ছেলেটা পর্ব-০৪ হুমায়ূন আহমেদ

ছেলেটা পর্ব-০৪

রনির খুব মজা লাগছে। পুলিশ অফিসারকে যন্ত্রণায় ফেলে দেয়া সহজ কাজ না। সে অবশ্যি এরকম একটা সিনেমা দেখেছিল যেখানে বাচ্চা একটা ছেলে ঘাপ্ত পুলিশ অফিসারকে নানান যন্ত্রণায় ফেলে দেয়। শেষে পুলিশ অফিসারের সঙ্গে ছেলেটার খুব বন্ধুত্ব হয়ে যায়। এই পুলিশ অফিসারের সঙ্গেও হয়তো রনির বন্ধুত্ব হবে। এই পুলিশ অফিসার হাসিখুশি মানুষ। আর সবচে মজার ব্যাপার হচ্ছে, তিনি হাসতে হাসতে হঠাৎ হাসি বন্ধ করে অবাক হয়ে তাকাতে পারেন।রনি বলল, আপনার নাম কী?

পুলিশ অফিসার বললেন, আমার নাম আফসার। আফসার উদ্দিন।আপনি কি খুব বড় অফিসার? আমি ছোট অফিসার। পুলিশ ইন্সপেক্টর, গোয়েন্দা বিভাগের লোক।গোয়েন্দা বিভাগ মানে কী? আমরা সাদা পোশাকে থাকি।সাদা পোশাকে থাকেন কেন? কেউ যেন আমাদের চিনতে না পারে।কেউ চিনতে পারলে কী হবে? আফসার উদ্দিন দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে বললেন, উফ খোকা, চুপ করো! চুপ করব কেন?

আমি চুপ করতে বলছি এইজন্যে চুপ করবে।আপনি চুপ করতে বলছেন কেন? তোমার প্রশ্ন শুনতে ভালো লাগছে না, এইজন্যে চুপ করতে বলছি।আমার প্রশ্ন শুনতে আপনার ভালো লাগছে না কেন? আফসার উদ্দিন হতাশ চোখে তাকিয়ে সোফায় গা এলিয়ে দিলেন। রনির মজা লাগছে। এই পুলিশ অফিসারের সঙ্গে সে একটা খেলা খেলছে। খেলার নাম–প্রশ্ন প্রশ্ন খেলা। এই খেলাটা সে শিখেছে লুতপাইনের কাছে।

রনির দাদাজান এলেন অফিসার চলে যাবার পর পর। তিনি রনিকে আড়ালে ডেকে থমথমে গলায় বললেন, ঘটনা কী? রনি বলল, জানি না। সূক্ষ্ম ষড়যন্ত্র হচ্ছে বুঝতে পারছিস? সূক্ষ্ম ষড়যন্ত্র কাকে বলে? আরে গাধা, সূক্ষ্ম ষড়যন্ত্রও বুঝিস না! ইংরেজিতে বলো, ইংরেজিতে বললে বুঝব। রনির দাদা অতি বিরক্ত হয়ে বললেন, ফালতু ইংরেজি স্কুলগুলি তো বড় যন্ত্রণা করে। মাতৃভাষা কিছুই শেখায় না। এখন আমি সূক্ষ্ম ষড়যন্ত্রের ইংরেজি পাব কই! মূল ব্যাপার হচ্ছে, ওরাই সাপ ওরাই ওঝা।

কারা সাপ কারা ওঝা? তোর ফলস বাবা-মা। ওরাই নিজের লোক পাঠিয়ে তোকে কিডন্যাপ করিয়েছে, আবার ফেরত দিয়ে গেছে।কেন করেছে? কেন করেছে এখনো আমার কাছে ক্লিয়ার না, তবে ক্লিয়ার হয়ে যাবে। আমার জন্যে অবশ্যি সুবিধা হলো। কী সুবিধা?

কাস্টডি মামলা করব। তোর ফলস বাবা-মা তোকে ঠিকমতো রাখতে পারছে না। সন্ত্রাসী কিডন্যাপ করে নিয়ে যাচ্ছে… রনি বলল, যিনি নিয়ে গিয়েছিলেন তিনি তো সন্ত্রাসী না। আর কিডন্যাপ করেও নেন নি।তুই চুপ থাক। নিজ থেকে খবরদার একটি কথাও বলবি না। ব্যারিস্টার যা শিখিয়ে দেবে তাই বলবি। এর বাইরে কিছু বললে থাপ্পড় দিয়ে দাঁত ফেলে দেব।দাদাজান তুমি দুষ্ট বুড়ো।

দুষ্টামির তুই দেখেছিস কি? আসল দুষ্টামি তো শুরুই হয়নি।তিনি আনন্দে হাসতে লাগলেন। পা দোলাতে লাগলেন। রনির মনটা খারাপ হলো–আবার মামলা-মোকদ্দমা শুরু হবে। আবার কোর্টে যেতে হবে। জজ সাহেব মায়া মায়া গলায় বলবেন–খোকা, তুমি কার সঙ্গে থাকতে চাও?

রনির দাদাজান যাবার আগে রনির কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বললেন, তোর ফলস পিতা-মাতা এখন বুঝবে–হাউ মেনি রাইস হাউ মেনি পেডি।রনি বলল, হাউ মেনি রাইস হাউ মেনি পেডির মানে কী? দাদাজান অত্যন্ত বিরক্ত হয়ে বললেন, ইংরেজি স্কুলে পড়ে তোর লাভটা কী হলো? সহজ ইংরেজিও তো জানিস না। হাউ মেনি রাইস হাউ মেনি পেডির মানে হলো কত ধানে কত চাল।রনি বলল, কত ধানে কত চালের মানে কী?

এত কথা বলতে পারব না। এখন থেকে তোর পেছনে থাকবে ডাবল স্পাই। একটা কালো রঙের ভক্সওয়াগন গাড়ি তোকে ছায়ার মতো ফলো করবে।দরকার নেই দাদাজান। দরকার আছে কি না সেটা আমি দেখব। মোদ্দাকথা ফুটবল এখন আমার কোর্টে।মোদ্দাকথার মানে কী দাদাজান?

এত মানে বলতে পারব না। তোদের স্কুলগুলি আছে কী জন্যে? এরা দেখি কিছুই শিখায় না। কাড়ি কাড়ি টাকা নেয়, পড়াশোনা লবডংকা।লবড়ংকা মানে কী? চুপ। রনি স্কুলে গেল মন খারাপ করে। স্কুলে রওনা হবার সময় দেখে, একটা কালো রঙের ভক্সওয়াগন গাড়ি সত্যি সত্যি তাদের পেছনে পেছনে আসছে।

ক্লাসরুমে ঢুকে রনির মন আরো খারাপ হলো। লুতপাইনের জন্যে সে সুন্দর একটা সরি কার্ড বানিয়ে এনেছে। অথচ লুতপাইন আসে নি। তার সিটটা খালি। লুতপাইন কখনো স্কুলে আসে না এমন হয় না। একবার জ্বর গায়ে এসেছিল। তার নাকি বাসায় থাকতে ভালো লাগে না। তার স্কুল ভালো লাগে।আজ বুধবার নতুন আর্ট টিচার আসার কথা। রনির কেন যেন মনে হলো তিনি আসবেন না। তাঁর সঙ্গে হঠাৎ হঠাৎ দেখা হবে এবং সেটাই ভালো। এরকম মানুষের সঙ্গে রোজ দেখা হওয়া ভালো না। হঠাৎ হঠাৎ দেখা হওয়াই ভালো।

থার্ড পিরিয়ড আর্ট ক্লাস। রনি দরজার দিকে তাকিয়ে আছে। ক্লাসে হাব্বত আলি সাহেব ঢুকেন কি-না সেটা দেখার ইচ্ছা। হাব্বত আলি ঢুকলেন না ঢুকলেন তাদের ক্লাস টিচার।হ্যালো লিটল এনজেলস, তোমরা কেমন আছ? ক্লাসের সবাই একসঙ্গে বলল, ভালো।আজ থেকে তোমাদের নতুন আর্ট টিচার আসার কথা। তিনি এসেছেন। তবে একটা ছোট্ট সমস্যা হয়েছে। তিনি জানিয়েছেন যে, তিনি চাকরি করবেন না। কাজেই এই ক্লাস আপাতত আমি চালাব। তোমরা খুশি তো?

সবাই যন্ত্রের মতো একসঙ্গে বলল, ইয়েস মিস।তোমরা ড্রয়িং খাতা বের কর। আজ তোমাদের ফ্রি চয়েস। যার যা আঁকতে ইচ্ছা করে আঁকবে। শুধু কার্টুন ছবি আঁকতে পারবে না। যে ছবিটি সবচেয়ে ভালো হবে সেটা স্কুলের বিলবোর্ডে টানিয়ে দেয়া হবে। তোমরা কি খুশি? ইয়েস ম্যাডাম। খুশি হলে এরকম করুণ গলায় ইয়েস ম্যাডাম বলছ কেন? হাসিমুখে ইয়েস ম্যাডাম বলো।ইয়েস ম্যাডাম।

তোমাদের একটা ভালো খবর দেয়া হয়নি–নাজমা ম্যাডাম মারা যান নি। শুরুতে আমরা ভুল খবর পেয়েছিলাম। তিনি হাসপাতালে আছেন। যদিও কন্ডিশন ভালো না। তোমরা তাঁকে Get well কার্ড পাঠাতে পারো প্রিন্সিপ্যাল আপার অফিসে জমা দিলে আমরা পাঠাব।রনি লক্ষ করল ক্লাসের সব ছেলে-মেয়ে খুব খুশি হয়েছে। তবে সবচে খুশি যে হতো সে ক্লাসে আসে নি। তার নাম লুতপাইন, তবে তাকে রনি খবর দিয়েছে।

রনি ছবি আঁকছে। এলিয়েনদের ছবি। একটা এলিয়েন তাদের প্ল্যানেটে অন্য একটা এলিয়েনের সঙ্গে যুদ্ধ করছে। তাদের দুজনের হাতেই রে গান। এলিয়েনদের চেহারা ভয়ঙ্কর। সারা মুখ ভর্তি চোখ। চোখগুলি বিড়ালের চোখের মতো।রনি এলিয়েনদের ছবি খুব ভালো আঁকতে পারে। সে যখন ছবি আঁকে, লুতপাইন মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থাকে। কারণ লুতপাইন ছবিই আঁকতে পারে না। আর্টে সে সবচে কম নাম্বার পায়।

লুতপাইনের বাবা মেয়ের জন্যে আর্টের একজন টিচার খুঁজছেন, পাচ্ছেন না। আজ যদি লুতপাইন ক্লাসে থাকত, তাহলে অবাক হয়ে রনির ছবি আঁকা দেখত এবং প্রশ্ন করে করে বিরক্ত করত।আচ্ছা একটা এলিয়েনের নয়টা চোখ, আরেকটা এলিয়েনের দশটা চোখ কেন? তুমি ভুল করেছ নাকি এদের চোখের ঠিক ঠিকানা থাকে না। কারো নয়টা, কারো দশটা, কারোর এগারটা এরকম?

আচ্ছা এই এলিয়েনটা ছেলে না মেয়ে?

আচ্ছা এরা কী খায়?

এরা কি আকাশে উড়তে পারে?

এরা কি ভয়ঙ্কর? না-কি ফ্রেন্ডলি?

শুধু যে প্রশ্ন করত তাই না, ছবি আঁকা শেষ হওয়া মাত্র বলত–এই ছবিটা তুমি আমাকে দেবে? আমার ঘরে টাঙিয়ে রাখব।রনি বলত, না।প্লিজ, দাও না প্লিজ। এই ছবিটা দিলে আমি তোমার কাছে আর ছবি চাইব না। কোনোদিন না। প্রমিজ বাই মাই হার্ট।তুমি আবারো চাইবে। বললাম তো আর চাইব না।

লুতপাইনের এটা কথার কথা। রনি জানে লুতপাইন আবার ছবির জন্যে তার পেছনে ঘুরঘুর করবে। এই পর্যন্ত লুতপাইন রনির আটটা ছবি নিয়েছে। এটা নিলে তার হবে নয়টা ছবি। তবে এই ছবিটা তো আর সে নিতে পারছে না। সে ক্লাসেই আসে নি।রনির ছবি দেখে ক্লাস টিচার খুবই বিরক্ত হলেন। তিনি রাগী রাগী গলায় বললেন, এটা কী এঁকেছ কাকের ঠ্যাং বকের ঠ্যাং! এই দুটা জন্তু কী?

এরা এলিয়েন।

এলিয়েন মানে?

ভিনগ্রহের মানুষ।

ভিনগ্রহের মানুষদের পনের ষােটা করে চোখ থাকে? রনি কিছু বলল না। মিস বললেন, এইসব আলতু ফালতু জিনিস কেন আঁকো? নরম্যাল জিনিস আঁকতে পার না? সরি ম্যাডাম।নদীতে সূর্যাস্ত হচ্ছে, পাল তোলা নৌকা যাচ্ছে–এইসব আঁকবে।রনি আবারো বলল, সরি ম্যাডাম।রনির মন খারাপ হলো। ছবিটা ম্যাডামকে দেখানোই উচিত হয়নি। সবচে ভালো হতো ছবি আঁকার পরপরই সে যদি লুতপাইনকে ছবিটা দিয়ে দিত। ছবির সঙ্গে সরি নোট।

রনি গাড়িতে উঠতে যাবে, পেছন থেকে গম্ভীর গলায় দাড়িওয়ালা একজন লোক ডাকল, হ্যালো খোকা। হ্যালো।রনি তাকিয়ে দেখে মুখভর্তি দাড়ি অচেনা এক লোক। মাথায় টুপি, মাওলানাদের মতো লম্বা পাঞ্জাবি পরা এক লোক তার দিকে এগিয়ে আসছে।কেমন আছ খোকা? লোকটা কে? হাব্বত আলি না তো? কিছুক্ষণ তাকিয়েই রনি বুঝে ফেলল, লোকটার দাড়ি-গোঁফ নকল এবং সে হাব্বত আলি না। পুলিশ ইন্সপেক্টার আফসারউদ্দিন।ভালো আছি কিন্তু আপনি যে নকল দাড়ি লাগিয়েছেন–এটা পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে।

বলো কী? তুমি কি আমাকে চিনে ফেলেছ? অবশ্যই। যে কেউ চিনে ফেলবে।বলো তো আমি কে? আপনি পুলিশ ইন্সপেক্টর আফসার উদ্দিন।তুমি তো ঠিকই চিনে ফেলেছ।আপনাকে যে দেখবে সে-ই চিনবে। তা ছাড়া আপনার দাড়ি কিন্তু খুলে যাচ্ছে।আফসার উদ্দিন ব্ৰিতমুখে হাত দিয়ে দাড়ি চেপে ধরলেন। রনি বলল, দাড়ি লাগিয়ে আপনি এখানে কী করছেন? তোমার বিষয়ে তদন্তে এসেছি।কিছু পেলেন?

প্রথম দিনেই কিছু পাওয়া যায় না, তবে ভক্সওয়াগান নিয়ে কয়েকটা লোক বসে আছে। তাদের গতিবিধি সন্দেহজনক। এর মধ্যে লক্ষ করেছি পাজেরো জিপ নিয়ে এক বুড়ো এসেছে। সে ভক্সওয়াগান লোকগুলির সঙ্গে কথা বলছে।ঐ বুড়ো কি খুব ফর্সা? হ্যাঁ ফর্সা।রবীন্দ্রনাথের মতো দাড়ি? হুঁ।ঐ বুড়ো আমার দাদাজান।এরা কি তোমাকে কিডন্যাপ করতে এসেছে? আসতে পারে।তাহলে তো মনে হয় আমার উচিত তোমার সঙ্গে যাওয়া। উঠি তোমার সঙ্গে গাড়িতে? উঠুন।

আফসার উদ্দিন গাড়িতে উঠে সিটে হেলান দিয়ে আরাম করে বসলেন। কিছুক্ষণের মধ্যে ঘুমিয়ে পড়লেন। ঘুমের মধ্যে তাঁর নকল দাড়ি খুলে পড়ে গেল। রনি সেই দাড়ি যত্ন করে তার নিজের স্কুল ব্যাগে ঢুকিয়ে রাখল।আফসার উদ্দিনের ঘুম ভাঙল রনিদের বাড়ির সামনে এসে। তিনি রনিকে নামিয়ে দিয়ে চলে গেলেন আফসার উদ্দিনের একবারো মনে হলো না যে তার মুখে এখন দাড়ি নেই। রনির মানুষটাকে পছন্দ হলো। কেমন সাদাসিধা আলাভোলা মানুষ। এই ধরনের মানুষ খুব ভালো হয়।

একজন লইয়ার এসেছেন, রনির সঙ্গে কথা বলবেন। রনি লেগো দিয়ে স্পেস ক্যাপসুল বানাচ্ছিল। বানানো বন্ধ করে উঠে গেল। লইয়ারদের সঙ্গে সে আগেও অনেকবার কথা বলেছে। প্রতিবারই প্রচণ্ড রাগ লেগেছে। সে নিশ্চিত আজো তার প্রচণ্ড রাগ হবে। লইয়ার কথা শেষ করে ফিরে যাবে, সে রাগ নিয়ে নিজের ঘরে ঢুকবে। স্পেস ক্যাপসুল বানাতে পারবে না।

রাতে ঘুমুতে যাবার সময় দুঃস্বপ্ন দেখবে। সেই দুঃস্বপ্নে কালো টুপি মাথায় দেয়া কয়েকটা এলিয়েন তাকে নিতে আসবে। সে দৌড়ে পালাতে চেষ্টা করবে। যেদিকেই যাবে সেদিকেই একজন এলিয়েন দাঁড়িয়ে থাকবে। যতবার রনি কোনো লইয়ারের সঙ্গে কথা বলে ততবারই এরকম দুঃস্বপ্ন দেখে।রনি লইয়ারের সামনে সোফায় বসল। লইয়ার সঙ্গে সঙ্গে বলল, খোকা নড়াচড়া করবে না। চুপচাপ বসো।

অথচ রনি কিছুই করে নি। শান্তভাবে বসেছে। কিছু না করার আগেই ভদ্রলোক ধমক দিলেন কেন? রনি সোফায় হেলান দিয়ে বসেছিল। এখন সোজা হয়ে বসতে বসতে বলল, নড়াচড়া করা যাবে না কেন? লইয়ার চোখ থেকে চশমা সরিয়ে রনির দিকে তাকিয়ে রইলেন। রনি আবারো বলল, আমাকে বুঝিয়ে বলুন কেন নড়াচড়া করা যাবে না।লইয়ার রাগী রাগী গলায় বললেন, আমি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু কথা বলব। কথাগুলি মন দিয়ে তোমাকে শুনতে হবে। এই জন্যেই নড়াচড়া করা যাবে না।

ভদ্রলোক সিগারেট ধরালেন। সিগারেটের গন্ধে রনির বমি এসে যাচ্ছে। তারপরেও সে শান্ত ভঙ্গিতে বসে আছে। যদিও সে বলতে পারে, বাচ্চাদের সামনে কেন সিগারেট খাচ্ছেন? আপনি কি চান আপনার আশেপাশে যারা আছে তাদেরও ক্যান্সার হোক? বড়দের মুখের ওপর এইসব কথা বলা যায় না। বেয়াদবি হয়।তোমার নাম রনি?

হুঁ।হুঁ হা না। আমি প্রশ্ন করলে স্পষ্ট জবাব দেবে। তোমার নাম রনি? হ্যাঁ, আমার ডাক নাম রনি। তুমি নিশ্চয়ই জানো তোমাকে নিয়ে আবারো কাস্টডি মামলা শুরু হয়েছে। তোমার দাদাজান কোর্টে মামলা করেছেন।আমি জানি না। এখন জানলাম।

তারা যুক্তি দেখাচ্ছে তোমার প্রতি যথেষ্ট টেককেয়ার করা হচ্ছে না। অচেনা অজানা লোকজন তোমাকে স্কুল থেকে বের করে নিয়ে যাচ্ছে। আমি কী বলছি মন দিয়ে শুনছ তো? শুনছি।তাহলে সিলিং ফ্যানের দিকে তাকিয়ে আছ কেন? আমার দিকে তাকিয়ে কথা বলো।রনি লইয়ারের দিকে তাকাল।কোর্টে তুমি বলবে বাইরের লোক কখনো স্কুল থেকে তোমাকে নিতে আসে নি। সবসময় বাসা থেকে তোমাকে আনতে গাড়ি যায়। সেই গাড়িতে ড্রাইভার ছাড়াও একজন গার্ড বসে থাকে।

মিথ্যা কথা বলব?

হ্যাঁ।

কেন?

তোমার মতো অবস্থায় যারা আছে তাদের কিছু মিথ্যা বলতে হয়।আমি মিথ্যা বলব না। আমি বলব একবার স্কুল থেকে একজন আমাকে নিতে এসেছিল, তার সঙ্গে আমি রিকশায় করে ঘুরেছি।লইয়ার চাপা গলায় বললেন, আমি তোমাকে যা শিখিয়ে দেব তুমি তাই বলবে। এর বাইরে একটা কথাও বলবে না।আপনি আমাকে মিথ্যা কথা বলা শেখাচ্ছেন? আরে যন্ত্রণা! তুমি কি মিথ্যা বলো না? বলি।তাহলে মিথ্যা বলতে সমস্যা কোথায়?

অন্য কেউ যে মিথ্যা শিখিয়ে দেয় সেই মিথ্যা আমি বলি না।ভালো যন্ত্রণায় পড়লাম তো! রনি বলল, আপনি পড়েছেন ভালো যন্ত্রণায় আর আমি পড়েছি খারাপ যন্ত্রণায়।তুমি তো খুবই ত্যাঁদড় ছেলে।ত্যাঁদড় ছেলে মানে কী? মানে টানে বলতে পারব না। তোমার মা-বাবাকে পাঠাও।তাঁদেরকে কীভাবে পাঠাব? তাদের বলবে যে আমি কথা বলতে চাই। তারা তো বাসাতেই আছেন।তারা বাসায় নেই। কোথায় গেছেন?

কোথায় গেছেন কীভাবে বলব? মৃত্যুর পর মানুষ কোথায় যায় তা তো আমি জানি না।ওহ মাই গড! তুমি আসলেই ত্যাঁদড় ছেলে। আমি তোমার রিয়েল বাবা-মার কথা বলছি না। তাঁরা যে মারা গেছেন তা আমি জানি। যে মার সঙ্গে তুমি বাস করছ তাদের কথা বলছি। যাও এক্ষুনি তাদের আসতে বলো।

রনি বের হয়ে এল। তার মন সামান্য খুঁতখুঁত করছে। মাথায় ঘুরছে ত্যাঁদড়। এই শব্দটার মানে কী জানা হলো না। নিশ্চয়ই খুব খারাপ কিছু। স্কুলে বাংলা মিসকে বললে তিনি কি বলতে পারবেন? শব্দটার মানে যদি মিস জানেন তাহলে অবশ্যই বলতে পারবেন। মানে না জানলে রেগে যাবেন। ধমক দিয়ে বলবেন, সবসময় আজেবাজে প্রশ্ন কর কেন?

 

Read more

ছেলেটা পর্ব-০৫ হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *