এই রকম একটা জায়গায় এসে বই ফেলে ট্রেন থেকে নেমে যাওয়ার কোন মানে হয়? বাকের বিরস মুখে সানগ্লাস চোখে দিল। সানগ্লাসটা সে ঢাকা রেলওয়ে স্টেশন থেকে কিনেছে। রাতের বেলা কেনা বলে দেখেশুনে কেনা যায়নি এখন দেখা যাচ্ছে দুই চোখে দুরকম রঙ একটা হালকা সবুজ আরেকটা গাঢ় নীল। ঢাকায় ফিরে টান দিয়ে ঐ হারামজাদার কান ছিঁড়ে ফেলতে হবে।
বাকেরের মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি। এই অবস্থায় বকুলের শ্বশুর বাড়ি উঠার কোন মানে হয় না। বাড়ি খুঁজে বের করতে কতক্ষণ লাগবে কে জানে। সারাদিন লেগে যাবে বলেই বাকেরের ধারণা। ঠিকানা ছাড়া হুঁট করে রওয়ানা হওয়াটা বোকামি হয়েছে। বিরাট বোকামি। বাকের শেভ করার জন্যে নাপিতের দোকানে ঢুকল। ক্ষিধেও লেগেছে। নাশতা শেষ করে। সারাদিনের চুক্তিতে একটা রিকশা ঠিক করতে হবে। এখানে উপস্থিত হবার অজুহাত হিসেবে সুন্দর একটা গল্পও বানাতে হবে। এলেবেলে কিছু বলে মুনার কাছ থেকে পার পাওয়া যাবে না। ধরে ফেলবে। দারুণ ইন্টেলিজেন্ট মেয়ে। ঠাণ্ডা মাথায় ভাবা দরকার। মাথা ঠাণ্ডা করা যাচ্ছে না–বইটা হারানোর পর থেকে মাথা গরম হয়ে আছে।
আজ বুধবার। বুধবার দিনটাই বাকেরের জন্যে খারাপ। নাপিত শোভ করতে গিয়ে খুচ করে গাল কেটে ফেলল। রক্ত পড়ছে সেদিকে লক্ষ্য নেই।
পাশের লোকের সঙ্গে খুচরা আলাপ জমিয়েছে। আলাপের বিষয় হচ্ছে পিয়াজের সের বিশ টাকা। এত দামে পিয়াজ এর আগে কখনো বিকায়নি। হুনছ কোনোদিন কুড়ি টেহা সের পেয়াইজ?
বাকের গলার স্বর যথাসম্ভব সংযত করে বলল, এই যে দাড়িওয়ালা ভাই। গাল কেটে তো রক্তারক্তি করেছেন তার ওপর খেজুরে আলাপ জুড়েছেন। আর একটা কথা যদি বলেন, যে ক্ষুর দিয়ে গাল কেটেছেন সেই ক্ষুর দিয়ে পেট ফাঁসায়ে দিব।
হতভম্ব নাপিত বলল, কি কন আপনে?
এক্কেবারে খাঁটি কথা বলি–মুখ দিয়ে যেন আর একটা শব্দ বের না হয়। যদি হয়। জিব টান দিয়ে ছিঁড়ে ফেলব।
মনের রাগ খানিকটা বের হয়ে যাওয়ায় বাকের একটু আরাম পেল। গাল কাটার দুঃখটাও বেশ কমে গেল। প্রচণ্ড একটা চড় বসিয়ে দিতে পারলে আরো কমত। তবে নতুন জায়গা, হাবভাব না বুঝে কিছু করা ঠিক না।
বাকের চা-নাশতা খেয়ে বাড়ি খোজার কাজে নামল। বুড়ো কিন্তু গায়ে শক্তি আছে এমন একজন রিকশাওয়ালা বের করল।
ঠিকানা জানা নাই এমন একটা বাসা খুঁজে বের করবে। পঞ্চাশ টাকা চুক্তি সারাদিন লাগলে সারাদিন ঘুরবে। খাওয়ার খরচ আমার। এই নাও টাকা নগদানগদি কারবার ভাল। বিরাট বড় বাড়ি। সেই বাড়ির ছেলে ডাক্তার। বিয়ে করেছে ঢাকায়। স্ত্রীর নাম বকুল। ডাক্তার ছেলের নাম জহির। আল্লাহর নাম নিয়ে শুরু কর।
বুড়ো রিকশাওয়ালা হ্যাঁ-না কিছুই বলল না–উদ্ধার বেগে খানিকক্ষণ রিকশা চালিয়ে বলল নামেন এই বাড়ি।
বল কি তুমি এই বাড়ি?
হুঁ। উকিল সাহেবের বাড়ি ছেলে ডাক্তার। নাম জহির।
বল কি জেনেশুনে পঞ্চাশ টাকা নিলে।
জোর কইরা নেই নাই মিয়াভাই। আপনে দিছেন।
বলার কিছু নেই। কিন্তু বাকেরের গা জ্বালা করছে। আজ বুধবার। এই জাতীয় কাণ্ড যে ঘটবে তা সে জানত। নেত্রকোনা শহরের সমস্ত রিকশাওয়ালার ওপর তার মেজার খারাপ হয়ে গেল। আবার দাঁত বের করে হাসছে।
খবরদার। নো লাফিং। বিদেয় হয়ে যাও। বিদায়।
বাকের কল্পনাও করেনি। কি প্রচণ্ড সমাদর তার জন্যে অপেক্ষা করছে। সে কে? কেউ না। বলতে গেলে একজন রাস্তার ছেলে। জেল হাজত খাটা লোক। এই বাড়ির সাথে তার সম্পর্ক কি? কোনই সম্পর্ক নাই। আপদে-বিপদে ছুটে এসেছে সে তো সবখানেই যায়। তাতে কি। তবু সে সংকুচিত ভঙ্গিতে বাড়ির উঠোনে এসে দাঁড়াল এবং বিশাল বাড়ি দেখে খানিকটা ঘাবড়েও গোল ঠিক তখন দোতলা থেকে বকুল তীক্ষ্ণ স্বরে চেঁচাল. কে বাকের ভাই না? পর মুহুর্তেই ছুটতে ছুটিতে সিঁড়ি ভেঙে নিচে নেমে এল–বিস্মিত গলায় বলল, ওমা কি আশ্চর্য সত্যি তো বাকের ভাই। আপনি কোথেকে?
কাজে যাচ্ছিলাম পথে পড়ল নেত্রকোনা ভাবলাম…
ইস আর দু’দিন আগে এলে মুনা আপার সঙ্গে দেখা হয়ে যেত। মুনা আপা পরশু সকালেও ছিল। বাকেরের মনটা খারাপ হয়ে গেলেও নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, মুনা এখানে ছিল? বলিস কি? জানতাম না তো! তোর এই অবস্থা কেন? স্কেলিটন হয়ে গেছিস। কংকাল বুঝলি কংকাল?
আমার ঘুম হয় না বাকের ভাই।
ঘুম হবে না কেন? কি কথাবার্তা বলছিস? ক্লিপ না হবার কি আছে? বিছানায় শুলেই স্লিপ অটোমেটিক চলে আসে।
জহির বাসায় ছিল না। বকুল বাবুকে পাঠাল খোঁজ নিয়ে আসতে। জহির বিরাট এক কাতল মাছ কিনে আনল। দুপুরে তার পাতে প্রকাণ্ড মাছের মাথা দেয়া হল। গরম ভাত ঠাণ্ডা করার জন্যে পাখা নিয়ে বসল। বকুল। এত আগ্রহে এত যত্নে কেউ কোনোদিন তাকে খাওয়ায়নি। কেন তাকে এত যত্ন করবে? সে কেউ না–রাস্তার ছেলে… … হাজত খাটা লোক। বাকেরের চোখে পানি এসে গেল। সে ধরা গলায় বলল–তোরা নেত্রকোনার লোক এত ঝাল খাস? আশ্চর্য ঝালের চোটে চোখে পানি এসে গেছে। এর মধ্যে আবার মরিচে কামড় পড়ে গেছে। বকুল লজ্জিত গলায় বলল, বাকের ভাই, একটু দেখে খান। এর সঙ্গে একটু ডাল নিন। ঝাল কম লাগবে। রান্না কেমন হয়েছে বাকের ভাই?
উত্তম হয়েছে। অতি উত্তম।
আমি রেঁধেছি।
ভাল হয়েছে খুবই ভাল। নাম্বার ওয়ান হয়েছে।
বাকেরের চোখ থেকে টপ টপ করে এক ফোঁটা পানি তার প্লেটে পড়ে গেল! ভাগ্যিস কেউ দেখতে পেল না।
রাতে কি খাবেন বাকের ভাই? যা! খেতে চান বলুন–রাঁধব।
পাগল হয়ে গেলে নাকি? বিকেলের ট্রেন ধরব, মেলা কাজ ঢাকায়।
আপনার কি কাজ আমার জানা আছে। যখন যেতে দেব তখন যাবেন। তার আগে না।
বকুল বড় একটা মাছের পেটি পাতে তুলে দিল। বাকেরের চোখ আবার ভিজে উঠছে। মমতা পেয়ে তার অভ্যাস নেই অল্পতেই সে কাতর হয়ে পড়ে। মন হু-হু করে।
বাকের বাড়িঘর দেখে মুগ্ধ। জহিরের ব্যবহারে মুগ্ধ। বকুলের ভালবাসায় মুগ্ধ। বাড়ির পেছনের বাধানো পুকুরের সাইজ দেখে মুগ্ধ। দুপুরে তার ঘুমিয়ে অভ্যাস নেই। ছিপ ফেলে সারা দুপুর পুকুর ঘাটে বসে রইল। সঙ্গে বাবু।
কেমন ঘাই দিচ্ছে দেখেছিস? মাছে পুকুর ভরতি। চার বানিয়ে ফেলতে হবে।
চার কি করে বানায় জানেন?
হুঁ। মেথি-ফেতি কি সব দিতে হয়। দেখি আগামীকাল জোগাড়-যন্ত্র করে ছিপ ফেলব। মাছ মারা সহজ ব্যাপার না বুঝলি–খুবই শক্ত। খুবই হার্ড কাজ। ভেরি হার্ড।
আজ বুধবার। মাছ ধরা পড়ার কথা নয়। কিন্তু কি আশ্চর্য সন্ধ্যার আগে আগে দেড় সের ওজনের একটা মৃগেল মাছ ধরা পড়ল।
বাকের আবেগজড়িত গলায় বলল, নেত্রকোনা জায়গাটা খুবই ভাল বুঝলি বাবু। অসাধারণ একটা জায়গা। বাংলাদেশের মধ্যে এক নম্বর। এর মধ্যে কোনো সন্দেহ নেই। নো ডাউট। খুব ভাল জায়গায় বকুলের বিয়ে হয়েছে। খুবই ভাল জায়গা। গুড প্লেইস।
বাকেরের প্রতি বকুলের উৎসাহের বাড়াবাড়ি জহিরের ভাল লাগছে না। সে যা হৈচৈ করছে তাতে যে কেউ বিরক্ত হবে। রাতে পোলাওয়ের ব্যবস্থা হয়েছে, মুরগী জবাই করা হয়েছে। অথচ দুপুরের মাছের প্রায় সবটাই আছে। এ সমস্ত হচ্ছে অসুস্থতার লক্ষণ। অথচ অসুস্থতার কোন ভিত্তি নেই। এবং অসুখটা এমন যে কারো সঙ্গে আলাপও করা যায় না।
গত দুরাত ধরে বকুল আলাদা শুচ্ছে। আলাদা মানে আলাদা ঘর। সন্ধ্যা হতেই সে ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দেয়। কিন্তু ঘুমায় না জেগে থাকে। যতবার জহির নিজের ঘর থেকে বের হয় ততবারই বকুল তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বলে–কে কে?
আমি ভয় নেই।
ও আচ্ছা।
বাতি নিভিয়ে শুয়ে পড় বকুল।
আচ্ছা।
বাতি নিভে যায়। কিন্তু বকুল ঘুমায় না। জেগে বসে থাকে। এ যন্ত্রণার কোন মানে হয়? যতই সময় যাচ্ছে অবস্থা ততই খারাপ হচ্ছে। কিছুদিন পরে হয়ত কাউকে চিনতে পারবে না। মুনা আপার সঙ্গে তাকে ঢাকায় পাঠিয়ে দেয়াই উচিত ছিল। জহির নিজে যেতে পারছে না। মামলা মোকদ্দমায় অস্থির হয়ে যাওয়ার জোগাড়। জহির কি করবে ভেবে পেল না।
বাকের পাঁচদিন কাটিয়ে দিল। এই পাঁচ দিন সে যে সমস্ত কাজকর্ম করল তার মধ্যে আছে–পুকুরের কচুরিপানা পরিষ্কার। বাড়ির পেছনে জঙ্গল পরিষ্কার। দু’টি সাপ মারা (এই সাপ দু’টি জঙ্গল পরিষ্কারের সময় বের হয়ে এসেছিল)।
সন্ধ্যাগুলিও বাকেরের খুব ভাল কাটছিল; বাড়ির কাছেই যুব নাট্যদলের অফিস। সেখানে পথের সন্তান নাটকের রিহার্সেল হয়। বাকের গত চার রাত ধরে রিহার্সেলে উপস্থিত। যুব নাট্য দলের লোকজন ঢাকার এই মানুষটির গভীর আগ্রহে খুবই খুশি। নাট্যকারের বয়স অল্প। সে নিজেও বাকেরকে খুব খাতির করে। যাওয়া মাত্র চেঁচিয়ে বলে বাকের ভাইকে চা দাও-বিনা দুধে। নাটকে হাস্যরসাত্মক অংশগুলি বাকেরের খুবই পছন্দ। যতবারই হাসির অংশগুলি হয়, বাকের ঘর ফাটিয়ে হাসে।
নাট্যকার এবং নাটকের লোকজন তাতে বড়ই উৎসাহিত হয়। বাকেরের ধারণা এটা একটা অসাধারণ নাটক। এবং ঢাকার কোন নাটকের দল এদের ধারে কাছেও যেতে পারবে না। বাকেরের ইচ্ছা হচ্ছে এক মাস পর যখন নাটক হবে তখন সে উপস্থিত থাকে। সে তার ইচ্ছা! ব্যক্তি ও করেছে। নাট্যকার অত্যন্ত অবাক হয়ে বলেছে কি বলেন বাকের ভাই, আপনাকে ছাড়া নাটক হবে নাকি? আপনাকে ঢাকা থেকে ধরে নিয়ে আসব না? ভেবেছেন কি আমাদের? তাদের আন্তরিকতায় বাকেরের মনটা অন্যরকম হয়ে যায়। বড় উদাস লাগে।
বাকেরের আরো কিছু দিন থাকার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু থাকতে পারল না, ঢাকায় চলে আসতে হল। কারণ বকুলের অবস্থা খুবই খারাপ। তাকে ঢাকায় নিয়ে যাওয়া দরকার। জহির যেতে পারছে না। তার মামলার তারিখ পড়েছে।
বকুলের যে বিরাট একটা অসুখ বুঝতেই পারেনি। তার ধারণা ঠিকমত খাওয়া-দাওয়া না করায় এই হাল হয়েছে। ট্রেনে উঠার পর বকুল যখন ফিসফিস করে বলল, আপনি আসায় আমার জীবনটা রক্ষা হয়েছে।
বাকের অবাক হয়ে বলল, কি বলছিস তুই?
সত্যি বলছি আমাকে মেরে ফেলত।
কে মেরে ফেলত?
জহির।
তুই পাগল হয়ে গেলি নাকি?
পাগল হব কেন? সত্যি কথা বলছি … ও আমাকে গলা টিপে মেরে ফেলতে চায়।
চুপ করে থাক। নয়ত চড় দিয়ে চাপার দাঁত ফেলে দেব।
বকুল চুপ করে গেল এবং কিছুক্ষণের মধ্যে জানালায় মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়ল। বাকেরের দুশ্চিন্তার সীমা রইল না ভালয় ভালয় ঢাকা পৌঁছতে পারলে হয়। ঢাকায় পৌঁছে দেরি করা যাবে না … ডাক্তারের কাছে ছোটাছুটি শুরু করতে হবে। মুনা একা কদিক সামলাবে? ভাগ্যিস সে সময়মত ছাড়া পেয়েছিল। এখনো হাজতে থাকলে তো বিরাট প্রবলেম হয়ে যেত।
বাকেরের জন্যে ট্রেনে কেউ কোন সাড়া শব্দ করতে পারল না। কেউ সামান্য কথা বললেও বাকের চেঁচিয়ে ওঠে–মরণাপন্ন রুগী নিয়ে যাচ্ছি–দেখতে পাচ্ছেন না? মা-বোন তো আপনাদের আছে? রোগ-শোক তো আপনাদেরও হয়, নাকি হয় না?
এই প্রচণ্ড ভিড়েও সে বেঞ্চ খালি করে বকুলকে শুইয়ে দিল এবং সারা পথ একটা খবরের কাগজ দিয়ে বকুলকে হাওয়া করল। একজন বুড়োমত যাত্রী একবার জিজ্ঞেস করল, উনার কি হয়েছে? বাকের বিরক্ত মুখে বলল, তা দিয়ে আপনার কোন দরকার আছে?
বুড়ো চুপ করে গেল।
ঢাকায় পৌঁছে বকুল পুরোপুরি সুস্থ। যেন তার কিছুই হয়নি। মুনার ক্ষীণ সন্দেহ হল অসুখের ব্যাপারটা পুরোপুরি বানানো–বকুলের একটা চমৎকার অজুহাত।
বাকেরের অবশ্যি খুব সুবিধা হয়েছে। দিনের মধ্যে তিনবার চারবার আসছে রুগীর খোঁজ নিতে এলাম মুনা। অবস্থা কেমন?
মুনা বিরক্ত হয়ে একবার ঝাঝিয়ে ওঠে… আপনি বড় ঝামেলা করেন বাকের ভাই। সকালবেলা তো একবার দেখে গেলেন বকুল সুস্থ। এই তিন ঘণ্টার মধ্যে আবার কী হবে?
তবু একটু খোঁজ নেয়া–মনের মধ্যে টেনশন থাকে।
টেনশনের কিছু নেই বাকের ভাই, যদি কিছু হয় আপনাকে খবর দেব। দয়া করে বিরক্ত করে মারবেন না।
আমি বিরক্ত করি?
কেন–আপনি নিজে বোঝেন না?
আচ্ছা আর করব না।
মুখ কালো করে বাকের চলে যায়। মনটা অসম্ভব খারাপ হয়। জলিল মিয়ার স্টলে তিনি কাপ চা খেয়ে ফেলে। মনস্থির করে ফেলে আর না। কী দরকার? যাদের ব্যাপার তারা বুঝবে। তবু সন্ধ্যার পর মনে হয়–খোজ নেয়া বিশেষ প্রয়োজন। দু’টা মেয়ে মানুষ একা একা থাকে। কত রকম সমস্যা হতে পারে। সন্ধ্যার পর দরজায় টোকা দেয়। মুনা গম্ভীর মুখে দরজা খোলে। বাকেরকে দেখেও কিছু বলে না।
দরজা-টরজা ভাল করে বন্ধ করে ঘুমুবে। চুরি হচ্ছে। দেশে বাস করা মুশকিল।
রাগ করতে গিয়েও মুনা রাগ করতে পারে না। হেসে ফেলে। বাকের বিস্মিত হয়ে বলে হাসো কেন?
কেন হাসি তা বোঝার ক্ষমতা আপনার নেই বাকের ভাই। বসুন। চা খাবেন?
খাব।
মুনা চা বানাতে যায়। বাকের বসে থাকে। তার বড় ভাল লাগে।
সিদ্দিক সাহেবকে আজ একটু বিমর্ষ দেখাচ্ছে।
কোন কারণে তিনি চিন্তিত এবং বিরক্ত। বিরক্ত হলে তার মুখে ঘন ঘন থুথু ওঠে। এখন তাই উঠছে। তিনি চারদিকে থুথু ছিটাচ্ছেন। সরকারি দলের নমিনেশন তিনি পাবেন, এই নিয়ে তার কোনো চিন্তা নেই। এক লাখ টাকার চাঁদা দেয়া ছাড়াও অন্য এক কায়দায় বিশেষ একজনকে এক লক্ষ আশি হাজার টাকা নগদ দেয়া হয়েছে। তিনি হিসেবি লোক পুরোপুরি নিশ্চিত না হলে এতগুলি টাকা বের করতেন না। সমস্যা এখানে নয় সমস্যা ভিন্ন জায়গায়। সরকারি দল মানেই বেশির ভাগ লোকের অপছন্দের দল। এই দেশের মানুষদের সাইকোলজি হচ্ছে ক্ষমতায় যে আছে তার বিপক্ষে কথা বলা। যতদিন পর্যন্ত তুমি ক্ষমতায় নেই। ততদিন পর্যন্ত তুমি ভাল। যে মুহূর্ত ক্ষমতায় চলে গেলে সেই মুহূর্তে থেকে তুমি খারাপ। তোমার বিরুদ্ধে জ্বলাও-পোড়াও আন্দোলন। বড় বড় বক্তৃতা।
সরকারি দলে থাকা বুদ্ধিমানের কাজ হবে কিনা এটাই সিদ্দিক সাহেব বুঝতে পারছেন না। চালে ভুল হলে মুশকিল। রাজনীতিতে প্রতিটি চাল ভেবেচিন্তে নিতে হয় এবং ভবিষ্যতের কথা মনে রাখতে হয়। আওয়ামী লীগের এক সময় রমরমা ছিল. কোথায় গেল সেই রমরমা? তবে কিছুই বলা যায় না। রমরমা ফিরেও আসতে পারে।
কোন রকম দলে না গিয়ে স্বতন্ত্র থেকে ইলেকশন করাই ভাল। তাহলে সব দলকেই বলা যায় আছি তোমাদের সাথে। তবে স্বতন্ত্র থেকে দাঁড়ালে ইলেকশনে জেতা কষ্টকর। প্রশাসনের সাহায্য দরকার। প্রশাসন শুধু শুধু সাহায্য করবে কেন? তাদের কী ঠেকা?
এই ইলেকশন সিদ্দিক সাহেবের কাছে খুবই সামান্য ব্যাপার। কিন্তু বড় কিছুতে যাওয়ার এটা হচ্ছে প্রথম সিঁড়ি। নামটা প্রথম ভাসতে হবে। মুখে মুখে ফিরতে হবে। খুনখারাবি হবে। হাঙ্গামা হবে। খবরের কাগজে লেখালেখি হবে–তখন সবাই বুঝবে এই কনসটিটিয়েনসি একটা জটিল জায়গা। সিদ্দিক সাহেব সেই জটিল জায়গা পানি করে দিয়েছেন। তার চেহারা এবং কার্যকলাপে। বোঝা যাওয়া চাই যে তিনি মহা ধুরন্ধব এবং মহা কঠিন ব্যক্তি।
আগেকার অবস্থা এখন নেই হেঁ হেঁ করে ভোটারের সামনে হাত কচলালে হবে না। হাত কচলান ক্যান্ডিডেটের দিন ফুরিয়েছে। এখনকার ভোটাররা শক্তের ভক্ত।
শুধু ভোটাররা না–সবাই এখন শক্তের ভক্ত।
সিদ্দিক সাহেব বসে আছেন তার বসার ঘরে। তার সামনে একগাদা পোস্টার। ছাপানো নয় আর্টিস্ট এনে লেখান হয়েছে। নগর কমিটির পোস্টার। নগর কমিটি তিনি কিছুদিন হল করেছেন। সরাসরি এই কমিটিতে তিনি নেই। কাজ করছেন উপদেষ্টা হিসেবে। যদিও সমস্ত কিছুই তাঁর করা। পোস্টারগুলিতে নানান ধরনের বক্তব্য–
“এই নগর আপনার
একে সুন্দর রাখুন।
যেখানে সেখানে মযলা ফেলবেন না।
নির্দিষ্ট ডাস্টবিনে ফেলুন।”
–নগর কমিটি
“আপনার আশপাশে কী অসামাজিক
কার্যকলাপ হয়?
অসামাজিক কার্যকলাপ প্রতিরোধ
করা আপনার সামাজিক দায়িত্ব।”
–নগর কমিটি
“আপনার আশপাশে কী বখাটে
ছেলেপুলের আড্ডা দেয়? নেশা করে?
নগর কমিটিতে খবর দিন।
–নগর কমিটি
“হিরোয়িন, মদ, গাঁজা আপনার
শত্ৰু। যারা এসবের ব্যবসা করছে
তারাও আপনার শত্রু। শত্রু নিৰ্মল করুন।”
–নগর কমিটি
“ধূমপান মনে বিষপান। পয়সা খরচ করে
কেন বিষপান করছেন? ধূমপান মুক্ত নগর
সৃষ্টি করুন।”
–নগর কমিটি
প্রায় একশর মত পোস্টার। লাল কাগজে ঘন কালো রঙে লেখা। আর্টিস্ট ছোকরা লিখেছে। ভাল। জায়গায় জায়গায় পোস্টার পড়লে দেখতে ভালই লাগেব।
সামনের সপ্তাহে তিনি শিশু নিকেতনের উদ্বোধন করতে মন ঠিক করেছিলেন সেখানে একটা ঝামেলা বেধেছে।
শিশু নিকেতনের চেংড়াহেগুলি উদ্বোধনের দিন কোন কবিকে নাকি আনতে চায়। প্রস্তাবটা তার মন্দ লাগেনি। তিনি সভাপতি কবি প্রধান অতিথি। এখন আবার বাতাসে অন্য রকম কথা ভাসছে। শিশু নিকেতনের সেক্রেটারি নাকি সভাপতি, কবি শামসুর রাহমান প্রধান অতিথি, সওগাত পত্রিকার নাসিরুদিন সাহেব বিশেষ অতিথি।
সিদ্দিক সাহেবের মেজাজ খারাপ হওয়ার মূল কারণ এটা। ওরা করতে চাইলে করুক তাঁর কোন আপত্তি নেই। কিন্তু তিনি ষড়যন্ত্রের আভাস পাচ্ছেন। তার ধারণা এর পেছনে নুরুদিনের হাত আছে। নুরুদ্দিন তার সঙ্গে কনটেস্ট করছে। তার পেছনে আছে আওয়ামী লীগ। নরুদ্দিন খুবই ঘুঘু লোক। পুরনো আওয়ামী লীগার। শেখ সাহেবের মৃত্যুর পর পর অবশ্য সে আওয়ামী লীগের সম্পর্কে অদ্ভুত অদ্ভুত সব কথাবার্তা বলতে থাকে যার একটা হচ্ছে দেশটা লিজ দেয়া হয়ে গিয়েছিল ইন্ডিয়ার কাছে। আল্লাহ পাকের দয়ায় রক্ষা পেয়েছে।
জিয়াউর রহমান সাহেবের সময় নুরুদিন কঠিন বিএনপি হয়ে যায়। তাতে তার আওয়ামী লীগে আবার ফিরে যাওয়াতে কোন অসুবিধা হয়নি। ঘুঘু লোক বলেই এটা সম্ভব হয়েছে। এ জাতীয় লোকদের সম্পর্কে সাবধান থাকা ভাল। সিদ্দিক সাহেব যথেষ্ট সাবধান। তবুও অস্বস্তি লেগেই থাকে। সিদ্দিক সাহেব শিশু নিকেতনের সেক্রেটারিকে আসতে বলেছেন ব্যাপারটা পুরোপুরি পরিষ্কার করে নিতে চান। ব্যাটাকে আসতে বলা হয়েছে চারটার সময় এখন বাজে পাঁচটা। এখনো আসছে না। সিদ্দিক সাহেবের মেজাজ ক্রমেই খারাপ হচ্ছে।
সেক্রেটারি ঢুকলো পাঁচটা পচিশে। মুখে তেলতোলে ধরনের হাসি। পরনে নকশাদার পাঞ্জাবি। পাতলা গোঁফের জন্যে চেহারাটাই কেমন ধূর্ত ধূর্ত হয়ে গেছে। লোকটির নাম মনোয়ার হোসেন তবে সবাই ডাকে মনু ভাই।
স্নামালিকুম স্যার।
ওয়ালাইকুম সালাম। কী ব্যাপার?
মনোয়ার হোসেন অবাক হয়ে বলল, আপনি তো ডেকে পাঠালেন।
ও আচ্ছা আচ্ছা, মনেই ছিল না। আরেকটু হলে চলে যেতাম! ভাগ্যিস এসেছে। হাজার ঝামেলা নিয়ে থাকি কিছু মনে থাকে না। বস বস।
মনোয়ার হোসেন বসল। তার মুখের হাসি আরো বিস্তুত হল।
তোমাদের শিশু নিকেতন সম্পর্কে জানার জন্যে ডাকলাম। কত দূর কি করলে?
হাঁটি হাঁটি পা পা অবস্থা স্যার। তবে একটা ঘর পাওয়া গেছে এটা একটা বড় উপকার হয়েছে।
ঘর কোথায় পেলে?
নুরুদিন সাহেব দিয়েছেন। কিছু ফার্নিচার ও পাওয়া গেছে। আপনাদের দশজনের সাহায্য ছাড়া তো স্যার হবে না। দশের লাঠি একের বোঝা।
সিদ্দিক সাহেব শুকনো গলায় বললেন, তা তো বটেই।
আপাতত ছবি আঁকা, নাচ আর গান শিখানো হবে। একটা শিশু লাইব্রেরি থাকবে। শিশুদের জন্যে হাতে লেখা দেয়াল পত্রিকা বের হবে। পত্রিকার নাম স্যার অনির্বাণ।
ভাল খুবই ভাল।
অনিৰ্বাণ প্রথম সংখ্যায় স্যার আপনাকে একটা বাণী দিতে হবে। না বললে হবে না স্যার।
উদ্বোধনের কী ব্যবস্থা করলে?
এখনো ফাইন্যাল কিছু হয়নি। শামসুর রাহমান সাহেব প্রধান অতিথি। এটা শুধু ফাইন্যাল হয়েছে।
ভাল ভাল খুবই ভাল।
আপনাকে স্যার উদ্বোধনীর দিন থাকতে হবে।
থাকব। নিশ্চয়ই থাকব। কেন থাকব না?
মনোয়ার হোসেন চা-বিসকিট খেয়ে বিদায় হল। সিদ্দিক সাহেব দীর্ঘ সময় চুপচাপ বসে রইলেন। ঝামেলা বাড়ছে–এত সব ঝামেলা সহ্য করা কঠিন। ব্যবসার ঝামেলা, জমিজমার ঝামেলা; প্রতিষ্ঠার ঝামেলা। একটা পরিত্যক্ত সম্পত্তি তিনি কিনেছেন। কিন্তু দখল পাচ্ছেন না। চারতলা বিল্ডিং ভাল জায়গায় গ্রিন রোড়ে। দখল না পেলে লাভ কি? সম্পত্তি, আসল মালিকের কাছ থেকেই কেনা। বলাই বাহুল্য। জলের দামে কেনা। কত দামে কেনা সেটা বড় কথা নয়। কাগজপত্র ঠিক আছে এটাই বড় কথা। কাগজপত্র থেকেও লাভ হচ্ছে না।
বাড়িতেও ছোটখাটো অশান্তি লেগে আছে। মন টেকে না। তার স্ত্রী দশ বছর আগে হঠাৎ করে মোটা হতে শুরু করেছিলেন–এখন মৈনাক পর্বত। দুই হাত দিয়ে বেড় পাওয়া যায় না। গাড়িতে উঠলে গাড়ি খানিকটা ডেবে যায়। এক মেয়েও মায়ের পথ ধরেছে। বয়স তেইশ। এর মধ্যেই হুঁলস্থূল কারবার। ছোট মেয়েটা এখনো ঠিক আছে। ভবিষ্যতে কী হবে কে জানে?
