হুমায়ূন আহমেদের লেখা ”তুমি আমায় ডেকেছিলে ছুটির নিমন্ত্রণে ”খন্ড-২৬

সুরুজ মিয়া বললেন- ফিরতে খুব সমস্যা হবে আম্মা। বেজায় সমস্যা , ফিরতে হবে উজানে। শাহেদ বলল তখন দেখা যাবে । ফেরার সময় আসুক, তারা নেমে পরল। শ্রাবণী বলল আমরা কোন একটা গাছের নিচে বসি। আপনার ,চলুন শাহেদ ভাই , 

তুমি আমায় ডেকেছিলে ছুটির নিমন্ত্রণেদায়িত্ব হচ্ছে সুন্দর একটা গাছ খুজে বের করা। আপনি ক্যামেরা এনেছেন না। এনেছি। তাহলে চুপচাপ বসে আছেন কেন আমার দারুব লাগছে। ছবি তুলুন। ইস ? তােমার পায়ের ব্যার্থী কি সেরে গেছে? সারেনি। এখনাে ব্যাথা নিয়েই হাঁটছি। আর আপনি এমনই মানুষ যে একবার ভদ্রতা করেও বলেন নি , শ্রাবণী ?

কি আপনি চান না আমি আপনার হাত ধরি-আমার হাত ধরে ধরে হাঁট। না , শাহেদ বলল কষ্ট করার দরকার নেই। আমার হাত ধর ।, এটা বলতে গিয়ে আপনার গলা কিন্তু কেঁপে গেছে শাহেদ ভাই। গলা কাঁপবে কেন? 

শ্রাবণী খিল খিল করে হাসছে। শাহেদ বলল দেখি আমার হাত ধর তাে।, শ্রাবণী বলল- আমাদের স্পিড় বােটের চালককে দেখুন !কেউ আবার কিছু মনে করবে না তাে , কেমন ড্যাব ড্যাব করে তাকাচ্ছে। তাতে কিছু যায় আসে না। শাহেদ বলল?খুশি লাগছে কে-তােমাকে এত খুশি , 

জানি না কেন। জ্বর আছে বলেই হয়ত। পায়ে জ্বর থাকলে আমার খুব ফুর্তি লাগে। তুমি অত মেয়ে। শ্রাবণী শাহেদের হাত ধরল। শাহেদ বলল তােমার হাত এত গরম কেন , জ্বর এসেছে স্বভাব খুবই প্রবল।-ড্রাপনি কি জানেন যে আমার মধ্যে ভালুক, এই জন্য গরম । শাহেদ ভাই , সেটা আবার কি? ভালুকদের ঝপ করে জ্বর আসে। আবার ঝপ করে চলে যায়। আমার এখন জ্বর এসেছে। আবার চলেও যাবে। 

তুমি আমায় ডেকেছিলে ছুটির নিমন্ত্রণে-খন্ড-২৬

তারা একটা শিমুল গাছের কাছে এসে দাঁড়াল। শ্রাবণী বলল ,এই গাছটা আমার পছন্দ হয়েছে। আসুন , 

এই গাছে নিচে বসে চা খাওয়া যাক। শাহেদ বলল গাছটা কাঁটায় ভর্তি। শ্রাবণী বলল শাহেদ ভাই। ,কাঁটা ভর্তি গাছই আমার ভাল লাগে। গােলাপ গাছও কাঁটা ভর্তি, হু। 

আপনি কি আপাকে বিয়ের ব্যাপারে সব ঠিকঠাক করে ফেলেছেন? কেন বল তাে? এমনি জিজ্ঞেস করছি। 

শাহের প করে রইল। শ্রাবণী বলল, সব ঠিকঠাক ঠিকঠাক করে না ফেলে নিজেকে ভাল করে জিসে – কতখানি ভালবাসা আলাদা করে রেখেছেন। 

শাহেদ বলল, ঐ প্রসঙ্গ থাক। ‘ঐ প্রসঙ্গ থাকবে কেন? আপনার কি মনে হয় না ঐ প্রসঙ্গটা খুব । 

আজ থাক। অন্য সময় আলাপ করব। আজ হৈ চৈ করতে এসেছি। করি।’ 

শ্রাবণী কয়েক মুহুর্ত চুপ করে থেকে বলল, আপাকে ফেলে এসে আপনি এ সঙ্গে হৈ চৈ করছেন, আপনার খারাপ লাগছে না? 

“আচ্ছা শ্রাবণী, তুমি কি শুরু করেছ বল তাে! চা দাও। চা খাও। শ্রাবণী বলল, আসুন, গান শুনতে শুনতে চা খাই।’ শাহেদ বিস্মিত হয়ে বলল, তুমি গান গাইবে গান জান তুমি? 

‘মােটামুটি জানি তবে না জানার মতই। দরজা বন্ধ করে যখন গান গাই ও হয়— ভালই তাে হচ্ছে- খােলামাঠে গান কেমন লাগবে জানি না। রিস্ক নিতে চান, আমি কাঁধের ঝােলায় একটা ক্যাসেট প্লেয়ার নিয়ে এসেছি। আপনার কি ধরৰে পছন্দ? রবীন্দ্র সংগীত না ধুম-ধাড়াক্কা । আমার কাছে সবই আছে । 

শ্রাবণী গান দিয়ে দিল। অরুন্ধতী হােমের গলায় অপূর্ব গান— ওকে ধরিলে তাে ধরা দেবে না— ওকে দাও ছেড়ে দাও ছেড়ে একি খেলা মােরা খেলেছি, শুধু নয়নের জল ফেলেছি– 

শাহেদ অবাক হয়ে দেখল, শ্রাবণীর চোখ ভিজে উঠেছে। সে অবাক হয়ে শ্রালার দিকে তাকিয়ে রইল। কি অপূর্ব লাগছে এই শ্যামলা মেয়েটিকে! 

শ্রাবণীর চোখ দিয়ে টপ টপ করে পানি পড়ছে। সে অশ্রুজল লুকানাের কোন চেষ্টা করছে না। 

তুমি আমায় ডেকেছিলে ছুটির নিমন্ত্রণে-খন্ড-২৬

জাহানারার ঘর অন্ধকার । তিনি দরজা-জানালা সব নিজের হাতে বন্ধ করেছেন। নবনী অন্ধকার ঘরে তার মার পাশে বসে আছে। তার কেমন ভয় ভয় লাগছে। তার মনে হচ্ছে—মা যেন ঘােরের জগতে চলে যাচ্ছেন । কথাবার্তা ছাড়া ছাড়া । মা’র মধ্যে কি কোন পাগলামি ভর করেছে? কেমন তীক্ষ্ণ গলায় কথা বলছেন। যেন মা না, অন্য কেউ । নানা বলল, এরকম করছ কেন? 

তােকে একটা কথা বলব।’ এমন কি কথা যে বলার জন্যে দরজা বন্ধ করতে হবে? কিছু কথা আছে অন্ধকারে বলতে হয়। আলােতে বলা যায় না।’ “মা, আমি শুনতে চাচ্ছি না।’ ‘তােকে শুনতে হবে।’ 

 আমার ভয় লাগছে । 

তুমি আমায় ডেকেছিলে ছুটির নিমন্ত্রণে-খন্ড-২৬

জাহানারা তীব্র গলায় বললেন, ভয় আমারও লাগছে। জীবনটা কাটিয়ে দিয়েছি ভয়ে ভয়ে। আর ভাল লাগছে না। আমি মুক্তি চাই। আমি আরাম করে ঘুমুতে চাই । কত রাত আমি ঘুমুই না তুই জানিস? মা তুমি শুয়ে থাক। আমি তােমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছি। আমি তােমাকে ঘুম পাড়িয়ে দিচ্ছি। তুই আমাকে ঘুম পাড়াবি, তুই? জাহানারা উঠে বসলেন। হড় হড় করে বিছানা ভাসিয়ে বমি করলেন।

নবনী ভয় পেয়ে ডাকল – মিলু বুয়া! মিলু বুয়া জাহানারা কঠিন গলায় বললেন, ওকে এখন ডাকিস না । আমার কথা শেষ হােক, তারপর ডাকবি। শােন নবনী, ঐ মিলুর বাচ্চা কাচ্চা কেন হয় না জানিস? এগারাে বছর হল বিয়ে হয়েছে। কোন ছেলেপুলে নেই। হবেও না কোন দিন। কেন তুই শােন? মা প্লিজ! খবরদার, প্লিজ বলবি না। খদার বললাম, আমার কথা শেষ করতে দে। মিলুর যখন সতেরাে বছর বয়স তখন ওর পেটে বাচ্চা এসে গেল। তার অতি ব্যস্তু বাবা নিজে তাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেল

 

Read More

হুমায়ূন আহমেদের লেখা ”তুমি আমায় ডেকেছিলে ছুটির নিমন্ত্রণে ”শেষ-খন্ড

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *