বুধিরে, জামাকাপড় গুলান তুল মা, আকাশ পানে দ্যাখ, এক্কেবারে কালো। তুকে সেই থেকে বুলেই যেছি, শুন মা, একটবার শুন।
শেষের কয়েকটি কথা শেষ হওয়ার পরে কিছু সময়ের জন্যে আবার সব চুপচাপ। তারপরেই জায়গাটা কাঁপিয়ে একটা গলা চিল্লিয়ে উঠল,‘বুধি!কথা গুলান কানে ঢুকছি নাই নাকিরে?’
সঙ্গে সঙ্গে বাতাসে হাঁপানোর শব্দ মিশিয়ে ছুটে এসে গলা বের করল,‘কি মা?’
-তুই কি বড় হলি নাই, দেখছিস পাট সারছি, জামাকাপড় গুলান তুলি লে। কত ম্যাগ আসিছে বল তো।
মায়ের কথা শুনে বুধি মায়ের থেকে চোখ ফিরিয়ে একবার আকাশের দিকে তাকায়। জামাকাপড়গুলোর দিকে চোখ রেখে বলে,‘এই তো দুটি আছে, জল নামুক তুলি লিব।’
মা এতক্ষণ শাক বাছছিল। কুলেখাড়ার সাথে থাকা গিমে শাক আলাদা করতে করতে বুধির দিকে তাকিয়ে উত্তর দিল,‘কাপড়গুলান পেলাস্টিকে ভর, ঘরকে জল পড়ছে, যদি বেশি হয়, বগলে দেবে কুথাও সরাতি হবেক।’
-জল তো পড়বেকই মা, তুমি উপরের খড় গুলান বিচি দিলে।
-আমার ছেরাদ্দের জোগাড় করি নাই, চাল কিনি ছিলম, কনট্রোলে। সেই চালই চলইছে। এতবড় মেয়ে হলি তুর কুনো দিকে নজর লাই।
শেষের কথাগুলো জোরে হচ্ছে দেখে বুধি আর কথা না বাড়িয়ে তার নিজের জায়গায় যেতে যেতে বলে গেল,‘বৃষ্টি নামলেই তুলি লিব, আমি কাছেই রইচি।’
-বুধিরে শুন মা তুই চটিট পিঁদে যা, কাল কাচে পা কাটালি।
আর কোন জবাব পাওয়া গেল না। বাড়ির পিছনে একটা ভাঙা দোকানের চাতালে বসে আবছা আলোতে বই পড়তে আরম্ভ করল। মোল্লা পাড়ার ইনজামুল, কাল বিকালে একটা ভূতের গল্পের বই দিয়ে বলেছে,‘বুধি খালা, এইট দিলম, তাড়াতাড়ি পড়ি লিবি। দুদিন সময়।’
-দুদিন সময়!কখন পড়ইব, সকালটই যা পাওয়া যাবেক। ঘরে তো লাইট নাই। সকাল টুকুন যা পড়ি, তাও আবার চুলা ধরানো, ভাত চাপানো রইছে। মিদ্যা চাচাদের বাড়ির ছাগল দুটোকে একবার মাঠে ছেড়ি আসতে হবেক, মা মাঝেমাঝে চাচাদের বাড়িতে বাসন মাজে। সকালে কাজে বেরুনোর আগে কপাল ঠুকে বলে, ‘হে মা কালি শেষ কালে কিনা এটো বাসন মাজালি।’
আর করবেই বা কি এ’পাড়াতে যেকটা ঘর হিন্দু আছে তাদের অবস্থা দিন আনা দিন খাওয়া। চাষবাস সব মুসলিমদের হাতে। ঘোষ পাড়া বা হাজরাদের ঘরগুলান তো কাজে নেয় না। বলে,‘দুর তুদের আবার জাত আছে নাকি, কি সব খাস তার ঠিক নাই।’
বুধি বা তার মা এ’পাড়ার কারোর বাড়ির কোনো খাবার খায় না, শুধু দোকান থেকে কোনো জিনিস কিনে দিলে খায়। তবে ঈদের দিন শিমাই খায়, আর পীরের মাজারের ঊরসের দিন সবার সাথে বসে খিচুড়ি খায়। ইনজামুলরা বুধিকে খুব ভালোবাসে, তারা সব একসাথে খেলে, হামিদা, আসমিনা আর বুধিদের পাড়ার পায়েল কোয়েল। বুধি ছাড়া বাকি সবাই গ্রামের প্রাইমারি স্কুলে পড়ে। বুধিও ক্লাস ফোর পর্যন্ত পড়েছে, তারপরে মা আর বড় স্কুলে ভর্তি করে নাই। হেডমাস্টারমশাই ভর্তির জন্যে টাকা দেবেন বলেছিলেন, কিন্তু মা বলে,‘ভর্তি করলেই তো হবেক নাই, খাতা বই পেরাইভেট, সব কে দিবেক? স্কুলও তো কাছে লয়, আপনি ছাড়ান দিন। শুধু একট বয়সের কাগজ দিয়ে দিবেন জব কার্ডট করতি পারব। ভোটের কার্ডট হবেক।’
মাস্টারমশাই মাকে অনেক বুঝিয়ে ছিলেন। মাসে মাসে মায়ের হাতে পাঁচশ টাকা দেবার কথাও বলেন। কিন্তু মা রাজি হয়নি, বাইরে গেলে কে চুলা ধরাবেক, কেই বা রান্না চাপাবেক। বুধি কিছু বলে না, মা কাজে বেরিয়ে গেলে সারাটা দিন একাএকা ঘরের দুয়ারে দাঁড়িয়ে থাকে। বাকি সবার স্কুল যাওয়া দেখে, মাঝে মাঝে প্রাইমারি স্কুলের আশেপাশে ঘুরে বেড়ায়। স্যারদের পড়ানোর আওয়াজ কানে আসে, জানলার পাশে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কথা শোনে, আর বাইরে বই পড়ে। এখনও ভালো করে রিডিং পড়তে না পারলেও গল্পের বই দেখতে, পড়তে ভালো লাগে। একটা গল্প পড়তে অনেক সময় লাগলেও ভালো লাগে। চোখের সামনে ফুটো ছাদ বেয়ে পরী নেমে আসে, রাজপুত্র আসে, ঘুমে চোখ জুড়িয়ে যায়। তখনই নাকে পোড়া ভাতের গন্ধ আসে। তাড়াতাড়ি উঠে ভাত নামায়, একদিনের চাল নষ্ট মানে একদিনের খাওয়া নষ্ট। বাড়ি ফিরে মা শুনেই রেগে যায়, মারে। কখনও বা এই রকম হলেই বুধি স্কুলে গিয়ে স্যারকে বলে সেদিনের ভাতের ব্যবস্থা করে, সঙ্গে তরকারি বা ডিম। মোল্লা পাড়ার অনেকে ভাত দিতে চায়, বুধির মা বলে,‘উয়াদের খাবার খেতে লাই।’
বাবা বেঁচে থাকবার সময় এই রকম সমস্যা ছিল না। বীরভূমের এক গ্রাম থেকে কাজের সন্ধানে এ’গ্রাম সে’গ্রাম ঘুরতে ঘুরতে এখানে ঘর বাঁধে, বিয়ে হয়। প্রথম বউ কয়েকমাসের মধ্যে এক রাজমিস্ত্রির সাথে পালিয়ে যাওয়ার পরে বাবা আবার দ্বিতীয় বিয়ে করে, সেই বুধির মা সোনামনি। বুধি বাবার খুব আদরের ছিল। বিয়ের প্রায় বছর সাত পরে অনেক ঠাকুরথান মাজার ঘুরে তবে বুধির জন্ম হয়। বাবা আদর করে আদুরি বলত। বুধির মনে আছে সেই সব কথা। কাজ থেকে ফেরবার পথে প্রায়ই খাবার নিয়ে আসত। সন্ধে বেলার দিকে বাবা পার্টি অফিসে যেত। পার্টি কি বুধি বোঝে না, শুধু সব কথাতে পার্টির কথা শোনে। একদিন বাবা পার্টি অফিস গিয়ে আর বাড়ি ফিরল না। তিনদিন পরে লাশ পাওয়া গেলেও পোড়ানো গেল না। কারা সব মাটিতে পুঁতে দিয়েছিল। বুধি সেদিন মায়ের সাথে খুব কেঁদে ছিল। বাড়ি ফিরে বাবার জামা কাপড়ে হাত বোলানোর সময় বুকে মোচড় দিচ্ছিল। তারপরে মা একদিন জামা কাপড়গুলো মাঠের মাঝে পুড়িয়ে দিয়ে এল। সব কান্নার শেষ। কিছুদিনের মধ্যেই আবার কষ্ট আরম্ভ হল। জমানো চালে কয়েকটা দিন চললেও বুধির মাকে শেষ পর্যন্ত সেই মাঠের শাক, গেঁড়ি গুগলি সেদ্ধ করেই পেট ভরানোর যুদ্ধে নামতে হল। সমস্যা অনেক, মাঠ ডুবে যায়, অন্য লোকে রাত থাকতে শাক তুলে নেয়। চালে টান পড়ে, সেই সময় ঘরের চালের খড় বের করে বিক্রি করতে হয়। ই’খড় আবার সবাই লেয় না, ভালো খড়ের সাথে মিশেল নেওয়ার জন্যে দু’এক আঁটি চাল থেকে নামিয়ে বুধির মায়ের হাতে দশ পনেরো টাকা গুঁজে দেয়। সোনামনি বুধিকে কন্ট্রোলে পাঠায়, শেষ কালে যুদ্ধে আর না পেরে লোকের এটো বাসন মাজার কাজ আরম্ভ করে।
-এই বুধি আর দেরি করিস নে মা, দ্যাখ ম্যাগ ডাকা আরম্ভ হয়ি গেছে।
এবার বুধি আর দেরি করে না করে এক ছুটে মায়ের কাছে আসে। বাইরের দড়িতে মেলতে দেওয়া মায়ের কাপড়, নিজের জামাটাকে পুঁটুলি পাকিয়ে ঘরের ভিতর একটা প্যাকেটে ভরে রাখে। বাইরে বেরিয়ে মায়ের দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে,‘মা আমাদের ঘর দিবেক নাই? ঐ পাড়াতে কতজনের ঘর হচে, পায়খানা হচে।’
মা একটা লম্বা শ্বাস ফেলে বলে,‘কেনে দিবেক বল, তুর বাপ তো অন্য পার্টি করত, এখন মরে আমাদের ডুবাই দিয়ে ড্যাং ড্যাং করে পালালো।’
সোনামনির কানে ঘর করবার টাকা বেরোনোর কথা আসা মাত্রই পঞ্চায়েত অফিসে ছুটেছিল। প্রধান সাহেবের সাথে দেখা করে সবকিছু বলতেই প্রধান জিজ্ঞেস করে, ‘তোমাদের গ্রামে কে থাকে, ডালিম তো? আমি বলে দেব ঘর, পায়খানা, দুটোর টাকাই ব্যবস্থা করে দেব।’
ডালিমের কাছে গিয়ে সব বলতেই উত্তর দেয়,‘কাকি, মাতন কাকা তো অন্য পার্টি করত, ঘরের টাকা দেওয়ার কথা শুনলেই দলের সবাই রেগি যাবেক। তাও আমি দেখব।’
এরপরে ডালিমের সাথে দেখা হলেই একগাল হেসে বলত,‘আমি দেখছি কাকি, তোমার ঘর করবার টাকার ব্যবস্থা করে দেব।’
সোনামনি হাসতে হাসতে উত্তর দেয়, ‘দেখ বাবা একটুকুন দেখ, একা বিটিটকে লিয়ে থাকি, ঘরের চাল ফুটো, জল পড়ছে গা, একদিকের দেওয়ালট লড়বড়ে, ঝড় জলের সময় বুকট কেঁপি ওঠে।’
কয়েকমাস পরে পাড়ার অনেকের ঘর করবার টাকা বেরুনোর খবর শুনে ডালিমের কাছে গিয়ে সব কথা বলতেই ডালিম খুব অসহায় ভাবে বলে,‘কাকিগো আমি আর পার্টিতে নাই, উয়ারা ঘর করবার টাকা দিছে কিন্তু আগে কুড়ি হাজার লিয়ে লিছে, তুমি কি দিতে পারবে কাকি?’
-কুড়ি হাজার!কুড়ি টাকা দিতে লারব রে বাপ।
-আমার হাতে তো আর কিছু নাইগো কাকি, আমি এখন অন্য গোষ্ঠির। তুমি একবার নজরুল বা মোহনকে বল, আমার নাম করনি যেন।
– নাম করইলে ঘর পাবো নাই? পায়খানাও না?
ডালিম সোনামনির কাঁধে হাত রেখে,‘আমি দেখছি।’ বলে চলে যায়।
এরপর ডালিমের সাথে দেখা হলে একগাল হেসে শুধু বলে,‘কাকি তোমারটা মনে আছে।’
-মনে থাকলে আর কি হবে, ঘর হবে, না পায়খানা হবে।
অথচ মাঠে গেলেই বিস্তর হ্যাপা, বসতে গিয়ে তো একদিন পুলিশ লাঠি নিয়ে খ্যাদারতে আসে। সোনামনি অফিসারকে বলে,‘তা বাবা পায়খানা করে দিবে নাই, মাঠেও হাগতে দিবে না, গরিব বলে কি হাগামুতা নাই গো।’
অফিসার গম্ভির ভাবে বলে ‘দেখছি কি ব্যবস্থা করা যায়।’
-সেতো বাবা সবাই বলইছে ‘দেখছি।’, মা বিটিতে থাকি কুন দিন চাপা পড়ব, কে জানে?
সোনামনি একদিন সকাল সকাল নজরুলের সাথে দেখা করে বলে,‘ব্যাটা, আমার ঘর টুকুন একটু দেখবি নাই। মেয়েটকে লিয়ে খুব কষ্টে আছি।’
-কাকি তোমারটাতে ফের আছে গো, কাকা তো উদের লোক ছিলেক।
-হ্যাঁরে বাপ্ গরিবের আবার ইদের উদের আছে রে? একটি বার আবার ঘরকে চল, রাতে চালের দিকে চায়লে চাঁদ দেখা যায়। ঝড় জলের সময় আইসছে, মেয়েট কে লিয়ে থাকব কুথাকে?
নজরুল সোনামনিকে একটু আড়ালে ডেকে নিয়ে গিয়ে বলে,‘কাকি সবই তো বোঝো, মনে কিছু কোরো না, কিছু খরচা পাতি লাগবে।
-খরচা পাতি? তা কত বাবা?
-ওই ধর হাজার পাঁচেক।
-হাজার পাঁচেক! বলিস কি রে বাবা, পাঁচ টাকা বের করতি গেলে ভাবতে হবে রে।
-তাহলে মারাও গে।
-শুন বাবা একটুকুন দ্যাখ।
সোনামনি আর নজরুলের কথা শুনে পাশ থেকে মোহন বলে ওঠে,‘কি হল কাকি, ইদিকে শুনো।’
সোনামনি কাছে যেতেই বলে,‘তোমায় ঘর দেব, টাকা দিবে নাই তবে আমাদের একটু কাজ কর, পার্টি অফিসটতে ঝাঁট-ফাঁট দাও।
-সে বাবা দিয়ে দিব, কিন্তু সবই জানিস, মাঠে কাজ করি, মুন্নাদের বাড়িতেও মাঝে মাঝে বাসন মাজি।
– তোমার মেয়ে কি করছে, স্কুল যায়?
-না’রে, বড় স্কুলে আর ভর্তি করি নাই, ঘরেই থাকে।
-বড় হয়ি গেছে তো উয়াকেই পাঠায় দিবে।
কথাগুলো বুধিকে বলতেই একপায়ে রাজি। হাসতে হাসতে বলে,‘ঝেঁটোয় যদি চাল পাওয়া যায়, ভালোই তো, কি বল মা?’
সোনামনি কিছু উত্তর দেয় না, শুধু বুধির মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। বুধি পার্টি অফিস ঝাঁট দেওয়া আরম্ভ করে। দিনচার পরে একদিন পার্টি অফিস থেকে হাঁপাতে হাঁপাতে ফিরে মাকে জড়িয়ে ধরে ডুকরে কেঁদে ওঠে। সোনামনি তখনও কাজে বের হয়নি। মাথায় হাত বুলিয়ে,‘কি হল মা’ জিজ্ঞেস করতেই বুধি কিছুসময় কোনো উত্তর দিতে পারে না, শুধু হাঁপাতে থাকে। কথার মাঝে শ্বাস জড়িয়ে যায়। হাঁপাতে হাঁপাতে সব শব্দগুলো পেটের ভিতরেই যেন কবরে চলে যাচ্ছে। কিছু সময় পরে বলে, ‘কাল থেকে আর যাবো নাকো, উয়ারা ছেঁড়া জামাতে হাত ঢুকায় দেয়, বাজে লোক।’
সোনামনি কিছুকথা বলবার আগেই বুধির গালে জোরে একটা চড় কষিয়ে বলে, ‘তুকে না এই জামাট পরি যেতে বারণ করিছিলম।’ তার পর নিজের গা থেকে ব্লাউসটা খুলে বুধিকে দিয়ে বলে ‘এইট পর।’
বুধি বাঁহাতটা গালে ঘষতে ঘষতে কান্না মেশানো গলায় বলে ওঠে,‘কুনটো পরব, সবকটাই তো ছিঁড়ি গেইছে মা।’
সোনামনি জানে বুধির আর জামা নাই। স্কুলের একটা সাদা জামা আর একটা লাল জামা ছাড়া আর নাই। সাদাটর পিঠের দিকেট ছেঁড়া, ছুটুও হয়ি গেছে। কিশোরী বয়সটা জামা ঠেলে বেরিয়ে আসতে চায়। সোনামনি বুধির চোখের জল মুছিয়ে হাতটা ধরে টানতে টানতে পার্টি অফিসের সামনে দাঁড়িয়ে জোরে জোরে চেল্লাতে আরম্ভ করে। ভিতরে তখন মোহন ছিল। সোনামনির চেল্লানি শুনে অফিসের ভেতর থেকে কয়েকজন বেরিয়ে এসে বলে,‘কি ব্যাপার এত চেল্লাচ্ছিস কেন?’
-তুরা আমার বুধির শরীরে হাত দিয়েছিস?
রেগে ওঠে মোহন,‘এক্কেবারে বাজে কথা বলবি না, গেরাম থেকে তাড়াই দিব, আমার নামে অপবাদ দেওয়া, ঘর দিবেক তুকে মুখে হেগি দিবো আয়।’
নিমেষে অফিসের সামনে লোকজন জমতে আরম্ভ করে। মোহনের সাথে দাঁড়িয়ে থাকা লোকজনের গলার আওয়াজে ঢাকা পড়ে যায় বুধি আর সোনামনির কান্না।
পরের দিন ডালিমের কাছে যেতেই ডালিম বলে,‘কাকি সব শুনেছি, আমি তো বিরোধী গোষ্ঠির, তবে আমি ব্লকে কথাগুলোন তুলব, তখন যদি দরকার হয় যেও।’ তার পর অবশ্য আরো কয়েক মাস কেটে গেছে।
-মাগো ঝড় উঠবেক মনে হচে। ম্যাগট দেখ কেমন কালো পারা।
সোনামনি সেই মাত্র শাক বেছে উঠে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে নিয়ে বুধির দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে,‘ঘরকে ঢুক, জল আসবেক।’
-মা তোশক বালিশ গুলোন ঐ গুলুকাকার দুকানে রেখি দিব। ঘরকে তো জল পড়বেক।
-ঐ দুকানেও তো চাল উড়ি গেছে। তুই বোসগে আমি মুন্নাদের ঘরকে রেখে আসি।
তোশক বালিশ আর ছেঁড়া চাদর বাঁধতে বাঁধতেই জোরে ঝড় আরম্ভ হয়ে গেল। সঙ্গে তুমুল বৃষ্টি। ঘরের ভিতরে মা, মেয়ে প্রকৃতির যুদ্ধ থেকে বাঁচতে ঘরের এককোণ থেকে আরেক কোণে ছোটাছুটি করতে লাগল। ঝড় কাঁপিয়ে দিচ্ছিল দেওয়াল, আলোর চাবুক ঘরটাকে কাঁপিয়ে অন্ধকারকে আরো বাড়িয়ে দিচ্ছিল। কিছু সময়ের মধ্যেই একদিকের জানলা খুলে যেতে, বাইরের হাওয়া হুহু করে ভিতরে আসতে লাগল। দরজার ছিটকিনি খুলে গেল, বাইরে থেকে শন্ শন্ করে ঝড় ভিতরে যেতে লাগল। একটা কোণে দুটো প্রাণি কুণ্ডলি পাকিয়ে বসে থাকল। কিছু সময় ওভাবে থাকবার পরে বুধির হাতটা ধরে সোনামনি বলে উঠল,‘বেটিরে চল্, দোকানটার বারান্দাতে গিয়ে দাঁড়াই। ঘরট পড়ি গেলে চাপা পড়ি যাবো। মা, মেয়ে বগলে তোশক, বালিশ পুঁটলি পাকিয়ে দোকানের বারান্দাতে দাঁড়াবার কিছু সময়ের মধ্যেই চোখের সামনে ঘরের দেওয়ালটা একদিকে হেলে পড়ল। হুড়মুড়িয়ে একদিকে হেলে পড়ল চালটাও। ভেজা তোশক, বালিশ, আরো ভেজার থেকে বাঁচতে একটু কোণে রাখতে সোনামণি বলে উঠল,‘ভাগ্যি বেরই ছিলম, নইলে চাপা পড়ি যেতম।
বুধি তখন একমনে আকাশের দিকে তাকিয়ে বৃষ্টি দেখছে। কখনও কখনও হাত বের করে জল নিচ্ছে। সারা শরীর কাক ভেজা। আচমকা হাত সরিয়ে বলে ওঠে,‘মা, ঝড় থামলে আম কুড়াতে যাবো? কালকে রফিক চাচাকে বিচি দিব।’
সোনামনি ততক্ষণে একটা জায়গায় অন্যমনস্ক হয়ে বসেছিল বুধির কথা শুনে কিছুসময় পর জবাব দিল,‘তুই একা না, আমিও যাবো।’