এই শেষ মুহূর্তটিতে দিলরুবা খানম আবার ত্রাণকর্তীর বেশে এসে দেখা দিলেন। প্রবীণ শিক্ষক ড. সারােয়ারের মুখ থেকে কথা টেনে নিয়ে বললেন, আমরা আবু সালেহর কাছে হার মানব কেন, আর ফিরেও যাব কেন। দিন এক টুকরাে কাগজ, আমি তৃতীয় প্রার্থীর নাম লিখে দিচ্ছি।
তারপর নিজে ভ্যানিটি ব্যাগের চেন খুলে ডায়েরি বের করে একটা বাতিল খাতা ছিড়ে একটানে মিয়া মুহম্মদ আবু জুনায়েদের নামটা লিখে দিয়েছিলেন। পড়ে ও ওর মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগলেন। দুয়েকজন হাসি চাপতে পারলেন না। ড. সারােয়ার মহা বিরক্ত হয়ে বলে বসলেন, এটা কী করলেন? দিলরুবা খানম চিবিয়ে চিবিয়ে বললেন, এটা হল গিয়ে আপনার তিন নম্বর নাম ! আমাদের তিনটি নামের একটি প্যানেল দেয়ার কথা। সে তিনটি নাম পুরাে হল । আর কোনাে কথা নয়। এখন যে যার ঘরে চলে যেতে পারেন । সকলে এত ক্লান্ত এবং বিরক্ত হয়ে পড়েছিলেন যে আর কথা বাড়ানাে উচিত মনে করলেন না ।।
ডােরাকাটা দল নির্বাচনে জয়লাভ করেছিল। অবশ্য আবু জুনায়েদ কম ভােট পেয়েছিলেন । চ্যান্সেলর আবু জুনায়েদকে উপাচার্য হিসেবে অনুমােদন দিয়েছিলেন, সে খবরটাকে ভিত্তি করেই কাহিনীটি তৈরি হয়েছে। সুতরাং এ নিয়ে আর বাক্য ব্যয়ের প্রয়ােজন নেই।
নুরুন্নাহার বানুর ভাগ্য, নাকি দিলরুবা খানমের হস্তক্ষেপ, নাকি চ্যান্সেলরের অনুমােদন অথবা এসব কিছুর মধ্য দিয়ে সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছের গৃঢ় বিজয় সূচিত হয়েছে বলা অত সহজ নয়। তবে খুব গােপন একটি তথ্য আমাদের হাতে এসেছে। গােয়েন্দা রিপাের্টে জানানাে হয়েছিল, আবু জুনায়েদ সরকারের বিরুদ্ধে কিছু করা দূরে থাকুক, জীবনে সভা-সমিতির ধার দিয়েও যাননি।
গাভী বিত্তান্ত -পর্ব-(৩)
টিশ স্থাপত্যের সুন্দর নিদর্শন উপাচার্য ভবনটিতে নুরুন্নাহার বানু, কলেজগামী কন্যা এবং ছােকড়া চাকরটি নিয়ে উঠে আসার পর মিয়া মুহম্মদ আবু জুনায়েদ পূর্বে চিন্তা করেননি এমন কতিপয় অসুবিধের সম্মুখীন হতে থাকলেন। উপাচার্য ভবনে পা দিয়েই নুরুন্নাহার বানু এমন সব মন্তব্য করতে থাকলেন সেগুলাে আবু জুনায়েদের মতাে গােবেচারা স্বামীর পক্ষেও পরিপাক করা একটু কঠিন হয়ে দাঁড়াল। মিয়া মুহম্মদ আবু জুনায়েদ মনেপ্রাণে নিজেকে বদলে ফেলার চেষ্টা করেছিলেন।
নিজের ওপর আস্থার অভাব ছিল, সেটুকু কাপড়চোপড় দিয়ে চাপা দেয়ার জন্য চেষ্টার ত্রুটি করছেন না। উপাচার্য হিসেবে প্রথম মাসের মাইনেটি পাওয়ার পূর্বেই দু’দুজোড়া স্যুট তিনি শহরের সেরা টেইলারিং হাউস থেকে আর্জেন্ট অর্ডার দিয়ে বানিয়ে নিয়েছেন। এক ডজন নানা রঙের টাই সংগ্রহ করেছেন । আৰু জুনায়েদ মাঝে-মধ্যে ধূমপান করেন। কিন্তু শুনেছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজ উপাচার্য লরেন্স সাহেব সব সময় পাইপ টানতেন। পাইপ মুখে থাকলে লরেন্স সাহেবের মুখমণ্ডল ভেদ করে আশ্চর্য একটা ব্যক্তিত্বের প্রভা বিকীরিত হত।
তিনি সামনের দেয়ালে উপাচার্যের প্রতিকৃতিসমূহের মধ্য থেকে পাইপ মুখে দণ্ডায়মান লরেন্স সাহেবের সঙ্গে মনে মনে নিজের তুলনা করছিলেন । টানতে পারবেন কি না বলতে পারবেন না তথাপি তিনটি পাইপ এবং টোবাকোও তিনি কিনে ফেলেছেন। ঘােড়ার রেস খেলার জকিদের পােশাক থাকে, ফুটবল ক্রিকেট খেলােয়াড়েরাও নিজেদের পােশাক পড়ে।
এমনকি মসজিদের ইমামের ও একটা বিশেষ পােশাক আছে, যা পড়লে চেনা যায় ইনি একজন ইমাম সাহেব, কোর্টের উকিল জজদের তাে কথা নেই। সুতরাং উপাচার্যের নিজের একটা পােশাক থাকবে না কেন? বিশ্ববিদ্যালয় বিধিমালায় না থাকুক তিনি নিজেকে বিশেষ পােশাকে মডেল উপাচার্য হিসেবে হাজির করবেন ।
গাভী বিত্তান্ত -পর্ব-(৩)
আবু জুনায়েদের মধ্যে যে দ্রুত পরিবর্তন ঘটে চলছিল এই প্রক্রিয়াটিতে নুরুন্নাহার বানু একটা মূর্তিমান বাধা হয়ে দেখা দিলেন । আৰু জুনায়েদ দুরকম সঙ্কটের মধ্যে পড়ে গেলেন। দিলরুবা খানম যদি হস্তক্ষেপ না করতেন, চেষ্টা চরিত্র করে হয়ত মাতৃগর্ভে প্রবেশ করতে পারতেন। কিন্তু উপাচার্য হওয়া তার পক্ষে সম্ভব হত না। দিলরুবা খানম এই মেন্দা মারা মানুষটির সাজ পােশাকের বহর দেখে সকলের কাছে তাকে দরজির দোকানের ডামি বলে বেড়াতে আরম্ভ করেছেন। এই মহিলা যিনি বলতে গেলে একবারে অবজ্ঞেয় অবস্থা থেকে তাঁকে উপাচার্যের চেয়ারটিতে হাতে ধরে বসিয়ে দিয়েছেন, তার মতামতের নিশ্চয়ই মূল্য আছে।
এদিকে নুরুন্নাহার বানু ভিন্ন রকম উৎপাত শুরু করে দিয়েছেন। উপাচার্য ভবনে পা দেয়া মাত্রই এমন সব কাজ করতে লাগলেন এবং এমন সব মন্তব্য ছুড়তে থাকলেন, পদে পদে আবু জুনায়েদকে নাকাল হতে হচ্ছিল। সকাল বেলা উপাচার্য ভবনে প্রবেশ করেছেন, সেই বিকেলেই ড্রয়িং রুমে কয়েকজন জুনিয়র শিক্ষককে নিয়ে চা খেতে বসেছেন। এই সময়টিতে একজন জুনিয়র শিক্ষককে ডেকে মন্তব্য করে বসলেন, আচ্ছা ওই বাড়িটার ছাদ অত উঁচু করা কি ঠিক হয়েছে? আর দেয়ালগুলােও অত পুরাে কেন? অনর্থক অনেক টাকার বাজে খরচ করা হয়েছে ।
অনায়াসে দোতলা বানানাে যেত। দেখুন না দেয়ালগুলাে কী রকম পুরু । একটু কম পুরু করে বানালে তিনটা বাড়ি বানানাে যেত। একজন মাঝবয়েসী শিক্ষক নুরুন্নাহার বানুকে বুঝিয়ে দিতে চেষ্টা করলেন, বেগম সাহেবা এটা এক ধরনের বাড়ির নির্মাণ পদ্ধতি। এটাকে গথিক বলা হয়। এই ধরনের বাড়িগুলাে এরকমই হয়ে থাকে । নুরুন্নাহার বানু মনে করলেন, শিক্ষকটি সকলের সামনে তাঁকে হেয় করার জন্য গথিক ধাচের কথা বলেছেন। তিনি মনে করলেন, এটা এক ধরনের অপমান।
গাভী বিত্তান্ত -পর্ব-(৩)
তিনি জবাব দিলেন, আপনি কি মনে করেন, আমি দালান কোঠার কিছুই বুঝিনে, আমার আব্বা সারা জীবন ঠিকাদারি করেছেন, এখনাে আমার ভাই সি, এ্যান্ডবি, হাউজিং কর্পোরেশন এবং রােডস এ্যান্ড হাইওয়েজের ফার্স্ট ক্লাস কন্ট্রাক্টর। আমাকে আপনার বাড়ি চেনাতে হবে না। জবাব শুনে সকলকে চুপ করে যেতে হল। তারপরে কথার গতি কোনদিকে যেত বলা যায় না । চারজন ভীন গৃহপ্রবেশ উপলক্ষে তাঁকে ফুলের তােড়া দিয়ে অভিনন্দন জানাতে এলেন।
উনারা সকলে ডােরাকাটা দলের সমর্থক। আগে যদি তাদের জানা থাকত আৰু জুনায়েদ মিয়া তাঁদের কাধের ওপর পা রেখে উপাচার্য হয়ে বসবেন এবং তাঁদের ফুলের তােড়া দিয়ে তাঁকে অভিনন্দন জানাতে হবে, তাহলে কাঁচা বাজারের থেকে ফেরার পথে তাকে খুন করে লাশ গুম করে ফেলতে ইতস্তত করতেন না । যা হােক, প্রবীণ শিক্ষকদের আগমনে পরিবেশ আবার হাল্কা হয়ে এল।
সন্ধ্যেবেলা বেয়ারারা সবগুলাে কক্ষের আলাে জ্বালিয়ে দিয়েছে। পয়লা নুরুন্নাহার ভাবলেন, অত আলাের কী দরকার । বেহুদা মােটা বিল আসবে। নিজ হাতে নিভিয়ে দিতে গিয়ে থেমে গেলেন । জুলুক বাতি জুলুক। তাদের তাে আর বিল দিতে হবে না। বাতি জ্বালাবার পর তার চোখে একটা নতুন জিনিস ধরা পড়ল ।
উপাচার্য ভবনের রুমগুলাে সত্যি প্রকাণ্ড। আবু জুনায়েদের ঘাড়ে ঠেলা দিয়ে বললেন, দেখেছ কত বড় একেকটা রুম। ফুটবল নিয়ে এসাে। সারা দিন ঘরের মধ্যে ফুটবল খেলবে। টুটুল তাদের নাতি। কথাটা নুরুন্নাহারের মনে ভীষণ ধরে গেল । স্বামী-স্ত্রী দুজন ঠিক করলেন, রেবাকে তার বর এবং টুটুলসহ এসে কিছুদিন থেকে যাওয়ার জন্য খবর দেয়া হবে। প্রস্তাবটি শুনে নুরুন্নাহার বানু উৎফুল্ল হয়ে উঠলেন। এতদিনে তার প্রাণপ্রিয় নাতিটির হেসে খেলে বেড়াবার একটা ব্যবস্থা হল ।
গাভী বিত্তান্ত -পর্ব-(৩)
তারপর আবু জুনায়েদ এবং নুরুন্নাহার বেডরুমে গিয়ে ঢুকলেন । মেহগনি কাঠের কারুকার্য করা খাট দেখে নুরুন্নাহার রানুর খুশিতে একেবারে ফেটে পড়ার অবস্থা। দেখেছ দেখেছ কত বড় খাট, আর কী সুন্দর! তারপর গলায় একটা কৃত্রিম বিষন্নতা সৃষ্টি করে বললেন, কিন্তু মুশকিলের কথা হল কী জানাে, এই এতবড় খাটে ঘুমালে আমি অন্ধকারে তােমাকে খুঁজে বের করতে পারব না। নুরুন্নাহার বানুর জবাব দিতে গিয়ে আৰু জুনায়েদ একটা বেফাঁস কথা বলে ফেললেন।
খুঁজে পেয়েও লাভ কী? তােমার কী আছে? কথাটি মুখ থেকে কেমন করে বেরিয়ে এল জুনায়েদ টেরও পাননি। নুরুন্নাহার বনু সাপিনীর মতাে উদ্যত ফণা তুলে চিৎকার করে জিজ্ঞেস করলেন, কী বললে তুমি?
আবু জুনায়েদ বুঝতে পারলেন, ভারি অন্যায় করেছেন। এখন বুঝিয়ে ঠাণ্ডা করতে গেলে হিতে বিপরীত হবে। তিনি তাড়াতাড়ি বেডরুম থেকে বেরিয়ে ড্রয়িং রুমে চলে এলেন এবং বেয়ারাকে বললেন, ড্রাইভারকে গাড়ি বের করতে বলাে।
ড্রাইভার গাড়ি বের করলে আপাতত তিনি পালিয়ে বাঁচলেন।
নুরুন্নাহার বানু কিছুক্ষণ স্থানুর মতাে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন । এই প্রথম অনুভব করলেন আবু জুনায়েদের জিহ্বায় অতি অল্প সময়ে শান পড়তে আরম্ভ করেছে। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আয়নার দিকে তাকালেন। নিজের ছবি দেখে ঘুষি মেরে আয়নাটা ভেঙে ফেলার ইচ্ছে হচ্ছিল। এই সময়ে ড্রয়িং রুমে টেলিফোনটা বেজে যাচ্ছিল । তাড়াতাড়ি নুরুন্নাহার বানু টেলিফোনটা ধরে জিজ্ঞেস করলেন :
হ্যালাে কে কথা বলছেন? ওপার থেকে নারীকণ্ঠের আওয়াজ ভেসে এল, ভি , সি , স্যার আছেন?
গাভী বিত্তান্ত -পর্ব-(৩)
, নেই, খুব ভারী এবং গম্ভীর কণ্ঠে জবাব দিলেন নুরুন্নাহার বানু। কবে পাওয়া যাবে? কেন আপনার কী দরকার?
আমি তার ডিপার্টমেন্টের একজন কলিগ, একটু কথা ছিল। ওপার থেকে জবাব এল।
কী নাম আপনার? আমার নাম দিলরুবা খানম। নামটি শােনামাত্র নুরুন্নাহার বানু টেলিফোনে চিৎকার করে উঠলেন :
আমার স্বামীর সঙ্গে, আপনি রাতের বেলা কী কথা বলতে চান? শুনুন দিলরুবা খানম, আপনাকে আমি চিনি। ঘাড় মটকানাের মতাে অনেক যুবক পুরুষ এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে, তাদের কারাে একজনের ঘাড়ে বসুন, আমার
সংসারটির এমন সর্বনাশ করবেন না । আর কথা নয়। টেলিফোন রাখলাম।
উপাচার্য ভবনের প্রথম রাতটি আৰু জুনায়েদের জন্য ছিল অগ্নি পরীক্ষার রাত । রাত দশটার দিকে বাইরে থেকে ফিরে এসে দেখেন ঢাকা দেয়া ভাত তরকারি পড়ে আছে। নুরুন্নাহার বানু ছুঁয়েও দেখেননি । আৰু জুনায়েদের বুকটা কেঁপে গেল । সরাসরি বেডরুমে প্রবেশ করতে সাহস হল না । তিনি বাঁ দিকে বাঁক ঘুরে মেয়ের ঘরে গেলেন।
জিজ্ঞেস করলেন, তুমি খেয়েছ দীলু? হ্যা বাবা কবে। মেয়ে জবাব দিল । তােমার মা খায়নি কেন বলতে পারাে, অসুখ-বিসুখ করেনি তাে? আব্বা মেজাজ খারাপ করাটাই মার স্বভাব । কী হয়েছে আমি বলতে পারব না । এসব তােমাদের ব্যাপার, তােমরা দেখাবে। আমাকে টানতে চেষ্টা করছ কেন? আমার ভীষণ ঘুম পাচ্ছে, আমি এখন ঘুমােব ।
গাভী বিত্তান্ত -পর্ব-(৩)
অগত্যা আবু জুনায়েদকে বেডরুমে প্রবেশ করতে হল । দেখেন নুরুন্নাহার বানু মেহগনি কাঠের অপূর্ব কারুকার্যময় খাটে বাঁকা হয়ে শুয়ে আছেন। তিনি কপালে হাত দিলেন। জ্বরজ্বারি কিছু নয়। অসুখটা অন্য জায়গায়। তিনি আস্তে আস্তে নুরুন্নাহার বানুর শরীরে হাত বুলিয়ে ডাকতে লাগলেন : | এই ওঠো খাবার পড়ে আছে।
অনেক রাত এখন। সারা দিন তো কম ধকল যায়নি। নুরুন্নাহার বানু কোনাে সাড়াশব্দ করলেন না। যেমন ছিলেন তেমনি শুয়ে রইলেন। আবু জুনায়েদ আরাে একটু জোরে ঠেলা দিয়ে তাকে জাগিয়ে তােলার জন্য ডাকাডাকি করতে থাকলেন । নুরুন্নাহার বানু এবার হাউমাউ করে কেঁদে বিছানার ওপর উঠে বসলেন। তারপর চিৎকার করে বলতে লাগলেন :
আমার আব্বা তােমাকে পড়ার খরচ না যােগালে আজ তুমি কোথায় থাকতে? আব্বা নিজের কাড়ি কাড়ি টাকা খরচ করে ওরকম একজন ছােটলােকের কাছে তােমার আদরের মেয়েকে তুলে দেয়ার বদলে তাকে খুন করে ফেললে না কেন? তােমার কাছে হাত পাতা মেনি বেড়ালটির সাহস কতদূর বেড়েছে আর ঘাড় কতটা মােটা হয়েছে তুমি নিজের চোখে দেখে যাও । আজ সে আমাকে নিয়ে ঠাট্টা বিদ্রুপ করে বেড়ায়। রাতের বেলা গাড়ি করে তার মেয়ে মানুষদের নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। আব্বা তােমার ছােট মেয়ের কপালে আল্লাহ কী দুঃখ লিখেছে দেখে যাও ।
আৰু জুনায়েদ তার মুখে হাতচাপা দিয়ে বললেন : একটু ঠাণ্ডা হও, এসব আবােল-তাবােল কী বলছ? নুরুন্নাহার বানু হাতটা মুখ থেকে সরিয়ে দিয়ে আরাে জোরে চিৎকার করে বললেন :
আমি ঠাণ্ডা হলে তােমার খুব আনন্দ হয়, না? আমি হাটে হাঁড়ি ভেঙে দেব । আমার আম্মাকে, ভাইকে ডাকব। তমার মেয়ে জামাই সবাইকে খবর দিয়ে এনে সকলের সামনে প্রমাণ করব, রাতের বেলা তুমি এই কবি দিলরুবার সঙ্গে কোথায় কোথায় মজা করতে যাও। ঘরে মেয়ে আছে, মাগীর সে কথাটাও মাথায় আসেনি। টেলিফোন করে বলবে স্যারকে চাই ।
গাভী বিত্তান্ত -পর্ব-(৩)
আৰু জুনায়েদ নুরুন্নাহার বানুর মাথায় হাত বুলােত বুলাতে বললেন, দেখাে এসব কথা তুমি মন থেকে বানিয়ে বানিয়ে বলছ, আমি গাড়ি করে তােমার ভায়ের বাড়িতে গিয়েছিলাম ! তুমি টেলিফোন করে দেখাে।
ধার্মিক সাজার চেষ্টা করবে না। তােমাকে আমি হাড়ে হাড়ে চিনেছি। কতদিন থেকে ওই কসবির সঙ্গে তােমার লীলা চলছে?
কার কথা বলছ, আমি কোনাে মহিলাকে চিনি না, কারাে সঙ্গে আমার কোনাে রকমের সম্পর্ক নেই।
এবার নুরুন্নাহার বানু আৰু জুনায়েদের চোখে চোখ রেখে বললেন, তুমি বলতে চাও, তােমার সঙ্গে দিলরুবা খানমের গােপন পীরিত নেই?
-ছি ছি কী বলছ তুমি? চুপ করাে। দারােয়ান বেয়ারা শুনলে কী বলবে? নুরুন্নাহার বানু কণ্ঠস্বর আরাে বাড়িয়ে বললেন, আমি সকলকে ডেকে শােনাব। ওই মাগী দিলরুবা টেলিফোনে আঁকুপাঁকু করে বলে কেন, স্যারকে চাই? এই রাতে স্যারকে কেন চাই? নুরুন্নাহার মুখের একটা ভঙ্গি করলেন ।
আবু জুনায়েদ এবার উপলব্ধি করতে পারলেন, তার দুর্ভোগের এই সবে শুরু। নুরুন্নাহার বানু কাটা কলাগাছের মতো ধপ করে বিছানায় পড়ে হাপুস হুপুস করে কাঁদতে লাগলেন । তাঁদের চিৎকার সহ্য করতে না পেরে পাশের ঘর থেকে মেয়েটি বেরিয়ে এসে বলল :
গাভী বিত্তান্ত -পর্ব-(৩)
আব্বা আম্মা আধারাতে তােমরা এসব কী শুরু করে দিয়েছ? সব কথা সব লােক শুনছে । কাল থেকে পাড়ায় মুখ দেখাবার উপায় থাকবে না । সে বাতি নিভিয়ে নিয়ে নিজের ঘরে চলে গেল।
পরের দিন ভাের হওয়ার অনেক আগেই নুরুন্নাহার বানুর ঘুম ভেঙে গেল । আসলে সারা রাত তিনি দু চোখ এক করতে পারেননি। তার বুকের ভেতরটা জ্বলেছে । এবার থেকে তাঁর পরাজয়ের পালা শুরু হল। তাঁর স্বামীর পদোন্নতি হওয়ার সংবাদ শােনার পর থেকে সকলের কাছে বলে বেড়াচ্ছিলেন, তার ভাগ্যেই আবু জুনায়েদের জীবনের মােড় ঘুরে গেছে । সে কথা মনে হওয়ায় এখন নিজেকে ধিক্কার দিতে ইচ্ছে করল।
মােল্লা আজান দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনি বিছানা থেকে উঠে পড়লেন। আবু জুনায়েদ বাম কাত হয়ে শুয়ে আছেন। তার নাক ডাকছে। নুরুন্নাহার বানু মনে করতে থাকলেন ওই মানুষটাই তার সারা জীবনের সমস্ত দুর্ভাগ্যের কারণ। মশারির বাইরে এসে স্পঞ্জে পা ঢুকিয়ে দাঁড়াতে গিয়ে অনুভব করলেন, তিনি ভীষণ ক্ষুধার্ত। তক্ষুনি তার মনে পড়ে গেল গত রাতে তিনি কিছু মুখে তােলেননি। ডাইনিং রুমে এসে দেখেন গত রাতের ঢাকা দেয়া খাবার তেমনি পড়ে আছে।
Read more
