হুমায়ূন আহমেদের লেখা ”তুমি আমায় ডেকেছিলে ছুটির নিমন্ত্রণে ”শেষ-খন্ড

বাচ্চা নষ্ট হল। তার বাবার বুদ্ধি তো খুব বেশি। কাজেই বুদ্ধি করে লাইগেশনও করিয়ে আনল। এতে খুব সুবিধা – ছেলেপুলে হবার ভয় নেই। যন্ত্রণা নেই। বুঝতে পারছিল কিছু? কাল রাতের কথা শুনবি? কাছে আয়, কানে কানে বলি। মিলু আমার মাথা টিপে দিচ্ছিল। তাের বাবা তাকে আমার ঘর থেকে ডেকে নিয়ে গেল।

তুমি আমায় ডেকেছিলে ছুটির নিমন্ত্রণে কোন রকম লজ্জা নেই, কোন সংকোচ নেই। স্বাভাবিক একটা ব্যাপার। এই স্বাভাবিক ব্যাপার রাতের পর রাত, বছরের পর বছর চলছে। আমরা যখন বাইরে কোথাও যাই – মিলুকে সঙ্গে নিতে হয়। নবনী, আমার কথা বুঝতে পারছিস রে বােকা মেয়ে? জাহানারা আবারাে হড় হড় করে বমি করলেন। নবনী ফিস ফিস করে বলল, মা তুমি অসুস্থ। জাহানারা বললেন, হাঁ, আমি অসুস্থ। বাকি সবাই সুস্থ।

তাের বাবা সুস্থ, তুই সুস্থ, শ্রাবণী সুস্থ। শুধু আমি বাদ পড়ে আছি। শুধু আমি। আমার চিকিৎসা দরকার। আমার খুব ভাল চিকিৎসার দরকার। মা প্লিজ! খবরদার, আমার কাছে আসবি না। যা দরজা খােল । তাের বাবাকে ডেকে আন, পুলিস দুটাকে ডেকে আন। আনসারদের ডেকে আন। চেয়ারম্যান সুরুজ মিয়াকে আন। যে যেখানে আছে সবাইকে ডাক। আমি সবাইকে বলব । জনে জনে ডেকে বলব। তারপর ঘুমুব। ঘুমে আমার চোখ বন্ধ হয়ে আসে কিন্তু আমি ঘুমুতে পারি না। দরজায় শব্দ হচ্ছে।

মিলু ক্ষীণ গলায় ডাকল – আম্মা দরজা খুলেন । কি হইছে আম্মা? জাহানারা চাপা গলায় বললেন, মেয়েটা আমারে আম্মা ডাকে। মিষ্টি করে আম্মা ডাকে। দরজা খুলে দে নবনী। আমার মেয়ের জন্য দরজা খুলে দে। নবনী দরজা খুলে বের হয়ে এল। তার সারা শরীর থর থর করে কাঁপছে। নবনীর পেছনে পেছনে জাহানারা বের হয়ে এলেন। উঁচু গলায় বললেন – তােমরা সবাই কোথায় – আমার কথা শুনে যাও । আস সবাই। আস খুবই মজার গল্প। হি হি হি। 

তুমি আমায় ডেকেছিলে ছুটির নিমন্ত্রণে-শেষ-খন্ড

নবনী একা একা বটগাছের গুড়ির বাঁধানাে অংশে বসে আছে। রাত অনেক হয়েছে। আকাশে চাঁদ উঠেছে। চারদিকে সুন্দর জোছনা। নবনীর মনে হচ্ছে সে একটা দুলের ডের আছে। বৃক্ষের দুর্গ। এই দুর্গ ভেদ করে কেউ তার কাছে আসতে পারে না। ক্রমাগত ঝিঝি ডাকছে। শীতের বাতাস বইছে। নবনীর ঘুম পাচ্ছে। তার খুব ইচ্ছে করছে এখানে ঘুমিয়ে পড়তে। এত ক্লান্তি লাগছে। কিন্তু তার মন শান্ত। মনে হচ্ছে তার কোন দুঃখবােধ নেই। সে কি নিজেই গাছ হয়ে যাচ্ছে গাছেদের জীবনে নিশ্চয়ই কোন তীব্র দুঃখবােধ থাকে না। 

‘আপা!’ 

নবনী তাকাল । শ্রাবণী এসেছে। সে আসবে নবনী জানতাে। সে শ্রাবণীর জন্যেই অপেক্ষা করছিল। শ্রাবণী এসে বসল বােনের পাশে। নবনী বলল, দেখেছিস কি সুন্দর! 

শ্রাবণী বলল, হ্যা। 

নবনী বলল, ইংরেজির ঐ অধ্যাপক ভদ্রলােকের মত আজ সারারাত আমি এখানে বসে জোছনা দেখব। 

শ্রাবণী বলল, আমিও দেখব। আমি তােমার জন্যে চাদর নিয়ে এসেছি, আপা। নাও, চাদরটা গায়ে দাও। 

নবনী কোন আপত্তি করল না। চাদর গায়ে দিল । শ্রাবণী বলল, আপা শােন, আমার দিকে তাকাও। আমার দিকে তাকিয়ে একটা কথা শােন। 

নবনী তাকাল। শ্রাবণী খুব সহজ স্বরে বলল, এই পৃথিবীতে তােমার চেয়ে বেশি আমি কাউকে পছন্দ করি না। তুমি যে কত ভাল একটা মেয়ে তা শুধু আমি জানি। আর কেউ জানে না। কেউ কোন দিন জানবেও না। আমি কি তােমাকে কষ্ট দিতে পারি আপা? ভুলেও ভেব না তােমার প্রিয়জনকে আমি কেড়ে নেব ! তােমার যে প্রিয় সে আমারও প্রিয়। 

নবনী ছােট্ট করে নিঃশ্বাস ফেলল। 

তুমি আমায় ডেকেছিলে ছুটির নিমন্ত্রণে-শেষ-খন্ড

শ্রাবণী বলল, আমি তােমার জন্যে অসম্ভব সুন্দর একটা জীবন চাই। এমন সুন্দর জীবন, যা শুধু গল্পে উপন্যাসে পাওয়া যায় । আমি কখনাে চাই না, তােমার জীবনটা মা’র মত হয়। আমি যা করেছি এই জন্যেই করেছ। তােমার যত ভ্রান্তি ছিল সব দূর করে দিলাম। এমনিতে তুমি কিছু বুঝতে পারছিল না কাজেই খুব কঠিনভাবে তােমাকে বুঝিয়ে দিলাম। 

মা’র ব্যাপারটা তুই জানতি?’ ‘কেন জানব না, আপা? আমার অনেক বৃদ্ধি।’ 

নবনী কাঁদতে কাঁদতে বলল, আমি এত বােকা হয়েছি কেন রে শ্রাবণী? আল্লাহ কেন আমাকে এত বােকা করে বানালাে। 

নবনী কুঁপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদছে। শ্রাবণী তার বােনকে শক্ত করে দু’হাতে জড়িয়ে ধরে রেখেছে। শ্রাবণীকে এখন একটা বৃক্ষের মতই লাগছে। যেন সে বােনের চারদিকে কঠিন দেয়াল তুলে দিয়েছে। যেন এই দেয়াল ভেদ করে পৃথিবীর কোন মালিন্য নবনীকে স্পর্শ করতে না পারে। 

 আকাশ থেকে জোছনা গলে গলে পড়ছে। শীতের বাতাসে যেন সেই জোছনা ভাসতে ভাসতে ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে। শাবণী ফিস ফিস করে বলল, কাঁদে না আপা। কাঁদে না।

 

Read More

ফিহা সমীকরণ-হুমায়ূন আহমেদ -(পর্ব-১)

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *