চাচা গরুটা কিনতে পারলেন কি না। যদিও কিনে থাকেন, গাড়ি ঘােড়ার ভিড় দেখে ভয় পেয়ে ছিড়ে কোথাও যদি চলে যায়। দীলু মেয়েটির উচ্ছাস ধরে না। একবার আবু জুনায়েদকে জিজ্ঞেস করে। একবার নুরুন্নাহার বানুকে,
-আব্বা গরুটা আসবে তাে! এই তাে আটটা বেজে গেল। কখন আসবে । শুধধাশুধি আমি টি, ভি, প্রােগ্রামটা মিস করলাম। | নুরুন্নাহার বানু এত বড় ধিঙ্গি মেয়ের আদেখলেপনা দেখে একটা কিল উঠিয়েছিলেন আবু জুনায়েদ তার হাতটা চেপে ধরলেন। অতএব মেয়েটি কিল খাওয়া থেকে রক্ষা পেয়ে গেল। ঘড়ির কাটা সাড়ে আটটার ঘরে ঠেকেছে। আবু জুনায়েদ নিজেকেই প্রশ্ন করেন, কী ব্যাপার গরু আসে না কেন? এরকম তাে হওয়ার কথা নয়। তবারক সাহেব এক কথার মানুষ এবং তাঁর সময়জ্ঞান অত্যন্ত প্রখর। তিনি ধরে নিয়েছিলেন, কোনাে একটা অসুবিধে হয়েছে। আজ আর আসছে এ সময়ে দারােয়ান এসে জানাল দুজন মানুষ একটা গরু নিয়ে এসেছে । ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ল সকলের ।
আৰু জুনায়েদ, নুরুন্নাহার বানু, মেয়ে দীলু, ছােকরা চাকর, কাজের বেটি সকলে হুড়ােহুড়ি করে নিচে নেমে এলেন। গরুসহ মানুষ দুজন ভেতরে প্রবেশ করল। সত্যি সত্যি একটা গরু উপাচার্য ভবনের কমপাউন্ডের মধ্যে প্রবেশ করল । আৰু জুনায়েদের কামনার ধন গরু। নতুন গরু কিনলে গােয়ালে ঢােকাবার আগে কতিপয় আচার পালন করতে হয়।
আবু জুনায়েদের তার একটাও মনে নেই। তিনি এত খুশি হয়েছেন যে হঠাৎ করে তার মুখ দিয়ে কোনাে কথাই বেরুচ্ছিল না। মানুষ দুজন গরুটাকে বােগােন ভেলিয়ার ঝাড়ের নিচে দাঁড় করিয়ে রেখেছিলেন, ছায়াছায়া অন্ধকারে পুরাে চেহারাটা কারাে চোখে ধরা পড়ছিল না।
গাভী বিত্তান্ত -পর্ব-(১৩)
– নি একটা আলাে আনতে বললেন। দারােয়ান ওপরে গিয়ে একটা চার্জার নিয়ে এল। এবার গরুর পুরাে চেহারা সকলের নজরে এল। আবু জুনায়েদের ইচ্ছে হল তিনি চিৎকার করে উঠবেন । কী অপূর্ব সুন্দর গরুটি। গায়ের রঙ উজ্জ্বল লাল। মাঝে-মাঝে ডােরা কাটা দাগ। গরুটিকে পৌরাণিক বুররাকের মতাে দেখাচ্ছে। যদি দুটি পাখা থাকত, তাহলে পশুটি আকাশের দিকে উড়াল দিত। ওলানটা অল্প অল্প মধু ভর্তি মৌচাকের মতাে স্ফীত হওয়ার পথে। সবচেয়ে সুন্দর চোখ দুটি। একটা অসহায় ভাব দর্পণের মতাে প্রতিফলিত হচ্ছে। লেজের চামড়াটা সাদা।
গরুটা অসহায় এবং কৌতূহলী দৃষ্টি দিয়ে লােকজনের দিকে তাকাচ্ছে। অল্প অল্প নড়াচড়া করছে এবং চারপাশ ভালাে করে দেখে নিচ্ছে। যখনই গরুটা নড়াচড়া করে গলার ঘণ্টি থেকে টুং টুং টুং আওয়াজ বেরিয়ে আসে। শিকলটা ঝন ঝন ঝন করে বেজে ওঠে ।
আৰু জুনায়েদের সারা জীবনের স্বপ্ন কামনা একটি গরুর আকার ধরে মূর্তিমান হয়ে সামনে দাঁড়িয়ে আছে। তার মুখ দিয়ে কোনাে কথা বেক্কল না। তিনি অভিভূতের মতাে দাঁড়িয়ে গরটি দেখছিলেন।
নুরুন্নাহার বানু শিকল ধরে দাঁড়ানাে লােকটির কাছে জানতে চাইলেন, -আহা গরুর কাছে গেলে চুসাতে আসবে না তাে। লােকটি উত্তর দিল,
– গরু কুঁসায় না । লাথি মারে না । ডরের কিছু নাই, যান কাছে যাইয়া আদর কইরা দেহে।।
নুরুন্নাহার বানু বললেন, -থাক বাবা আমার সাহস হয় না । জানােয়ার তাে কখন কী করে বসে।
নুরুন্নাহার বানুর মেয়েটি তার চাইতে সাহসী । সে গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে এসে গরুর গলায় হাত রাখল। গরুটি একটু ঘুরে গিয়ে লম্বা জিভ বের করে তার বাহু চাটতে আরম্ভ করল। মেয়েটির কাতুকা লাগছিল। দুপা পিছিয়ে এসে কলকণ্ঠে বলে উঠল,
-দেখাে দেখাে আল্লু গরুটি কেমন করে আমার বাহু চাটতে ছুটে আসছে । আবু জুনায়েদ বললেন, -তুমি সরে এলে কেন, চাটতে দাও না। বােঝা যাচ্ছে গরুটির বেশ দয়াময় আছে।
গাভী বিত্তান্ত -পর্ব-(১৩)
এবার উপাচার্য সাহেব এগিয়ে এসে গরুর পিঠে হাত রাখলেন। পশমের মতাে সুন্দর কেশের স্পর্শসুখ অনুভব করলেন । গরুটি আবার আৰু জুনায়েদের শরীরের অনাবৃত অংশ চাটবার জন্য জিভ বের করল । আৰু জুনায়েদ পাঞ্জাবির আস্তিন গুটিয়ে নিয়ে হাতটি প্রসারিত করে দিয়ে বললেন,
-বেটি চাট।
আৰু জুনায়েদের ইচ্ছে হল ওলানটা একটু ধরে দেখবেন। স্ত্রী এবং কন্যার উপস্থিতিতে সেটা করা সঙ্গত হবে না মনে হওয়ায় বিরত থাকলেন । তিনি নানা জায়গায় হাত বুলিয়ে গরুর শরীরের উত্তাপ অনুভব করছিলেন। তাঁর স্বামী একটা গরুকে নিয়ে লােকজনের সামনে এত আদিখ্যেতা করবেন, নুরুন্নাহার বানুর সেটা সহ্য হল না। কণ্ঠস্বরে ঝাঁঝ মিশিয়ে বললেন,
-পিঠে হাত বুলিয়ে আদর করলেই চলবে নাকি? গরুকে তার জায়গায় নিয়ে যাও। খেতে দেবে কী সে কথা চিন্তা করাে।
দড়ি ধরে থাকা লােকটি বলে বসল,
-একটা মশারির প্রয়ােজন হবে। এই জাতের গরু মশার কামড় সহ্য করতে পারে না।
নুরুন্নাহার বানু বললেন, -তুমি একটু ঠাণ্ডা হও, আমি দেখি কী করা যায় । তারপর তিনি ডাক দিলেন, -ওই বুয়া শুনে যা । বুয়া এলে বললেন,
-আজ রাতের জন্যে তােমার মশারিটা গরুটাকে দিয়ে দাও। কাল সকালে অন্য ব্যবস্থা করা হবে।
বুয়া বিড়বিড় করে বলল,
-মানুষটাকে মশায় খাউক কুনু চিন্তা নাই । গরুর বাচ্চারে মশারি লাগাইয়া দাও। মাইনষের বিচার।
কিন্তু সে আট-দশ জায়গায় তালিমারা নিজের মশারিটা এনে দিল। লােকটি এক ঝলক দেখেই বলে দিল ।
-ওই মশারি ত তিন হাত লম্বা দুই হাত পাশ । গরুটা কত লম্বা জানেন, পৌনে পাঁচহাত চলবে না।।
আবু জুনায়েদ বললেন, -আজকে কোনােরকমে থাকুক, কাল নতুন মশারির ব্যবস্থা করব ।
গাভী বিত্তান্ত -পর্ব-(১৩)
নুরুন্নাহার বানু চটে গেলেন। তিনি কোনাে কথা ভেতরে রাখতে পারেন না। লােকজনের সামনেই বলে বসলেন,
-বাড়িতে পারা দিতেই নতুন মশারির সব কাল সকাল হলে আরাে কত কিছুর প্রয়ােজন হবে। আবু জুনায়েদ অপ্রস্তুত হয়ে গেলেন। নুরুন্নাহার বানুর কথাগুলাে তবারক সাহেবের কানে গেলে তিনি অসন্তুষ্ট হতে পারেন । তিনি বললেন,
-আঃ তুমি চুপ করাে। আমি কিছু একটা ব্যবস্থা করতে চেষ্টা করব। ভাই আপনি গরুটা ওই দিক দিয়ে গােয়াল ঘরে নিয়ে যান। দারােয়ান গােয়ালঘরের বাতিটি জ্বালিয়ে দাও তাে।
দারােয়ান বলল,
-স্যার গােয়াল ঘরে তাে আলাের বন্দোবস্ত করা হয়নি। আবু জুনায়েদ এই প্রথমে শেখ তবারক আলীর ব্যবস্থাপনার মধ্যে একটা ত্রুটি আবিষ্কার করলেন।
লােকটি বলল, -স্যার এই জাতের গরু আন্দাইরে থাকতে পারে না। আবু জুনায়েদ দিশেহারা হয়ে বললেন, -কী করব বাবা তুমিই বলে দাও। শুনলে তাে গােয়াল ঘরে আলাে নেই। লােকটি বলল, -আমি একুয়া কথা কমু আপনের মন লয় কি না চিন্তা করবেন। আৰু জুনায়েদ বললেন, -হা বাবা বলাে।
-আজই রাইতে বড় দালানের বারান্দার একপাশে থাকুক। আবু জুনায়েদ বললেন, -ঠিক আছে বাবা ওই থামটার সঙ্গে বেঁধে রাখাে । নুরুন্নাহার বানু রেগে মেগে ওপরে চলে গেলেন । কিন্তু মেজাজটা প্রকাশ করলেন । মনে মনে বলতে থাকলেন, লােকটি বললে গরুটিকে নুরুন্নাহার বানুর বিছানায় শশায়াতে হবে, আবু জুনায়েদ চতুষ্পদের বাচ্চাকে তাঁর খাটে উঠিয়ে দিতে কুণ্ঠাবােধ করতেন না।
গরুটা থামের সঙ্গে বেঁধে লােক দুজন চলে গেছে। আবু জুনায়েদ এই নিরিবিলি মুহূর্তটিতে সম্মুখ পাছ নানা দিক থেকে দেখছিলেন। এই সময়ে একটি কণ্ঠস্বর শুনলেন।
গাভী বিত্তান্ত -পর্ব-(১৩)
-স্যার বেয়াদবি মাফ করবেন । পারমিশন না নিয়ে আপনাকে বিরক্ত করতে এলাম ।
তিনি তাকিয়ে দেখেন সামনে দাঁড়িয়ে আছেন তারই বিভাগ অর্থাৎ রসায়ন শাস্ত্রের এসােসিয়েট প্রফেসর আধপাগলা মুস্তাফিজুর রহমান। আবু জুনায়েদ বিরক্ত হয়েছেন। যা হােক, সেটা গােপন করে বললেন,
-কী খবর মুস্তাফিজুর এত রাতে । মুস্তাফিজুর রহমান বললেন,
-স্যার প্রথমেই আপনাকে জানানাের জন্য ছুটে এসেছি। কাজটি আপনার সঙ্গে পরামর্শ করেই শুরু করেছিলাম। এই এতদিনে প্রবলেমটার একটা সলিউশন পাওয়া গেছে।
এই যে দেখুন ইউ, এস, এ-র প্রিন্সটন নিভা থেকে ড, রবার্টসন ফ্যাক্স করে জানিয়েছেন আমার সলিউশনটা কারেক্ট । এই লাইনে ড. রবার্টসন সর্বশেষ্ঠ অথরিটি। কেমিস্ট্রির ইতিহাসে এটা বড় ঘটনা। | মুস্তাফিজ ফ্যাক্সের কপিটা আৰু জুনায়েদের দিকে বাড়িয়ে ধরে বললেন, এই যে দেখুন । আবু জুনায়েদ কপিটা একবার দেখলেন বটে ! কিন্তু পড়ে দেখার প্রবৃত্তি হল
মুস্তাফিজ সাহেবকে বললেন, -মুস্তাফিজ আমি এখন অন্য চিন্তায় মগ্ন আছি। একটা গরু সংগ্রহ করেছি। ভালাে জাতের গরু। মশার আক্রমণ থেকে গরুকে রক্ষা করার জন্য একটি বড়সড় মশারি কোথায় পাওয়া যায়, সে ব্যাপারটা নিয়ে ব্যস্ত আছি ! কাল সকালে আপনার ফ্যাক্স পড়ে দেখব। ফ্যাক্সের কপিটা রেখে যেতে পারেন, না নিয়ে যান । কাগজ পত্রের ভিড়ে হারিয়ে যাবে।
মুস্তাফিজ হতাশ ভঙ্গিতে টলতে টলতে বাইরে চলে এলেন। ওই এত রাতে ভুল জায়গায় কেন এলেন? মনে ভীষণ অনুতাপ জন্মাতে লাগল ।
রাত সাড়ে দশটার সময়ে শেখ তবারক আলী উপাচার্য ভবনে এলেন। তিনি ছিপ নৌকোর মতাে লম্বাটে একটি স্পাের্টস কারে চড়ে এসেছেন।
গাভী বিত্তান্ত -পর্ব-(১৩)
আবু জুনায়েদকে খবর দেয়ার প্রয়ােজন ছিল না। তিনি বারান্দায় দাঁড়িয়ে গরুটাকে নানাদিক থেকে দেখছিলেন। বড় সুন্দর গরু, দেখে দেখে আশ মিটে না। আবু জুনায়েদ বিস্ময় ভরা মুগ্ধতার ভেতরে এতই ডুবে ছিলেন যে শেখ তবারক আলী কখন তার পাশটিতে এসে দাঁড়িয়েছেন, খেয়াল করতে পারেননি।
শেখ তবারক কাধে হাত রাখলেন। তাকে দেখে চমকে উঠলেন। তবারক সাহেবের বদলে চাচা শব্দটি তার মুখে এসেই গিয়েছিল প্রায়। কিন্তু ডাকা হল না। মাথা ঝুঁকিয়ে কদমবুসি করার ইচ্ছেও তাকে দমন করতে হল।
শেখ তবারক আলী জিজ্ঞেস করলেন, -গরু পছন্দ হয়েছে? -বারে পছন্দ হবে না, এত সুন্দর গরু, জবাব দিলেন আৰু জুনায়েদ। -মা বানু এবং দীলুর পছন্দ হয়েছে? -সেসব আপনি তাদের কাছ থেকে শুনবেন। চলুন ওপরে যাই।
শেখ তবারক আলী আবু জুনায়েদের পিছে পিছে পা বাড়িয়েছিলেন । কিন্তু হঠাৎ ঘুরে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করে বসলেন, গােয়াল ঘরে না নিয়ে গরুটা এখানে বেঁধে রেখেছেন কেন?
-আবু জুনায়েদ জবাব দিলেন,
আপনার লােকটা বলল এই জাতের গরু অন্ধকারে থাকতে পারে না। তাই আজ রাতটা এখানেই রেখেছি।
গাভী বিত্তান্ত -পর্ব-(১৩)
-সে কি গােয়াল ঘরে কারেন্ট দেয়নি? শেখ তবারক আলী হতবাক হয়ে গেলেন । তারপর আক্ষেপের সুরে বললেন,
-এই সমস্ত ইডিয়টদের নিয়ে কাজ করে ২ নেই । শেখ তবারক আলী আবু জুনায়েদের সঙ্গে ওপরে এলেন। নানা এসেছেন, নানা এসেছেন বলে শােরগােল শুরু করে দিল। মজা করে শেখ রাকের মাথা থেকে টুপিটা তুলে নিয়ে নিজের মাথায় দিল । তিনি আদর করে নাতনির চুল ধরে টানলেন, নাক এবং গাল টিপে দিলেন, বললেন,
টুপিতে নাতনিকে সুন্দর মানিয়েছে।
নুরুন্নাহার বানু এসে চাচাকে সালাম করলেন ! শেখ তবারক তার ভ্রাতুস্পুত্রীর মাথায় হাত দিয়ে আদর করলেন, জিজ্ঞেস করলেন,
-কেমন আছ মা বানু? নুরুন্নাহার বানু রাগত স্বরে বললেন, -চাচা আপনার সঙ্গে কথা বলব না।
শেখ তবারক অবাক হওয়ার ভঙ্গিতে বললেন, কেন মা বানু পাগলি আমি আবার অন্যায়টা কী করলাম?
কথা বলব না তার প্রথম কারণ, আপনি আসবেন বলেছিলেন, আসেননি আর দ্বিতীয়টি থাক বলতে বলতে থেমে গেলেন।
শেখ তবারক আলী বললেন, -এই তাে মা আমি এসেছি, এখন দ্বিতীয় কারণটি বলাে। –
Read more
