গাভী বিত্তান্ত -পর্ব-(২)-আহমদ ছফা

গাভী বিত্তান্ত

সংবাদ পরে যখন নতুন কোনাে প্রােগ্রামের দিকে দৃষ্টি যােগ করতে চেষ্টা করতেন, সেই সময়ে নুরুন্নাহার বানু কিল চড় দিতে দিতে কলেজ পড়ুয়া মেয়েটিকে খাতা বইসহ আবু জুনায়েদের সামনে বসিয়ে দিতেন। অগত্যা আবু জুনায়েদকে মেয়েটিকে ক্যালকুলাস এবং ইংরেজি ব্যাকরণের ট্যান্স, নাম্বার, জেন্ডার এসব শেখাতে হত।

রাতের খাবার খেতে কোনােদিন দশটা বেজে যেত। খাওয়ার পর তিনি চুক চুক করে এক গ্লাস দুধ পান করতেন। তারপর বাতি নিভিয়ে বিছানায় ঘুমিয়ে পড়তেন। এই সময়ে নুরুন্নাহার বানু বাসি পাউরুটির মতাে থলথলে শরীরখানা মেলে ধরে তাকে উস্কে তােলার চেষ্টা করতেন। সব দিন তিনি সাড়া দিতে পারতেন না এবং পাশ ফিরে ঘুমােতেন।

নুরুন্নাহার বানু মনে করতেন সেই ডিপার্টমেন্টের ছেনাল শিক্ষিকার সঙ্গে সম্পর্কের কারণে ইদানীং আবু জুনায়েদ শয্যায় তাকে উপেক্ষা করতে আরম্ভ করেছেন। আবু জুনায়েদ ঘুমিয়েই নাক ডাকতে শুরু করতেন । নুরুন্নাহার বানু ভেতরে ভেতরে রাগে ফুঁসতে থাকতেন ।

আবু জুনায়েদের ঘুমটা গাঢ় হয়ে এলে ঠেলা দিয়ে তাকে জাগিয়ে দিয়ে গণ্ডারের মতাে নাসিকা গর্জনের জন্য আধারাতে ঝগড়া লাগিয়ে এক ধরনের তৃপ্তি অনুভব করতেন । আবু জুনায়েদের শরীর লম্বা লম্বা কালাে কালাে লােমে ভর্তি ছিল। একবার তাে ম্যাচকাঠি জ্বালিয়ে লােমের বনে আগুনই ধরিয়ে দিয়েছিলেন।

 মিয়া মুহম্মদ আবু জুনায়েদের এ সকল অসঙ্গতি এগুলাে কাল্পনিক হােক বা বাস্ত ব যােক বেগম নুরুন্নাহার বানু এবং কাঁচা বাজারের দোকানদারেরা ছাড়া অন্য কারাে দৃষ্টিতে বিশেষ ধরা পড়েনি। তবে তার বৃদ্ধ শ্বশুর তার মনের ভেতর একটা চাপা ক্ষোভ পুষে রেখেছিলেন। তার পয়সায় আবু জুনায়েদ বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করেছেন। তিনি মনে করেন বিগত কয়েক বছর ধরে আবু জুনায়েদ যেভাবে কদমবুসি করেন, তাতে ভক্তি শ্রদ্ধার পরিমাণ যথেষ্টভাবে কমে এসেছে ।

গাভী বিত্তান্ত -পর্ব-(২)

কিন্তু একথা তিনি মুখ ফুটে কারাে কাছে প্রকাশ করেননি। আবু জুনায়েদের দৈনন্দিন জীবনযাপন পদ্ধতি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যবেক্ষণ করে আমরা তার মধ্যে সামান্য পরিমাণ দোষও আবিষ্কার করতে পারিনি। নুরুন্নাহার বানুর যৌন সন্দেহটুকুকে ধর্তব্যের মধ্যে আনাও উচিত নয় মনে করি। তার সবটাই কাল্পনিক ! মেয়ে মানুষ ঘরে বসে থাকলে এবং নিজেকে ক্লান্ত করার প্রচুর কাজ না থাকলে, মাথার উকুনের মতাে মনের মধ্যে সন্দেহের উকুন বাসা বাঁধতে থাকে । তরকারিঅলা, মাছঅলা এদের মতামতের কী দাম । তারা তাে অহরহ নিরীহ নাগরিকদের পকেট কাটছে। 

| এই পর্যায়ে মিয়া মুহম্মদ আবু জুনায়েদের একটি বিশেষ প্রবণতার দিকে সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করব। এটাকে দোষ বলব বা গুণ বলব এখনাে স্থির করে উঠতে পারিনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছুটি ছাটার সময় আবু জনায়েদ সাভার, আমিন বাজার, জয়দেবপুর, মাওয়া শহরতলী এসকল অঞ্চলে জমির দালালদের সঙ্গে ঘুরে বেড়াতেন। অল্প পয়সায় অধিক জমি কোথায় পাওয়া যায় এবং কীভাবে কেনা যায় সে ধান্ধায় মত্ত হয়ে থাকতেন।

জমি কেনার আকাঙক্ষা তাঁর মনে মগজে নেশার মতাে প্রবেশ করেছিল। তার দৈনন্দিন জীবনযাপন পদ্ধতির মধ্যে ওই একটি বিষয় যেখানে তিনি কোনাে শাসন বারণ মানতেন না। আবু জুনায়েদের মনে একটা পেশাগত অহঙ্কার ছিল। সেটা চাপা থাকত। তবু তার যে সমস্ত সহকর্মী নানা 

প্রতিষ্ঠানে পরামর্শক জরিপকারকের কাজ করে টাকা-পয়সা করে লাল হয়ে যাচ্ছেন, আবু জুনায়েদ তাঁদের সম্পর্কে নীচু ধারণা পােষণ করতেন। মুখ ফুটে কাউকে কিছু বলার অভ্যাস নেই বলে এ-কথাটিও কাউকে বলা হয়নি। তার স্বভাবের মধ্যে পেশাগত অহঙ্কারের সঙ্গে যােগ হয়েছিল একটা জেদ ।

আৰু জুনায়েদ মনে করতেন, তার সহকর্মীরা অনৈতিক উপায়ের আশ্রয় গ্রহণ করে যে টাকা-পয়সা আয় করেন, তিনি সৎ ভাবে চেষ্টা করে অনেক বেশি টাকার মালিক হতে পারবেন। তিনি মনে করতেন, ওই জমিকে আশ্রয় করে একদিন তার ভাগ্য খুলে যাবে। নিশ্চয়ই কোথাও নামমাত্র মূল্যে তাঁর জন্য প্রচুর পরিমাণ জমি অপেক্ষায় আছে। তার কাজ হল খুঁজে বের করা। খুনােখুনি কিংবা অন্যরকম গণ্ডগােলে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হয়ে গেলে আবু জুনায়েদ ভীষণ খুশি হয়ে উঠতেন ।

গাভী বিত্তান্ত -পর্ব-(২)

দালালদের নিয়ে তিনি দূর দূর অঞ্চলে জমির সন্ধানে পাড়ি জমাতেন। তার বাড়িতে নানা আকার নানা প্রকারের দালাল হরহামেশা লেগেই থাকত। তাদের কারাে কারাে পায়ে রবারের পাম্প সু, মুখে গুছি দাড়ি । কেউ ছাতাটি বগলে নিয়ে গুটি গুটি পায়ে ড্রয়িং রুমে হানা দিত। আবু জুনায়েদ এ ধরনের লােকদের ভারি সমাদর করতেন।

পরীক্ষার প্রশ্ন করে, খাতা দেখে, অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে বহিরাগত পরীক্ষক হিসেবে যেয়ে মাস মাইনের বাইরে যে টাকা তিনি আয় করতেন, প্রায় তার সবটাই দালালদের সেবায় ব্যয় করতেন। পারলে মাস মাইনের টাকাটাও দালালদের পেছনে ঢেলে দিতেন। সেটি সম্ভব হয়নি। কারণ, সব টাকাটা নুরুন্নাহার বানুর হাতে তুলে দিতে হত। দৈনন্দিন হাত খরচ টাকাটাও তাকে স্ত্রীর কাছ থেকে চেয়ে নিতে হত। দশটা টাকা বেশি দাবি করলে দশ রকম জেরার সম্মুখীন হতে হত । 

তিন আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়টির ছিল গৌরবময় অতীত। অনেকে এই বিশ্ববিদ্যালয়টিকে গােটা দেশের আত্মার সঙ্গে তুলনা করে গর্ব বােধ করতেন। এখানে মহান ভাষা আন্দোলন জন্ম নিয়েছে। যুগ যুগ ধরে অবদমিত ইতিহাসের উষ্ণ নিঃশ্বাসের মতাে এখান থেকে মুক্তিযুদ্ধের আগুন সমগ্র ভূখণ্ডে ছড়িয়ে পড়েছে। মুক্তি সংগ্রামের জ্বালামুখ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছেবি শ্ববিদ্যালয় ।  অতীতের গৌরব গরিমার ভার বইবার ক্ষমতা বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের নেই । 

মপ্রতিককালে নানা রােগ ব্যাধি বিশ্ববিদ্যালয়টিকে কাবু করে ফেলেছে। মাছের চন যেমন মস্তক থেকে শুরু হয়, তেমনি যাবতীয় অসুখের জীবাণু শিক্ষকদের চিন্ত -চেতনায় সুন্দরভাবে স্থান করে নিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্বরজারি, ধনুষ্টঙ্কার নানা রকমের হিস্টিরিয়া ইত্যাকার নিত্য-নৈমিত্তিক ব্যাধিগুলাে শিক্ষকদের ঘায়েল করেছে।বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় বারশ শিক্ষক। এখন শিক্ষকসমাজ বলতে কিছু নেই। আছে হলুদ, ডােরাকাটা, বেগুনি এসব দল। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষমতা জো করার জন্য দলগুলাে সম্ভব হলে সম্মুখ সমরে অবতীর্ণ হত। মাঠ এবং রাস্তা ছাত্রেরা দখল করে রেখেছে বলে শিক্ষকদের লড়াইটা স্নায়ুতে আশ্রয় করে নিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় সম্বন্ধে বেশি প্যাচাল পাড়লে মিয়া মুহম্মদ আবু জুনায়েদের উপাচার্য হওয়ার উপাখ্যানটি অনাবশ্যক লম্বা হয়ে যায় । 

গাভী বিত্তান্ত -পর্ব-(২)

 সেই বছরটিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেটে ডােরাকাটা দলটি নির্বাচিত হওয়ার খুবই সম্ভাবনা ছিল। আবু জুনায়েদের সঙ্গে এই দলের একটা ক্ষীণ সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। আবু জুনায়েদ নির্বিরােধ শান্তশিষ্ট মানুষ। দলবাজি তার মতাে ধাতের মানুষের পােষায় না। তারপরেও আবু জুনায়েদ কীভাবে যুক্ত হয়ে গেলেন। বলা যেতে পারে আবু জুনায়েদের ভাগ্য তাঁকে দলের দিকে টেনে নিয়ে গিয়েছিল ।

তথাপি পেছনে ছােট্ট একটা কাহিনী আছে। রসায়ন বিভাগের অবিবাহিতা সুন্দরী শিক্ষিকাটি পুরুষ মানুষদের সঙ্গে প্রেম প্রেম খেলে বিরক্ত হয়ে গেলে অধিকতর উত্তেজনাপূর্ণ কোনাে কিছুর মধ্যে নিজেকে ঢেলে দিতেন। এরকম ঘটনা একাধিকবার ঘটেছে। ভদ্রমহিলা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমানে যে উপাচার্য ভদ্রলােকটি আসীন আছেন, তাঁর পেয়ারের এক সুদর্শন শিক্ষকের প্রেমে আকণ্ঠ ডুবে গিয়েছিলেন।

সকলকে বলাবলি করতে শােনা যেত এবার দিলরুবা খানমের একটা হিল্লে হয়ে যাবে । হঠাৎ করে বলা নেই কওয়া নেই, ভদ্রলােক শিল্প মন্ত্রণালয়ের সেক্রেটারির অল্প বয়েসী এক কন্যাকে বিয়ে করে ফেললেন । এই ঘটনাটি দিলরুবা খানমকে এক রকম ক্ষিপ্ত করে তুলেছিল। তিনি সপ্তাহখানেক ক্লাসে আসেননি। আঘাতের ধকলটা হজম করতে একটু সময় নিয়েছিল। পরে দিলরুবা খানম জেনেছিলেন ওই সেক্রেটারি ভদ্রলােকের সঙ্গে উপাচার্যের কী ধরনের আত্মীয়তা ছিল।

তিনিই বিয়েটা ঘটিয়ে দিয়েছিলেন। দিলরুবা খানমের সমস্ত ক্ষোভ রাগ ওই উপাচার্যকে উপলক্ষ করে ফুঁসে উঠতে থাকল। তিনি সর্বত্র বলে বেড়াতে লাগলেন এই দুর্নীতিবাজ আবু সালেহকে আসন থেকে টেনে ফেলে না দিলে এই বিশ্ববিদ্যালয় ধ্বংস হয়ে যাবে । উপাচার্য ছিলেন হলুদ দলের মনােনীত প্রার্থী। হলুদ দল ছাড়া বাদামি দলের শিক্ষকেরাও তাকে সমর্থন করতেন। দিলরুবা খানম কিছুদিনের মধ্যে একটা অসম্ভবকে সম্ভব করে তুললেন। হলুদ দলের সমর্থক বাঘা শিক্ষকদের ডােরা কাটা দলে নিয়ে এলেন।

গাভী বিত্তান্ত -পর্ব-(২)

দিলরুবা খানমের মুখে ওই এক কথা। বর্তমান উপাচার্য অথর্ব, অশিক্ষিত, দুর্নীতিবাজ। তাকে ঝেড়ে ফেলে দিতে না পারলে বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘাস গজাবে না। অবশ্য বাঘা বাঘা শিক্ষকেরা একেবারে নিজের নিজের কারণে ডােরা কাটা দলে যােগ দিয়েছেন। বর্তমান উপাচার্য নিজের পেটোয়া লােক ছাড়া কারাে প্রত্যাশা পূরণ করেননি। এই দলছুট শিক্ষকদের কেউ আশা করেছিলেন, উপাচার্য সাহেব তাকে একটা চার রুমের ফ্ল্যাট বরাদ্দ করবেন। কেউ আশা করেছিল, বিদেশ যাবার সুযােগ দেবেন।

কেউ প্রত্যাশা করতেন তাঁর আদরের দুলালীটি বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি পাবে। কিন্তু মুহম্মদ আবু সালেহ একে ওকে সবাইকে নিরাশ করেছেন। তাই তাঁরাও একে একে ক্ষমতার বলয় থেকে দূরে সরে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন। দিলরুবা খানমের আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক রাজনীতিতে কোনাে মহিলা শিক্ষককে এমন অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে দেখা যায়নি। তরুণ শিক্ষকদের অনেকে মনে করতেন, শিক্ষক বাহিনীতে একজন মহিলা 

অগ্রণী ভূমিকা পালন করায় শিক্ষক রাজনীতিতে একটা নতুন মাত্রা যােগ হল । দেশের প্রধানমন্ত্রী মহিলা, বিরােধী দলীয় নেত্রী মহিলা, সুতরাং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের রাজনীতিতেও একজন মহিলা যদি নেতৃত্ব দিতে ছুটে আসেন এই চরাচরপ্লবী নারী জাগরণের যুগে এই ঘটনাটিকে অত্যন্ত সঙ্গত ও স্বাভাবিক বলে ধরে নিতে হবে ।

 সুন্দরী মহিলার স্বভাবের খুঁত, দুর্বলতা যখন প্রকাশ পায় তখন তার পুরুষ মানুষকে আকর্ষণ করার ক্ষমতা অনেক গুণ বেড়ে যায় । বেচারী আবু জুনায়েদ তাঁর সুন্দরী এবং স্খলিতস্বভাবা সহকর্মী মহিলাটির আকর্ষণে মুগ্ধ হয়ে ডােরাকাটা দলের সমর্থকে পরিণত হয়েছিলেন।

গাভী বিত্তান্ত -পর্ব-(২)

শুধু একজন নীরব সমর্থক, তার বেশি কিছু হওয়ার ক্ষমতা মিয়া মুহম্মদ আবু জুনায়েদের ছিল না। এখন দেখা যাচ্ছে আবু জুনায়েদের ধর্মপত্নী রাতের বেলা তাঁর পাশে ঘুমিয়ে মনের মধ্যে যে সন্দেহটি নাড়াচাড়া করতেন, সেটি একেবারে অমূলক নয়। মধু জুনায়েদ যদি দিলরুবার টানে আকৃষ্ট হয়ে ডােরাকাটা দলে যােগ না দিতেন তার উপর্য হওয়ার প্রশ্নই উঠত না। তাহলে একথা থেকে আরেকটি কথা বেরিয়ে আসে । আৰু জুনায়েদের স্ত্রী নুরুন্নাহার বানু সকলের কাছে যে দাবি করে বেড়াচ্ছেন, তাঁর ভাগ্যে আবু জুনায়েদের ভাগ্য খুলেছে সেটা সত্যি নয়।

এতে দিলরুবা খানমের হাত ছিল। আবু জুনায়েদের উপাচার্য হওয়ার ঘটনাটিকে যদি আল্লাহর কেরামত বলে মেনে নিই, আমরা বেহুদা কল্পনা করার কষ্ট থেকে রেহাই পেয়ে যাই। আল্লাহ নুরুন্নাহার বানুর খসম আবু জুনায়েদকে উপাচার্য বানাবার জন্য দিলরুবা খানমের হাবুডুবু খাওয়া প্রেমকে নষ্ট করে দিয়ে তাকে শিক্ষক রাজনীতিতে টেনে এনেছিলেন।

শুধু এটুকু বললে আল্লাহর লীলাখেলার সূক্ষ্ম কেরামতির কথা সঠিকভাবে বর্ণনা করা হয় না। আল্লাহ যে বিশ্বজগতের সমস্ত রহস্য নিয়ন্ত্রণ করছেন এবং তাঁর ইঙ্গিতে যে সবকিছু ঘটে, সেটা প্রাঞ্জলভাবে উপলব্ধি করার জন্য আরাে কিছু বিষয়ের ব্যাখ্যা দেয়া প্রয়ােজন। 

ডােরাকাটা দলে যেসব সিনিয়র শিক্ষক এসে যােগ দিয়েছিলেন, শুরুর দিকে সকলের বুলি ছিল, বিশ্ববিদ্যালয়কে বাঁচাতে হবে, প্রশাসনকে দুর্নীতিমুক্ত করতে হবে এবং সর্বক্ষেত্রে সুবিচার প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। আর জুনিয়র শিক্ষকদের যাতে তাড়াতাড়ি প্রমােশন হয় এবং তাঁরা তাড়াতাড়ি বিদেশ যেতে পারেন সে ব্যবস্থাটিও নিশ্চিত করতে হবে। এগুলাে তাে হল নির্বাচনী দাবি। কিন্তু প্রার্থী মনােনয়নের বেলায় একটা মস্ত ঘাপলা দেখা দিল। 

গাভী বিত্তান্ত -পর্ব-(২)

এবারের নির্বাচনে ডােরাকাটা দলের জয়লাভ করার সমূহ সম্ভাবনা। এই দলের ভেতর থেকে তিনজন যােগ্য ব্যক্তিকে প্রার্থী হিসেবে বেছে নিয়ে তিনজনের একটি প্যানেলকে মনােনয়ন দিতে হবে। এই তিনজনের প্যানেল ঠিক করার সময় শুরু হল আসল গণ্ডগােল।

সাম্প্রতিককালে প্রায় বার জন ঝুনাে প্রফেসর ডােরাকাটা দলের সমর্থক। তাঁদের প্রত্যেকেই মনােনয়ন পেতে ভীষণ রকম আগ্রহী। সকলেই মনে করেন, তাঁর মতাে যােগ্য প্রার্থী পূর্বে কখনাে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেননি। প্রায় সকলেই মনে করেন বিশ পঁচিশ বছর ধরে শিক্ষকতার মহান ব্রতে নিযুক্ত আছেন, অবসর নেয়ার পূর্বে উপাচার্যের চেয়ারটিতে একটা পাছা ঠেকাতে পারলে নিঃস্বার্থ জ্ঞান সেবার একটা স্বীকতি অন্তত মিলে ।

এই জ্ঞানবৃদ্ধ মহান শিক্ষকদের মধ্যে এ নিয়ে এত ঝগড়াঝাটি হতে থাকল যে সকলে আশঙ্কা পােষণ করতে লাগলেন ডােরাকাটা দলটিই না আবার তিন টুকরাে হয়ে যায়। আগের জমানা হলে তলােয়ার দিয়ে প্রতিদ্বন্দিদের মাথা কেটে নিজেকে প্রার্থী হিসেবে ঘােষণা করতেন।

কিন্তু মুশকিলের ব্যাপার হল নিজে নিজে ঘােষণা করে প্যানেলভুক্ত প্রার্থী হওয়া সম্ভব নয়। তার জন্য দলের স্বীকৃতি অর্জন করতে হয় । দলের কর্তা ব্যক্তিদের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। তারা কিছুতেই সিনিয়র শিক্ষকদের একটা আপােস মীমাংসায় টেনে আনতে পারলেন না। দিনে রাতে মিটিং করেও কোনাে গ্রহণযােগ্য ফর্মুলা বের করা সম্ভব হল না।

বুড়াে প্রফেসররা নিজ নিজ অবস্থান এমন দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে রইলেন যে বিরক্ত জুনিয়র শিক্ষকেরা তাঁদের কাছে যাওয়া আসা ছেড়ে দিয়ে যার যার ঘরে ফিরে যাওয়ার কথা চিন্তা করছিলেন। সকলে আবার বলাবলি করতে থাকলেন আবু সালেহ আরাে এক টার্মের জন্য উপাচার্য থেকে যাবেন। ডােরাকাটা দলটাকে বুড়াে প্রফেসররা পাংচার করে দিয়েছেন।

গাভী বিত্তান্ত -পর্ব-(২)

সুতরাং আবু সালেহর দল এবারও বিনা বাধায় নির্বাচিত হয়ে যাচ্ছে। ডােরাকাটা দল পনের দিনব্যাপী ঝগড়া ঝাটির কারণে ভেঙে চার টুকরাে হয়ে গিয়েছিল প্রায়। কিন্তু দিলরুবা খানম এবারেও তার ম্যাজিকটা অব্যর্থভাবে প্রয়ােগ করলেন। 

তিনি রিকশা করে তরুণ শিক্ষকদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে তাঁদের বুঝিয়ে সুজিয়ে এনে জড়াে করলেন। দলীয় ঐক্যটাকে ভেতর থেকে মজবুত করে তুললেন। তারপর তরুণ শিক্ষকদের দিয়ে ঘােষণা করালেন যে সমস্ত সমর্থকদের দলীয় সিদ্ধান্ত মেনে নিতে হবে। যিনি স্বেচ্ছায় মেনে নেবেন না তাকে দল থেকে বের করে দেয়া হবে।

এই ঘােষণাটা ভয়ানকভাবে কাজ দিল। জ্ঞানবৃদ্ধ প্রফেসরদের আস্ফালন আপনা থেকেই থেমে গেল। এত পানি ঘােলা করার পরে আবু সালেহর দলে গিয়ে যে জুটবেন, সে পথও খােলা নেই। অগত্যা দলীয় সিদ্ধান্তের জন্য চুপ করে অপেক্ষা করা ছাড়া গত্যন্তর রইল না! ডােরাকাটা দলের সমর্থকেরা বৈঠকের পর বৈঠক করে প্যানেলের জন্য দুজন মানুষকে বেছে নিলেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমাজে তাদের মােটামুটি সুনাম আছে। তারা প্রতিপক্ষকে খুন করে নিজেরা মনােনীত হওয়ার উগ্র আকাক্ষা বিশেষ ব্যক্ত করেননি। দুটি নাম তাে পাওয়া গেল। কিন্তু তৃত নামটির বেলায় তারা মস্ত ফাপড়ে পড়ে গেলেন। সমস্ত ডােরাকাটা দলে আর একটিও মানুষ নেই, যাকে মনােনয়ন দিলে দলে বিতর্ক সৃষ্টি হবে না। মিয়া মুহম্মদ জুনায়েদকে মনােনয়ন দিলে কোনাে বিতর্ক হত না, এটা সকলেই জানতেন। কিন্তু তাঁর কথা একটিবারও কারাে মনে আসেনি। তিনি প্রফেসর বটে, বিদেশের নামকরা একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডক্টরেট ডিগ্রিও আছে। ছাত্রী কিংবা সহকর্মী কাউকে নিয়ে লটর ফটর করার অপবাদও কেউ তাকে দিতে পারবেন না। পরীক্ষার খাতা দেখার বেলায় তিনি মােটামুটি নিরপেক্ষতা মেনে চলেন।

গাভী বিত্তান্ত -পর্ব-(২)

ডােরাকাটা দলের সমর্থক হওয়া সত্ত্বেও তার নাম কারাে মনে আসেনি, কারণ তার মতাে গােবেচারা মানুষের নাম উপাচার্যের জন্য বিবেচিত হতে পারে, এটা কেউ স্বপ্নেও চিন্তা করতে পারেননি। এদিকে সময় বয়ে যাচ্ছিল। আজকের রাতটাই সময়।

আগামী কাল সকাল দশটার মধ্যে তিনজন প্রার্থীর প্যানেল ঘােষণা দিতে হবে । তারপর নির্বাচন হবে। তৃতীয় নামটির জন্য দলের মধ্যে আবার উৎকণ্ঠা ঘনীভূত হয়ে উঠল। একজন প্রবীণ শিক্ষক তাে মন্তব্যই করে বসলেন, চলুন ফেরা যাক। এবারেও আবু সালেহর কাছে আমরা হেরে গেলাম । ডােরাকাটা দলের ভাগ্য চিকন সুতােয় ঝুলছিল।

 

Read more

গাভী বিত্তান্ত -পর্ব-(৩)-আহমদ ছফা

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *