গাভী বিত্তান্ত -পর্ব-(১০)-আহমদ ছফা

গাভী বিত্তান্ত

তাদের হাতেও পিস্তল কাটা রাইফেল ইত্যাদি আছে। এসব অস্ত্রশস্ত্র কোথেকে আসছে, তিনি ভালােরকম জানেন, কিন্তু প্রকাশ করেন না। কারণ তাতে বিপদের আশঙ্কা আছে। এই দলটির দাবি মেটাতে রাজি হননি বলেই সেদিন টেন্ডার বক্স খােলার সময়ে ডান পায়ে ওভারসীয়রকে গুলি করেছিল । আবু জুনায়েদ জিজ্ঞেস করলেন 

-ওরাও কি আপনার কাছ থেকে টাকাকড়ি পায়? 

-কিছু তাে দিতে হয়। জলে বাস করে কুমীরের সঙ্গে বিবাদ করব কেমন করে? বিশ্ববিদ্যালয়ে কেন সবখানেই সন্ত্রাসীরা ছড়িয়ে আছে। এদের না হলে ক্ষমতাসীন দলের চলে না, বিরােধী দলের চলে না। ছােটখাটো রাজনৈতিক দলগুলােকেও মাস্ত নির অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে হয়। আমি একজন সামান্য ঠিকাদার মানুষ আমি কোন সাহসে ওদের সঙ্গে বিবাদে নাম? 

 শেখ তবারক আলীও বােধহয় হুইস্কি পান করেছেন । আৰু জুনায়েদ নিজের চোখে দেখেননি। কিন্তু মুখ থেকে ওরকম গন্ধ পাচ্ছিলেন। হুঁকোর নলে টান দিয়ে মাঝে-মাঝে চোখ বন্ধ করতে চেষ্টা করেন। ধোয়া ছেড়ে কথা বলতে থাকেন । নেশার ঘােরে কি না আবু জুনায়েদ বলতে পারবেন না, শেখ তবারক আলীকে কথা বলায় পেয়ে বসেছে। আবু জুনায়েদ রুদ্ধশ্বাস বিস্ময়ে শুনে যেতে লাগলেন। 

শেখ তবারক আলীকে বিশ্ববিদ্যালয়ের চীফ ইঞ্জিনিয়ার, সাব ইঞ্জিনিয়ার, ওভারসীয়র, কেরানী, একাউন্ট্যান্ট সবাইকে নিয়মিত পয়সা দিয়ে হয়। নয়ত তারা একটা অনর্থক ঘাপলা বাঁধিয়ে দেয়। বাজার থেকে সবচেয়ে উৎকৃষ্ট মাল কিনে দিলেও বাগড়া দিয়ে বসবে, বলবে ইট ভালাে নয়, বালুর মধ্যে কাঁকড়া আছে, রড়গুলাে মাপে দুই সুতাে কম আছে। শেখ তবারক আলীর কাজ কী এই সমস্ত ছােটলােকের বাচ্চাদের সঙ্গে ঘাপলা করে। তাই কিছু কিছু দিয়ে ছােটলােকের বাচ্চাদের মুখ বন্ধ রাখতে হয়। 

গাভী বিত্তান্ত -পর্ব-(১০)

 শেখ তবারক তামাক টানছিলেন। ‘ সে কন্ধে থেকে স্ফুলিঙ্গগুলাে এদিক ওদিক ছড়িয়ে পড়ছিল । তার মুখ থেকে এ কথা বেরিয়ে আসছিল। আবু জুনায়েদ এই প্রথম জানতে পারলেন, বলয়ের হেড ওভারসীয়র দেখতে যাকে মনে হবে মুসল্লী মানুষ, কপালে না ;তে পড়তে দাগ পড়ে গেছে, এই শহরের নানা জায়গায় তার পাঁচটি বাড়ি এবং তিনটি দোকান আছে। ইচ্ছে করলে হেড ওভারসীয়র কফিল উদ্দিন পাঁচ পাঁচ জন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষককে মাইনে দিয়ে পুষতে পারে । দেখে কি চেনার কোনো উপায় আছে? আবু জুনায়েদ আরাে 

শুনলেন, একজন উপাচার্য তাঁর কাছ থেকে মেয়ের বিয়ের সমস্ত নিমন্ত্রিত অতিথিদের খাওয়ার খরচটা গলায় পা দিয়ে আদায় করেছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে এত গলিঘুড়ি বারান্দা, চোরাগলি, সুড়ঙ্গ, গােপন লেনদেনের এত পাকা বন্দোবস্ত দীর্ঘকাল থেকে তৈরি হয়ে রয়েছে এ ব্যাপারে আবু জুনায়েদ কিছুই জানতেন না। তার মনে হতে থাকল, এতকাল শূন্যের ওপর ভেসে বেড়াচ্ছিলেন।

শেখ তবারক আলীর কথায় হঠাৎ করে তার জ্ঞান নেত্রের উম্মীলন ঘটতে থাকল । তবারক আলী বলে যেতে লাগলেন, কর্মচারীরা এত টাকা আদায় করে নেয়, সে তুলনায় মাস্তানদের আর কত দিতে হয়। এরই মধ্যে টেলিফোনটা বেজে উঠল । শেখ উঠে রিসিভারটা নামিয়ে রাখলেন। 

-স্যার আজ শুধু আপনার সঙ্গেই কথা বলব। টেলিফোন রিসিভ করব না । মনের কথা বলার মানুষ পাইনে। মাঝেমাঝে পাগল হয়ে যেতে ইচেছ হয়। দেশটা কোথায় যাচ্ছে। মােটা অঙ্কের টাকা সরকারি দলকে দিতে হয়। বিরােধী দলকে দিতে হয়।

আমলাদের দিতে হয়, মাস্তানদের দিতে হয়। আমাদের মতাে সৎ ব্যবসায়ী যারা পলিটিক্যাল ব্যাকিংয়ে রাতারাতি আঙুল ফুলে কলাগাছে পরিণত হয়নি, ঘরের টাকা ঢেলে ব্যবসাপাতি করে থাকে, তাদের কি টিকে থাকার কোনাে উপায় আছে? ব্যাঙ্কগুলােতে যেয়ে দেখুন, ব্যাঙ্কের ষাট ভাগ টাকা নানা রকম প্রভাব প্রতিপত্তি খাটিয়ে ফাটকাবাজ ব্যবসায়ীরা নিয়ে গেছে। কলকারখানার নাম করে টাকা নিয়েছে। যেয়ে দেখুন একটা কম্পাউন্ড ছাড়া কিছু নয় ভেতরে ফাঁকা।

গাভী বিত্তান্ত -পর্ব-(১০)

কোনাে যন্ত্রপাতি বসেনি। ব্যাঙ্ক থেকে লােনটা নিয়ে প্রথম চোটেই গুলশান, বনানী কিংবা বারিধারায় বৌয়ের নামে বাড়ি বানিয়ে ওপরতলা ভাড়া দিয়ে নিচের তলায় স্থায়ীভাবে বাস করার ব্যবস্থা করেছে, অধিকাংশ মানুষ। ব্যাঙ্ক যখন টাকা দাবি করে, সুদ দাবি করে, অজুহাত দেখিয়ে বসে লেবার ট্রাবলের জন্য প্রােডাকশন কিছুই হয়নি।

সুতরাং সুদ মওকুফ করতে হবে। ব্যাঙ্ক যখন আসল দাবি করে, জবাব দেয় আপনারা গােটা কারখানাটাই নিয়ে যান। ব্যাঙ্ক যখন কারখানার দখল নিতে যায় দেখে লােনের টাকার দশ ভাগের এক ভাগও সেখানে বিনিয়ােগ করা হয়নি। বাড়িঘর, নিলাম করে নেয়ার ক্ষমতাও ব্যাঙ্কের নেই। এই হল ব্যাপার, এভাবেই বাংলাদেশ চলছে। মাঝে-মাঝে ভাবি চাষারা লাঙলের মুঠি ধরে দেশটা টিকিয়ে রেখেছে। নয়ত অসাধু আমলা, দুর্নীতিবাজ রাজনৈতিক এবং ফাটকা ব্যবসায়ীরা দেশের সমস্ত মাটি মন মেপে বিদেশে চালান করে দিত। 

আৰু জুনায়েদ শেখ তবারক আলীর মধ্যে গত সমুদ্রের গভীরতা আবিষ্কার করছিলেন। যতই শুনছিলেন তিনি যেন তলিয়ে যাচ্ছিলেন তাঁর দেশপ্রেমের সংবাদ যখন জানতে পারলেন তার প্রতি শ্রদ্ধা অনেক গুণেই বেড়ে গেল। জর্দার নেশায় তঁার মাথাটা একটু একটু ঘুরছিল । উত্তর দিকের জানালা খুলে তিনি মুখের পিকটা ফেলে এলেন। রুমালে মুখ মুছে তিনি বললেন 

-এবারে আপনার সম্বন্ধে কিছু বলুন। আপনি কত ধরনের ব্যবসা করেন। শেখ তবারক আলী বললেন 

-আমি নেহায়েতই চুনােপুটি। ঠিকাদারি দিয়ে শুরু করেছিলাম। এখনাে ঠিকাদারি আঁকড়ে ধরে রয়েছি। ছেলেমেয়েরা এটা ওটা বানাবার জন্য শিল্প-কারখানা গড়ে তােলার কথা বলে। আমি কোনােরকমে বুঝিয়ে সুজিয়ে বারণ করে রেখেছি।

আমি বলি বাবা ওদিকে যাবে না, গেলে মারা পড়বে। ঠিকাদারী না করতে চাও ট্রেডিং করাে, বিদেশ থেকে সিমেন্ট আনাে, গাড়ি আনাে যা প্রাণ চায় আনাে এবং বাজারে বেচো । মুনাফা বেশি না হােক তােমার মূলধন মারা যাবে না। তুমি কলকারখানা বসিয়ে কিছু একটা বানাতে গিয়েছ কি মরেছ। কে কিনবে তােমার জিনিস।

গাভী বিত্তান্ত -পর্ব-(১০)

হাল আমলের ছেলে সব সময় বুড়াে বাপের কথা শুনতে চায় না। তিনি আরাে জানালেন, শুধু নগদ টাকা থাকলে ব্যবস্থা হয় একথা মােটেই ঠিক নয়। তােমার ধৈর্য থাকতে হবে, মেজাজ থাকতে হবে এবং পরিশ্রম করার অভ্যেস থাকতে হবে। ব্যবসাও একটা এবাদতের মতাে ব্যাপার। সকলকে দিয়ে ব্যবসা হয় 

 মাঝে-মাঝে ছেলেদের মতিগতি দেখে তিনি শঙ্কিত হয়ে পড়েন। জামাইটা ছিল বলেই ব্যবসাটা টিকে আছে। ভারি ঠাণ্ডা মেজাজের ছেলে। আর মাথাটাও খুব পরিষ্কার। তিনি জামাতার একটা সাম্প্রতিক বিচক্ষণতার দৃষ্টান্ত তুলে ধরলেন। ওয়াটার বাের্ড থেকে বুড়িগঙ্গা ড্রেজিংয়ের কন্ট্রাক্ট নিয়েছিল জামাই।

পাশাপাশি পূর্ত মন্ত্রণালয় থেকে মীরপুরের নিচু জমি ভরাট করার কাজটাও আদায় করে নিয়েছিল। এখন বুড়িগঙ্গার ড্রেজিং করা মাটি দিয়েই নিচু জমি ভরাট করার কাজটি চলছে । নদী ড্রেজিং এবং নিচু জমি ভরাট করা দুটি মিশালে যে একটি চমৎকার বড় ব্যবসা হয়, এই জিনিসটি প্রথম জামাইর মাথায় এসেছিল। আড়াই কোটি এবং তিন কোটি টাকার কাজ।

কোনােক্রমে যদি উঠিয়ে দিতে পারা যায় তাহলে তিন গুণ লাভ হওয়ার সম্ভাবনা। সব টাকা কি তিনি ঘরে তুলতে পারবেন? তিন ভাগের এক ভাগ রাঘব বােয়ালদের পেটেই চলে যাবে। . আবু জুনায়েদ শেখ তবারক আলীর মুখের কথা রূপকথার গল্পের মতাে মুগ্ধ বিস্ময়ে শুনছিলেন । আর তার মুখের হাঁটি ক্রমশ বড় হয়ে যাচ্ছিল। 

চাকর নতুন করে তামাক দিয়ে গেল । শেখ তবারক আলী দুটো এলাচদানা মুখে পুরলেন এবং গুড়গুড়িতে টান দিয়ে বলতে আরম্ভ করলেন-দিনকাল পাল্টে যাচ্ছে । নতুন জমানার অনেক কিছুই বুঝিনে। ঠিকাদারিও আমাকে দিয়ে আর বেশি দিন চলবে না। বয়স তাে হয়েছে। ছেলে এবং জামাইয়ের ওপর ছেড়ে দিয়েছি, তারা যা পারে করবে। না পারলে করবে না।

গাভী বিত্তান্ত -পর্ব-(১০)

আমি এই বুড়াে বয়সে বার বাপের পেশায় ফিরে যাচ্ছি। গুলশান এবং বাড়ার মাঝখানে ভ তনশাে বিঘের মতাে জমি আছে। জায়গাটা জলা। সারা বর্ষাকাল পানির তল ডুবে থাকে। শীতের শেষে যখন পানি শুকিয়ে আসে বােরা ধান চাষ করি হচর দশেক মন ধান পাই। ঐ এলাকার গরিব লােকদের দিয়ে চাষ করাই। তার কিছু নিয়ে যায়, আমি কিছু আনি।

বর্ষাকালে সমস্ত বিলটা পানিতে যখন সয়লাব হয়ে যায়, আমার স্পীড বােটে চড়ে ঘুরে বেড়াতে বেশ লাগে। একবার সময় সুযােগ করে আপনাকে, মা বানুকে এবং আমার নাতনিকে ঘুরে ঘুরে জায়গাটা দেখাব। আপনাদের ভালাে লাগবে। এই জমিটার ওপর দেশী-বিদেশী অনেকেরই কড়া নজর ।

অনেক দাম দিয়ে আমার কাছ থেকে কিনে নিয়ে দালান কোঠার কমপ্লেক্স বানাতে চায় । ছেলে এবং জামাই অনেকবার বলেছে ঐ জমি কিনে বেচে শিল্প-কারখানায় ইনভেস্ট করতে। আমি সাফ সাফ বলে দিয়েছি, আমার জীবদ্দশায় এটি হচ্ছে না। যতদিন বেঁচে আছি চাষ করে যাব। 

আবু জুনায়েদ যখন শেখ তবারক আলীর মুখ থেকে শুনলেন বাড়ার মাঝখানে তাঁর তিনশাে বিঘে জমি আছে এবং সেখানে তিনি রীতিমতাে ধান চাষ করেন, তার বুকের ভেতর জমির ক্ষুধাটা প্রবলভাবে মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। তার মনের একটা গােপন দরজা খুলে গেল।

শরীরের সমস্ত রক্ত সভা করে উজানে উঠে আসতে চাইল। মুসা নবীর ললাহিত সাগরের বুক দর্শন করে যে রকম অনুভূতি হয়েছিল সে রকম একটা ভাবাবেগ তাঁর মনে ঢেউ খেলতে থাকল । মনে করতে থাকল, কামনা সমুদ্রের তীরে তিনি দাঁড়িয়ে আছেন। শেখ তবারক আলীকে স্বর্গ থেকে নেমে আসা আকাঙ্ক্ষা পূরণের বার্তাবাহক বলে ভাবতে থাকলেন। 

শেখ তবারক আলীর তামাক ফুরিয়ে গিয়েছে। তিনি নলটা একপাশে সরিয়ে রাখলেন। আবু জুনায়েদ অত্যন্ত বিনীতভাবে জানালেন 

-আমার একটি শখের কথা আপনাকে জানাতে খুব ইচ্ছে করে, কিন্তু লজ্জা লাগে। 

গাভী বিত্তান্ত -পর্ব-(১০)

-স্যার, আপনি আমাকে এখনাে আপনা মানুষ হিসেবে ভাবতে পারছেন না শুনে আমার খুব দুঃখ হচ্ছে। আপনি তাে আবেদের মতাে আমার আরেকজন জামাই। কীসের শখ আপনি মুখ খুলে জানাবেন। নইলে এ বুড়াে মানুষটি কষ্ট পাবে । 

আবু জুনায়েদ এবার তার মনের কথা প্রকাশ করলেন । 

-ছােটবেলা থেকে আমার একটা গাইগরু পােষার খুব শখ। গােটা চাকরি জীবন তাে ফ্ল্যাট বাড়িতে কাটাতে হল। জায়গার অভাবে সে শখটা অপূর্ণ থেকে গেছে । এখন জায়গা আছে, ঘাসও বেশ আছে। আমার মনে হচ্ছে একটা গরু আমি পুষতে পারি। গরু কোথায় বেচাকেনা হয়, কীভাবে পছন্দ করে কিনতে হয় কিছুই জানিনে । আপনার হাতে লােকজন আছে, যদি একটা গরু দেখেশুনে কেনার ব্যবস্থা করে দিতেন । আপনার হাতে কি সেরকম সময় আছে? 

শেখ তবারক আলী বললেন 

-আপনার শখটি খুব উত্তম শখ। এই গল্পে দাে সৌভাগ্যের লক্ষণ। শুনে আমার খুব ভালাে লেগেছে। মেয়ে নাতনি জইকে একটা কিনে দেয়ার তৌফিক আল্লাহ আমাকে দিয়েছেন। কিন্তু একটি কথ গুরু যে কিনবেন, রাখবেন কোথায়, চিন্তা করেছেন? 

গাভী বিত্তান্ত -পর্ব-(১০)

-না সে ব্যাপারে একেবারে কিছুই চিন্তা করিনি। আপনার চাষবাসের কথা শুনে আমার গরু পােষার কথাটা মনের মধ্যে জেগে উঠল । আমার আগেই ভাবা উচিত ছিল গরু পুষতে গেলে গােয়াল আগে।। 

 আবু জুনায়েদ একটুখানি নিরাশ হয়ে পড়লেন ; শেখ তবারক আলীর তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আবু জুনায়েদের মুখের ভাব লক্ষ্য করে বললেন: 

ঠিক আছে গরু আর গােয়ালের ভাবনা আপনাকে ভাবতে হবে না। কাল নটার দিকে আমার মিস্ত্রি আপনার বাড়িতে যাবে, কোথায় গােয়াল ঘর বানাতে চান, জায়গাটা দেখিয়ে দেবেন, বাকি দায়িত্ব মিস্ত্রির । তারপর বললেন, চলুন একটু ভেতরে যাই, ছেলে মেয়ে, বউ এবং আপনার চাচীর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেই।

ভেতরের ঘরে গিয়ে শুনলেন, শেখ তবারক আলীর ছেলে দুজন অধিক রাত হচ্ছে দেখে চলে গেছে। তাদের একজন থাকে গুলশানে, অন্যজন বারিধারায় । যে নাতিটির আকিকা উপলক্ষে যাওয়া, তাকে দোয়া করার সুযােগও পেলেন না আৰু জুনায়েদ। ইঞ্জিনিয়ার মেয়ে তাহমিনা, তার স্বামী আবেদ এবং শেখ তবারক আলীর স্ত্রীর সঙ্গে পরিচয় হল । আবু জুনায়েদের ইচ্ছে করছিল, এই বুড়াে মহিলার পদধূলি নেবেন। উপাচার্যের পােশাকটা তাঁকে এটা করতে দিল না। শেখ তবারক আলী তার স্ত্রীকে বললেন 

-এই হল মা বানুর স্বামী আমার উপাচার্য জামাই । আবু জুনায়েদ সালাম করলেন। -সুখে থাকো বাবা। বললেন মহিলা। 

আবু জুনায়েদের মেয়ে দীলু হরিণ শিশুর মতাে ছুটোছুটি করছিল। আবু জুনায়েদের গা ঘেঁষে আবদেরে গলায় বলল 

-এই দেখাে আমাকে এবং মাকে নানি কী সব দিয়েছেন। দীলু বাক্স খুলে দেখাল তাকে সােনার লেডিজ ঘড়ি, পার্কার ফাউন্টেন কলম, একটা চমৎকার বেনারশী শাড়ি এবং নুরুন্নাহার বানুকে দেয়া জড়ােয়া গয়নার সেটটি দেখালেন ।। 

-এসব দিতে গেলেন কেন? আবু জুনায়েদের কেমন বাধাে বাধাে ঠেকছিল। শেখ তবারক আলীর স্ত্রী নরম সুরে বললেন -জামাই মিয়া এগুলাে মেয়ে নাতনির কাছে নানির সামান্য উপহার। 

সে রাত্রে ফিরে আসার সময় নুরুন্নাহারের ঠোটে তবারক চাচার কথা লেগেই রইল । ভীষণ আকর্ষণীয় এবং খুশি খুশি দেখাচ্ছিল তাঁকে। 

গাভী বিত্তান্ত -পর্ব-(১০)

তবারক আলী এক কথার মানুষ । পরের দিন নটা বাজতেই ট্রাক ( এসে উপাচার্য ভবনের গেটের সামনে হর্ন দিতে থাকল । দারােয়ান গেট খুলতে রাজি ছিল না। ইট-সিমেন্ট, রড় বালুতে ভর্তি তিন তিনটি ট্রাকের এই সকালবেলায় আগমনের হেতু দারােয়ান জানত না। ট্রাকগুলাে বারবার হর্ন দিতে থাকল। বাধ্য হয়ে দারােয়ানকে উপাচার্য সাহেবকে খবর দিতে ওপরে যেতে হল। আবু জুনায়েদ স্যুট টাই পরে অফিসে যাওয়ার জন্য তৈরি হয়ে পায়চারি করছিলেন। দারােয়ানকে ওপরে উঠে আসতে দেখে তিনি রেগে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, কী চাই? 

-স্যার তবারক সাহেব ইটা বালু ভর্তি তিনটি ট্রাক পাঠিয়ে দিয়েছেন। ট্রাকগুলাে ভেতরে ঢুকতে চাইছে, জবাব দিল দারােয়ান । | আবু জুনায়েদের মনে পড়ে গেল। আগের রাতে শেখ তবারক আলী তাঁকে বলেছিলেন, ঠিক নটার সময় তবারক সাহেবের লােকজন ট্রাক নিয়ে তার বাড়ির গেটে এসে হাজির হবে । সাড়ে ন’টার সময়ে তাঁর একটি মিটিংয়ে বসার কথা।

আজ রসায়ন বিভাগের লেকচারার নিয়ােগের ইন্টারভুর তারিখ । সাধারণত আৰু জুনায়েদ প্রফেসর এবং এসােসিয়েট প্রফেসর ছাড়া নিচের দিকের পােস্টগুলাে ইন্টারভুর সময়ে উপস্থিত থাকেন না। যেহেতু রসায়ন তার একেবারে নিজস্ব ডিপার্টমেন্ট, তাই তিনি আপনা থেকেই প্রস্তাব করেছিলেন, লেকচারারদের ইন্টারভুর সময় তিনি স্বয়ং হাজির থাকবেন। কথা দিয়েছেন অথচ এদিকে ট্রাক এসে হাজির ।

তিনি যদি নিজে দাড়িয়ে থেকে জায়গা দেখিয়ে না দেন, কী রকম ঘর তৈরি করতে হবে ভালাে করে বুঝিয়ে না দেন, তাহলে পরে অসুবিধেয় পড়ে যেতে হবে। ট্রাকসহ লােকজনদের আজ চলে যেতে বলবেন কি না একটুখানি চিন্তা করে দেখলেন ।

তিনি উপস্থিত না থাকলে বড় রকমের ক্ষতি হওয়ার কথা নয়। তার বদলে টেলিফোনে উপ উপাচার্যকে ডেকে ইন্টারভুটা চালিয়ে নিতে বললে কাজ চলে যায়। তারপরেও একটা ব্যাপারে আবু জুনায়েদের মনের মধ্যে একটা সংশয় থেকে গেল। আবু জুনায়েদ বিশ্বস্তসূত্রে জানতে পেরেছেন, আজকে যে সকল প্রার্থীর ইন্টারভু হবে, তার মধ্যে ড. করিমের একজন নিকটাত্মীয় রয়েছে।

 

Read more

গাভী বিত্তান্ত -পর্ব-(১১)-আহমদ ছফা

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *