(ছোটগল্প )-মনিকা শকুন্তলা

(ছোটগল্প )-মনিকা শকুন্তলা

(ছোটগল্প )
✏✏মনিকা শকুন্তলা

দিপান্বিতাকে খুব মনে পড়ে। দিপান্বিতা আমার বাল‍্যসখী ছিল। আমি রাহুল বলছি। তোমাদের জীবনে কত বিজয়া দশমী এসেছে। কত দেবী বিসর্জন তোমরা দেখেছো।

কিন্তু আমি দেখেছি দিপান্বিতার শাখা সিঁদুর বিসর্জন সেই সাথে নিজের অন্তর্লীন হয়ে যাওয়া…
কি আশ্চর্য! কি অদ্ভূত ছিল সেই অনুভূতি সেটা বলে বোঝানোর মতো নয়।

দিপান্বিতাকে সংক্ষেপে দিপা বলে ডাকতাম আমরা। বলতে পারো ওটা ওর সার্বজনীন নাম ছিল। শুধুমাত্র স্কুলের স‍্যার ম‍্যাডামকে দেখতাম পুরো নাম ধরে ডাকতে।

এমনটাই হয়। বড় ধরনের বর্ণমালা বিশিষ্ট নাম কে আমরা কেটেছেঁটে ছোট করে সাজিয়ে নেই। এতে সুখ পাই এজন‍্য যে শব্দ কমে যায়। তাছাড়া আদরণীয় একটা ভাবের প্রকাশ হয়।

যাই হোক মূল প্রসঙ্গে আসি। তো দিপার সাথে আমাদের সখ‍্যতা বাল‍্যকাল থেকেই। কেননা সে তো একই গাঁয়ের মেয়ে। একসাথে পদ্মপুকুরে ঝাঁপিয়ে পড়া, একসাথে পেয়ারা চুরি করে ওর আঁচলে বেধে রাখা আবার একসাথেই বিদ‍্যালয়ে বিদ‍্যারম্ভ।

সব মিলিয়ে দিপা আমি আর প্রতিবেশী পরাণ এই তিনজন ছিলাম প্রাণের বন্ধু। কখন যে দিপা আর পরাণের মন বিনিময় হয়েছিল আমি ঠিক বলতে পারিনা।

তবে পরবর্তীকালে পরাণ দিপার শুভ বিবাহ সুসম্পন্ন হয়। খুব আনন্দ করেছিলাম আমরা।
সেই আনন্দের রেশ খুব বেশি দিন ছিল না।

কয়েক বছর পরই দেবী বিসর্জনের মতো শাখা সিঁদুরের বিসর্জন হয় দিপার। সেই সাথে দিপা নিজেও…
আমি তখন গ্রামের বাজারে ছোট একটা ব‍্যবসা শুরু করেছি। সকালে যাই আবার বিকেলবেলা বাড়ি ফিরে আসি।

আশ্চর্যজনকভাবে সেদিন ছিল দূর্গাপূজোর দশমী। বিকেল থেকেই দেবী বিসর্জনের আয়োজন চলছিল।
তখন কি আমরা কেউ ভেবেছিলাম আজ আমাদের দিপা এবং পরাণকেও চিরতরে বিসর্জন দিতে হবে।

বিকেলে ঘরে ফিরেই শুনলাম পরাণ সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে। তার দেহের অন্তিম সৎকারের সমস্ত আয়োজন চলছে তখন। আমি কাল বিলম্ব না করে সামিল হলাম শ্মশ্মানঘাটে।

হঠাৎ নিথর রক্তাক্ত দেহটা দেখে ভয়ানক ভাবে শিউরে উঠলাম আমি। দিপা নাকি বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলো তখন বাড়িতে। খুব দ্রুততার সাথে শবদেহ সৎকার করা হলো।
ধীরপায়ে এগিয়ে যাচ্ছিলাম পুকুরঘাট ধরে।

সেই পুকুরঘাট যেখানে দিপা আমি পরাণ আরো অনেক বাল‍্যবন্ধু ভরদুপুরে ঝাঁপিয়ে পরতাম নাইতে। বৃষ্টিতে আমরা ভেলা ভাসাতাম। আবার শাপলা তুলে খোঁপায় পরে নিত দিপা। চোখের সামনে একের পর এক স্মৃতি ভেসে আসলো। উহ: আর সহ‍্য হচ্ছেনা এই যন্ত্রণা…

হঠাৎ দেখি দিপাকে সাদা ধবধবে শাড়ি পরিয়ে প্রায় জ্ঞানহীন অবস্থায় টেনে নিয়ে যাচ্ছে পুকুর ঘাটে।
সঙ্গে রয়েছে আরো দু তিনজন বিধবা এবং সাদা শাড়ি পরা রমণী। প্রত‍্যেকেই দিপার আত্মীয়া।

কোনো এয়োস্ত্রী আসেনি সাথে। এয়োস্ত্রী মানে হলো সধবা রমণী। যাদের হাতে শাখা পলা আর কপালে স্বামীর দেয়া সিঁদুর আছে তারাই এয়োস্ত্রী।
গ্রাম অঞ্চলে প্রবাদ আছে সদ‍্য বিধবা রমনীকে শাখা সিঁদুর বিসর্জনের জন‍্য পুকুর ঘাটে নিয়ে যাবে কোনো বিধবা নারী।

কখনোই সধবা নারী সাথে যাওয়া মঙ্গলজনক নয়। কে জানে তারও যদি আবার এমন কপাল বরণ করতে হয়।
হায়রে নিয়তি!
হায়রে বিশ্বাস!
হায়রে কুসংস্কার!
আর কবে ঘুচবে এসব…

তারপর দিপার হাত থেকে একে একে শাখাপলা চূর্ন করা হলো পুকুরধারে। পাথরের আঘাত শঙ্খের চুড়িকে দ্বিখন্ডিত করলো। ভেঙে গেলো রক্তবর্ণা পলাজোড়া।

ঠিক যখন সিঁথির সিদুর মুছে দিচ্ছিলো সবাই মিলে তখন একবার মাত্র আর্তচিৎকার দিয়ে উঠলো দিপা।
না না না…

আর কিচ্ছু বলতে পারেনি। সম্পূর্ণভাবে জ্ঞান হারিয়ে লুটিয়ে পরে পুকুরের শান্ত জলে। তরঙ্গায়িত হয় জলের ঢেউ। কিছুক্ষণ আগে এই জলেই পরাণের দেহ মিশে গেছে ভস্মীভূত হয়ে।

যেনো একাকার হয়ে গেলো দুজন মিলেমিশে। ওদিকে গোধূলি বেলা বয়ে যাচ্ছে। ঝুপঝাপ পদ্মপুকুরে বিসর্জন হচ্ছে দেবী প্রতিমা। পরাণ দিপা আর দূর্গাদেবীর কাঠামো একসঙ্গে জলে বিসর্জন হয়ে গেলো।

আমি দেখছি…
কেবল দেখছি…
হঠাৎ কানে শব্দ এলো পেছনে আমার স্ত্রী কেঁদে কেঁদে বলছে শাখা সিঁদুর বিসর্জনের এমন মর্মান্তিক দৃশ্য কেউ কখনো দেখেনিগো…
কেউ দেখেনি…

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *