তাঁকে জাপটে ধরে।
আজ অবশ্যি আলো ঘুমাচ্ছে। ভাবভঙ্গিতে মনে হচ্ছে গাঢ় ঘুম। হয়তো আজ জাগবে না। দীপা সাবধানে বিছানা থেকে নামলেন। বাতি নিভিয়ে নীল আলো জ্বলে দিলেন। পাশের ঘরে ঢুকলেন।মহসিন বিছানায় শুয়ে ন্যাশনাল জিওগ্রাফি পড়ছিলেন। স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে নরম গলায় বললেন, আলো ঘুমোচ্ছ। হুঁ।জেগে যাবে না তো? একটা কোল বালিশ দিয়ে এসেছে?
হুঁ।দীপা দরজার ছিটকিনি লাগিয়ে দিলেন। তাঁর অবশ্যি খুব অস্বস্তি লাগছে। মাঝরাতে এ ঘরে আসা, আস্তে আস্তে কথা বলা, ছিটকিনি লাগানো—সব কিছু মনে করিয়ে দেয় এই সমস্ত কর্মকাণ্ডের পেছনের উদ্দেশ্যটি অন্য। বিছানায় পাশাপাশি শুয়ে গল্প করতে করতে শরীরে পৌছানো এক ব্যাপার, আর এরকম প্রস্তুতি নিয়ে এগোনো সম্পূর্ণ অন্য জিনিস। এতে নিজেকে কেমন যেন ছোট মনে হয়।
দীপা অস্বস্তি বোধ করছেন অস্বস্তি কাটানোর জন্যে তিনি অন্য গল্প শুরু করলেন, তোমার স্যারেরজীত সব পড়ে যাচ্ছে, জান? না তো। দাঁত পড়ে যাচ্ছে? উপরের পাটিতে একটি দাতও এখন নেই।বল কি? অদ্ভুত ব্যাপার না? নিচের পাটিতে সব দাঁত আছে অথচ উপরের পাটির একটা দাঁতও নেই। তোমার কাছে ব্যাপারটা অদ্ভুত লাগছে না?
অদ্ভূত তো বটেই।তিনি তাঁর স্ত্রীর কথা এখন তেমন মন দিয়ে শুনছেন না। তিনি দীপাকে আদর করতে শুরু করেছেন। পুরুষদের সেই বিশেষ আদর যা দীপার একই সঙ্গে ভালো লাগে এবং ভালো লাগে না।দীপা বললেন, বাতি নিভিয়ে দাও না। লজ্জা লাগছে।
Read more
