রিকশায় উঠেই মুনার মনে হল বাসায় এই সময় ফিরে কোনো লাভ নেই। দুপুরে ঘুমুলেই সারাটা বিকাল এবং সারাটা সন্ধ্যা তার খুব খারাপ কাটে। রাতের বেলা ঘুম আসে না। রাত দুটো তিনটে পর্যন্ত জেগে থাকতে হয়। মুনা রিকশাওয়ালাকে বলল মগবাজারের দিকে যেতে। এ সময় মামুনের মেসে থাকার কথা নয়। তাকে পাওয়া যাবে না এটা প্রায় একশ ভাগ সত্যি।
তবু একবার দেখে গেলে ক্ষতি নেই কোনো। না পাওয়া গেলে কলেজে গিয়ে খোঁজ নেয়া যাবে। কোন বইতে যেন পড়েছিল পুরুষরা সবচে খুশি হয় যখন তারা মেয়েদের কাছ থেকে সিগারেট উপহার পায়। মামুনকে সে আগেও কয়েকবার সিগারেট দিয়েছে, কোনো বারই মনে হয়নি সে খুব খুশি হয়েছে। এমন ভাবে প্যাকেট খুলেছে যেন এটা তার প্রাপ্য। আজও তাই করবে।
মামুন মেসে ছিল না। তার পাশের রুমের আলম সাহেব বললেন, উনি তো টেলিগ্রাম পেয়ে দেশে গেছেন। তার এক বোন মারা গেছে, আপনি কিছু জানেন না?
না।
অনেক দিন ধরে অসুস্থ ছিল। উনার সবচে ছোট বোন।
মুনা একটু বিব্রত বোধ করতে লাগল। এত বড় একটা ব্যাপার মামুন তাকে কোনোদিন বলেনি। তার একটি ছোট বোন আছে তা সে জানত কিন্তু এই বোনের এমন একটা অসুখ তা মামুন কোনোদিন বলেনি।
বসবেন আপনি?
জি না, বসব না। ও দেশে গেছে কবে?
পরশু সকালে। টেলিগ্রাম এসেছে তার আগের রাত্রে। ট্রেন ছিল না, যেতে পারেনি।
কবে আসবে কিছু বলে গেছে?
জি না কিছু বলেনি। আজ-কালের মধ্যে এসে পড়বে। মরবার পর তো আর কিছু করার থাকে না, শুধু শুধু ঘরে বসে থেকে হয়টা কি?
মুনা ক্লান্ত ভঙ্গিতে এসে রিকশায় উঠল। কড়া রোদ এসেছে। চকচক করছে চারদিক। তাকালেই মাথা ধরে যায়। মুনা হ্যান্ড ব্যাগ খুলে সানগ্লাস বের করল। রোদটা খুব চোখে লাগছে।সানগ্নাস ব্যাপারটা বেশ অদ্ভুত। চোখে পরিবার সঙ্গে সঙ্গে চারদিক কেমন মেঘলা হয়ে যায়। একটু যেন মন খারাপ ও লাগে। মুনা ছোট্ট একটি নিঃশ্বাস ফেলল।
অস্পষ্ট ভাবে তার মনে হতে লাগল–মামুন কখনো তার নিজের ভাই-বোন-মা-বাবার কথা নিয়ে তার সঙ্গে গল্প করেনি। এমন একজন অসুস্থ বোন ছিল তার এটাও পর্যন্ত বলেনি। না বলার পেছনে কোনো যুক্তি নেই। মুনার খুব জানতে ইচ্ছে হল এই বোনটি কি ওর খুব আদরের ছিল? নামই বা কি তার? নাম মামুন বলেছিল, খুবই কমন একটা নাম বলে এখন মনে পড়ছে না। রোকেয়া বা সাবিহা জাতীয়।
মুনার মনে হল একটা চিঠি লিখে রেখে এলে ভাল হত। অল্প কয়েক কথার সুন্দর একটা চিঠি–
হঠাৎ করে তোমার বোনের মৃত্যু সংবাদ শুনলাম।
সে যে অসুস্থ তা তো তুমি কখনো বলনি।…
চিঠিটা ঠিক হচ্ছে না। অভিযোগের ভঙ্গি এসে পড়েছে। কেন অসুস্থতার খবর আগে বলা হয়নি। সেই নিয়ে অভিযোগ। পুরোপুরি মেয়েলি অভিযান। মৃত্যুর মত এত বড় একটা ব্যাপারের পাশে মেয়েলি অভিযোগ একেবারেই মিশ খায় না।
মুনা মনে মনে চিঠিটা অন্যভাবে লিখতে চেষ্টা করল এবং এক সময় খুবই অবাক হয়ে লক্ষ্য করল। তার চোখ ভিজে উঠেছে। কেন মামুন তাকে আগে বলল না?
বকুলদের স্কুলে কোনোদিনই পুরোপুরি ক্লাস হয় না। প্রায় দিনই সেভেনথ পিরিয়ডে ছুটি হয়ে যায়। আজ সেভেনথ পিরিয়ডে রেহানা আপার ক্লাস। এই ক্লাসটা হবে না ধরেই নেয়া যায়। কারণ রেহানা আপার অনেক রকম যোগাযোগ আছে। সে সব নিয়ে তাকে ব্যস্ত থাকতে হয়। মেয়েদের টিফিন এবং কোঅপারেটিভদের দোকান তিনিই চালান।
গার্লস গাইড এবং সবুজ সেবিকার ব্যাপারগুলিও তাকে দেখতে হয়। নিয়মিত ক্লাস নেবার সময় কোথায় তার! কিন্তু আজ তাকে ক্লাসে আসতে দেখা গেল। তাঁর মুখ গম্ভীর, হাতে প্রকাণ্ড একটা গ্লোব। তিনি ক্লাসে ঢুকেই ব্ল্যাকবোর্ডে বড় বড় করে লিখলেন, জলবায়ু। জলবায়ু তিনি গত সপ্তাহের আগের সপ্তাহে পড়িয়েছেন, কেউ অবশ্যি তাকে সেটা বলল না।
ফরিদা তুই বল জলবায়ু মানে কি?
ফরিদা ফ্যাকাশে মুখে দাঁড়িয়ে রইল। তিনি তাকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে ছাত্রীদের মোট সংখ্যা গুণতে লাগলেন। সব মিলিয়ে আটত্রিশ জন ছাত্রী উপস্থিত। তিনি মুখ অন্ধকার করে বললেন, আটত্রিশ জন প্রেজেন্ট, কিন্তু টিফিন এনেছিস একচল্লিশটা, কেন?
ক্লাস ক্যাপ্টেন অনিমার মুখ শুকিয়ে গেল।
বল একচল্লিশটা টিফিন কেন?
অনিমা আমতা আমতা করতে লাগল।
চুরি শিখে গেছিস এই বয়সে, বাবা কি করে?
অনিমার মুখে কথা জড়িয়ে গেল। রেহানা আপা আরো গম্ভীর হয়ে বললেন, জলবায়ু কাকে বলে বল দেখি? এটি একটি কাঁচা কাজ হয়ে গেল। কারণ অনিমা খুবই ভাল ছাত্রী। জলবায়ু কি এটি সে তার চেয়েও অনেক গুছিয়ে বলল।
ভূ-মধ্যসাগরীয় অঞ্চলের জলবায়ু কী বল?
আপা এটা এখনো পড়ানো হয়নি?
সব কিছু পড়িয়ে দিতে হবে? নিজে নিজে পড়া যায় না? তুই আজ ক্লাস শেষে আমার সঙ্গে দেখা করবি। বসছিস কি জন্যে? বসতে বলেছি? দাঁড়িয়ে থােক। ফরিদা তুইও দাঁড়িয়ে থাক।
তিনি প্ৰায় দশ মিনিট ধরে মেয়েদের মিথ্যা বলার অভ্যাস এবং চুরি করার অভ্যাসের ওপর বক্তৃতা দিয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়লেন। ক্লাসে টু শব্দও হল না। তিনি কপালের ঘাম মুছে ক্লান্ত স্বরে বললেন, বকুল ক্লাসে এসেছে?
সবচে পেছনের বেঞ্চ থেকে বকুল ভয়ে ভয়ে উঠে দাঁড়াল।
তোকে গতকাল টিফিন পিরিয়ডে আমার সঙ্গে দেখা করতে বলেছিলাম, করেছিলি?
আপা, আমি গিয়েছিলাম, আপনি হেড আপার সঙ্গে কথা বলছিলেন।
কথা কি আমি সারা জীবন ধরে বলেছিলাম? পাঁচ মিনিট দাঁড়ানো গেল না?
বকুল প্রায় আধা ঘণ্টা দাঁড়িয়ে ছিল, কিন্তু সে কিছু বলল না।
আজ ক্লাস শেষ হবার সাথে সাথে আসবি। বাংলাদেশের জলবায়ু কি রকম বল?
বকুল ঘামতে লাগল।
বইয়ের সঙ্গে কারো কোনো সম্পর্ক নেই? মৌসুমী বায়ু কাকে বলে? কেউ জানো না? কে জানে? হাত তোল।
শুধু অনিতা হাত তুলল। তিনি অনিমাকে কিছু জিজ্ঞেস করলেন না। বিমর্ষ মুখে বাংলাদেশের জলবায়ুর কথা বলতে লাগলেন। গত সপ্তাহের আগের সপ্তাহেও একই কথা বলেছিলেন। তার মনে নেই। ক্লাসের মেয়েরা ঘণ্টা পড়ার জন্যে অপেক্ষা করতে লাগল। ঘণ্টা আর পড়ছে না। তাদের মনে হল তারা অনন্তকাল ধরে ক্লাসে বসে আছে।
বকুল টিচার্স কমন রুমে ভয়ে ভয়ে উঁকি দিল। রেহানা আপা হাত নেড়ে নেড়ে অংক আপার সঙ্গে কথা বলছে। তিনি ইশারায় বকুলকে অপেক্ষা করতে বললেন। কতক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে কে জানে। অন্য ছাত্রীরা সব চলে যাচ্ছে। স্কুল ঘর দ্রুত ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে। আজ তার একা একা যেতে হবে। বকুল কিছুক্ষণ পর পর্দা ফাঁকা করে আবার উঁকি দিল। রেহানা আপা এবং অংক আপা দুজনেই খুব হাসছে। অংক আপা কখনো হাসেন না। তার হাসি দেখে বকুল খুবই অবাক হল। অংক আপা বকুলকে তাকিয়ে থাকতে দেখে হাসি থামিয়ে গম্ভীর হয়ে গেলেন। রেহানা আপার মুখ অবশ্যি এখনো হাসি হাসি। তিনি চটের ব্যাগটা হাতে নিয়ে বেরিয়ে এলেন।
বকুল তুই আয়, হাঁটতে হাঁটতে কথা বলি। রাস্তার মোড় পর্যন্ত এগিয়ে দেব। তারপর রিকশা নিয়ে চলে যাবি। কাল যখন স্কুলে আসবি তখন মনে করে তোর একটা ছবি নিয়ে আসবি।
বকুল অবাক হয়ে তাকাল। রেহানা আপা বললেন, শাড়ি পরা ভাল ছবি আছে?
জি না আপা।
তাহলে এক কাজ কর, আজ বিকেলেই একটা তুলিয়ে ফেল। চুলগুলি সামনে ছড়িয়ে দিবি। যাতে কত লম্বা সেটা টের পাওয়া যায়।
বকুল ক্ষীণ কণ্ঠে বলল, জি আচ্ছা।
খুব দরকার, ভুলে যাবি না যেন আবার।
বকুল কথা বলল না। রেহানা আপা বললেন, তুই তো সবার বড়, তাই না?
জি আপা।
ক ভাই-বোন তোরা?
এক ভাই এক বোন।
বাহ ছোট ফ্যামিলি তো। এক’দিন যাব তোদের বাসায়। তোর মাকে বলিস।
জি আচ্ছা।
পড়াশুনা করছিস তো ঠিকমত?
করছি।
লাস্ট বেঞ্চে বসিস কেন সব সময়? ফাস্ট, বেঞ্চে বসবি। মনে থাকবে?
থাকবে।
রেহানা আপা রাস্তার মোড়ে বকুলের জন্যে একটা রিকশা ঠিক করে, রিকশাওয়ালার হাতে দুটাকা ভাড়া দিয়ে দিলেন।
বকুল হুঁড় তুলে দে। হুঁড না তুলে মেয়েদের রিকশা করে যাওয়া আমার পছন্দ না।
বকুল সারা পথ অস্বস্তি বোধ করতে লাগল। মেয়েদের কাছে রেহানা আপার ছবি চাওয়া কোনো নতুন ব্যাপার না। তিনি উপরের ক্লাসের সুন্দরী মেয়েদের কাছে (বেছে বেছে, সবার কাছে না) ছবি চান এবং তার দিন দশেকের মধ্যে সেই সব মেয়েদের বিয়ে হয়ে যায়। আজেবাজে বিয়ে নয়, ভাল বিয়ে।
রেহানা আপার ধারণা ক্লাস টেনে পড়া মেয়েরা হচ্ছে বিয়েব পাত্রী হিসেবে সর্বশ্রেষ্ঠ। এই সময়টা মেয়েরা ছেলেদের সম্পর্কে প্রথম কৌতূহলী হয় এবং প্রেম করবার জন্যে ছোক ছোক করে। বিয়ের পর হাতের কাছে স্বামীকে পায় বলেই প্রথম প্ৰেম হয় স্বামীর সঙ্গে। সে প্ৰেম দীর্ঘস্থায়ী হয়। ক্লাস টেনে পড়া মেয়েদের সম্পর্কে তার নানা রকম থিওরি আছে। এই সব থিওরি তিনি অত্যন্ত আগ্রহের সঙ্গে প্রচার করে থাকেন।
শওকত সাহেব বাইরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিলেন। তিনি বকুলকে রিকশা থেকে নামতে দেখে অবাক হলেন। তাকে রিকশা ভাড়া দেয়া হয় না। স্কুল এত দূরে নয় যে, রিকশা করে যাওয়া-আসা করতে হবে। সংসারে কোনো কাঁচা পয়সা নেই। বকুল বোধ হয় মুনার কাছ থেকে নিচ্ছে। মুনা এই সংসারে নানান ভাবে টাকা খরচ করে। এটা তার পছন্দ নয়। কোন বইতে যেন পড়েছিলেন, যে সংসারে মেয়েদের রোজগারের টাকা খরচ হয় সেই সংসারের কোনো আয়উন্নতি হয় না।
বকুল ঘরে ঢুকলা খুব ভয়ে ভয়ে। তার ধারণা ছিল বাবা অকারণেই তাকে একটা ধমক দেবে। দেরি হল কেন? রিকশা করে এসেছিস কেন? কিন্তু শওকত সাহেব তেমন কিছুই করলেন না। মেয়ের দিকে ভালমত তাকালেনও না।
চারদিক ফাঁকা ফাঁকা। মুনা আপা বা বাবু কেউ নেই। সে মার ঘরে উঁকি দিল। লতিফা হাত ইশারায় তাকে আসতে বললেন। তার চোখ জ্বলজ্বল করছে, যেন বড় একটা কিছু ঘটেছে। তিনি ফিসফিস করে বললেন, তোর বাবার কি হয়েছে?
কেন? হবে আবার কি?
মিষ্টি কিনে এনেছে।
কোথায় মিষ্টি?
ঐ দেখা ড্রেসিং টেবিলের উপর।
বকুল অবাক হয়ে দেখল সত্যি সত্যি এক প্যাকেট মিষ্টি। সে বলল, তুমি জিজ্ঞেস করনি কিছু?
না, তুই জিজ্ঞেস করে আয়।
মুনা আপা আসুক, সে জিজ্ঞেস করবে।
লতিফা নিজের মনে বললেন, আজ তোর বাবা চেঁচামেচি রাগারগি কিছু করেনি। অফিস থেকে এসেছেও সকাল সকাল।
বকুল বলল, আজ তোমার শরীর কেমন?
ভালই। যা তোর বাবাকে চা বানিয়ে দে। ঘরে মুড়ি আছে। পেয়াজ-মরিচ দিয়ে মেখে দে।
বকুল বারান্দায় গেল। বাবা আগের মতই হাঁটাহাঁটি করছেন। কারো জন্যে অপেক্ষা করছেন বোধ হয়। বকুল ক্ষীণ স্বরে ডাকল বাবা।
কি?
চা আনি?
আন।
চায়ের সঙ্গে কিছু খাবে? ঘরে মুড়ি আছে। মেখে দেই।
দে। বেশি করে ঝাল দিবি। আর শোন, মিষ্টি এনেছি। তোর মাকে দে তুইও খা।
বকুল ভয়ে ভয়ে বলল, মিষ্টি কি জন্যে?
এমনি আনলাম।
শওকত সাহেব সিগারেট ধরিয়ে বিব্রত ভঙ্গিতে কাশতে লাগলেন। মিষ্টি এনে তিনি যেন একটা অপরাধ করে ফেলেছেন।
বকুল ছবির কথা তুলালো রাতের খাবার সময়। অন্য সবার খাওয়া হয়ে গেছে। মুনা এবং সে বসেছে শেষে। এ-কথা সে-কথার পর বকুল খুব স্বাভাবিক ভাবে রেহানা আপার ছবি-চাওয়ার কথা বলল। মুনা খাওয়া বন্ধ করে তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বলল, কেন ছবি দিয়ে কি হবে?
আমি কি করে জানব আপা?
তুই কিছু জিজ্ঞেস করিসনি?
না।
ঠিক কি কি কথা হয়েছে তোর সাথে?
বকুল কথাগুলো গুছিয়ে বলতে চেষ্টা করল। কিন্তু ঠিকমত বলতে পারল না।
মুনা বলল, শাড়ি পরা ছবি চেয়েছে?
হ্যাঁ।
তোকে বিয়ে দিতে চায় নাকি?
বকুল কোনো জবাব দিল না।
কি, কথা বলছিস না কেন?
বোধ হয়। আপা এ রকম মেয়েদের কাছে ছবি চায়। তারপর ওদের বিয়ে হয়ে যায়। শায়লার এ রকম বিয়ে হল। ডাল নাও আপা। ডাল নিয়ে খাও।
খেতে ইচ্ছা করছে না।
মুনা প্লেট ঠেলে উঠে দাঁড়াল।
তুমি কি আমার ওপর রাগ করেছো আপা?
তোর ওপর বাগ করব কেন? তুই আয়, তোব সঙ্গে আমার জরুরি কথা আছে।
বাবু বিছানায় শুয়ে বই পড়ছিল। পড়ার ভঙ্গি দেখে মনে হতে পারে গল্পের বই। কিন্তু গল্পের বই না। বাবা যে কোনো সময় ঘরে ঢুকতে পারেন রাত দশটার আগে হাতে গল্পের বই দেখলে সৰ্ব্বনাশ হয়ে যাবে।
মুনা ঘরে ঢুকতেই বাবু হাসিমুখে বলল, ফ্যান দেখেছি আপা? নতুন ফ্যান। বাকের ভাই বলে গেছেন পুরানটা ঠিক না হওয়া পর্যন্ত এটা থাকবে। মুনা বিরক্ত চোখে ফ্যান দেখল। কিছু বলল না। বাবু বলল, আরাম করে ঘুমানো যাবে, ঠিক না আপা?
হুঁ। তোর মাথাব্যথা হয়নি?
না!
বিকেলে খেলতে গিয়েছিলি?
হুঁ।
এখন থেকে রোজ যাবি। নিয়মিত খেলাধুলা করলে মাথাব্যথা থাকবে না। ঝড় হোক, বৃষ্টি হোক, যাবি।
আচ্ছা যাব।
যা তো আমার জন্যে একটা পান নিয়ে আয়। কেমন যেন বমি বমি আসছে।
বাবু পান আনতে গিয়ে আর ফিরল না। শওকত সাহেব তাকে আটকে ফেললেন। ইংরেজি বানান ধরতে লাগলেন। মাসকিউটো, এমব্রয়ডারি, ইনকুইজিটিভনেস এই জাতীয় বানান। বাবু তালগোল পাকিয়ে ফেলতে লাগল। যেটাতেই সে আটকাচ্ছে সেটাই ডিকশনারি খুঁজে বের করতে হচ্ছে এবং বিশবার করে সশব্দে বানান করতে হচ্ছে।
রান্নাঘর গুছিয়ে বকুল যখন শোবার ঘরে উঁকি দিল তখন রাত দশটা বাজে। মুনা ঘর অন্ধকার করে শুয়ে আছে। বকুল মৃদু স্বরে ডাকল, আপা।
কি?
ঘুমোচ্ছ নাকি?
না।
কি যেন বলবে বলেছিলে আমাকে?
মুনা একটা লম্বা বক্তৃতা তৈরি করে রেখেছিল। কিন্তু বক্তৃতাটা দেয়া গেল না। সে শুধু বলল, তুই রেহানা আপাকে বলিস, আমার বাবা ছবি দিতে রাজি হলেন না। বকুল বলল, এটা কেমন করে বলব?
অন্য কথাগুলি যেমন করে বলিস ঠিক তেমনি বলবি।
আপা দারুণ রাগ করবে।
রাগ করলে করবে। রাগ কমানোর জন্যে বাচ্চা একটা মেয়ের বিয়ে হয়ে যাবে? তুই কী বুঝিস বিয়ের?
আপা আস্তে। বাবা শুনবে।
মাস্টারদের দায়িত্ব হচ্ছে পড়ানো। বিয়ে দেয়া না। যখন সময় হবে তখন আপনাতেই বিয়ে হবে। এই নিয়ে তোর এত চিন্তা কিসের?
আমি আবার কখন চিন্তা করলাম?
ছবি দেয়ার ব্যাপারে তোর এত আগ্রহ কেন?
তুমি বুঝতে পারছি না। আপা খুব রাগ করবে।
রাগ করলে করবে। যা আমার জন্যে একটা পান বানিয়ে আন। বাবুকে পাঠিয়েছিলাম, সে আর ফিরবে না। আটকে গেছে।
আপা নতুন ফ্যান দেখেছ?
দেখলাম।
বাকের ভাই নাকি এসে অনেকক্ষণ ছিল। অনেক গল্পটল্প করল।
কার সঙ্গে করল?
বাবার সঙ্গে। বাবা আজ সকাল ফিরেছিলেন। বাকের ভাই এসেই গল্প জুড়ে দিল। কালপরশুর মধ্যে একটা কাজের লোকও এনে দেবে বলেছে।
এনে দিলে তো ভালই। তুই যা, পানটা নিয়ে আয়।
আমার সাহসে কুলাচ্ছে না। বাবার সামনে দিয়ে যেতে হবে। তুমি নিজেই যাও না আপা।
মুনা উঠে বসল। বকুল বলল, মিষ্টি কি জন্যে আনলেন এটাও একটু জিজ্ঞেস করবে। জানতে ইচ্ছা করছে।
জানতে ইচ্ছে হলে তুই নিজেই জিজ্ঞেস কর।
আমার এত সাহস নেই।
বসার ঘর থেকে শওকত সাহেব ডাকলেন, বকুল বকুল। বকুল মুখ অন্ধকার করে উঠে গেল।
শওকত সাহেবের সামনে বাবু কানে ধরে দাঁড়িয়ে ছিল। তার চোখ লাল। বকুল এসে ঢুকতেই শওকত সাহেব বললেন, পাটিগণিত নিয়ে আয়।
টেলিগ্রামে লেখা ছিল–ফরিদা সিরিয়াস, কাম ইমমিডিয়েটলি। মামুন ধরেই নিয়েছিল। সে মারা গেছে। আলম সাহেবকে যাবার বেলায় বলেও গেল, বোনটা মারা গেছে বোধহয়। মৃত্যুর খবরে লোকজন সব সময়ই হকচাকিয়ে যায়, আলম সাহেবও হকচাকিয়ে গেলেন।
কীভাবে মারা গেছে? সে সব কিছু লেখেনি অসুস্থ ছিল। ওর মৃত্যুটা আমাদের সবার জন্যেই রিলিফ। বড় কষ্টে ছিল।
তাই নাকি? জি। বাড়িতে গেলে ঘুমাতে পারতাম না। চিৎকার করতো সারা রাত। চোখে দেখা যায় না এমন কষ্ট।
হয়েছে কি? স্নায়ুর মধ্যে কি যেন হয়েছে। চিকিৎসা নেই কোনো। ব্যথা কমানোর ইনজেকশন দিয়েও কিছু হয় না। বাড়ি যাওয়াই ছেড়ে দিয়েছিলাম।
কথা খুবই সত্যি। মামুন গত এক বছরে একবার মাত্র গিয়েছিল এক’দিন থেকে পালিয়ে এসেছে। সারারাত উঠোনে মোড়া পেতে কাটিয়েছে। ভয়ংকর একটা রাত। এখন বাড়িতে গেলে সে রকম কোন ঝামেলা হবে না। ঘুমানো যাবে না।
তাদের গ্রামের বাড়িটি সুন্দর। পাকা দালান। পেছনের পুকুরটি বুজে গেছে। এটা ঠিকঠাক করতে হবে। মুনাকে নিয়ে গ্রামে আসতে হবে। সে কোনোদিন গ্রাম দেখেনি। গ্রাম সম্পর্কে তার ধারণা খুবই খারাপ। ধারণা পাল্টে যাবে।
মামুন বাড়ি পৌঁছল সন্ধ্যার পর। চারদিকে কেমন অস্বাভাবিক নীরবতা। বসার ঘরের বারান্দায় হারিকেন জ্বলিয়ে কয়েকজন মুরব্বি বসে আছেন। মামুনকে দেখে তাঁরা এগিয়ে এলেন। মৃদু স্বরে কি সব যেন বলতে লাগলেন। কিছুই বোঝা গেল না। মামুনের বড় চাচা বললেন, তোমার লাগি অপেক্ষা। তুমি না আওনে দম বাইর হইতাছে না। যাও ভিতরের বাড়িতে যাও। ভোইনের সাথে কথা কও;
ফরিদা বড় খাটটায় পড়ে আছে। ঘরে দুটো হারিকেন একটা কুপী। অনেক মেয়েদের ভিড়। মামুন ঘরে ঢুকতেই ফরিদার গোঙানি থেমে গেল। সে পরিষ্কার গলায় ডাকল, ভাইজান!
মামুন অসাহায়ের মত তাকাল চারদিকে।
ভাইজান বড় কষ্ট।
হারিকেনেব আলোয় চকচক করছে ফরিদার চোখ। চোখগুলো এখনো এত সুন্দর?
ফরিদার শ্বাসকষ্ট শুরু হয়েছে। টেনে টেনে শ্বাস নিচ্ছে। মামুনের কি উচিত কাছে গিয়ে বসা? হাতে হাত রাখা। কিন্তু জন্তুর মত শব্দ যে করছে সে কি ফরিদা? একজন কে হারিকেন উঁচু করে ধরলেন। ভালমত দেখাতে চান বোধ হয়। কী আছে দেখানোর?
ফরিদা শ্বাস টানার ফাঁকে ফাঁকে বলল, গত বছর আপনি আসছিলেন। কিন্তু আমার সঙ্গে কোনো কথা বললেন না। আমার মনে কষ্ট হয়েছে।
এমন কোনো মনের কষ্ট আছে যা এই তীব্র শারীরিক যন্ত্রণাকে স্পর্শ করতে পারে? মামুন ঘোলাটে চোখে তাকাতে লাগল চারদিকে।
একজন বুড়ো মহিলা বললেন, পশ্চিম দিকে মুখ কইরা দেন। কলমা তৈয়াব পড়েন। লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মদুর রাসুলাল্লাহ।
শ্বাসকষ্ট সন্ধ্যা রাত্ৰিতে শুরু হলেও ফরিদা মারা গেল পরদিন সকাল নটায়। একেকবার কষ্টটা কমে যায়, সে চোখ বড় বড় করে তাকায় সবার দিকে। সেই তাকানো দেখেই মনে হয়। সে বুঝতে পারছে সময় ফুরিয়ে যাচ্ছে এবং তার জন্যে সে খুশি। সে অপেক্ষা করছে আগ্রহ নিয়ে।
মামুন বাড়ি যাবার সময় ঠিক করে রেখেছিল দু’দিন থাকবে। কলেজ থেকে ছুটি নেয়া হয়নি। কাউকে কিছু বলে যাওয়া হয়নি। দুদিনের বেশি থাকার প্রশ্নই ওঠে না। কিন্তু সে থাকল এগারো দিন। বারো দিনের মাথায় ঢাকায় ফিরে এল। তার মুখ ভর্তি খোঁচা খোঁচা দাড়ি। অনিদ্রাজনিত কারণে চোখ লাল। আলম সাহেব তাকে দেখে আঁতকে উঠলেন। মামুন শুকনো হাসি হেসে বলল, সব ভাল তো?
ভাল, সবই ভাল। আপনি কেমন?
ভালই। চিঠিপত্র আছে কিছু?
জ্বী না, চিঠিপত্র নেই।
মুনা খোঁজ করেছিল?
জ্বী, এসেছিল এক’দিন।
মামুন আর কিছুই জিজ্ঞেস করল না। সারাদিন কাটাল ঘুমিয়ে। সন্ধ্যাবেলা একা একা একটা সিনেমা দেখতে গেল–দি বিস্ট। একজন মানুষ পূর্ণিমা রাতে কেমন করে নেকড়ে হয়ে যায় তার গল্প। প্রথমদিকে গল্পটি কিছুই ধরা যাচ্ছিল না। শেষ দিকে দারুণ জমে গেল। মামুন অবাক হয়ে লক্ষ্য করল সে বেশ উত্তেজনা অনুভব করছে। শেষ দৃশ্যে সুন্দরী একটি তরুণী মেয়ের কৌশলের কাছে জন্তুটির পরাজিত হবার ঘটনাটি তাকে অভিভূত করে ফেলল। চারদিকে হাততালি পড়ছে। সে বহু কষ্টে হাততালি দেবার লোভ সামলাল। প্রথম থেকে ছবিটি মন দিয়ে না দেখার জন্যে তার আফসোসের সীমা রইল না।
মেসে রাতে খাবার ব্যবস্থা আছে। তবুও সে হেঁটে হেঁটে নবাবপুরের এক দোকানে বিরিয়ানী খেতে গেল। ছাত্র থাকাকালীন দল বেঁধে এখানে আসত। অনেক দিন পর আবার আসা। সব কিছু আগের মত আছে। একশ বছর পরেও বোধ হয় দোকানটা এ রকমই থাকবে। তবে বিরিয়ানী আগের মত লাগল না, চাল পুরোপুরি সেদ্ধ হয়নি। লবণও কম হয়েছে। আগে তেঁতুলের টক দিত। এখন বোধ হয় দিচ্ছে না। কাঁচা মরিচে কোনো ঝাল নেই। মিষ্টি মিষ্টি লাগছে খেতে। মামুন প্লেট শেষ না করেই উঠে পড়ল। ঘুম ঘুম লাগছে কিন্তু মেসে ফিরে যেতে ইচ্ছা হচ্ছে না। রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ানোরও কোনো অর্থ হয় না।
মামুন সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে চলে গেল। অনেককাল আগে দল বেঁধে সবাই আসত এখানে। একবার নৌকা ভাড়া করেছিল আধা ঘণ্টার জন্যে। বশিরের জন্যে নৌকা ডোবার উপক্রম হয়েছিল। মামুন একটি ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলল। লঞ্চ টার্মিনাল আগের মত নেই। অনেক দিন আসা হয় না এদিকে। সব বদলে যাচ্ছে।
আলম সাহেব জেগে বসে ছিলেন। মামুনকে আসতে দেখে উঠে এলেন কোথায় ছিলেন এত রাত পর্যন্ত? মামুন অস্পষ্ট ভাবে হাসল। আপনি যাওয়ার পরপরই আপনার বান্ধবী এসেছিল। সন্ধ্যা পর্যন্ত ছিলেন। মামুন কোনো উৎসাহ দেখাল না।
আপনাকে কাল সকালে তাদের বাসায় যেতে বলেছেন।
কাল যাব কিভাবে, কাল কলেজ আছে।
কাল শুক্রবার না। কাল তো ছুটি।
ও হ্যাঁ।
চিঠিও লিখে গেছেন একটা। আপনার টেবিলে রেখে দিয়েছি। আর ভাত-তরকারিও ঢাকা দিয়ে রেখেছি। আপনার শরীর ভাল তো মামুন সাহেব?
জি ভাল।
চোখ লাল হয়ে আছে।
সারাদিন ঘুমিয়েছি তো তাই।
সন্ধ্যাবেলা কোথায় গিয়েছিলেন?
একটা ছবি দেখলাম। নাজ সিনেমায়। দি বিস্ট। ভাল ছবি।
আলম সাহেব অবাক হয়ে বললেন, সিনেমা দেখতে গিয়েছিলেন?
জি। মনটা ভাল ছিল না। তাই ভাবলাম যাই দেখে আসি।
ভালই করেছেন।
ছাত্র জীবনে খুব ছবি দেখতাম। রোমান হলিডে ছবিটা মোট এগারো বার দেখেছিলাম। ঐ মেয়েটার প্ৰেমে পড়ে গিয়েছিলাম।
মামুন চিঠিটা পড়ল। দুলাইনের চিঠি। আগামীকাল আমাদের বাসায় দুপুরে ভাত খাবে। সকালে চলে আসবে। ব্যাপারটা বোঝা যাচ্ছে না। ওদের এখানে যাওয়ার ব্যাপারে মুনার খুবই আপত্তি। মামা পছন্দ করেন না। একবার গিয়ে তো বেইজোতী অবস্থা। ভদ্রলোক একটা কথাও বললেন না! সালামের জবাব পর্যন্ত দিলেন না। রাগ দেখাবার জন্যে তার সামনেই কাজের মেয়েটাকে বিনা কারণে এমন একটা চড় দিলেন যে মেয়েটা উল্টে চেয়ারের ওপর পড়ে গেল। বিশ্ৰী অবস্থা।
মামুন সাহেব।
জি।
ভাত খান।
না ভাত খাব না। ভাত খেয়ে এসেছি।
চা খাবেন? চলেন মোড়ের দোকান থেকে চা খেয়ে আসি।
