গাভী বিত্তান্ত -পর্ব-(৮)-আহমদ ছফা

গাভী বিত্তান্ত

নুরুন্নাহার বানু মনে করলেন, তবারক চাচার কাছে আবু জুনায়েদের হয়ে কিছু সাফাই গাওয়া উচিত। তাই তিনি বললেন : ছেড়ে দেন চাচা আপনাদের জামাইর কথা। এরকম ভােলামনের মানুষ দ্বিতীয়টি আমি চোখে দেখিনি। কাজে-কর্মে এত ব্যস্ত থাকেন যে কোনাে কোনাে 

সময়ে এক পায়ে মােজা পরে অফিসে চলে যান। থাকুক আপনাদের জামাইর কথা। আপনি এক্ষুনি চলে আসুন। আমি আপনাকে নিজের হাতে রান্না করে খাওয়াব। এই আমি রান্নাঘরে গেলাম। নুরুন্নাহার মনে করলেন, এই একটা চমৎকার সুযােগ । তবারক চাচা এলে এই বিশাল প্রাসাদের সবগুলাে ঘর ঘুরে ঘুরে দেখাবেন।

কত ধরনের চীনামাটির সুন্দর সুন্দর বাসনপত্র, ছুরি, কাঁটাচামচ, ডিনার সেট, কফি সেট সব দেখিয়ে অবাক করে দেবেন। তৈজসপত্র সব দেখানাে হয়ে গেলে তিনি তাঁকে ঘুরিয়ে গােটা বাড়ির কম্পাউন্ড দেখাবেন। সামনের ফুল বাগান, পেছনের তরকারি বাগান, চার পাশের ডালপালা প্রসারিত শিশু গাছের সারি সব দেখলে তবারক চাচার চোখে ধাধা লেগে যাবে। পােশাক পরা চাপরাশি, মালি, আয়া, খিদমতগার সব যখন নিজের চোখে দেখবেন, চাচা ঠিকই মনে করবেন নুরুন্নাহারটি রাণীর ভাগ্য নিয়ে জন্মেছিল। 

নিজের সৌভাগ্য এবং ঐশ্বর্যের কথা অপরকে জানাতে এত সুখ, এত আনন্দ এতদিন একথা নুরুন্নাহারের মনে যে উদয় হয়নি একথা ঠিক নয়। বিশ্ববিদ্যালয় কোয়ার্টার্সের শিক্ষকদের স্ত্রীদের নিমন্ত্রণ করার কথা চিন্তা করছিলেন। এ সমস্ত ফুটানিমারা মহিলারা এসে খাবেন এবং খেতে খেতে তাঁকে উদ্দেশ্য করে বাঁকা তেরছা মন্তব্য করবেন, শুনলে নুরুন্নাহার বানুর মাথায় রক্ত চড়ে যাবে, সে আশঙ্কায় তিনি তাদের খাওয়ার নিমন্ত্রণ করে পয়সা খরচ করার পরিকল্পনাটি বাতিল করেছেন।

গাভী বিত্তান্ত -পর্ব-(৮)

তার ভাই এবং ভ্রাতৃবধূদের দেখানাের ইচ্ছেও মাঠে মারা গেছে। মিয়া মুহম্মদ আবু জুনায়েদ উপাচার্য হওয়ার পর দু’তিনবার তারা আসা-যাওয়া করেছেন। ভাইয়ের বউদের সঙ্গে নুরুন্নাহার বানুর একটা অঘােষিত বিবাদ রয়েছে ।

ভাই দুজন আব্বাজান এন্তেকাল করার পর ঠিকাদারী করে অঢেল পয়সার মালিক হয়েছেন । তাদের বাড়ি আছে, গাড়ি আছে। বউরাও এসেছেন বাড়িঅলা, গাড়িঅলা পরিবার থেকে। মাপা মাইনের সংসারে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্ল্যাট বাড়িতে নানা উপলক্ষে যখনই এসেছেন তার সংসারে এটা নেই, ওটা নেই একথা প্রচ্ছন্নভাবে নুরুন্নাহার বানুকে জানিয়ে দিয়েছেন। দীর্ঘদিন থেকে তিনি ভ্রাতৃবধূদের খোঁচাগুলাে সহ্য করে আসছেন। আবু জুনায়েদ উপাচার্য হওয়ার পর ভাই ভ্রাতৃবধূদের, তাদের ছেলেমেয়েসহ খাওয়ার নিমন্ত্রণ করে এনেছেন। নুরুন্নাহারের ইচ্ছে ছিল ভ্রাতৃবধূদের সঙ্গে এই বাড়িটির পরিচয় করিয়ে দেবেন। বলবেন এই রকম বাড়ি সারা বাংলাদেশে এই একটাই আছে।

এ ধরনের বাড়িকে গথিক বাড়ি বলা হয় । চীনামাটির বাসন পেয়ালা যেগুলােতে খাবার পরিবেশন করা হয়েছে এগুলাে কেনা হয়েছিল সাহেব উপাচার্যের আমলে। বিলেতের প্রধানমন্ত্রী ডিনার এবং লাঞ্চ খাওয়ার সময় এ ধরনের বাসন পেয়ালা এখনাে ব্যবহার করেন। 

নুরুন্নাহার বানু তার কথা বলার কোনাে সুযােগ করে উঠতে পারলেন না। বড় ভাইয়ের বউ খাওয়ার সময় ভিসিপিতে সদ্য দেখা অমিতাভ বচ্চন এবং মাধুরী দীক্ষিতের একটা ছবি নিয়ে বকবক করতে লাগলেন। নুরুন্নাহার বানু মতলব করেছিলেন খাওয়া-দাওয়া শেষ হওয়ার পর পুরুষ মানুষেরা যখন আলাদা হয়ে পড়বেন, পান চিবুতে চিবুতে তার সৌভাগ্য সম্পদের কথা ভ্রাতৃবধূদের সামনে সবিস্তারে তুলে ধরবেন।

গাভী বিত্তান্ত -পর্ব-(৮)

কিন্তু খাওয়া শেষ হওয়ার পর পান মুখে দেয়ার আগেই ছােট ভাইয়ের আহলাদী বউটি আমেরিকার লসএঞ্জেলস শহরে তার ভাইয়ের মেম বিয়ে করার কাহিনী নিয়ে মেতে উঠলেন। আমেরিকা থেকে বিয়ের যে ভিডিও ছবিটি পাঠিয়েছেন তার পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা করতে থাকলেন।

ভায়ের গাড়ি, ভায়ের বাড়ি, কুকুর, বাগান, বউয়ের শুভ বিয়ের গাউন, নীল সুন্দর আয়ত নয়ন এবং লসএঞ্জেলস শহরের আকাশ ঠেকা অট্টালিকার সারি, বিরাট বিরাট গাড়ির মিছিল, শীতের তুষারপাত এসবের এমন জমকালাে বর্ণনা দিতে থাকলেন, স্বয়ং নুরুন্নাহার বানুও মুগ্ধ হয়ে কাহিনীটা না শুনে পারলেন না। তারপরেও একটা ক্ষীণ আশা ছিল, শান শওকতের কথা না হােক অন্তত এই বাড়ির একটা ঐতিহ্য আছে সেটা বুঝিয়ে দেবেন ।

বিয়ের গল্প শেষ হওয়ার পর বড় ভাইয়ের বােনের মেয়েটি মা এবং চাচির সঙ্গে ষড়যন্ত্রে যােগ দিয়ে বসল। বাড়ি ফিরে যাওয়ার জন্য এমন চিৎকার এবং কান্না জুড়ে দিল যে ভাই এবং ভ্রাতৃবধূরা বাড়ি ফিরে যেতে বাধ্য হলেন। নুরুন্নাহার বানু ভাই, ভ্রাতৃবধূদের গেট পর্যন্ত এগিয়ে দিতে এলেন। তাঁদের গাড়ি রাস্তা দিয়ে এঁকেবেঁকে চলে গেলে তিনি অনুভব করলেন, ভ্রাতৃবধূরা তাকে একটা মস্তরকম দাগা দিয়ে গেলেন। 

নুরুন্নাহার বানু একজন মনের মতাে মানুষের সন্ধান করছিলেন, যার কাছে হৃদয় বেদনার কথা প্রকাশ করে মনের ভার লাঘব করবেন । সুখ, ঐশ্বর্য, আড়ম্বর এসবের কথা কাউকে বলতে না পারা, তার বেদনা কী অল্প! আমি স্বর্গে যেয়ে আরাম-আয়েশ ভােগ করে লাভ কী, যদি আমার প্রতিবেশী সেগুলাের প্রতি ঈর্ষাতুর দৃষ্টিপাত না করে। সুতরাং নুরুন্নাহার বানু মনে মনে একজন মানুষের সন্ধান করছিলেন। তবারক চাচা নিঃসন্দেহে নুরুন্নাহার বানুর সেই মনের মানুষটি হবেন ছােটবেলায় পাকা কুল খাওয়ার আর ধরে তাঁকে কুল গাছে চড়তে বাধ্য করেছেন।

গাভী বিত্তান্ত -পর্ব-(৮)

একবার পেয়ারা গাছে চড়তে গিয়ে ভাল ভেঙে পা মচকে গিয়েছিল। পছন্দমতাে ফ্রক, সালােয়ার, কামিজ চাইতে গিয়ে আব্বা-আম্মার কাছে ধমক খেয়ে যখনই তবারক চাচাকে ধরেছেন, তিনি তাকে পছন্দসই জামা কাপড় কিনে দিয়েছেন। এরকম কত কাহিনী তাঁর মনে পড়ে গেল। তিনি শেখ তবারক আলীকে টেলিফোনে জিজ্ঞেস করলেন : 

-চাচা আমি আপনার জন্য অপেক্ষা করে আছি। আপনার কতক্ষণ লাগবে? 

-বানু, বেটি আমার, এত উতলা হওয়ার কী আছে? আমি তাে সর্বক্ষণ তােমার বাড়ির পাশেই থাকি । যে কোনােদিন যাওয়া যাবে। 

-তাহলে চাচা আপনি আজ আসবেন না? নুরুন্নাহার বানুর উৎসাহ-উদ্দীপনা দপ করে নিভে গেল। তিনি দাড়িয়ে ছিলেন, বসে পড়লেন। মনে হল টেলিফোনের রিসিভারটা ছুড়ে দেবেন। ও প্রান্ত থেকে শেখ তবারকের কণ্ঠ ভেসে এল : 

-বানু, মা আমি কি জন্য টেলিফোন করেছি সে কথাটি আগে শুনে নাও। ক্ষুন্নকণ্ঠে নুরুন্নাহার বানু বললেন : -বলুন।। 

-আগামী শুক্রবার আমার ছােট ছেলের বাচ্চার আকিকার তারিখ । ঐদিন রাত আর্টটায় তুমি, তােমার মেয়ে এবং জামাই মিয়াসহ আমার বাড়িতে এসে দুটো দানাপানি গ্রহণ করবে। না এলে তােমার বুড়াে চাচার মনে খুব কষ্ট হবে। জামাই মিয়াকে বলতাম, ভাবলাম মেয়ে থাকতে আবার জামাই কেন। মেয়ে ছিল বলেই 

তাে জামাই পেয়েছি। আসবে তাে? 

-নুরুন্নাহার বানু বললেন : 

-চাচা কেমন করে যাব, আপনার বাড়ি তাে আমরা কেউ চিনি না। আর আপনার জামাইয়ের নানা মিটিং থাকে। এখানে সেখানে সভা-সমিতিতে যেতে হয়। সময় আছে কি না আমি তাে বলতে পারব না। 

গাভী বিত্তান্ত -পর্ব-(৮)

-বানু, একজন উপাচার্যকে কত ব্যস্ত থাকতে হয়, তা কি আমি জানিনে। কিন্তু আমি ভালাে করে খবর নিয়েছি ঐদিন জামাই মিয়া মােটামুটি ফ্রি আছেন। আর আমার বাড়ি চেনার জন্য তােমাকে ভাবতে হবে না । আমি লােক পাঠিয়ে নিয়ে আসব । 

-দেখি চাচা আপনার জামাইয়ের সঙ্গে আলাপ করে দেখি। -জামাইয়ের কাজ থাকে আসবেন না। তুমি আসতে চাও কি না বলাে। -কী যে বলেন চাচা, আমার ইচ্ছে হচ্ছে এক্ষুনি চলে যাই। 

-কোনাে ভাবনা নেই বেটি, আজ বুধবার, পরশু শুক্রবার। মাঝখানে বৃহস্পতিবার একটি দিন। পরশু তাে তােমাদের সঙ্গে আমাদের দেখা হচ্ছেই। 

শেখ তবারক আলীর বাড়িতে আকিকার নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে যাবেন কি না একটু দ্বিধার মধ্যে পড়ে গিয়েছিলেন আবু জুনায়েদ। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ঠিকাদারের বাড়িতে নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে যাবেন, একথা নিশ্চয়ই জানাজানি হবে।

এখানে কোন কথাটি গােপন থাকে? আবু জুনায়েদ মিয়ার অজানা নেই, অবশ্যই পাঁচজনে পাঁচ কথা বলবে। অতীতে ঠিকাদারদের সঙ্গে উপাচার্যের সম্পর্ক নিয়ে অনেক কেলেঙ্কারি হয়েছে। আবু জুনায়েদ সেসব জানেন না তা নয়। তথাপি তাঁকে মত দিতে হল।

নুরুন্নাহার বানু জেদ করলেও তিনি রাজি হতেন না। নুরুন্নাহার বানুর প্রভাব খাটাবার কতটুকু অধিকার তার সীমারেখাটি আকারে ইঙ্গিতে ভালাে করে বুঝিয়ে দিয়েছেন। আসল কথা হল শেখ তবারক আলী মানুষটিকে তার পছন্দ হয়েছে। এজন্যেই তিনি যাবেন বলে কথা দিলেন। 

শুক্রবার দিন আবু জুনায়েদ, নুরুন্নাহার বানু এবং তাদের কন্যা দীলু সেজেগুজে অপেক্ষা করছিলেন। নুরুন্নাহার বানুর মনে একটুখানি অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছিল ইদানীং তার মনে একটা কুসংস্কার জন্মেছে। নির্বিঘ্নে তার কোনাে কাজ সমাধা হয় । কোথা থেকে না কোথা থেকে একটা বাধা এসে হাজির হয়। তার শরীরে অল্প অল্প ঘাম দিচ্ছিল। 

গাভী বিত্তান্ত -পর্ব-(৮)

ঠিক আটটা বাজতেই খবর দেয়া হল তাদের নিয়ে যাওয়ার জন্য গাড়ি এসে হাজির। নুরুন্নাহার বানুর মনে অন্যরকম একটা পরিকল্পনা ছিল। উপাচর্যের গাড়িটি নিয়ে যেতে পারলে বেশ হত। তবারক চাচাকে দেখানাে যেত, তারা এখন কত বড় গাড়িতে চলাফেরা করেন। নিচে নেমে নুরুন্নাহার বানুর ভিমরি খাওয়ার যােগাড়।

বাড়ির সামনে একেবারে চকচকে নতুন একটি পাজেরাে গাড়ি তাদের জন্য অপেক্ষা করছে। নুরুন্নাহার বানু ভাবলেন নিশ্চয়ই তবারক চাচার অনেক টাকা হয়েছে। গাড়িটি যে ভদ্রলােক চালিয়ে নিয়ে এসেছেন, তাকেও পেশাদার ড্রাইভার মনে হল 

। উনারা কাছাকাছি আসতেই ভদ্রলােক গাড়ি থেকে নেমে সালাম দিলেন । দীর্ঘদিন পশ্চিম দেশে থাকলে বাংলা উচ্চারণের মধ্যে যে ধাতবতা পরিলক্ষিত হয়, ভদ্রলােকের কথাবার্তার মধ্যে তেমনি একটি আভাস পাওয়া গেল। এই সুদর্শন তরুণটিকে দেখে নুরুন্নাহার বানুর একটা কৌতুহল জেগে গিয়েছিল। তিনি জিজ্ঞেস করলেন : 

–আপনি তবারক চাচার কে হন? 

ভদ্রলােক একটুখানি ঢােক গিলে বললেন : -জ্বী উনি আমার শ্বশুর। নুরুন্নাহার বানু ফের জানতে চাইলেন : 

-আপনি কি আমেরিকা থাকেন? আমেরিকা দেশটির প্রতি তার ভারি আকর্ষণ। ছােট ভাইয়ের বউয়ের ভাই আমেরিকার লসএঞ্জেলস শহরে থাকে। তাদের ফ্ল্যাটের ওপর তলার কুদসিয়া বেগমের স্বামী সম্প্রতি আমেরিকা থেকে গাড়ি, ফ্রিজ, ভিসিপি,ওয়াশিং মেশিন কত কিছু নিয়ে ফিরেছেন।

নুরুন্নাহার বানুর কপালে বিদেশ দেখার সুযােগ নেই। যাক আবু জুনায়েদের সঙ্গে বিয়েটা যদি ভক্টরেট করার আগে হত, অন্তত বিলেত দেশটা দর্শন করা থেকে তিনি বঞ্চিত হতেন না। এখন বিদেশের কথা উঠলেই চাপা দীর্ঘনিশ্বাস বুকের ভেতর জমিয়ে রাখেন। যা হােক, 

ভদ্রলােক জবাব দিলেন : 

-এখন চলে এসেছি, চার বছর ছিলাম এবার কথােপকথনে আৰু জুনায়েদ যােগ দিলেন। 

-আমেরিকার কোন শহরে ছিলেন? –এখানে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে মাস্টার্স শেষ করেছিলাম। ওখানে বিজনেস ম্যানেজমেন্টে লেখাপড়া করেছি। 

গাভী বিত্তান্ত -পর্ব-(৮)

গাড়ি নিউমার্কেট ছাড়িয়ে গেছে । হঠাৎ আবু জুনায়েদের খেয়াল হল, তবারক সাহেবের জামাতার নামটা জিজ্ঞেস করা প্রয়ােজন ।। 

-ভাই তােমার নামটা জানা হয়নি। তুমি বললাম, রাগ করলে? 

অল্প বয়সের কারাে সঙ্গে আলাপ হলে আপনা-আপনি তুমি বেরিয়ে আসে, মাস্টারি করার এটাই দোষ। 

-স্যার, তুমিই তাে বলবেন। এক সময়ে আমি আপনার ডিপার্টমেন্টে ভর্তি হয়েছিলাম। বেশ কিছুদিন ক্লাস করেছি। পরে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে চান্স পেয়ে চলে গেছি। আমার নাম আবেদ হােসেন। 

-আচ্ছা আবেদ তােমার সঙ্গে তবারক সাহেবের মেয়ের বিয়ে হয়েছে কতদিন? -সে অনেক আগে। সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে আমরা ক্লাসফ্রেন্ড ছিলাম । -তােমার স্ত্রীও ইঞ্জিনিয়ার? -হা স্যার ইঞ্জিনিয়ার, বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টারি করে। 

আবু জুনায়েদ মনে মনে হিসেব মেলাতে চেষ্টা করেন। তিনি তবারক আলীকে শিক্ষা-সংস্কৃতি হীন সাধারণ একজন ঠিকাদার ধরে নিয়েছিলেন। পাজেরাে গাড়ি, মার্কিন দেশ ফেরত জামাতা এবং ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের শিক্ষক কন্যার কথা শুনে শেখ তবারক আলী সম্পর্কে লালিত ধারণাটি ভেঙে যাচ্ছিল।

নুরুন্নাহার বানুর মুখে তাে কথাই নেই। তিনি ভেবেছিলেন, তবারক চাচাকে তাক লাগিয়ে দেবেন। সেটি আর হচ্ছে না বুঝতে পারলেন । আরাে কত বিস্ময় তার জন্য অপেক্ষা করে আছে কে জানে ।। 

আবু জুনায়েদ জিজ্ঞেস করলেন ; -আবেদ তুমি কি চাকরি করাে? 

গাভী বিত্তান্ত -পর্ব-(৮)

আগে তাে আমরা হাজবেন্ড এ্যান্ড ওয়াইফ এক সঙ্গে একই ডিপার্টমেন্টে কাজ করতাম। কিন্তু আব্বা আমাকে চাকরি ছাড়তে বাধ্য করলেন । আব্বার তাগিদেই তাে আমাকে আবার বিজনেস এ্যাডমিনিস্ট্রেশনে পড়শােনা করতে হল । | -বিশ্ববিদ্যালয়ে তাে আমাদের সামান্য কাজ। আমরা চিটাগাং পাের্ট ট্রাস্টে কাজ করি । হাউজিংয়ে কাজ করি। রােডস এ্যান্ড হাইওয়েজে কাজ করি। রিভার ড্রেজিং এ কাজ করি। 

আৰু জুনায়েদের আর কিছু জিজ্ঞেস করতে সাহস হল না। নুরুন্নাহার বানু। জানতে চাইলেন : 

-আপনার কয় ছেলেমেয়ে? -আমার একটি ছেলে, একটি মেয়ে। -কত বয়স? -ছেলেটি কেজিতে পড়ছে। মেয়েটি দেড় বছরের । 

গাড়ি সংসদ ভবন ছাড়িয়ে আগারগাঁওয়ের দিকে মােড় নিয়েছে। শেরে বাংলানগর এবং মীরপুরের মধ্যবর্তী স্থানে পৌছে গাড়ি আবার বাঁ দিকে মােড় নিল । দুপাশে সার সার বস্তি । আবেদ হােসেন জানালেন আমরা এসে পড়েছি। 

 আবু জুনায়েদ ভাবলেন এত জায়গা থাকতে শেখ তবারক আলী এই নােংরা বস্তির মধ্যে বাড়ি করতে আসলেন কেন? আসলে ঠিকাদারদের যতই টাকা-পয়সা হােক, দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টায় না। কোটি টাকার মালিক হলেও ননাংরা জিনিসের প্রতি আকর্ষণ তারা ছাড়তে পারে না।

আবু জুনায়েদ এরকম এক বড় লােকের কথা শুনেছেন। বড় লােকটি বারে গিয়ে বিলেতি মদের বদলে বাংলা মদ পান করে । বারের পরিবেশনকারীর সঙ্গে একটা বন্দোবস্ত করে রেখেছে, সে পূর্ব থেকেই বাংলা মদ সংগ্রহ করে রাখে। এ কারণে সে মােটা বখশিস পায়। 

একটা বিরাট গেটের কাছে এসে গাড়ি দাঁড়াল। আবু জুনায়েদ লক্ষ্য করে দেখেন, বাড়িটির চারপাশে গােল কম্পাউন্ড। কম্পাউন্ডের প্রাচীর ঘেঁষে একটার পাশে একটা লাগানাে ঘন বস্তির ভিড়।

 

Read more

গাভী বিত্তান্ত -পর্ব-(৯)-আহমদ ছফা

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *